বেশ কিছু গাছ, ফুলের কথা আমরা বইয়ে পড়ি, কিন্তু তাদের চাক্ষুষ দেখা হয়ে ওঠে না। দেখলেও নাম না জানার জন্য চেনা সম্ভব হয় না। গ্রামে-গঞ্জে বা জঙ্গলে তো আছেই, হয়তো একটু খোঁজ করলে দেখা যাবে সে সব গাছ এই ব্যস্ত শহরের আনাচকানাচে আছে। যেমন রবীন্দ্রসরোবর বা বটানিক্যাল গার্ডেনে চেনা অচেনা বৃক্ষের সমারোহ মুগ্ধ করে। এই জায়গাগুলি গাছ চেনা বা প্রকৃতিপাঠের জন্য আদর্শ। যাঁরা গাছ ভালবাসেন, তাঁদের কাছে একটি নতুন গাছের সঙ্গে পরিচয় হওয়া, সেই গাছের পাতা ফুল ফল চিনতে পারা বড়ই আনন্দের। বড়দের মতো ছোটরাও আনন্দ পায় প্রকৃতিপাঠে।
মুচকুন্দ চাঁপা: মুচকুন্দ বা মুচকুন্দ চাঁপা ফুলের শরবতের কথা গল্প-সাহিত্যে পড়লেও, সে ফুল কেমন দেখতে, কেমনই বা সেই শরবতের স্বাদ তা অনেকেরই অজানা! গাছের নীচে ঝড়ে পড়ে থাকা মুচকুন্দ দেখে কলার খোসা বলে ভ্রম হতে পারে! মুচকুন্দ চাঁপার মিষ্টি সুবাস। এই ফুল ঘরে এনে রাখলে সারা ঘর সৌরভে ভরে যাবে। মুচকুন্দর বৃতি মিছরি জলে ভিজিয়ে রাখলে কিছুক্ষণ পরে জলে সুন্দর গন্ধ হয়। সেই সুগন্ধি জল শরবতের মতো পান করা যায়। এই শরবত শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। এই বিরাট গাছের ফলও অভিনব দেখতে। বর্ষার শেষ থেকে ফুল আসে। এর পাতা বেশ বড়, তাতে রীতিমতো খাবার খাওয়া যায়। তাই হয়তো এই গাছের আর এক নাম ডিনার প্লেট ট্রি!
হিজল: জীবনানন্দ দাশের কবিতায় হিজল ফুলের পরিচয় পাওয়া যায়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পাতার ফাঁক দিয়ে লম্বা পুষ্পদণ্ড ভরে হালকা গোলাপি রঙের হিজল ফোটে। নদী বা জলাশয়ের পাশে নরম মাটিতে এই গাছ জন্মায়। ভোরবেলা হিজল ফুল ঝরে পড়ে জলে। সেই ফুলের গন্ধ বড়ই মিষ্টি।
কুসুম: বসন্তে কুসুম গাছ লাল পাতার সমাহারে সেজে ওঠে। এটাই তার বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য। অরণ্যে সবুজের মাঝে একটি কুসুম গাছ থাকলে তার দিকে নজর যাবেই। পুরুলিয়া, ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চল, জঙ্গলমহল, ঝাড়খণ্ডে ভেষজ গুণে ভরপুর এই গাছটির বেশ দেখা মেলে। এর ফলের খোসা ছাড়ালে ডিমের কুসুমের মতো দেখতে লাগে।
নাগলিঙ্গম
নাগলিঙ্গম: কলকাতা শহরের বেশ কিছু জায়গায় রাস্তার পাশে নাগলিঙ্গম বা ক্যাননবল ট্রি-র দেখা মেলে। এই গাছ ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে! বহুবর্ষী এই গাছের ফুলের গঠন বেশ অন্য রকম। গাছের গোড়ায় ঘুঙুরের মতো ঝোলে ফুল। এই গাছের ফল বড় বেলের আকারের মতো, যা অবশ্য মানুষের খাদ্য নয়। হাতিদের অসুখে এই ফল খাওয়ানো হয়। তাই এই গাছের আর একটি নাম হাতির জোলাপ।
মান্দার-শিমুল-পলাশ: বসন্তে আর একটি ফুল নজর কাড়ে, তা হল মান্দার বা ইন্ডিয়ান কোরাল ট্রি। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চ পর্যন্ত পাতাহীন লাল ফুলে ভরা মান্দার গাছ প্রিয় পাখি-প্রজাপ্রতিদের। মার্চের শেষ দিক থেকে ফল ধরে এই গাছে। গরম যত বাড়ে, ফল শুকিয়ে ফেটে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে বীজ। এই সময় বীজ সংগ্রহ করে রাখা যায়। বহুবর্ষজীবী এই গাছ সত্তর-আশি ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে! ভেষজগুণে ভরপুর মান্দারের পাতা, বাকল আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার হয়। অঞ্চলভেদে এর আরও কয়েকটি নাম আছে, যেমন পলতে মাদার, পারিজাত মান্দার ইত্যাদি। বাড়ির বাগানে জায়গা থাকলে মান্দার গাছ রোপণ করা যেতে পারে। বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয় না। যে সব নার্সারিতে মেহগনি, নিম, পলাশের চারা বিক্রি হয়, সেখানে মিলবে মান্দারের চারা।.
