দরোঘা আব্বাস আলি যখন ‘বিউটিজ় অব লখনউ’ (১৮৭৪) ছবির সঙ্কলন প্রকাশ করছেন, তত দিনে অওয়ধে সাহেবদের আগমন ও শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের নির্বাসনের পরে প্রায় দু’দশক অতিক্রান্ত। শুধু অওয়ধের রাজসভার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক দলিল নয়, ইতিহাসবিদরা মনে করেন— ছবিগুলিতে আছে প্রতিরোধের স্বরও: সে সময় বিদেশি শাসকের চোখে তওয়াইফদের যে ভাবমূর্তি, তার উল্টো রাস্তায় হেঁটে আলোকচিত্রী আলি সেই নারীদের ফ্রেমবন্দি করলেন অভিজাত মহিলাদের মতোই।
প্রায় সে সময়েই বিশ্বের অন্য প্রান্তে, প্যারিসে ওয়েট প্লেট কলোডিয়ন পদ্ধতিতে আটটা ছোট ছবি তুলে, কার্ডে সেঁটে ‘দ্য কার্তে দে ভিসিৎ’ বা ভিজ়িটিং কার্ডস পদ্ধতি শুধু বিজ্ঞাপনী ও বাণিজ্যিক চমকই দিল না, ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বে, উচ্চবিত্তদের একচেটিয়া দখল থেকে ফোটোগ্রাফিকে সরিয়ে এনে তার গণতন্ত্রীকরণ করল।
আলোকচিত্র-শিল্পের দু’শো বছরের ইতিহাস আর বিবর্তন, এই দীর্ঘ সময়ে সমাজ, সভ্যতার স্মৃতি ও দলিল সংরক্ষণে তার ভূমিকা, ও আরও ‘কত অজানারে’ নিয়ে কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি (কেসিসি) আয়োজন করেছে প্রদর্শনী ‘টাচিং লাইট’। সহ-উদ্যোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অলাভজনক ক্রাউডফান্ডেড আলোকচিত্র শিল্পকেন্দ্র ‘মিউজ়িয়ো ক্যামেরা’। গত ১৬ মে থেকে শুরু হয়েছে কেসিসি-তে, চলবে ২৯ মে পর্যন্ত, প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধে ৭টা। কারও শৈলী ডকুমেন্টারি ও ফাইন আর্ট, কেউ খ্যাত রেট্রো-ফ্যাশন ও স্টুডিয়ো পোর্ট্রেটে; কারও ছবিতে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের ফিরে দেখা, আবার মঞ্চে পারফর্মিং আর্টস ও শিল্পীদের নানা মুহূর্ত, নানা ঘরানার সাদা-কালো ও রঙিন ছবি— অ্যানালগ পদ্ধতিতে প্রদীপ দাশগুপ্ত, হরবংশ মোদী, দীনেশ খন্না, মালা মুখোপাধ্যায়, আকাশ দাস, বন্দীপ সিং, রোহিত চাওলা ও অবিনাশ পাশরিচা-র লেন্সবন্দি। সাদা-কালোয় অবিনাশ পাশরিচার তোলা এম এস শুভলক্ষ্মীর (উপরে) প্রতিকৃতি, হরবংশ মোদীর ফুন্দন সিং (উপরে ডানে), প্রদীপ দাশগুপ্ত, বা আকাশ দাসের অ্যানালগ ছবিগুলিতে রসিকদের জন্য বহু-আলোচিত গ্রেন, স্ক্র্যাচ, রঙের বৈচিত্র।
ডিজিটাল প্রযুক্তির রমরমায় ছবি-শিকারিদের সময় হয়তো বাঁচছে, ছবির সংখ্যাও হচ্ছে দ্বিগুণ, কিন্তু অ্যানালগ যুগে একটি আলোকচিত্রের শিল্প হয়ে ওঠার পিছনে যে শ্রম, আবেগ, সময়ের বিনিয়োগ ছিল, তা কি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে? এ প্রদর্শনী সেই ফেলে আসা সময়ের রসাস্বাদনের পাশাপাশি স্মৃতির আড়ালে চলে যাওয়া সামগ্রিক অ্যানালগ প্রক্রিয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও