E-Paper

গরমকাল সরগরম!

আমাদের কৈশোরে গরম ছিল এক বিস্ময় আর মজার খনি। কালবৈশাখীর স্নিগ্ধ সোঁদা গন্ধ আর কাঁচা-মিঠে আম খাওয়ার সেই সব দুপুর আর ফিরবে না কখনও। পিছু ফিরে দেখলে মনে হয়, গরমকাল মানেই সারা জীবনের স্মৃতির ঝাঁপি

সুবর্ণ বসু 

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ১১:২১
ছবি: কুণাল বর্মন।

ছবি: কুণাল বর্মন।

আশির দশকে যাদের জন্ম আর নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা, তারা জানে, আমাদের কৈশোরে গরম এমন ভয়ঙ্কর ছিল না। একবার মার্চের শেষে স্কুলের টিফিনব্রেকে খেলাধুলো করে ঘেমেনেয়ে এসে আমরা ক্লাসে পাখা চালিয়েছিলাম। পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অলকবাবু এসে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “সর্দিগর্মি ধরাবি নাকি! এপ্রিল মাসের আগে যেন পাখার সুইচে হাত না পড়ে।” বলে পটাপট সব পাখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

এখন মার্চের শুরু থেকেই পাখা চালাতে হয়। আমাদের সেই সব গ্রীষ্ম উজ্জ্বল ছিল, কিন্তু জ্বালাময়ী ছিল না। সারা দিনের শেষে যখন ঠান্ডা সন্ধে নামত, গঙ্গার দিক থেকে বয়ে আসত ঠান্ডা হাওয়া। বিকেলের খেলাধুলোর পর গায়ের ঘাম গায়েই শুকোত। বাড়ি ফিরে হাত-পা ধুয়ে শসা-মুড়ি খেয়ে পড়তে বসতাম। গরমে চৌবাচ্চায় ধরে রাখা সময়-কলের ঠান্ডা জলে বার তিনেক চান করার স্বাধীনতা ছিল।

​রোদের দুপুর আর সিঁড়ির ক্রিকেট

​গরমের ছুটি পড়লেই মনে খুশির তুফান উঠত। সকালের নামমাত্র লেখাপড়া সেরেই মাথায় তেল মেখে চান। তার পরই বড়ঘরে। শ্যামবাজার বাড়ির মাঝখানের হলঘরটাতেই রাখা থাকত সাদা-কালো টিভিটা। সেখানেই বারোটা থেকে আরম্ভ দূরদর্শনের ‘ছুটি ছুটি’। এক ঘণ্টার সেই অনুষ্ঠানে কত যে ভাল ভাল ছবি দেখেছি, তা বলে শেষ করা যাবে না। ছবিগুলো ভেঙে ভেঙে দু’দিন কিংবা তিন দিনে দেখানো হত, তা-ও উত্তেজনারঅন্ত ছিল না। এখন ইউটিউবে যখনইচ্ছে, যা ইচ্ছে দেখে নেওয়া কৈশোর কোনও দিন বুঝতেও পারবে না, সেই দিনগুলো কেমন হত।

দুপুরটা ছিল নিষিদ্ধ অ্যাডভেঞ্চারের সময়। মা-জেঠিমাদের কড়া নির্দেশ থাকত, ‘এই রোদে বাইরে বেরোবে না, লু লাগবে।’ মায়েরা যখন দিবানিদ্রায় মগ্ন হতেন, তখনই শুরু হত আমাদের দুপুরের সিঁড়ি-ক্রিকেট। ল্যান্ডিংয়ের উপরে দাঁড়িয়ে ব্যাট, তার নীচের ল্যান্ডিং থেকে বল। সারা দুপুর ২৫ গ্রামের প্লাস্টিক বলের টকাটক আওয়াজে মুখর হয়ে উঠত বাড়ি। শুধু শনি-মঙ্গলবার সিঁড়িতে খেলা, ছুটোছুটি করা বারণ ছিল। কেন, সে কথায় আসছি একটু পরে।

​কালবৈশাখীর দুপুরের কথা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। আকাশ হঠাৎ নীল থেকে ধূসর, তার পর ঘোর কালো হয়ে যেত। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর ধুলোর ঝড় শুরু হয়ে যেত। প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা যখন উত্তপ্ত মাটিতে পড়ত, আশ্চর্য এক সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে যেত বাতাস বেয়ে। ঝড়ে আম কুড়নো হয়নি কখনও, তবু বাজার থেকে কেনা কাঁচা-মিঠে আম খাওয়া হত সবাই মিলে, নুন-লঙ্কা দিয়ে। সন্ধের মুড়ি মাখার সময় ঢালা হত আচারের বয়ামের আমতেল। ঠান্ডা হাওয়ায় ভাইবোনেরা ঝুব্বুস হয়ে বসতাম। আর গল্প শুনতাম।

​সন্ধের টিভি, লোডশেডিং আর গল্প

স্মার্টফোনের মোহময় নীল আলো তখন কল্পনাতেও ছিল না। বিনোদন বলতে ছিল টিভি। আর সেই টিভি-র প্রধান শত্রু ছিল আশপাশের বাড়ির ডিসি পাখা আর লোডশেডিং। কারও কারও বাড়ি পাখা চালালে অন্যান্য বাড়ির টিভির ছবি নাচানাচি শুরু করে দিত, ছাদে উঠে অ্যান্টেনায় কসরত করতে হত। বুধবার সন্ধেয় কখনও লোডশেডিং হলে, গোটা পাড়া জুড়ে চাপা হাহাকার শোনা যেত। সন্ধেয় গানের অনুষ্ঠান ‘চিত্রহার’টা মিস হয়ে গেল যে! লোডশেডিংয়ে আশপাশের কয়েকটা বাড়ি থেকে রাস্তায় চেয়ার পেতে বসে গল্প করত বড়রা। আমরা রাস্তার আলো-আঁধারিতে ছুটোছুটি করে খেলতাম। সন্ধের পড়াটা হারিয়ে যেত রুটিন থেকে।

​নিজের বাড়িতে থাকলে ঠাম্মা আর মামার বাড়িতে থাকলে দিদু, এরাই ছিল লোডশেডিংয়ে ভয়ের গল্পের রেডিয়ো স্টেশন। দিদুর বলা চোর-ডাকাতের গল্প, দিনহাটার বাড়িতে সাপ আসার গল্প আর ঠাম্মার বলা বাগবাজারের বাঘাদাদু-ভুলোদাদুর বাড়ির ভূতের গল্প বারবার শুনেও পুরনো হত না। শ্যামবাজারে আমরা যে বাড়িটায় থাকতাম, সে বাড়িতেও নাকি ভূত ছিল। যেখানে আমরা সারা দুপুর ক্রিকেট খেলতাম, সেখানে নাকি অনেকদিন আগে একটা বাচ্চা ছেলে ঘুরে ঘুরে খেলত, কেউ কাছে গেলেই সে হাওয়ায় মিলিয়ে যেত। পরে ওঝা ডেকে সিঁড়িবন্ধন করানো হয়েছিল। তার পরেওশনি-মঙ্গলবার কেউ সিঁড়িতে পড়ে গেলে তার জ্বর আসত। তাই শনি-মঙ্গলের দুপুরে সিঁড়িতে খেলা বারণ ছিল।

​গরমের খাওয়াদাওয়া আরআচার-শরবত

​গরমকাল মানে আমাদের বাড়িতে খাবারের পাতেও আসত নানা পরিবর্তন। ডুমো ডুমো করে কাটা লাউ কিংবা পেঁপে দিয়ে মাছের ঝোল, কাঁচা আম দেওয়া টকের ডাল আর আমের চাটনি। গরমের পছন্দের আমিষ পদ ছিল মৌরলা মাছের টক আর মাছের ডিমের টক। নিরামিষের দিন আলু-ঝিঙে-পোস্ত আর পাঁপড়ভাজা। পান্তাও খাওয়া হত ছোট ছোট গোল পেঁয়াজ আর তেঁতুলের টক দিয়ে। কখনও কখনও বড়রা খেতেন বাড়িতে পাতা দই দিয়ে ভাত। দুপুরে কোনও কোনও দিন খাওয়া হত দইয়ের ঘোল। পুরো গরমটাই ছিল টকের রাজত্ব।

সন্ধের মুখে ​মাঝে মাঝে আসত কুলফি-মালাই বরফওয়ালা। কাচের বাক্সে লাল শালু দিয়ে জড়ানো থাকত বরফ জমানো মালাই। কারও গাড়িতে লেখা থাকত ‘দিলখুশ মটকা’। সেই তৃপ্তিটুকুর দাম এক টাকা কিংবা দু’টাকা। আর ছিল ‘বরফ-গোলা’। লাল-নীল শরবতে রাঙানো সেই বরফের কুচি খেলে জিভটা রঙিন হয়ে যেত, যা ডেকে ডেকে দেখাতাম বন্ধুদের। বাড়িতে কোনও কোনও দিন হত কাঁচা আমপোড়ার শরবত। সে আশ্চর্য স্বাদ কখনও ভোলার নয়।

ছড়ানো-ছেটানো মজার ঝাঁপি

​মাঝে মাঝে গ্রীষ্মের দিনে রাস্তায় আসত পিচের গাড়ি। দুপুর রোদে সে পিচ শুকোতে চাইত না। তার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে বাধ্য হতেন কেউ কেউ। কারও হাওয়াই চটি পিচে আটকে চটাস করে স্ট্র্যাপ ছেঁড়ার ঘটনা দেখে হা হা হি হি করতাম আমরা। এখন মনে হয়, যাকে চটি হারিয়ে ওই গরম রাস্তায় খালি পায়ে যেতে হত, তার কী কষ্টই না হত!