বাক্স বাদাম: বাক্স বাদাম বা ওয়াইল্ড আমন্ড ট্রি বা জাভা অলিভ ট্রি ১১০ থেকে ১১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে! এই মহীরুহের ডাল থেকে গুচ্ছাকারে ঝুলে থাকে লাল ফল। দূর থেকে দেখলে শিমুল ফুল মনে হতে পারে। শীতের শেষে পরিপক্ব এই ফলে একটু চাপ দিলেই খুলে যায়, আর তার মধ্যে কালো খেজুরের মতো দেখতে সারিবদ্ধ ভাবে থাকে বাদাম। এই বাদাম সুস্বাদু, পুষ্টিগুণে ভরপুর। অনেকে এই বাদাম দিয়ে বরফিও তৈরি করেন।
উর্বশী: ‘ট্রি অব হেভেন’ বা উর্বশী গাছের ফুলের সৌন্দর্য দেখার মতো। তাই হয়তো এর আর এক নাম ‘প্রাইড অব বার্মা’। এই গাছের আদি নিবাস বার্মা অধুনা মায়ানমার। গাছের কাণ্ড ও ডালপালা থেকে লম্বা মঞ্জরি দণ্ড নীচের দিকে ঝালরের মতো ঝুলে থাকে। তার গোড়ার দিকের ফুলটি প্রথমে ফোটে, তার পর ক্রমশ নীচের ফুলগুলো ফুটতে থাকে। লাল পাপড়িগুলোর মাঝে হলুদ বর্ণের এই ফুল ভীষণ সুন্দর। এর লাল ও সোনালি-হলুদ বর্ণের কচি ফল বা সিডপডগুলো দেখতে অনেকটা শিমের মতো। হেমন্ত থেকে বসন্ত পর্যন্ত এই গাছে ফুল ফোটে, কখনও গ্রীষ্মেও দেখা মেলে।
কাইজেলিয়া: বিরাট লম্বা গাছের ডাল থেকে লাল বা বেগুনি রঙের সুগন্ধি ফুলগুলো এমন ভাবে ঝোলে, দেখে মনে হয় ফুলের ঝাড়বাতি। তাই হয়তো কাইজেলিয়া আফ্রিকানা-র বাংলায় নামকরণ হয়েছে ফানুস ফুল বা ঝাড়ফুল নামে। যদিও এই গাছকে গোটা বিশ্ব জানে সসেজ ট্রি নামে। এর ফল অনেকটা সসেজের মতো দেখতে বলে সম্ভবত এমন নামকরণ। এই গাছটি মূলত আফ্রিকার জঙ্গলে পাওয়া যায়। কলকাতায় রবীন্দ্র সরোবরে এই গাছের দেখা মেলে।
মাঝেমাঝে বাচ্চাদের নিয়ে এমন প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের অভিযানে বেরিয়ে পড়লে মন্দ লাগবে না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)