আজকের কর্মধারায় তার অবস্থান অনুধাবনেরও সুযোগ। অতীতের পাতা থেকে দরোঘা আব্বাস আলির কাজ, এ দেশে বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড স্টুডিয়োর কার্তে দে ভিসিৎ, বা উনিশ শতকের অ্যালবুমেন প্রিন্ট প্রক্রিয়া, খ্যাতনামা আলোকচিত্রীদের ছবির সঙ্কলন— “এই বিপুল আয়োজন ইতিহাসকে এই প্রজন্মের সামনে তুলে ধরবে, মনে করিয়ে দেবে যে আলোকচিত্র শিল্প ও তার বিজ্ঞান ধরে রাখে মানুষের আবহমান জীবন ও অভিজ্ঞতাকেই,” বললেন কেসিসি-র চেয়ারপার্সন রিচা আগরওয়াল।
কবির জন্মদিনে
সেনাবাহিনী-ফেরত তরুণ কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২০-র মার্চে কলকাতায় এলেন। অচিরেই এ শহরে শুরু তাঁর সাহিত্যিক জীবন। জীবনের বহুলাংশ কেটেছে এখানে, বার বার ঠিকানা বদল করেছেন। স্মৃতিময় এ শহরে কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী নজরুল-প্রদর্শনী ‘আমারে দেব না ভুলিতে’, ছায়ানট (কলকাতা)-র আয়োজনে। যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস-এর সুনয়নী চিত্রশালা ও চিত্তপ্রসাদ গ্যালারিতে আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় উদ্বোধন। ৩০ মে পর্যন্ত, দুপুর ২টো-রাত ৮টা। সোমঋতা মল্লিকের ভাবনায় একত্র দুই বাংলার সংগ্রাহকদের নজরুল-স্মারক: তাঁর স্বাক্ষর, দুর্লভ ছবি, কবিকণ্ঠের গান-কবিতার রেকর্ড, ভারত বাংলাদেশ (ছবি) পাকিস্তানের নজরুল-ডাকটিকিট ও মুদ্রা, কবির ছবি দিয়ে দেশলাই বাক্স, ছায়ানট অগ্নি-বীণা কাব্যের প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণ, চলচ্চিত্র-পুস্তিকা, শিল্পীদের আঁকা কবিপ্রতিকৃতি, সেরামিক প্লেট স্লেটপাথর আলপনায় নজরুল। আর থাকছে গুণিজন-সম্মাননা, কুইজ়, শব্দবাজি, কথালাপ, গানও।
উপনিষদের রবি
রবীন্দ্রনাথের গানে আছে এক অনন্য দর্শন, তার সূত্রটি মেলে উপনিষদে। রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথের উপলব্ধিতে ব্রহ্মের রূপ তাঁর ব্রহ্মসঙ্গীতে পরিবাহিত হয়েছে ভাব ভাষা সুরের সম্মিলনে, এসেছে তাঁর লেখালিখিতে, গীতাঞ্জলি-র কবিতায়, শান্তিনিকেতনে উৎসব-অভিভাষণে। ‘টেগোর অ্যান্ড জার্নি উইথ দ্য উপনিষদ’ অনুষ্ঠানে ডা. আনন্দ গুপ্ত ও ‘দক্ষিণায়ন ইউকে’র সদস্যেরা সেই ইতিহাসই তুলে ধরবেন, আগামী ২৬ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়, ইন্ডিয়ান মিউজ়িয়মে। শৈলজারঞ্জন মজুমদার মায়া সেন সুদেব ও রণো গুহঠাকুরতার এই শিষ্য রবীন্দ্রসৃষ্টির নানা আঙ্গিক নিয়ে চর্চা করছেন দীর্ঘকাল, বিশ্বের নানা প্রান্তে নিবেদন করেছেন তা। সেই ধারাতেই নব সংযোজন।
চিরদিনের
