পোষ্যদের মধ্যে স্থূলতার সমস্যা অন্যতম পরিচিত। এর জন্য তাদের বেশি খাওয়ানো এবং পাশাপাশি শারীরচর্চা না করানোর মতো কারণই মুখ্য। তা ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে হরমোনের সমস্যা ও আরও কিছু জিনগত অসুখ পোষ্যদের ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ওজন নিয়ন্ত্রণ না করলে তা এমন পর্যায়ে পৌঁছয়, যা ডেকে আনে বিভিন্ন অসুখ। পশুরোগ বিশেষজ্ঞ গৌতম মুখোপাধ্যায় জানালেন, ইদানীং ছোট ফ্ল্যাটের পরিসরে পোষ্যদের ছোটাছুটি করার অবকাশ কমে আসায় এই সমস্যা খুব বেশি করে চোখে পড়ে। তবে একটু সচেতন থাকলে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
এখন নিজস্ব বাড়ি বা বাগান খুব কম লোকেরই থাকে। বেশির ভাগ সময়ে ফ্ল্যাটের ভিতরেই বেড়ে ওঠে পোষ্যরা। তাই দিনে এক-দু’বারের বেশি ওদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার অবকাশ হয় না। প্রায় সারা দিনই বাড়ির ভিতরে কেটে যায়। “চলাচল কম হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই ভালবেসে পোষ্যকে বেশি খাওয়ান। পাগ, বুলডগ, ল্যাব, রিট্রিভারের মতো কুকুরের ব্রিড সাধারণত খেতে খুব ভালবাসে। এ ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে পোষ্যের মালিককেই,” বললেন ডা. মুখোপাধ্যায়।
স্থূলতার কারণ
বেশি খাওয়া, কম শারীরচর্চা তো আছেই, তা ছাড়া হাইপোথাইরয়েডের মতো হরমোনের সমস্যা পোষ্যদের স্থূলতার অন্যতম কারণ। কুশিং ডিজ়িজ়ের মতো হরমোনাল অসুখের ফলেও পেটের অংশ ফুলে ওঠে কুকুরদের। স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ বেশি খেলেও ওদের মোটা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
প্রভাব সুদূরপ্রসারী
কম বয়স থেকেই ওজন নিয়ন্ত্রণে না রাখলে পরে গিয়ে তা কমানো মুশকিল হতে পারে। কুকুর বা বিড়ালের দেহে বেশি পরিমাণে চর্বি জমলে কতকগুলি অসুখ মাথাচাড়া দেয়। পায়ের অস্থিসন্ধিতে চাপ পড়ার ফলে আর্থ্রাইটিস দেখা যায়, যা চলাফেরায় প্রভাব ফেলে। তখন পোষ্যরা সামান্য দৌড়লে বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলেই হাঁফিয়ে ওঠে। পায়ের আকার বিকৃত হয়ে যায়। এর থেকে হিপ ডিসপ্লেসিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। টাইপ টু ডায়াবিটিসও এই স্থূলতার অন্যতম ক্ষতিকর প্রভাব।
পেটে চর্বি জমলে যকৃতে চাপ পড়ে, তা থেকে ফ্যাটি লিভার হতে পারে। কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
নিয়ন্ত্রণের উপায়
খাদ্যতালিকা নতুন ভাবে তৈরি করুন। ডা. মুখোপাধ্যায় জানালেন, পোষ্যকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার দেওয়া অভ্যেস করুন। “খাওয়ার টেবিলের উদ্বৃত্ত খাবার পোষ্যকে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। অনেকে প্লেট থেকে মাছের তেল কিংবা মাংসের চর্বিটা পোষ্যদের দিয়ে দেন। ওদেরও এটা অভ্যেস হয়ে যায়, ফলে আবদারও বেড়ে যায়। এটা বন্ধ করতে হবে,” বললেন ডা.মুখোপাধ্যায়। তা ছাড়া পোষ্যদের কোনও কাজ করানোর জন্য বা ভোলানোর জন্য অনেকে ট্রিট দেন। এগুলি বেশি পরিমাণে দিলে ওজন বাড়বেই। হাই ক্যালরি যুক্ত ট্রিট বেশি দিলেই পোষ্য মোটা হয়ে যাবে। ওরা চিউ বোন খেতেও খুব ভালবাসে। এই ধরনের আবদারে যত কম প্রশ্রয় দেবেন, ততই ভাল।
খাদ্যতালিকায় নজর
পশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী পোষ্যের খাদ্যতালিকা তৈরি করুন ও তা কঠোর ভাবে মেনে চলুন। পোষ্য মাংসাশী হলে প্রোটিনসমৃদ্ধ ডায়েট তৈরি করতে হবে। ভাত, ডাল বা চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খাওয়ালেই মেদবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে। দুধ সহ্য না হলে তার বদলে ছানা বা দই দিতে পারেন। জলখাবারে দই-ওটসের মতো খাবার অভ্যেস করান। যাঁরা কমার্শিয়াল ফুড খাওয়ান পোষ্যকে, তাঁরা প্যাকেটের গায়ে লেখা ব্রিড ও বয়স অনুযায়ী খাওয়াবেন। অ্যান্টি ওবেসিটি কমার্শিয়াল ফুডও পাওয়া যায়। মিষ্টি খাবার, ভাজাভুজি, চকলেট, আইসক্রিম একেবারে বর্জনীয়।
খাবারের পরিমাণও আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালবেসে বেশি খাওয়ালে তা পরোক্ষে আপনার পোষ্যেরই ক্ষতি করবে। অনেক সময়ে ওরা আবদার করলেও বেশি খাওয়ানো চলবে না। ডা. মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বললেন, “বেশি খাওয়ানোর অর্থই ভালবাসা নয়, বরং পরিমিত আহারই পোষ্যের সুস্থতার চাবিকাঠি।”
শারীরচর্চার অভ্যেস
রোজ সকালে ও রাতে দু’বেলা ওদের নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরোতে হবে। ওদের সঙ্গে খেলা, হাঁটাতে নিয়ে যাওয়ার সময়-সুযোগ থাকলে তবেই বাড়িতে বড় ব্রিডের কুকুর কেনা উচিত। বাড়ির কাছে মাঠ বা পার্ক থাকলে সেখানে নিয়ে গিয়ে বল, রিং, খেলনা দিয়ে ওদের দৌড় করান। যদি সম্ভব হয়, সাঁতারেও ভর্তি করানো যায় কুকুরদের। এতে সার্বিক স্বাস্থ্যও খুব ভাল থাকবে। নানা রকমের গ্রুমিং এক্সারসাইজ় হয়, তা শিখে নিয়ে শেখাতে পারেন নিজের পোষ্যকে।
ডা. মুখোপাধ্যায় জানালেন, সব কিছু মেনে চলার পরেও যদি দেখা যায়, পোষ্যের ওজন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা হলে রক্তপরীক্ষা করানো দরকার। “টিথ্রি, টিফোর, টিএসএইচ, লিপিড প্রোফাইল ও আরও কিছু হরমোনাল টেস্ট করিয়ে তখন আমরা দেখি,অন্য কোনও অসুখ হয়েছে কি না। অনেক সময়ে কিছু সাধারণ হরমোনাল ট্রিটমেন্ট করালেই ওজন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। চিকিৎসকের কাছে প্রথমেই নিয়ে আসা এ ক্ষেত্রে খুব জরুরি,” বললেন ডা. মুখোপাধ্যায়।
পোষ্যদের আটকে রাখার বদলে যতটা সম্ভব খোলা জায়গায় ছেড়ে রাখার ব্যবস্থা করুন। ওদের শরীর, মন দুই-ই ভাল থাকবে এতে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)