Advertisement
E-Paper

পারসিক বা মোগল, উৎস যা-ই হোক না কেন, জামদানি শাড়ি বাঙালির চিরকালের গর্ব

ঢাকার মানুষের অভিধানে ‘ঢাকাই’ বলে কোনও শব্দ নেই। ঢাকা থেকে আসে বলে, ঢাকায় তৈরি হয় বলে আমরা তাকে ঢাকাই বললেও সে দেশের মানুষের কাছে তা ‘জামদানি’। আমরা অবশ্য অনেক সময় ঢাকাই জামদানিও বলে থাকি।

শর্মিলা বসুঠাকুর

শর্মিলা বসুঠাকুর

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:৫৫
The history and specialty of Jamdani saree

আমরা পূর্ববঙ্গের মানুষ। আমার বাপ ঠাকুর্দার আদি নিবাস ঢাকা, বিক্রমপুর। অনেক বড় হয়ে, বলা ভাল প্রায় বুড়ো হয়ে আমি সেই ভিটে দেখে এসেছি। নানা কাজে ঢাকা শহরে আমার যাতায়াত ছিল এবং আছে। নিত্য যাতায়াতের ফলে আমার পরিচয় হয়েছে নানা মানুষজনের সঙ্গে, গড়ে উঠেছে সখ্য, পুব বাংলার নানা শহরে, গঞ্জে বাস করা মানুষের সঙ্গে তৈরি হয়েছে বন্ধুত্ব। পুব বাংলার মানুষদের মধ্যে দেখেছি, প্রথম আলাপেই তাঁরা দেশের খোঁজ নেন, ঠিকানার খোঁজ নেন। ছেলেবেলায় আমার দাদুভাইকেও (আমার ঠাকু্রদাকে ওই নামেই ডাকতাম) দেখতাম, আমার বাবার কাছে কেউ এলে বা আমার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে তাঁর প্রথম প্রশ্ন “দ্যাশ কই আছিল?” এই খোঁজ নেওয়ার মধ্যে একটা শিকড়ের সন্ধানের ঔৎসুক্য ছিল, যা আমার খুব ভাল লাগত।

ফ্যাশন কলামে নানা দেশের পরিধান-সংস্কৃতি নিয়ে লিখতে বসে সেই শিকড়ের সন্ধানেই যেতে হয় বার বার। গত সপ্তাহে পন্ডুরু খাদি নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখলাম, এই নামকরণের উৎস তার জন্মস্থান, অন্ধ্রপ্রদেশের পন্ডুরু গ্রাম। বেশির ভাগ কাপড় কিংবা শাড়ির নামকরণের উৎসই তার জন্মস্থান, তার ঠিকানা।

টাঙ্গাইল, ধনেখালি, শান্তিপুরী, ফুলিয়া, চান্দেরি, বেনারসি— এমন অনন্ত উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। শাড়ির নামের সঙ্গে তার জন্মস্থান বা ঠিকানার জড়িয়ে থাকার মধ্যে আমাদের যে কোনও জরুরি সরকারি বা বেসরকারি নথিপত্রের ক্রমিক বিন্যাস মনে পড়ে। নাম, তার পরেই ঠিকানা। জ্যোতিষের ডেরায় গেলেও একই ব্যাপার। নামের পরেই আপনার দিকে ধেয়ে আসবে পরবর্তী প্রশ্ন, জন্মস্থান? শাড়ির ঠিকুজি-কুষ্ঠি জানতেও সেই একই, ভৌগোলিক অবস্থান জানা প্রয়োজন। শাড়ির নামকরণ আর তার জন্মস্থানের এই গভীর সম্পর্ক আমাদের দৈনন্দিন ভাষায় ঢুকে পড়েছে। এই অভ্যাসবশত ঢাকা শহরে গিয়ে ঢাকাই শাড়ির খোঁজ করতে গিয়ে আমাকে প্রথম বার বেশ বোকা বনতে হয়েছিল। তাঁদের অভিধানে ‘ঢাকাই’ বলে কোনও শব্দ নেই। ঢাকা থেকে আসে বলে, ঢাকায় তৈরি হয় বলে আমরা তাকে ঢাকাই বললেও সে দেশের মানুষের কাছে তা জামদানি। আমরা অবশ্য অনেক সময় ঢাকাই জামদানিও বলে থাকি। আসলে জামদানি হল নকশার নাম, এই বুনন পদ্ধতির নাম, যার আদি নিবাস ঢাকা। সেই থেকেই হয়তো ওই নামের প্রচলন হয়েছে। আমাদের কাছে ঠিকানাই বড় কথা। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে, ঢাকার নারণগঞ্জ জেলায় এর জন্ম। তাই আমাদের কাছে এই অনন্য পরিধেয় ঢাকাই নামে চিহ্নিত। রবিঠাকুরের ‘বাঁশি’ কবিতার বিখ্যাত লাইন “পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর”। এই পঙ্‌ক্তি ঢাকাই শাড়িকে আশ্রয় করে বাঙালি নারীর ঐতিহ্যবাহী আভিজাত্যকে তুলে ধরেছে।

