মুখ বদলায়। মূল ছবিটা পাল্টায় না।

১৯৮৪। তখনও ‘অগ্নিকন্যা’ হননি মমতা। ‘দিদি’ তো নয়ই। লোকসভা ভোটে যাদবপুরে জাঁদরেল সিপিএম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সাদামাঠা প্রার্থী তিনি। সেই প্রথম তাঁর ভোটে লড়া এবং জেতা। প্রচারে ঝড় তুললেন স্রেফ ‘ঘরের মেয়ে’ হয়ে। ধনী-দরিদ্র, পক্ষ-বিপক্ষ কোনও ভেদ নেই। দরজা ঠেলে বাড়ির অন্দর মহলে বৌদি-মাসিমা ডাকতে ডাকতে সরাসরি ঢুকে পড়া। অতি বড় সিপিএম পরিবারেও বলাবলি, ‘মেয়েটা বড় ভাল। বড় আপন করে নেয়।’

২০১৬। ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে লড়তে নেমে সেই ‘ঘরের মেয়ে’ হয়ে ওঠাই এ বার জোট-প্রার্থী দীপা দাশমুন্সির তুরুপের তাস। রাজনৈতিক অবস্থান এবং গুরুত্ব বিচারে আজকের তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের দীপার তুলনায় অনেক বেশি ওজনদার। কিন্তু সোমনাথবাবুর বিরুদ্ধে মন কাড়তে মমতা যেমন ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন, দীপাও ঠিক সেই পথেই হাঁটলেন। সাংসদ ছিলেন, কেন্দ্রে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাই ’৮৪-র মমতার মতো অচেনা মুখ তিনি নন। তবু পাড়ার পর পাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে নিজেকে নতুন করে চেনানোর চেষ্টা করলেন দীপা। ফের লোক বলতে শুরু করল, ‘একদম ঘরের মেয়ের মতো!’

’৮৪-র প্রচারের ফাঁকে একবার সোমনাথবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল মমতার। বয়োজ্যেষ্ঠ প্রতিপক্ষকে প্রণাম করে মমতা বলেছিলেন, ‘‘আশীর্বাদ করবেন।’’ সোমনাথবাবু হতচকিত। ঘটনাটি কয়েক মাইল এগিয়ে দিয়েছিল সেদিনের ‘ঘরের মেয়ে’কে। ’১৬-র চলার পথে মমতা-দীপা মুখোমুখি হওয়ার খবর নেই। তবে ভোট চাইতে কংগ্রেস প্রার্থী সটান ঢুকে পড়েছিলেন ‘দিদি’র কাছের ভাই ববি হাকিমের চেতলার বাড়িতে। ববি তখন না থাকলেও ছিলেন তাঁর স্ত্রী। ভোট চেয়ে বেরোনোর মুখে ববির সঙ্গেও দেখা। নমস্কার, সৌজন্য বিনিময়।

তিন দশক পেরিয়ে এ ভাবেই দুটি ছবি কোথায় যেন মিল খুঁজে পায়।


শেষ দিনের প্রচারে ভবানীপুরের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। সুদীপ্ত ভৌমিক ও সুদীপ আচার্যের তোলা ছবি।

তবে একটি জিনিস অবশ্যই পাল্টেছে। ১৯৮৪-তে মমতা ছিলেন প্রতিষ্ঠান বিরোধী, বিদ্রোহিনি। নিজে তখন একেবারে প্রথম সারির নেত্রী ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার রাজনীতি তাঁকে যাদবপুরের মতো কঠিন সিপিএম দুর্গে ফাটল ধরাতে সাহায্য করেছিল। আজ ২০১৬-র মমতা নিজেই প্রতিষ্ঠান। শুধু মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বলেই নয়। কংগ্রেস ভেঙে নিজে দল গড়ে, সেই দলকে এগিয়ে নিয়ে একেবারে সিপিএমের ৩৪ বছরের রাজ্যপাট বদলে দেওয়ার ইতিহাস তৈরি করতে সফল হয়েছেন তিনি। ’৮৪-র মমতার সহায়-সম্বল ছিল সীমিত। আজ লোকবল, অর্থবল কিছুতেই তাঁর কমতি নেই। এতগুলি বছরের রাজনৈতিক অভিযাত্রা এবং পরপর সাফল্য তাঁকে রীতিমতো মজবুত ভিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

দীপার লড়াই ‘মমতা’ নামের সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তুলনা টেনে কেউ হয়তো বলতে পারেন, আপাত অপ্রতিরোধ্য সিপিএমের তারকা সোমনাথবাবুকে যাদবপুরের শক্ত ভূমিতে মমতা হারিয়ে দেবেন— সেদিন কি ভাবা গিয়েছিল? তা হলে দীপা কেন নয়? কিন্তু এই সব ধারণা বাস্তবের সঙ্গে কতটা মেলে, প্রশ্ন সেটাই।

প্রথমেই ভোটের অঙ্ক। বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে ভবানীপুরের জন্ম ২০১১-তে। বিধানসভা ভোটে প্রথমে জিতেছিলেন তৃণমূলের সুব্রত বক্সী। প্রবল বাম-বিরোধী হাওয়ায় ৫০ হাজারে হেরে গিয়েছিল সিপিএম। তিন মাস পরে উপ-নির্বাচনে সেই ব্যবধান মমতা বাড়িয়ে নেন ৫৪ হাজারে। তখনও তৃণমূলের সঙ্গেই ছিল কংগ্রেস। এর পরে ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন। মমতা একা। কংগ্রেস, বিজেপি কেউ সঙ্গে নেই। দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের এই বিধানসভা এলাকায় তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দিল নরেন্দ্র মোদীর দল। ফারাকটা যৎসামান্য। কিন্তু তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়!  দেখা গেল, মোদী-ঝড়ে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি-র ভোট হু হু করে বেড়ে গিয়ে তৃণমূলকে ১৭৬-এ হারিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি লক্ষ করা গেল, বিজেপির কাছে তৃণমূল একটু পিছিয়ে পড়লেও তারা একা যে ভোট পেয়েছে তা সিপিএম এবং কংগ্রেসের মোট ভোটের চেয়েও সাড়ে ন’হাজার বেশি। এক নজরে এই হিসেব সামনে রেখেই এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা-দীপা লড়াই।

তবে কথায় বলে, সংখ্যার চেয়ে বড় গর্দভ আর হয় না। আর রাজনীতির অঙ্ক তো শুধুই স্কুলের খাতায় যোগ-বিয়োগের আঁক কষা নয়, রসায়নের ক্লাসও বটে! দুয়ে-দুয়ে চারের সহজ হিসেব তাই অনেক সময় জটিল হয়ে যায়।

২০১৪-র লোকসভা নির্বাচন এবং এ বারের বিধানসভা নির্বাচন উভয়ের পটভূমি আলাদা। রাজনৈতিক বাস্তবতাও ভিন্ন। গত লোকসভা ভোটের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন মোদী। তাঁকে ঘিরে হ্যাঁ অথবা না-এর ভোট দিয়েছিল ভারতবাসী। তাতে বিজেপি যে ভাবে ভোটের মেশিনে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে পেরেছিল, সেই পরিস্থিতি আজ নেই। একই ভাবে রাজ্যের ভোটে ২০১১ মমতাকে ঘিরে যে আবেগ তৈরি করতে পেরেছিল, সরকারে থাকার পাঁচ বছর পরে ২০১৬-তে তা-ও একই রকম রয়েছে বললে পুরোপুরি ঠিক বলা হবে না। নানা ঘটনার ঘাত-অভিঘাত তার কারণ। তৃণমূল নেত্রী নিজেও জানেন এই বাস্তবতা। তাই ২৯৪টি কেন্দ্রেই নিজেকে প্রার্থী বলে বারবার তুলে ধরে তিনি বুঝিয়েছেন, দলকে এই বৈতরণী পার করানোর একমাত্র কান্ডারি তিনিই। আগুয়ান সেনাপতির মতো ভাল-মন্দ সব দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার সাহস দেখাতে তিনি পিছপা হননি। 

ভবানীপুর এর থেকে আলাদা কিছু হতে পারে না। এখানেও তাই ভোটের বিন্যাসে হেরফের হওয়া নিশ্চিত। আর লোকসভার ফলের নিরিখে ভাবলে সেই বিন্যাসে বিজেপি অবশ্যই আলোচনায় জায়গা পাবে। এ বারেও সেখানে বিজেপি প্রার্থী রয়েছেন। তিনি নেতাজি-পরিবারের চন্দ্র বসু। প্রচারের মাপকাঠিতে কেউ তাঁকে ‘অমাবস্যার চাঁদ’ বলতেই পারেন। তবে এটা সত্য যে, প্রধানত বিজেপির ভোট কতটা ভাঙে এবং কোথায় যায়, ভবানীপুরের ভবিষ্যৎ আপাত দৃষ্টিতে অনেকটাই তার ওপর দাঁড়িয়ে।

পাশাপাশিই মমতার বিপুল জনপ্রিয়তা, ভবানীপুরের সঙ্গে পাড়ার মেয়ে মমতার আজন্ম সম্পর্ক, মুখ্যমন্ত্রী মমতার নিজস্ব ক্যারিশমা— এ সবও সেই ভাঙা-গড়ার খেলায় অবিচ্ছিন্ন উপাদান। গাণিতিক নিয়মে যার পরিমাপ করা অসম্ভব। যেখানে সরাসরি মমতার নিজের হারজিতের প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, বিবেচনার মাপকাঠিটাও সেখানে অন্য রকম হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। শুধু রাজনীতি বা ভোটের অঙ্কে তাই ভবানীপুরের উত্তর মেলানো কঠিন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে শুধু দীপা দাশমুন্সির প্রতিদ্বন্দ্বী নন। ভবানীপুরের লড়াই মুখ্যমন্ত্রী মমতার সঙ্গে ব্যক্তি মমতার। জিতলে দুই মমতাই জিতবেন। আর দীপা যদি ‘অঘটন’ ঘটাতে পারেন, সেটা হবে ২৯৪ জন মমতার পরাজয়।