পঞ্চাশ ষাট সত্তর দশকে বাঙালি বাড়িতে হত গানের রেওয়াজ, রবীন্দ্র-নজরুল-অতুলপ্রসাদের। আর পাড়ার জলসায় আকর্ষণ ছিল ছবির গান ও বেসিক বাংলা গান, সে-সব ঠিক সুরে গাইতে প্রয়োজন হত স্বরলিপি। তাই বাংলা গানের স্বরলিপি-বইয়ের নিয়মিত প্রকাশও ছিল স্বাভাবিক ঘটনা: দু’মলাটে একই গীতিকারের লেখা বা একই সুরকারের সুর দেওয়া গান। গীতিকার প্রণব রায়ের লেখা ৩১টি গানের সঙ্কলন পরিচিতা বেরোয় ১৯৫৩-য়, ‘জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যান্ড পাব্লিশার্স’ থেকে। সবগুলি গানেরই সুরকার কমল দাশগুপ্ত, স্বরলিপিকার নিতাই ঘটক, গেয়েছিলেন যূথিকা রায় জগন্ময় মিত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ। ৭৩ বছর পর সম্প্রতি বইটি নতুন করে বার করেছে ‘সুস্মৃতি’ প্রকাশনী, একই নামে।
সিনে-সুন্দরবন
বাংলা ছবির আউটডোর বলতেই সফেন সমুদ্র বা উত্তরবঙ্গের পাহাড় ভেসে ওঠে চোখে, সুন্দরবনের কথা মনে হয় না কেন? একটু ভাবলেই পাওয়া যাবে কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের জল জঙ্গল, শক্তি সামন্তের অমানুষ, রাজেন তরফদারের নাগপাশ থেকে গৌতম ঘোষের চেন অব বন্ডেজ, অপর্ণা সেনের দ্য জাপানিজ় ওয়াইফ, তানভীর মোকাম্মেলের বনযাত্রী হয়ে একালের টান, রোর: টাইগার্স অব দ্য সুন্দরবনস, বনবিবি, দোআঁশ, হাওয়া: দুই বাংলার নানা কাহিনিচিত্র, তথ্যচিত্র, ওয়েব সিরিজ়। চলচ্চিত্র মাধ্যমে কী ভাবে ও কতটা উঠে এসেছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি জীবনসংগ্রাম, সেই ভাবনা থেকেই শুধু সুন্দরবন চর্চা পত্রিকা (সম্পা: জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ি) প্রকাশ করেছে ‘সিনেমায় সুন্দরবন’ সংখ্যা। তথ্যে ছবিতে ভরা, ভাবনার রসদ।
প্রসেনিয়াম নিয়ে
সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারার মধ্যে বৌদ্ধিক আদানপ্রদানের একটি পরিসর তৈরিই উদ্দেশ্য কলকাতা আন্তর্জাতিক শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (কিফাল্ক)-এর। রাজা বসন্ত রায় রোডের এই সংস্কৃতিকেন্দ্রে হয় সাহিত্য গান সিনেমা চিত্রকলা ও বিবিধ মননক্ষেত্র নিয়ে কথালাপ, প্রদর্শনী, কর্মশালা ইত্যাদি। সেই ধারাতেই আগামী ২৯ মে বিকেল সাড়ে ৫টায় দেখানো হবে একটি তথ্যচিত্র, অশোক বিশ্বনাথনের নির্দেশনায়, এনসিজ়েডসিসি-প্রযোজিত ইন্ডিয়ান প্রসেনিয়াম থিয়েটার। ভারতে নাট্য-প্রযোজনায় প্রসেনিয়ামের গুরুত্ব, নানা ভাষার নাটক মঞ্চায়নে এর ভূমিকা, উদ্ভূত বিতর্কও উঠে এসেছে ছবিতে, আছে নাট্যভিনয়ের নির্বাচিত অংশও। প্রারম্ভিক কথনে থাকবেন বিভাস চক্রবর্তী ও শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
জন্মশতবর্ষে
মা-কে মেয়ের উপহার, ডায়রি। মা তাতে লিখবেন অন্তরের কথা। টুকরো কথা আর ছবিতে ভরা রেবা হোরের ডাইরি, ২০০৮-এর, প্রকাশিত হতে চলেছে শিল্পীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে। ১৯২৬-এর ৭ মে কলকাতায় জন্ম, ১৯৪৬-এ অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে আর্ট কলেজে প্রবেশ, পেয়েছেন অতুল বসু হরেন দাসের মতো শিক্ষক। আর্ট কলেজেই আলাপ সোমনাথ হোরের সঙ্গে, ১৯৫৪-য় বিয়ে। ১৯৫৮-য় পান ললিতকলার জাতীয় পুরস্কার, ষাটের দশকের শেষপর্ব থেকে থিতু শান্তিনিকেতনে। লব্ধযশ শিল্পী সোমনাথ হোরের পাশে তাঁর ভূমিকা আন্তরিক সহযোদ্ধার, কিন্তু দু’জনের শিল্পপথ স্বতন্ত্র। চিরদিন নিজেকে আড়ালে রাখতে স্বচ্ছন্দ শিল্পী মায়ের শতবর্ষে কন্যা চন্দনা হোরের সক্রিয় উদ্যোগে তাঁর বিভিন্ন মাধ্যমের (ছবি) শতাধিক কাজ নিয়ে জন্মশতবার্ষিকী প্রদর্শনী ‘দেবভাষা বই ও শিল্পের আবাস’-এ, আজ শুরু। দেখা যাবে শিল্পীর বিভিন্ন সময়ের তিনটি পূর্ণাঙ্গ স্কেচখাতাও। প্রদর্শনী আগামী ১৬ জুলাই অবধি, ছুটির দিন ও রবিবার বাদে রোজ দুপুর ২টো-রাত ৮টা।
যাত্রাগোপাল
ক্ষয়ে যাওয়া যাত্রাজগতের এক নকলনবিশের কাহিনি। গোপাল নামে এক অভিনেতার আত্মপ্রকাশ, গ্রামেগঞ্জে শান্তিগোপালের সস্তা বদলি হিসেবে। হাততালিধন্য পালা থেকে টুকে নিজের পালা লিখে নেয় সে: এক বার কার্ল মার্ক্স হয়, এক বার লেনিন, এক বার হিটলার। তার মধ্যে এতগুলো মানুষ, কোনটা নিয়ে শেষ অবধি এগোবে সে? এক বিদ্রোহী, মরমি অভিনেতা আর তার চার দিকের বহতা জীবন নিয়ে উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের নতুন নাটক যাত্রাগোপাল, সুদীপ্ত দত্তের নির্দেশনায় মঞ্চে আনছে চাকদহ নাট্যজন, প্রথম অভিনয় ২৮ মে অ্যাকাডেমি মঞ্চে সন্ধে সাড়ে ৬টায়। যাত্রাজগতের প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা শান্তিগোপালের (ছবি) জীবন ছুঁয়ে এক অনামী অভিনেতার দ্বন্দ্ব, মুখ্য চরিত্রে সঞ্জীব সরকার।
অভিনব
থাকেন গিরিডিতে, উস্রি নদীর ধারে বেড়ান আর জাদুকরের মতো একের পর এক জিনিস বানিয়ে চলেন। প্রোফেসর শঙ্কু এক দুর্দান্ত উদ্ভাবক, দুনিয়া ঘোরা বাঙালি। খুব ভাল এক জন মানুষও, নিজের আবিষ্কার যিনি উৎসর্গ করেন জনকল্যাণে, অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেন লোভ। সত্যজিৎ রায়ের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি প্রোফেসর শঙ্কুকে পাঠক-ভক্তের আরও কাছে আনতে ‘ভাষা পাবলিশিং’ তৈরি করেছে ফ্যাক্টবুক-নোটবুক শঙ্কু 2-in-1। পাতায় পাতায় শঙ্কু-ট্রিভিয়া, সন্দীপ রায়ের বিশেষ ‘শঙ্কু-ফ্যাক্ট’, সঙ্গে ভট্টবাবুর আঁকা ছবি, পাঠকের নোট নেওয়ার পাতা। সেই সঙ্গে এই প্রথম বেরোচ্ছে ফ্লিপবুক-ফ্যাক্টবুক ফেলুদাকে নিয়েও, সোনার কেল্লা 2-in-1— অগ্নিভ চক্রবর্তীর সম্পাদনায়, অলঙ্করণ ও ফ্লিপবুক-নির্মাণে শুভম ভট্টাচার্য। প্রকাশ পাবে ২৪ মে সন্ধ্যা ৬টায় রিড বেঙ্গলি বুকস্টোরে, থাকবেন সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় দেবাশীষ দেব প্রমুখ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)