কেমন লাগছে ভূমিকন্যা করতে?

ভালই লাগছে। আমি তো এর আগে কখনও টেলিভিশন করিনি। টেলিভিশনে এত বড় স্কেলে ও বড় চরিত্রে, প্রায় বলা যেতে পারে, যে যে মুখ্য চরিত্র আছে সেগুলোরও মুখ্য চরিত্র করছি। সেটাকে প্রায় জীবনে প্রথম বারের জন্য হিরোর রোল বলা যায়। সেই এক্সপেরিয়েন্সটা খারাপ না। তবে থিয়েটার, সিনেমা অনেক এগিয়ে আছে কাজের স্যাটিসফ্যাকশনের জায়গা থেকে।

সুদীপ্তা, সোহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন...

সুদীপ্তাদির সঙ্গে আমার প্রথম কাজ। যদিও ধনঞ্জয় ফিল্মে আমরা একসঙ্গে ছিলাম।  কিন্তু আমরা একই সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ পাইনি।একই দৃশ্যে আমরা ছিলাম না। এখানে সে সুযোগ পাচ্ছি।

সোহিনী খুব মজার, খুবই রসিক। আমরা সমবয়সী, অভিনয় নিয়ে ভাবনার দিক থেকেও আমাদের মিল আছে। আমাদের দৃশ্যগুলো নিয়ে আলোচনা করে নেওয়া...কী করে ভাল করা যায়, কী করে কম্প্যাক্ট করা যায়, কী করে এফেক্টিভ করা যায়, এ সব নিয়ে আমরা আলোচনা করি। প্রায় চার মাস ধরে আমরা একসঙ্গে কাজ করছি কিন্তু কখনও বোর হয়ে যাচ্ছি না। এই যে বোর না হওয়া, এটাই বোধহয় অভিনেতা হিসেবে একটা পাওনা।

পর্দা ও পর্দার বাইরে সোহিনীর সঙ্গে আপনার রসায়ন...

আমাদের কেমিস্ট্রি ভালো। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল বলেই হয়তো দৃশ্যগুলো ভাল করতে পারছি। ব্যক্তিগত কেমিস্ট্রি কিছু একটা থাকতেই হবে তবে সেটা স্ক্রিনে রিফ্লেক্ট করবে, সেটা তো নয়। আমরা অভিনেতা। দৃশ্যগুলো ফুটিয়ে তোলাই আমাদের কাজ। অভিনেতারা কেমিস্ট্রি তৈরি করতে জানেন। আমরাও পারি। সোহিনীর সঙ্গে তো আমার ঝগড়া ঝামেলা এ সব কিছু নেই।আমরা বন্ধু মানুষ। শটের বাইরেও আমরা হাসিঠাট্টা করি। ক্যামেরার সামনেও।

আপনার চরিত্রের সঙ্গে কি পৌরাণিক বা লৌকিক কোনও চরিত্রের আদল আছে?

একমাত্র আমার চরিত্রটাই পৌরাণিক বা লৌকিক গল্পের বাইরে। এটা একদমই একটা নতুন চরিত্র। এই ধারাবাহিকের প্রায় সব চরিত্রই পৌরাণিক বা লৌকিক চরিত্রের কনটেম্পোরারি ভার্সন।

অনির্বাণ ভট্টাচার্য এবং সোহিনী সেন

অরিন্দমদা (শীল) আপনাকে নানান রকম চরিত্র করার সুযোগ করে দিয়েছেন।

অরিন্দমদার কাজের সূত্রেই আমার পাদপ্রদীপের তলায় আসা। অরিন্দমদার সঙ্গে সবসময় নতুন নতুন এবং প্রথম প্রথম কাজ করেছি। প্রথম ধনঞ্জয়ের মতো চরিত্র করেছি অরিন্দমদার সঙ্গে। ‘দুর্গা সহায়’-তে ভিলেনের ছোট্ট রোল করেছি। সিনেমায় দু’-আড়াই বছরের কেরিয়ারেই প্রথম ‘গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স’ লেখা হয়েছে। টেলিভিশনের কাজ তো অনেক দর্শকের কাছে পৌঁছয়। অরিন্দমদার সৌজন্যেই প্রথম টেলিভিশনে এলাম এবং নায়ক বা হিরোর রোল পেলাম। তো অরিন্দমদার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। তিনিই আমার মতো নতুন অভিনেতাকে সম্মান জানিয়েছেন।

ভূমিকন্যা করতে গিয়ে কি ফিল্ম বা মঞ্চের জন্য সময় কমে যাচ্ছে?

