Advertisement
E-Paper

‘ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে,’ কৃষ্ণকলির সাঁওতাল শাড়ি আজ র‍্যাম্পে হেঁটে ভুবন ভোলাচ্ছে

সাঁওতালি শাড়ির বিবর্তন, আধুনিকীকরণ এবং প্রসারণের প্রচেষ্টায় লেগে পড়লেন লিপ্সা, গড়ে উঠল তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘গালাং গাবান’, যার অর্থ ‘নিষ্ঠা ভরে কিছু করা’।

শর্মিলা বসুঠাকুর

শর্মিলা বসুঠাকুর

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ১১:৩৭
When Santhali saree reaches the global space, the story of Lipsa Hembrem and her creations

সাঁওতালি শাড়ি নজর কাড়ছে শৌখিনীদের। — নিজস্ব চিত্র।

আজ আপনাদের এক সাঁওতাল মেয়ের গল্প শোনাই। ময়ুরভঞ্জের রাইরংপুর গ্রামে যাঁর জন্ম, সেই কৃষ্ণকলির যাত্রাপথের গল্প। তাঁর বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, পারিবারিক প্রেক্ষিত এবং তাঁর সফল কেরিয়ারের গল্প। আড়ে-বহরে ছোট, মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নিয়ে কী ভাবে সেই শৈলীর বৈভব, বিন্যাস এবং বাতায়নে নিয়ে এলেন নবদিগন্তের জোয়ার, সেই গল্প।

— নিজস্ব চিত্র

সেই সাঁওতাল কন্যার নাম লিপ্সা হেমব্রম। সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এই বিশিষ্ট ডিজ়াইনার তাঁর কালেকশন নিয়ে, ‘সাঁওতালি কথা’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। ট্র্যাডিশনাল সাঁওতাল পরিবারে জন্ম এই মেয়ের। পরবর্তী কালে ওড়িশার ভুবনেশ্বরে বেড়ে ওঠা। ভিন্‌দেশি শহুরে অভ্যাসে থেকেও সাঁওতাল রীতিনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতিতে আশৈশব লালিত লিপ্সা সর্বদাই নিজের কৌমের ঐতিহ্যবিন্দুকে ছুঁয়ে থাকতে চেয়েছেন তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে। হায়দরাবাদ নিফট (দ্য ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ফ্যাশন টেকনলজি) থেকে পাশ করে কাজ শুরু করেন। “একদিন আমার মা বললেন, আমাদের সাঁওতাল কস্টিউম বা কাপড় নিয়ে কিছু ভাবতে পারো না? ফরমাল ওয়্যার হিসেবে যে শাড়ি সবাই পরতে পারে,” বলেন লিপ্সা। সেই শুরু বুনন, ডিজ়াইন, রং, সুতো নিয়ে লিপ্সার নানা পরীক্ষানিরীক্ষা।

— নিজস্ব চিত্র

সাঁওতাল কাপড় বা কস্টিউম বলতে আমরা যা দেখি, তা আমাদের বারো হাত শাড়ির চেয়ে অনেক ছোট, তাঁতে বোনা একটু মোটা ধরনের কাপড়। ড্রেপিং বা পরার ধরনও আলাদা। আমাদের মতো কুঁচি দিয়ে পরার রীতি বা উপায় (ছোট কাপড় বলে) কোনওটাই ছিল না। আগে শরীরের উপর এবং নীচের অংশের জন্য আড়াই মিটার আর দুই মিটার আলাদা আলাদা দুটো কাপড় ব্যবহৃত হত। পরবর্তী কালে একটি কাপড়ই পরার চল হল। তুলনায় আগের চেয়ে বড় বস্ত্রখণ্ড বলে একে বলা হয় ‘ঝাল-আ’। সাঁওতালি ভাষায় যার অর্থ ‘অপেক্ষাকৃত লম্বা’। এই ঝাল-আ বা সাঁওতালি শাড়ির বিবর্তন, আধুনিকীকরণ এবং প্রসারণের প্রচেষ্টায় লেগে পড়লেন লিপ্সা, গড়ে উঠল তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘গালাং গাবান’, যার অর্থ ‘নিষ্ঠা ভরে কিছু করা’। “আমাদের ট্র্যাডিশনাল সাঁওতাল কাপড়ে সব সময়েই সাদা খোলে মেরুন অথবা সবুজ চেকের প্রচলন। আর আমার বরাবর প্রিয় ওড়িশার উইভ। এই দুইয়ের মিলমিশে তৈরি হয় নতুন গল্প। ডিজ়াইন মানেই তো সম্মেলন আর সামঞ্জস্য। আমাদের সাঁওতালি সংস্কৃতির সীমানাকে সম্মান জানিয়ে, তাকে আশ্রয় করেই গড়ে তুলেছি আমার সৃষ্টির সম্ভার। আমার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অনন্ত রসদ সংগ্রহ করে তাঁতের টানাপড়েনে ঢেলে দিই, আমার ভাবনা সাকার হয়। নান্দনিক দিক থেকে আমার সাঁওতাল শাড়ি তার ঐতিহ্যের শিকড়েই রয়েছে,” সগর্বে জানান লিপ্সা।

মায়ের কথা মেনে, সাঁওতাল ট্যাডিশন বজায় রেখে প্রথম যে শাড়ি বুনিয়েছিলেন, তার মডেল হয়েছিলেন লিপ্সার মা এবং মাসি। আজ সেই সাদার ওপর মেরুন চৌখুপির জমিতে ফুল, পাতা বা জামদানি মোটিফ। ফ্যাশন উইকের র‍্যাম্পে মডেল কন্যাদের পরনে ঝাল-আ, নতুন রূপে, নতুন বিন্যাসে। কখনও ধুতি স্টাইলে, কখনও বা খানিকটা সাদাসিধে আদলে, আঁচল সামনে ঘুরিয়ে কোমরে গোঁজা। ঘোমটা দেওয়ার মতো আড়-বহর তার নেই। ফলে রবিঠাকুরের কৃষ্ণকলি আজও অনবগুণ্ঠিতা। ঢিলে হাতা চেককাটা ব্লাউজ়ের সঙ্গে র‍্যাম্প মাতানো উপস্থিতি। ময়ুরভঞ্জের সীমিত গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বপটে আজ এই হ্যান্ডলুম শাড়ি নন্দিত। ভাবনায়, উপস্থাপনায় সে আজ আধুনিক, সাম্প্রতিকতার সুরে ঋদ্ধ। নিজের গণ্ডিকে ভাঙতে ভাঙতে জীবনের বিস্তারের মধ্যে ঢুকে পড়াতেই তো একজন শিল্পীর শিল্পের সার্থকতা। ঐতিহ্যের বিস্তার।

Smart Saree Fashion Indian Saree Fashion Santali Culture
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy