Advertisement
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

টোটা কাহিনি

চোদ্দো মিনিটের ‘অহল্যা’ সুপারহিট। তাঁর ছবি ‘শপথ’‌য়ের অভিনব রিলিজ প্ল্যান নিয়ে প্রচুর চর্চা টালিগঞ্জে। সঙ্গে বঞ্চনা আর ক্ষোভ। টোটা রায়চৌধুরী-র মুখোমুখি ইন্দ্রনীল রায়।চোদ্দো মিনিটের ‘অহল্যা’ সুপারহিট। তাঁর ছবি ‘শপথ’‌য়ের অভিনব রিলিজ প্ল্যান নিয়ে প্রচুর চর্চা টালিগঞ্জে। সঙ্গে বঞ্চনা আর ক্ষোভ। টোটা রায়চৌধুরী-র মুখোমুখি ইন্দ্রনীল রায়।

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল।

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল।

শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০০:১৬
Share: Save:

হোয়াটস ইন আ নেম?

Advertisement

মানে?

মানে, আপনার এক সহপাঠী এবং কার্শিয়াংয়ে বেড়ে ওঠা আর একজন অভিনেত্রী, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় বলছিলেন তাঁরা আপনাকে চেনেন পুষ্পরাজ রায়চৌধুরী হিসেবে।

Advertisement

হা হা হা হা। হ্যাঁ, পুষ্পরাজই আমার ভাল নাম। টোটা ডাকনাম। আমার জন্মের সময় আমার দাদু পুরীর কাছে টোটা গোপীনাথের মন্দিরে পুজো করছিলেন। সেই থেকেই ডাকনাম।

নাম বদল করতে বলেনি কেউ?

প্রচুর লোক বলেছিলেন। নাম শুনলেই অনেকে বলত কী রকম সমাজবিরোধী মার্কা নাম। এমনিতে আমাকে দেখতে বাঙালিদের মতো নয়। একটু কাঠখোট্টা। তার উপর নাম টোটা। কিন্তু পরে জেদ চেপে গেল। মনে হল, এই নাম নিয়েই ‘নাম’ করব।

এক সময় আপনি ঋতুপর্ণ ঘোষের পছন্দের অভিনেতা ছিলেন। উনি কোনও দিন বলেননি নাম বদলাতে?

না। তবে ঋতুদা এটা বলেছিল যে ম্যাটিনি আইডল হওয়া আমার কোনও দিন হবে না। তার কারণ, চলনে-বলনে আমি নাকি ভীষণ পারফেক্ট। ওর মত ছিল, ম্যাটিনি আইডল হতে গেলে অত পারফেকশন থাকলে চলে না।

‘সানগ্লাস’‌য়ের পর থেকে আর তো আপনাকে দেখাই গেল না ঋতুপর্ণ-র ছবিতে। ঝগড়া হয়েছিল?

না, ঝগড়া হয়নি কিন্তু ঋতুদা ‘সানগ্লাস’ করতে করতেই বলেছিল, ‘‘এটা বোধহয় তোর সঙ্গে আমার শেষ কাজ।’’ আমি তো শুনে অবাক। জিজ্ঞাসাও করেছিলাম, ঋতুদা, এরকম বললে কেন? বলেছিল, ‘‘তুই আমাকে ছাড়াও তো ভাল কাজ করছিস। এ বার আমি একটু অন্যদের সঙ্গে কাজ করব।’’ তারপর থেকে যিশুকে নেওয়া শুরু করল ঋতুদা। যিশু আমারও খুব ভাল বন্ধু। আর সে সময় বোধহয় সত্যিই ওর ঋতুদার ছবিগুলো করার দরকার ছিল।

কানাঘুযো শোনা যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নাকি প্রেশার ছিল ঋতুপর্ণ-র উপর!

একদমই না। প্রসেনজিৎ আর ঋতুদা ছিলেন বেস্ট ফ্রেন্ডস। ঋতুদা আমাকে সব সময় বলত, ‘‘বুম্বার প্রতি আমার অসম্ভব একটা সহানুভূতি আছে।’’ বুম্বাদার খারাপ সময়েও ঋতুদা পাশে ছিল। সবচেয়ে ভাল সময়েও।

কিন্তু ‘রাম লক্ষ্মণ’ বলে একটা ছবি করেছিলেন আপনি বুম্বাদার সঙ্গে। যেখানে নাকি বুম্বাদা আপনার ছবি পোস্টার থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন?

ইনিশিয়ালি আমি ভেবেছিলাম বুম্বাদা আমাকে পোস্টার থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, এটা ছিল প্রোডিউসরদের কারসাজি। সেই সময় বুম্বাদা সুপারস্টার। ওর কোনও দরকার ছিল না আমার মুখ পোস্টার থেকে সরানোর।

আপনার একটা ছবি রিলিজ করেছে। ‘শপথ’। একই সঙ্গে ‘অনলাইন’ আর হলে রিলিজ হয়েছে এবং ভাল চলছে।

হ্যাঁ। আমাদের টাকার জোর নেই যে একশো হলে রিলিজ করাব। তাই একটা স্ট্র্যাটেজি নিয়েছিলাম, একই দিনে ছবিটা অনলাইন আর হলে রিলিজ করব। এর আগে অনলাইনে ছবি রিলিজ হয়েছে, কিন্তু সেটা হলে রিলিজ হওয়ার দিন দশেক কী দিন সাতেক পরে। এটার জন্য আমরা হল মালিকদের কাছেও কৃতজ্ঞ। ওঁরা আমাদের ভীষণ সাপোর্ট করেছেন। এখন সিক্যুয়েলও করছি, ‘শপথ ২’।

‘শপথ’ ভাল চলছে এই নিয়ে আপনি একটা এসএমএস করেছিলেন। সেটাতে লিখেছিলেন...

...লিখেছিলাম আমি ‘টেরিফিক ট্রায়ো’ নই, না আমি ‘ফ্যাব ফাইভ’। তাও কি আমার ইন্টারভিউ সম্ভব!

এসএমএস পড়ে মনে হয়েছিল রেগে আছেন আপনি?

না, রাগ নয়। ফ্রাস্ট্রেশন। দুঃখ। হেল্পলেসনেস। আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার কী করা উচিত। ক্রমশ নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম কোথায় ভুল হচ্ছে।

কোথায় হচ্ছিল ভুল? প্লিজ বাজে পিআর-এর উদাহরণ দেবেন না!

না, বাজে পিআর-এর উদাহরণ দিচ্ছি না। আমার চিন্তাভাবনায় ভুল ছিল। আমি আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো ভাবছিলাম। আমার ধারণা ছিল আমি ভাল কাজ করে যাব, মানুষ ঠিক খবর পেয়ে যাবে। আজকে বুঝি সেটা ভুল ছিল। এখানে রোজ নিজেকে বিক্রি করতে হয়। এখানে অভিনেতা মানুষ নয়। সে দাঁতের মাজন, অথবা জুতোর কালির মতো একটা প্রোডাক্ট।

একটা জিনিস বলুন, পরম, যিশু বা আবীরের তো জেদটা অনেক বেশি থাকবেই কারণ তাঁরা এমপি জুয়েলার্সের মালিক নন। কোথাও কি এমপি জুয়েলার্সের মালিক হওয়ার কমফর্ট ফ্যাক্টরটা আপনার কিলার ইন্সটিংক্ট কমিয়ে দিয়েছে?

(ভেবে) ইয়েস, হতে পারে। আমি আমার কাজের জায়গায় নিশ্চয়ই যথেষ্ট কিলার ইন্সটিংক্ট দেখাই। কিন্তু কাউকে টপকে, কারও ঘাড়ে পা দিয়ে এগিয়ে যাব, সেটা আমি পারব না। পারব না তার কারণ কোথাও আমার এমপি জুয়েলার্সের ব্যাকগ্রাউন্ডটা চলে আসে। আর ওই যে ফ্রাসট্রেশনের কথা বলছিলাম, সেটার অন্যতম কারণ আজকাল বড় ছবিতে কেউ আমাকে নিচ্ছেই না।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়কে বলেন না কেন?

একবার রিকোয়েস্ট করতে পারি। বার বার করলে তো সেটা ঘ্যানঘ্যানে লাগবে। তাই না?

অনেকে বলেন আপনার অভিনয় ‘উডেন’। ভীষণ কাঠকাঠ…

(হেসে) এটা এসেছে একটা মাইন্ড সেট থেকে। আমি নিয়মিত জিম করি। সিক্স প্যাক্স বানিয়েছিলাম বহু বছর আগে। সে সময় আমাকে এক ড্রেসার বলেছিল, ‘‘কী করেছ পেটটা, একটু চর্বি আনো শরীরে। না হলে অভিনয় করবে কী ভাবে।’’

ওরা ধরে নিয়েছিল যেহেতু আমি জিম করি এবং সোজা হয়ে হাঁটি তাই আমি স্টিফ। আমি অনেক হিরোকে বলতে চাই, আগে আমার মতো শরীর করে দেখা না! বাইরে বসে শুধু কথা। তোমরা জামা খুললে তো মেয়েরা হাসে। দেখছি আমার ঢাক আমাকেই পেটাতে হবে…

পেটান...

একটা অভিনেতা দেখিয়ে দিন যে ‘চোখের বালি’র পাশাপাশি ‘রাম লক্ষ্মণ’ করেছে, ‘টিনটোরেটোর যিশু’র পাশাপাশি ‘গোলমাল’ করেছে। ‘বলো না তুমি আমার’এর সঙ্গে ‘আবর্ত’ করেছে। তার পর বুঝব কে উডেন আর কে বাঁশের কঞ্চির মতো নড়বড়ে!

সুজয় ঘোষের ‘অহল্যা’তে আপনার প্রশংসা হল।

‘অহল্যা’ এমন একটা সময় এসেছিল, যখন ভেবেছিলাম আমি শেষ।

খুব ন্যাস্টি একটা রিঅ্যাকশন শুনেছিলাম আপনার ‘অহল্যা’ পারফরম্যান্সের ব্যাপারে।

কী সেটা?

কয়েকজন বলেছিলেন পারফেক্ট কাস্টিং করেছেন সুজয়। ‘উডেন’ টোটা রায় চৌধুরীকে লাস্টে কাঠের পুতুল বানিয়ে দিয়েছেন...

হা হা হা হা। এত ইন্টেলিজেন্ট কমেন্ট যে এখনও টালিগঞ্জে কেউ করতে পারে এটা জেনে ভাল লাগল। তবে যাঁরা এই সব করেন তাঁদের ওপর আমার করুণা হয়।

এইটুকু বুঝি তাঁরা হিংসে করেন। তাঁদের কাজ তো চল্লিশ হাজারের বেশি লোক কোনও দিন দেখেননি। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ‘অহল্যা’ তো চল্লিশ লক্ষ লোক দেখলেন এবং প্রশংসা করলেন। তাদের আর কী বলব?

আপনার পরের প্রজন্মে র অভিনেতাদের কেমন লাগে? ঋত্বিক, পরম, শাশ্বত, আবীর?

ঋত্বিক আউটস্ট্যানডিং। আমার মনে হয় নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির চাইতে কোনও অংশে কম নয়।

শাশ্বতকে কাছ থেকে দেখেছি। ‘কহানি’ আর ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’য়ের আগে ওর ফ্রাসট্রেশন দেখেছি। ওকে টিভি-তে দাদা-কাকার রোল দিচ্ছিল সবাই। সংসার চালাতে হবে তাই ফ্রাসট্রেটেড হয়ে ওই কাজগুলো করতেও হচ্ছিল। কিন্তু ওই দুটো ছবি দেখিয়ে দিয়ে গেল ও কত বড় মাপের অভিনেতা।

আবীর, পরম...

আবীরকে হ্যাটস অফ। অনেকেই জানে না, ‘অংশুমানের ছবি’তে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তের গলাটা আবীরের ডাব করা। সেখান থেকে সাত বছরে ফেলুদা, ব্যোমকেশ — বড় বড় ব্যানার। আবীর দেখিয়ে দিয়েছে ওর ফাইটিং স্পিরিট। আই লাইক হিম আ লট।

আর পরম?

মাল্টিডাইমেনশাল। অভিনয় করে, পরিচালনা করে, গান গায়, কাগজে লেখে। কিন্তু মনে হয় এত সব করতে গিয়ে ওর কনসেনট্রেশনটা অ্যাফেক্টেড হচ্ছে। পরম কী হতে চায়, নিজের ভিতরের এই কনফিউশনটার জন্যই কিন্তু আবীর ওকে ছাড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে।

এখান থেকে তা হলে কোথায়? জিম না দোকান?

জিম করে দোকান।

কোন শোরুমে গেলে আপনাকে দেখতে পাব?

বিবেকানন্দ রোডের শোরুমে বসি আমি। আমার কাজটা ব্যাক অফিস দেখা।

এমন কি হয়েছে দোকানে এত ভিড় যে আপনি ক্যাশ সামলাচ্ছেন?

হয়েছে। ক্যাশ নিয়ে কাউন্টারে গিয়েছি। খুব ভিড় হলে সিসিটিভিতে চোখ রেখেছি।

শেষ প্রশ্ন। টালিগঞ্জের অবস্থা খারাপ। এই অবস্থায় ব্যবসায়ী টোটা রায় চৌধুরীর কোনও বিজনেস স্ট্র্যাটেজি আছে টালিগঞ্জকে বাঁচানোর?

মাল্টিস্টারার ছবি করতে হবে। বুম্বাদাকে জিতের সঙ্গে বা জিৎকে দেবের সঙ্গে ছবি করতে হবে। পাঁচ’ছ কোটির ছবি এখনই বন্ধ করতে হবে। ওই টাকা ফেরত আসবে না কিছুতেই কারণ অত হলই নেই, আর পশ্চিমবঙ্গে স্যাটেলাইট বাজারও জিরো। ম্যাক্সিমাম আড়াই কোটির বাজেট হতে পারে। এমনিতেই চোরাবালিতে রয়েছি। হাঁটু অবধি তো ঢুকেই গিয়েছি। বাজেট না কমালে সবাই ডুবে যাব।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.