এই কাজটা এবং ফিল্মের কাজ প্যারালালি করব, এ রকমটাই ঠিক করে রেখেছিলাম। সেটাই হচ্ছে। কিন্তু মঞ্চে খুব একটা বেশি কাজ করতে পারছি না। ভূমিকন্যা তো অনেকটাই শুট হয়ে গেল। এটা শেষ হলেই মঞ্চের কাজে সময় দিতে পারব বলে আমার ধারণা।

সামনে আপনার কী কী কাজ দেখব?

দুর্গাপুজোয় ‘এক যে ছিল রাজা’ রিলিজ করছে। অঞ্জন দত্তর পরিচালনায় একটা ফিল্ম করেছি। সে ছবি শীতকালে রিলিজ করবে। রিলিজ ডেট জানি না। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার তৃতীয় ছবি ‘সাজাহান রিজেন্সি’ রিলিজ করবে ডিসেম্বর মাসে। আমার ‘ব্যোমকেশ’-এর শুটিং আছে শিগগির। আশা করা যাচ্ছে বড়দিনের কাছাকাছি হইচই-এ আসবে। অঞ্জনদার সঙ্গে পরের কাজের কথা চলছে। রিনাদির (অপর্ণা সেন) ‘ঘরে বাইরে আজ’ করছি। নিখিলেশ করছি আমি। এই আইকনিক চরিত্রটার জন্য আমাকে অনেক খাটতে হবে। রিহার্সাল, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি চলছে। আমার মনে হয়, আমি যদি ভাল করে চরিত্রটা করতে পারি তো পিপল উইল রিমেম্বার দ্য রোল ফর আ লং টাইম। আবারও বলছি, যদি আমি ভাল অভিনয় করতে পারি।

কেন? কনফিডেন্ট নন?

আমি কোনও দিনই কনফিডেন্ট নই।

‘ঘরে বাইরে আজ’-এর গল্প কি সমসাময়িক?

হ্যাঁ। রবীন্দ্রনাথেরই গল্প কিন্তু কন্টেম্পোরাইজড।

টেলিভিশনে আপনার প্রথম কাজ। কেমন লাগছে?

ভালই লাগছে। টেলিকাস্টের দিক থেকে যদি দেখি তা হলে টেলিভিশন তো একটা রোজের ব্যাপার, প্রতি দিনের ব্যাপার। সিনেমা ঠিক তা তো নয়। একটা সিনেমা অনেক দিন সময় নিয়ে তৈরি হয়, তার পর হলে রিলিজ করে। টেলিভিশনের মধ্যে একটা রেগুলারিটি আছে, প্রতি দিন আছে, সোম থেকে রবি আছে। ফলত, টেলিভিশনের কাজের মধ্যে থামতে না পারা বা থামতে না চাওয়ার এক ধরনের ক্লান্তি আছে এবং এক ধরনের মোনোটনি আছে।

আপনি ক্লান্ত?

একটু টায়ার্ড তো মাঝে মাঝে লাগে। আমার ধারণা, অন্য অভিনেতাদেরও লাগে। এখন এই ফরম্যাটটা টেলিভিশনের একটা দিক। শুধু অভিনেতারা নন, এই যে ইউনিট কাজ করে...ট্রলি সেটিং, ইলেকট্রিক, লাইট, ক্যামেরা, এডিটিং, ডিরেক্টোরিয়াল...সমস্ত ডিপার্টমেন্টের সদস্যদেরই প্রতি দিন কাজ করতে হয়, প্রতি দিন ডেলিভার করতে হয়। একটু তো ক্লান্ত লাগেই।

টেলিভিশনে কাজের সময় নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু অদলবদল হল

হয়েছে তো। আমার ধারণা, খুবই পজিটিভ ডিসিশন সেটা। মানে মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে, একটু সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার পক্ষে সেটা খুবই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কৌশিক সেন ও চিরঞ্জিতের সঙ্গেও তো কাজ করছেন?

দীপকদার (চিরঞ্জিত) সঙ্গে অনেক দিন আগেই অরিন্দমদা আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। দীপকদা আমার কাজ দেখতেন, কাজ মানে সব রকম কাজ দেখতেন। থিয়েটারও দেখতেন এবং খুবই স্নেহ পরবশ হয়ে আমাকে পরামর্শ দিতেন। নিজে উপযাচক হয়ে এসে আমাকে বলতেন। এত বিখ্যাত, এত পপুলার এক জন মানুষ, আইকনের মতো। তিনি আমাকে এসে এসে এ রকম বলছেন! ভূমিকন্যায় প্রথম দীপকদার সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করা শুরু করেছি। যদিও খুব অল্প সময় আমরা একসঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ পাই। কারণ গল্পের দুটো আলাদা ট্র্যাকে আমরা অভিনয় করছি। আমার সঙ্গে এখনও পর্যন্ত দুটো দৃশ্য হয়েছে। অদ্ভুত একটা স্নেহ আছে, ভালবাসা আছে। আমার মতো জুনিয়রের প্রতি আদর আছে।

বাবানদার (কৌশিক সেন) সঙ্গে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক। সেই ইউনিভার্সিটির সময় থেকেই বাবানদার থিয়েটার দেখতে যেতাম। বাবানদার সঙ্গে আমার ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’র মতো ছবিতে অতটা কাজ। ভূমিকন্যাতেও বাবানদার সঙ্গে মাঝে মাঝেই...যদিও ওই, অন্য ট্র্যাক। দুটো ট্র্যাক মিলে গেলেই একসঙ্গে কাজ হয়। ভূমিকন্যায় বাবানদার অভিনয় তো অত্যাশ্চর্য হয়ে দেখার মতো বিষয়। তাঁর মতো অভিনেতা ও রকম একটা চরিত্রে কী ভাবে অভিনয় করছেন, তাঁর টাইমিং, তাঁর ডেলিভারি একটা অভিনয়ের ক্লাসের মতো। মানে যারা অভিনয় করতে নতুন আসছে তাদের সিরিয়াল দেখার পরামর্শ দেব তা নয়। কিন্তু তারা যেন বাবানদার চরিত্রায়িত চন্দ্রভানুকে দেখে। তা হলে বুঝতে পারবে যে অভিনেতার টাইমিং কাকে বলে, অভিনেতার ডেলিভারির কনফিডেন্স কাকে বলে, অভিনেতার স্কিল কাকে বলে। স্কিলড অ্যাক্টর কেমন হয় সেটা বাবানদার অভিনয় দেখে বোঝা যায়। বাবানদাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। সৌভাগ্য আমার।

প্রেম করেন?

হ্যাঁ।

প্রেমিকা কে?

সেটা বলা যাবে না। তাতে আমার থেকেও বেশি তার অসুবিধা হবে।

সময় দিতে পারেন তাঁকে?

খুব একটা নয়। তবে প্রয়োজনীয় সময়টুকু বের করে নিই। পেশাদার জীবন। কাজটাই মূল প্রায়োরিটি। তার বাইরে যতটুকু সম্ভব সময় দিই।

প্রচুর ফ্যান বেড়ে গিয়েছে আপনার।

শুনছি তাই। নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকি না। অন্যদের কাছে শুনছি। আমার কাজ মানুষের ভাল লাগছে। তাঁরা আশীর্বাদ করছেন। একটা হিসাবে এটা পরম প্রাপ্তি।

আরও পড়ুন: নানার পাশে দাঁড়িয়ে তনুশ্রীকে আক্রমণ রাখি সবন্তের

আপনার স্বপ্নের চরিত্র আছে যা আপনি করতে চান?

অনেক চরিত্র। মূলত থিয়েটারে। থিয়েটারে হ্যামলেট করতে চাই এক বার, আর একটু বয়স হয়ে গেলে কিং লিয়ার করতে চাই। কিং লিয়ার কিম্বা রিচার্ড থার্ড, শেক্সপিয়রের যে কোনও একটা।

সৃজিতের সঙ্গে আপনার কাজের ভালই অভিজ্ঞতা হল।সৃজিতকে কী মনে হয়? ভীষণ কড়া?

সবাই এক প্রশ্ন করে। কেন যে এ রকম একটা ধারণা হয়েছে কে জানে! কেন স্ট্রিক্ট হতে যাবে? সিরিয়াস এক জন লোক, সিনেমার কাজ নিয়ে ভীষণ ফোকাসড্‌। নিজে যখন নিজের তরফ থেকে বেস্ট ডেলিভার করছেন তখন অন্যান্য লোকের কাছ থেকেও বেস্ট কাজটা এক্সপেক্ট করবেন। অভিনেতা হিসেবে সেটাকে আমি খুব ভাল চোখে দেখি। এই ধরনের ডিমান্ডের মুখে গিয়ে যদি আমি না দাঁড়াই তা হলে আমার বেস্টটা কী করে ডেলিভার করব, এক্সপ্লয়েট করব? সৃজিতদা এত সিরিয়াসলি অ্যাক্টরদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করেন সেটা কেন যে এ রকম স্ট্রিক্ট, কঠোর, কঠিন আখ্যা পেয়েছে কে জানে?

আরও পড়ুন: রেগে গিয়ে এক যুবককে প্রকাশ্যে চড় মারলেন দেব! দেখুন ভিডিয়ো

সামনেই তো ‘এক যে ছিল রাজা’র রিলিজ?

আমার এটা জীবনের প্রথম পুজো রিলিজ। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবির জন্য দর্শকদের কিছু বলে দেওয়ার দরকার নেই। কারণ সৃজিত মুখোপাধ্যায় বাঙালির কাছে অলরেডি একটা পুজো ট্রিট। তাঁরা জানেন যে সৃজিত তাঁদের জন্য একটা বড় উপহারের ডালি সাজিয়ে রেডি থাকবেন। এবং আবার একটা অন্য স্বাদের ছবি। ট্রেলার দেখে যে উচ্ছ্বাস, যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে সেই আগ্রহ দেখে আমরা সকলেই আশাবাদী।

অপর্ণা সেনের ‘ঘরে বাইরে আজ’ নিয়ে আলাদা করে কোনও প্রস্তুতি নিয়েছেন?

রিনাদি কোনও অভিনেতাকে নিজের ওপর ছাড়েন না। রিনাদি অভিনেতাদের ডেকে নেন, ওয়ার্কশপ করান। সেখানে থাকেন সোহাগ সেন এক জন ট্রেনার বা গ্রুমার হিসেবে। এই অভিজ্ঞতা একদম প্রথম ছবিতে হয়েছিল যখন আমি ‘আরশিনগর’ করেছিলাম। এ বার রিনাদির সঙ্গে আমার দ্বিতীয় কাজ আরও বড় পরিসরে। এ বারেও তিনি তাই করেছেন। কখনও সোহাগদির বাড়িতে, কখনও রিনাদির বাড়িতে ওয়ার্কশপ হয়েছে। অভিনেতা প্রস্তুতি নেবে কি নেবে না তার উপর নির্ভর না করে তিনি চোখের সামনে অভিনেতাকে প্রস্তুত করেন।

অঞ্জন দত্ত’র সঙ্গে কাজ করে কেমন লাগল?

অঞ্জনদা লাভলি ডিরেক্টর, লাভলি হিউম্যান বিয়িং, খুব ইমোশনাল। সকলেই ভালবাসেন, কিন্তু অঞ্জনদার ভালবাসার মধ্যে একটা ওয়ার্মথ পাওয়া যায়। অঞ্জন দত্ত একটু আগের সময়ের মানুষ। উনি নিজে অন্য বড় বড় ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করেছেন, সো কলড্‌ আর্টফিল্ম করেছেন। মৃণাল সেন, নবেন্দুবাবু, অপর্ণা সেন এঁদের সঙ্গে কাজ করে এসেছেন। অঞ্জন দত্তের মতো দক্ষ অভিনেতা আমাদের দেশে খুব কম আছেন। তো ও রকম এক জন সেরিব্রাল, ভয়ঙ্কর সিরিয়াস এবং অসম্ভব দক্ষ ভাল অভিনেতার সঙ্গে কাজ করছি, উনি যে ক্রিয়েটিভ আশ্রয় দিতে পারছেন সেটা আমার কাছে একটা বিশাল প্রাপ্তি।

(হলিউড, বলিউড বা টলিউড - টিনসেল টাউনের সমস্ত গসিপ পড়তে চোখ রাখুন আমাদের বিনোদন বিভাগে।)