ইতিহাস বলে, হাওয়ার মতো ফুরফুরে আর জলের মতো স্বচ্ছ এই শাড়ির জন্ম মোগল আমলে। ঢাকাই জামদানি খাঁটি হ্যান্ডলুম এবং এর বুননে তাঁতের টানাপড়েনে সত্যিই মুনশিয়ানা লাগে। তাঁতে বসেই পড়েনে অর্থাৎ আড়ের দিকের বুনটে তৃতীয় একটি সুতোয় হাতে নকশা তুলতে হয়, আগে থেকে আঁকার কোনও ব্যাপারই নেই। বেশিটাই ফ্লোরাল এবং জ্যামিতিক মোটিফ। দক্ষতা এবং সময়, দুই-ই জরুরি হাতে বোনা এই অত্যাশ্চর্য বুনন পদ্ধতিতে। ইউনেস্কো সাধে কি আর ‘ইনট্যাঞ্জিব্‌ল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি’ আখ্যায় ভূষিত করেছে এই জামদানি বুননকে! বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও তা আজ স্বীকৃত। বুটিদার, তেরছা, ঝালর... নানা নাম, নানা ডিজ়াইন জামদানি ক্যানভাসে, মসলিন এবং সুতিতে।

জামদানির ইতিহাস আর ভূগোল নিয়ে নানা তত্ত্ব এবং তথ্য নানা বইতে, গবেষণাপত্রে পাওয়া যায়। জামদানি নকশার প্রচলন ও মসলিনের বিকাশের সন, তারিখ, ‘জামদানি’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, পারসিক আর মোগল, দুই মিশ্র সংস্কৃতির ফসল জামদানি কি না, এই সব জটিলতা এবং বিতর্কে গিয়ে কী লাভ বলুন তো? শুধু শুধু ভারী মাথা আরও ভারী করা। ঢাকাইয়ের ফুরফুরে মেজাজটারই বারোটা, সেই সঙ্গে নিজেদেরও। তার চেয়ে বরং চলুন শ্রী-র সঙ্গে আপনাদের আলাপ করাই। অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজের মেয়ে, শাড়ি কিনতে এবং পরতে দারুণ ভালবাসে, নিজেকে নিয়ে রসিকতা করতে ওর মতো খুব কম জনই পারে। ভালবাসে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানাতে। সাদার ওপর ম্যাজেন্টার কম্বিনেশনের শাড়িটি যে কোনও সময় আদরের। আর গোলাপি শাড়ির শিশুসুলভ সারল্যে শ্রী নিজেই ডগমগ। গরমে যে কী আরাম! তবে মিউজ়িয়াম রিভাইভাল পিস নীলাম্বরী শাড়িটি তার বড় প্রিয়। শাড়ির জমি জুড়ে বুটি এবং পাড় আঁচলের মোটিফে বাঘের থাবার বিচরণ। শুনতে কিঞ্চিৎ ভয়ানক ঠেকলেও, সেই ভয়কে শৃঙ্গারে রূপান্তর ঘটিয়েছেন যে শিল্পী, তাঁকে এক বার কুর্নিশ জানাবেন না!

আজ জামদানি নিয়ে আধুনিক ডিজ়াইনারদের মধ্যে অনেকেই দারুণ কাজ করছেন। গৌরাঙ্গ শাহ, লিপ্সা হেমব্রম এবং আরও অনেকেই। ঢাকাই, বা ঢাকাই জামদানি, যে নামেই ডাকি না কেন, নামে কী-ই বা আসে যায় তার! শীতলক্ষ্যা নদীতীরের গ্রামে যার জন্ম, সে আজ পৌঁছে গিয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ব্রিটিশ আমলের যান্ত্রিক দৌরাত্ম্য পেরিয়ে তার স্বীয় ঐতিহ্য, মাহাত্ম্য আর আভিজাত্য নিয়ে আজ সে পরিধান মহাকাশে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে। দক্ষিণী আবহে, সাঁওতাল সংস্কৃতিতে, ওড়িশার তাঁতিপাড়ায় চলছে ফুল, লতা পাতা, পাখি, কল্কা, ময়ূর, ঘোড়ার নকশা তোলার কাজ। কখনও ক্যানভাস বদলাচ্ছে, কখনও বা মোটিফ। কিন্তু বুনন পদ্ধতিতে তৃতীয় সূত্রের আগমন অবশ্যম্ভাবী। তৃতীয় ব্যক্তির আগমনে সম্পর্কে টানাপড়েন ঘটলেও, জামদানি মহলে তৃতীয় সত্তাই অন্তরাত্মা, খানদানি মেজাজের উৎস। এই জাতীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

(মডেল: শ্রী রায়চৌধুরী, ছবি: সহেলি দাস মুখোপাধ্যায়, ভাবনা ও পরিকল্পনা: শর্মিলা বসুঠাকুর।)

Jamdani Saree Fashion Tips
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy