দিকে দিকে বার্তা রটল, তিনি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে বার করার আগেই এসএসকেএমের জরুরি বিভাগে তাঁর নামে তৈরি হল টিকিট। হাসপাতালের উডবার্ন ওয়ার্ডের ২১ নম্বর ঘর ঝটিতি সাফসুতরো হল। পাল্টে দেওয়া হল বিছানার চাদর। পূর্ত দফতরের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের কর্মীরা এসে পরীক্ষা করে গেলেন, ঘরের সমস্ত বিদ্যুৎ সংযোগ ঠিক আছে কি না।

বিরোধীরা প্রতিবাদে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন। কামারহাটির জোট প্রার্থী, সিপিএমের মানস মুখোপাধ্যায় কমিশনের কাছে আর্জি জানালেন, হাসপাতালে ভর্তি হলেও ‘তাঁর’ নাগালের মধ্যে যেন মোবাইল ও ইন্টারনেট না থাকে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় যেন মুড়ে ফেলা হয় কেবিন। একই অনুরোধ এল বিজেপি প্রার্থী কৃশানু মিত্রের কাছ থেকে।

দিনের শেষে স্বস্তি দিয়ে এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ জানালেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। আপাতত ভর্তি হচ্ছেন না। অবশ্য তত ক্ষণে কামারহাটি থেকে এসএসকেএম হয়ে জেল— ছোটখাটো একটা ঝড় বইয়ে দিয়েছেন মদনগোপাল মিত্র! আজ, সোমবার জেল থেকেই যিনি বসছেন বিধানসভা ভোটের পরীক্ষায়।

বিরোধীদের অভিযোগ, সোমবার ভোট ‘কন্ট্রোল’ করবেন বলেই নিজের এক সময়ের খাসতালুক এসএসকেএমে ফিরতে চেয়েছিলেন মদন। কিন্তু বির্তকের ঝ়়ড় ওঠায় ঝুঁকি নিতে চায়নি দল। বাধ্য হয়েই সেই পরিকল্পনা থেকে পিছু হটতে হয়েছে সারদা-কাণ্ডে ধৃত প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রীকে।

রবিবার দুপুর বারোটা নাগাদ রটে যায়, মদন অসুস্থ। তাঁকে এখনই এসএসকেএমে আনা হবে। হাসপাতালে সাজো সাজো রব পড়ে যায় তখনই। কী হয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রীর?


এসএসকেএম-এর রেজিস্টারে উঠে গিয়েছিল মদন মিত্রের নাম।

এসএসকেএমের তরফে জানানো হয়, ভোটের মুখে গত ক’দিন ধরেই শ্বাসকষ্ট বেড়েছে মদনের। সঙ্গে উদ্বেগ ও ছটফটানি। রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না তাঁর। খাওয়াদাওয়াও কমে গিয়েছে। ডাক্তাররা ভর্তি হয়ে চিকিৎসার কথা বলেছিলেন বারবার। মদন রাজি হননি। শনিবার সকাল থেকে তাঁর অল্প জ্বর ছিল। এ দিন সকালে প্রায় ১০২ জ্বর উঠে যায়। সঙ্গে বাড়তে থাকে শ্বাসকষ্ট। আলিপুর জেল কর্তৃপক্ষ তখন কোনও ঝুঁকি না নিয়ে মদনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে তৎপর হন। এসএসকেএমের যে চিকিৎসকেরা নিয়মিত জেলে গিয়ে মদনকে পরীক্ষা করেন, তাঁরাই অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে জেলে পৌঁছন। এসএসকেএমের দাবি, ওই চিকিৎসকেরা মদনকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু শেষমেশ মদনকে না-নিয়েই ফিরে আসে অ্যাম্বুল্যান্স। কেন? চিকিৎসকদের দাবি, মদন নিজেই হাসপাতালে যেতে চাননি। কারা-কর্তাদেরও একাংশের বক্তব্য, স্থিতিশীল হলেও প্রাক্তন মন্ত্রীর অবস্থা একেবারেই ভাল নয়। কিন্তু তিনি কিছুতেই হাসপাতালে ভর্তি হতে রাজি নন। এমনকী, জেলের হাসপাতালেও নয়। বাধ্য হয়ে তাঁকে এখন জেলেই চিকিৎসকদের কড়া নজরে রাখা হচ্ছে।


এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের বিশেষ দল চলেছে মদন মিত্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। —নিজস্ব চিত্র।

কর্তারা এ কথা বললেও সমান্তরাল এক ‘হাইলি সাসপিশাস’ ঘটনাও ঘটে যায় এসএসকেএমে। ইমার্জেন্সি কাউন্টারের এক কর্মী জানান, এ দিন বিকেল সওয়া চারটে নাগাদ স্থানীয় এক তৃণমূল কর্মী এসে মদনগোপাল মিত্রের নামে টিকিট করান। জানান, হাসপাতালের একেবারে
কাছাকাছি এসে পড়েছেন রোগী। মদন যদি আসতেই না চান, তা হলে তাঁর নামে টিকিট তৈরি হল কার নির্দেশে?

সুপার মানস সরকারের বক্তব্য, ‘‘আমি এমন কিছু জানি না। মেডিক্যাল বোর্ড ওঁকে দেখতে জেলে গিয়েছিল। তার পর কে টিকিট তৈরি করেছেন, কেন করেছেন, তা জানা নেই।’’ প্রশ্নের উত্তর দেননি অধিকর্তা মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তবে মদনের বড় ছেলে স্বরূপ বলেন, ‘‘সকাল থেকে বাবার জ্বর এবং বুকে ব্যথা হওয়ায় ডাক্তাররা ওঁকে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমরাও জোর করেছিলাম। কিন্তু বাবা বলে দেন, ভোটের আগে এ নিয়ে ফের রাজনীতি হবে। তাই তিনি হাসপাতালে যাবেন না। ’’

অতএব, নতুন করে কোনও নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি না হলে ভোটের দিনে জেলই হতে চলেছে কামারহাটিতে তৃণমূল প্রার্থী মদনগোপাল মিত্রের আস্তানা।