১৮৭০-এর দশক থেকে পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল এক ভয়াবহ প্রাণঘাতী মহামারি, যার পটভূমি আসলে তৈরি হয়ে গিয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী আগে। ব্যয়বহুল ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধে জয়লাভের পরে কোষাগার পূর্ণ করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সদ্য অধিগ্রহণ করা অসম অঞ্চলকে বিশাল চা-বাগানে পরিণত করার উদ্যোগ করেছিল। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে যাওয়া-আসার পথ খুলে দেওয়ায় মানুষ ও রসদপত্রের দ্রুত চলাচলের সঙ্গে অজ্ঞাতসারে, নিঃশব্দে প্রবেশ করল ‘কালা-আজার’ বা কালাজ্বর, যা ম্যালেরিয়ার অভিশাপের থেকেও ছিল তীব্র এবং ভয়ঙ্কর।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্য দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, তীব্র রক্তাল্পতা, প্লীহা ও যকৃতের বৃদ্ধি এবং ত্বকের কালো হয়ে যাওয়া, যে কারণে এর নাম ‘ব্ল্যাক ফিভার’ বা ‘কালো জ্বর’। তবে স্থানবিশেষে এর নানা রকম নাম— দমদম জ্বর, সাহেবের রোগ (অসম), কালা-জ্বর, পুষ্কর ও বিহারে কালা-দুখ, গারো জনজাতির দেওয়া নাম ‘সরকারি বিমারি’। অসম ও ডুয়ার্স-তরাই অঞ্চলের ঘন জঙ্গল সাফ করে চা-বাগান বিস্তারে, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলিয়ে আনা বিহার ও বাংলার দরিদ্র গ্রামীণ পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যবস্থার অভাবে স্ত্রী বেলেমাছির কামড়ে কালাজ্বরের সংক্রমণের শিকার বিরাটসংখ্যক অসহায় শ্রমিকের মৃত্যু হত। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জনশূন্য, চা-বাগান অর্থনীতি পতনের দোরগোড়ায়। এই মহামারি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে চা-বাগান এবং কোনও কোনও গ্রামীণ এলাকায় ক্রান্তীয় চিকিৎসা ও নজরদারির দিকে মনোযোগ সরাতে বাধ্য করেছিল।
কালাজ্বরের কারণ অনুসন্ধান ও ওষুধ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে ইন্ডিয়ান মিলিটারি সার্ভিসের ব্রিটিশ চিকিৎসকরা নিরন্তর গবেষণা চালাচ্ছিলেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিসের ডাক্তার লিশম্যান এবং ডাক্তার ডোনোভান পৃথক ভাবে প্রোটোজ়োয়া পরজীবী আবিষ্কার করায় সেটির নামকরণ হয় লিশম্যানিয়া ডোনোভানি। টার্টার এমেটিক-এর মাধ্যমে এর চিকিৎসা শুরু হলেও এই দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক ও ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি দিয়ে কালা-আজারকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বৈপ্লবিক পরিবর্তন এল ১৯২০-এর দশকে, যখন প্রতিভাবান বাঙালি চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী কলকাতার ক্যাম্পবেল হাসপাতালের একটি ঘরে গ্যাস সংযোগ বা জলের কল ছাড়া এবং রাতে কেরোসিনের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিরলস গবেষণা করে আবিষ্কার করলেন একটি অত্যাশ্চর্য ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামাইন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল ন্যূনতম, এবং নিরাময়ের হার ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। এই ওষুধটি সময়মতো বাজারে সহজলভ্য হলে হয়তো কালাজ্বরের আক্রমণে মৃত্যুবরণ করতেন না সুকুমার রায়। ব্রহ্মচারী কালা-আজারের একটি নতুন ও মারাত্মক রূপও আবিষ্কার করেন— ডার্মাল লিশম্যানিয়াসিস। গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রায়বাহাদুর ও নাইটহুড উপাধি লাভ করেন। নোবেল পুরস্কারের জন্যও তাঁর নাম দু’বার মনোনীত হয়েছিল, যদিও দুর্ভাগ্যবশত তিনি তা কখনও পাননি।
ঔপনিবেশিক আমলের পূর্ব ভারতে কালাজ্বর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের যে অভাব ছিল, অচিন্ত্য কুমার দত্তের এই বইটি সেই অভাব পূরণ করেছে। এই বিষয়ে লেখকের পূর্বপ্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন গবেষণালব্ধ প্রজ্ঞা। ভূমিকা এবং উপসংহার ছাড়া, সাতটি অধ্যায়ে সুবিন্যস্ত এই গ্রন্থে অবিভক্ত বাংলা, অসম এবং বিহার অঞ্চলে কালাজ্বরের বিস্তার, অর্থনীতি ও সমাজের উপরে তার প্রভাব, কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং চিকিৎসকদের ভূমিকা, বিভিন্ন চিকিৎসাবিজ্ঞানীর মধ্যে পেশাগত দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিষয়ের উপরে লেখক আলোকপাত করেছেন।
প্রথম অধ্যায়ে কালাজ্বর রোগটির উৎপত্তি এবং বিস্তারের কারণ অনুসন্ধান, এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। প্রোটোজ়োয়া প্যারাসাইট আবিষ্কারের কৃতিত্ব কার প্রাপ্য তা নিয়ে বিতর্ক, বিভিন্ন সম্প্রদায়, শ্রেণি, লিঙ্গভুক্ত মানুষজন ও বিভিন্ন বয়সির উপরে কালাজ্বরের প্রভাবের বিস্তার প্রভৃতির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচনায় উঠে এসেছে প্রাথমিক পর্বে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির ফলে কী ভাবে কালাজ্বরকে প্রায়শই অন্যান্য ধরনের জ্বরের শ্রেণিবিন্যাসের অন্তর্ভুক্ত করে ভুল করা হত।
ফাইটিং দ্য ফিভার কালা-আজার ইন ইস্টার্ন ইন্ডিয়া, ১৮৭৫-১৯৪৭
অচিন্ত্য কুমার দত্ত
১৪৯৫.০০
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস
পরের অধ্যায়ে বিভিন্ন ব্যাধি ও মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য ঔপনিবেশিক সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বিভিন্ন দিক এবং জনসাধারণের উপরে তার প্রভাবের প্রেক্ষাপটে কালাজ্বরের মোকাবিলার প্রচেষ্টাগুলির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সরকারের নীতির পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নে কারা কী ধরনের ভূমিকা পালন করেছিলেন, পরিকল্পনা নির্মাণ এবং বাস্তবায়নের মধ্যে আদৌ সঙ্গতি ছিল কি না— এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টায় লেখক সরকারি নীতির সীমাবদ্ধতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
বইটির তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম অধ্যায়ে যথাক্রমে আলোচিত হয়েছে স্থানীয় স্তরে অসম, অবিভক্ত বাংলা এবং বিহারে কালাজ্বরের প্রকোপ এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার বিভিন্ন দিক। নানান স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ভূমিকার কথাও এই আলোচনার আওতায় এসেছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু— কী ভাবে ভারতীয় এবং ইউরোপীয় গবেষকবৃন্দ কালাজ্বরের কারণ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দিক নির্দেশের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এই ব্যাধি দমনের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ ম্যালেরিয়া এবং প্লেগ নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার থেকে অনেক বেশি সাফল্য অর্জন করেছিল বলে মনে করা হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নিরলস সাধনা এবং সাফল্যের কথা। স্মলপক্স প্রভৃতি ব্যাধির মতোই সরকারপক্ষ কালা-আজার নিয়ন্ত্রণের অসাফল্যের জন্য ভারতীয়দের কুসংস্কার, কু-অভ্যাস ও অসহযোগিতাকে যে ভাবে দায়ী করত, সেই বক্তব্যকে লেখক যুক্তি সহকারে খণ্ডন করেছেন। সরকারের তরফ থেকে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব ছিল এবং ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য ছিল নেহাত সাময়িক। ১৯৩০ এবং ১৯৪০-এর দশকেও এই মারণ ব্যাধির প্রকোপ অব্যাহত ছিল। তবে লেখকের মতে, ভারতীয়দের একাংশ যে পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহবশত জ্বরের সঙ্গে লড়াইয়ে উৎসাহ বোধ করেছিলেন, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
জ্বরের সঙ্গে লড়াইয়ের ‘ন্যারেটিভ’-এ প্রধানত রাষ্ট্রীয় নথির উপরে নির্ভরশীলতার ফলে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস বা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সরকারি বর্ণনার নিরিখে ‘অনুগত’ বা ‘সহযোগী’ হিসাবেই দেখানো হয়েছে। রোগীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বর এখানে অনেকাংশেই অনুপস্থিত। স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী, ব্যক্তিগত ডায়েরি ও চিঠিপত্র, সাময়িকী ও সংবাদপত্র, মৌখিক ইতিহাস, লোকগাথা ও গান, সাহিত্য প্রভৃতি (ব্যাধির) সামাজিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য দলিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় অমৃতবাজার পত্রিকা-র কথা অথবা ফণীশ্বর নাথ রেণু রচিত বিখ্যাত হিন্দি উপন্যাস মৈলা আঁচল, চিকিৎসক এবং সাহিত্যিক ধ্রুবজ্যোতি বোরার অসমিয়া উপন্যাস আজাড়-এর কথা, যেখানে যথাক্রমে বিহার এবং অসম ও সংলগ্ন বাংলার কালাজ্বর মহামারির প্রভাবের বিস্তারিত উল্লেখ আছে, যা বৃহত্তর সমাজ ও সঙ্কটের ইতিহাসটিকেও স্পর্শ করেছে। এই ধরনের উপাদানের ব্যবহার এই ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করত বলে মনে হয়।
তা সত্ত্বেও এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক পর্বের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন— কারণ তা কালাজ্বরের ইতিহাসের অকথিত দিকগুলোর নির্ভরযোগ্য চিত্রটিকে সামনে নিয়ে আসে। ব্রহ্মচারীর আশামতো এই রোগ পৃথিবী থেকে এখনও নির্মূল হয়নি। এই ইতিহাস আমাদের নতুন ভাবনার পথ দেখাতে সক্ষম হবে, এই প্রত্যাশা করাই যায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)