এক বার গরমের দুপুরে পাড়ার এক বন্ধুর মাথায় এল, গরম রাস্তার উপর পাত্র রেখে ডিম ফাটিয়ে দিলে নাকি ওমলেট হয়ে যায়। তিন-চারজন মিলে ডিম আর নুন জোগাড় করলাম। রাস্তার ধারে একটা প্লেট রেখে ডিম ফাটানো হল। আধঘণ্টা রোদে বসে থেকেও ওমলেট তো হলই না, উল্টে ডিম শুকিয়ে বিদঘুটে গন্ধ ছাড়ল। পরীক্ষা নিষ্ফল হওয়ায় আমরা খুবই হতাশ হয়েছিলাম।

চড়া রোদে জেঠুর দেওয়ালে টাঙানো ছোট আয়নাটা হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতাম। সমরেশ বসুর ‘গোগোল অমনিবাস’-এ একটা গল্প পড়েছিলাম, ‘আয়না নিয়ে খেলতে খেলতে’। তখন থেকে শখ হয়েছিল আয়না দিয়ে রোদের প্রতিফলন ঘটানোর। খাঁ খাঁ দুপুরে রাস্তায় লোকজন তেমন থাকত না যে, কারও চোখে আলো ফেলব। ফলে আমি আয়নার প্রতিফলিত আলোটাকে টর্চের মতো ব্যবহার করে খুঁটিয়ে দেখতাম সামনে মজুমদারদের কাঠগোলার অন্ধকার ভিতরটা। খালি চোখে দেখা না গেলেও, আয়নার আলোয় দেখা যেত একটা মাটির কুঁজো, তার উপর উল্টে রাখা নীল প্লাস্টিকের গেলাস, দড়িতে ঝোলানো লাল গামছা, কৃষ্ণঠাকুরের ক্যালেন্ডার— মনে মনে যেন আমিও গোগোল হয়ে উঠতাম। এখন কি আর বাচ্চাদের চোখ মোবাইলের গেমস পেরিয়ে দূরের কিছু দেখে? বলা মুশকিল।

অনেক দিন ছাদে চুপচাপ রোদেই বসে থাকতাম। বহু দূরে নীলচে সাদা আকাশে কেউ যেন একটা ঘুড়ি বেড়ে বসে থাকত। আমার মতোই একা একা সেই ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হত, ঘুড়িটাও যেন আমাকে দেখতে পাচ্ছে। অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম ঘুড়িটার দিকে। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও ঘুঘু ডেকে উঠত আনমনে।

​ফিরবে না আর কোনও দিন

বিশ্বের উষ্ণায়ন যে ভাবে বাড়ছে, এ যুগে গরমকাল মানেই অসহ্য ক্লান্তি আর ঘাম। এখন দুপুরবেলা আর কেউ ছাদে ওঠে না, বাইরে বেরোয় না। কালবৈশাখী এলে আমরা আর সোঁদা গন্ধে গভীর ভাবে শ্বাস নিই না। আকাশের কোনও রংবদল হঠাৎ ভুলক্রমে চোখে পড়ে গেলে মুগ্ধ হওয়ার আগে ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলে স্টেটাস দিই।

​কিন্তু আজও যখন রাস্তায় থাকার সময় হঠাৎ নাকে আসে কাঁচা-মিঠে আমের গন্ধ, কিংবা একটা সোঁদা গন্ধ, খুলে যায় স্মৃতির আগল। সেই ধুলোমাখা ছোটবেলা, সেই অকৃত্রিম আনন্দ ঝাঁপিয়ে ফিরে এসেদখল নেয় মন।

​সেই ফেলে আসা দিনগুলো আজ স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি। আমরা বড় হয়ে গেছি, দায়িত্ব বেড়েছে, কিন্তু বুকের ভিতরে এখনও সেই ছোট্ট ছেলেটা রয়ে গেছে, যে কালবৈশাখীর মেঘ দেখলে আজও দৌড়ে ছাদে উঠতে চায়। বেরিয়ে পড়তে চায় রাস্তায়। ছাদে উঠতে ইচ্ছে হয় একা একা। খুঁজতে ইচ্ছে হয় সেই একলা ওড়া ঘুড়িটাকে। শুনতে ইচ্ছে হয় সেই নির্জন ঘুঘুর ডাক।

আমি যেমন ওই ঘুড়িটাকে দেখতাম, ও-ও কি আমায় দেখতে পেত? সে কথা হয়তো জানা হবে না আর কোনও দিন।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Summer Season

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy