ফরিদপুরে মাঝেমধ্যেই এসে উপস্থিত হতেন চিত্তরঞ্জন দাশ সুভাষচন্দ্র বসু বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ। ব্রিটিশবিরোধী সভায় তাঁদের বক্তৃতা দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করত মানুষকে। এ-সমস্ত সঞ্চিত আছে মৃণাল সেনের বয়ানে, পরোক্ষ ও খানিকটা প্রত্যক্ষ স্মৃতির সূত্রেও। তাঁর বাবা, এমনকি মা’ও কমবেশি জড়িয়ে ছিলেন সে-সব কর্মকাণ্ডে। মায়ের ডাক পড়ত সভায় উদ্বোধনী গানের জন্য, ‘অয়ি ভুবনমনোমোহিনী’ গেয়েছিলেন। পারিবারিক ঔজ্জ্বল্যের এই সব অনুষঙ্গে কখনও অন্তঃপুরের কথা খেয়াল করিয়ে দিতে কিন্তু ভোলেননি মৃণালবাবু, বলতেন খেলাচ্ছলে, সরস ভঙ্গিতে, তার মধ্যেই ধরা পড়ত পিতৃতন্ত্রের ঘেরাটোপ, ঠিক তাঁর ছবির মতোই। যেমন মায়ের এই গান গাওয়া নিয়ে বলেছেন, দু’দিন পরেই ঠাকুরমার রুক্ষ স্বরে মাকে জিজ্ঞাসা: “শুনলাম তুমি নাকি পাবলিক মিটিং-এ গান গেয়েছ? কী করে সাহস হল তোমার অত লোকের সামনে গাইবার? কখনও শুনেছ কোনও ভদ্র পরিবারের মেয়ে লোকসমক্ষে গাইছে?” চেঁচামেচিতে বাবা ছুটে এলেন বটে, কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলেন নিশ্চুপ। মা বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলেন, তাঁকে গাওয়ানোর পুরো পরিকল্পনাটাই যে বাবার তা নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না।
অ্যাট হোম উইথ মৃণাল সেন
দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়
৩৯৫.০০
ওম বুকস ইন্টারন্যাশনাল
দীর্ঘ কথোপকথন দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে, মূলত আড্ডার মেজাজে, নানা কালপর্বে। নিজের ‘হয়ে ওঠা’র কথা বলেছেন মৃণাল সেন, সিনেমার আধুনিক ভাষায় কী ভাবে মিশিয়ে দিতেন প্রতিবাদের স্বর, সময় ও বিবেক কী ভাবে আজীবন তাড়া করে ফিরেছে তাঁকে, আরও কত কী! সর্বভারতীয় পাঠকের কাছে দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়ই সর্বপ্রথম পৌঁছে দেন মৃণাল সেনকে, নব্বই দশকের প্রথমার্ধে। মুখবন্ধে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় তাঁকে বলেছেন ‘মৃণাল সেন’স বসওয়েল’। বইটিতে রয়েছে সিনেমার ভাষা নিয়ে সত্যজিৎ-মৃণাল দ্বৈরথের কথা, মৃণালবাবুর ছবি নিয়ে দীপঙ্করের ভাষ্য, এ ছাড়াও রঙিন ও সাদা-কালোয় ফিল্মের পোস্টার, স্থিরচিত্র।
মৃণাল সেনকে নিয়ে বন্ধু/মাই ফাদার-মাই ফ্রেন্ড— বছর তিনেক আগে প্রকাশিত কুণাল সেনের বইটির অনুবাদ নয় এ-বই, বাংলায় তাঁর বিভিন্ন লেখা জড়ো করে তৈরি। “বাবা সম্পর্কে লিখতে গেলে আমি শুধু মানুষটার কথা বলতে চাই,” জানিয়েছেন শুরুতে। টুকরো কতকগুলি মুহূর্ত, ফেলে আসা সময়ের জীবন্ত গল্প যেন একটা চিন্তার সুতো দিয়ে বাঁধার চেষ্টা, পর্যবেক্ষণের মধ্যে আশ্চর্য এক নির্লিপ্তি: কুণালের কলম এক অজানা মৃণাল সেনকে দাঁড় করায় আমাদের সামনে। ‘আমরা দু’জন বন্ধু’ লেখাটিতে তাঁদের পারস্পরিকতার অনির্দিষ্ট খতিয়ান— বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে নিয়ে তাঁর বোধগুলোও কী ভাবে বদলে যেতে লাগল; ছেলেবেলার অভিজ্ঞতায় বাবা বলতে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন একটা মানুষের প্রতিচ্ছবি, সেই মানুষটিকে নিয়ে একটা ভাল-লাগাও তৈরি হল, “সম্পর্কটা এত দিনে যেন বন্ধুত্বের জায়গায় পৌঁছচ্ছে।”
আমার বন্ধু
কুণাল সেন
৩০০.০০
সপ্তর্ষি প্রকাশন
আবার ‘বাবার কথা, বাড়ির কথা’য় আটপৌরে কথনে মৃণালবাবুর বাড়ি বদলে যাওয়ার এক নৈর্ব্যক্তিক আখ্যান। অশ্বিনী দত্ত রোডের চিলেকোঠার ঘর থেকে মনোহরপুকুর রোডের বাড়ি, মতিলাল নেহরু রোডের বাড়ি, বেলতলা রোডের বাড়ি... তাঁর শিল্পীজীবনের পরিক্রমায় দিনযাপনের যে বৃত্তান্ত লেখেন কুণাল, তাতে নস্টালজিয়ার বদলে জেগে থাকে খর বাস্তব: “এই সবের মাঝে যাঁকে সবচেয়ে কষ্ট পেতে হয়েছে, তিনি আমার মা”, গীতা সেন, “আমাদের তখনও সেই বোধই তৈরি হয়নি যে, একজন মানুষের নিজস্ব একটা জায়গা লাগে।” লিখেছেন, কেন তিনি ফিরে দেখছেন বা ফিরিয়ে আনছেন প্রচণ্ড লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে পিতার শিল্পসৃষ্টির কথা, কারণ “এখন পৃথিবী জুড়ে একটা ন্যাশনালিস্ট ফ্যাসিস্ট রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।”
পদাতিক মৃণাল সেন
সম্পা: গৌর খাঁড়া
৩০০.০০
পান্থজন
১৯৯৭-এ পূরণচাঁদ জোশি স্মারক বক্তৃতা দিয়েছিলেন মৃণাল সেন, অধৃষ্য কুমারের উজ্জ্বল উদ্ধারে ফের ছাপা হয়েছে এ-বইয়ে। তাতে মৃণালবাবু রবীন্দ্রনাথের সদর স্ট্রিটের বাড়িতে ‘চৈতন্য’ দিয়ে সূর্যোদয় দেখার প্রসঙ্গ তোলেন, খেয়াল করিয়ে দেন, সিনেমাও দেখা উচিত ‘চৈতন্য’ দিয়েই। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার সুমিতা এস চক্রবর্তীকে দেওয়া ১৯৯৬-এ, সেখানে তিনি বলছেন, চোখ-কান থাকলেই ছবির দর্শক হওয়া যায় না, “আপনাকে সংযোগ স্থাপন করতে হবে এবং সেই সংযোগ স্থাপনের জন্য আপনার বৌদ্ধিক ক্ষমতা ব্যবহার প্রয়োজন।” মৃণাল সেনের এই শিল্পচেতনা, শিল্প নির্মাণের শৈলী, ভারত তথা বিশ্বের ইতিহাসে তাঁর ছবির স্থান ইত্যাদি নিয়ে সুলিখিত প্রবন্ধে ঋদ্ধ বইটি, গৌতম ঘোষ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় মৈনাক বিশ্বাস শেখর দাশ তপন বন্দ্যোপাধ্যায় গৌতম বসু অনিন্দ্য সেনগুপ্ত অনসূয়া মজুমদার নিশা রূপারেল সেন জন উড ফরেস্ট উইলিয়ামস প্রমুখ গুণিজনের কলমে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)