×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

বিনোদন

‘খারাপ’ অডিশনেই গুলজারের ছবিতে, কাজের অভাবেও অর্থকষ্টে পড়েননি ‘চিতচোর’-এর শিশুশিল্পী

নিজস্ব প্রতিবেদন
২৫ মার্চ ২০২১ ১৩:৩৫
৫ বছরেই অভিনয় করে ফেলেছিলেন বড় বড় তারকাদের সঙ্গে। পাল্টে ফেলেছিলেন নিজের পরিচয়ও। জন্মগত নাম ফহিম আজমি থেকে হয়ে গিয়েছিলেন রাজু শ্রেষ্ঠ। কারণ তাঁকে এই নাম দিয়েছিলেন সঞ্জীবকুমার। তার পর থেকে তিনি দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে আছেন মাস্টার রাজু নামেই।

রাজুর বাবা ইউসুফ ছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। মা মেহরুন্নিসা ছিলেন শিক্ষিকা। অভিনয় জগতের সঙ্গে দূরদূরান্তেও সম্পর্ক ছিল না পরিবারে। থাকতেন মুম্বইয়ের ডোংরিতে। তাঁদের বাড়ির কাছে বলিউডের অনেক কাস্টিং ডিরেক্টর থাকতেন। তাঁদের মধ্যে এক জন কাজ করতেন গুলজারের সঙ্গে।
Advertisement
সেই কাস্টিং ডিরেক্টর কথা বলেন রাজুর বাবার সঙ্গে। প্রথমে তিনি অনুমতি দেননি। তার পর রাজি হন। বান্দ্রায় ‘পরিচয়’ ছবির অডিশনে হাজির হন রাজু। সেখানে আরও অনেক শিশুশিল্পী অডিশনের জন্য ছিল। তাদের ‘কাজ’ অনেক বেশি দক্ষ ছিল। কিন্তু ক্যামেরার সামনে রাজু কেঁদে ফেলে।

এর পর রাজুর পরিবারের ধারণা হয়েছিল, ‘পরিচয়’ ছবিতে তাদের বাড়ির ছেলের আর অভিনয় করা হল না। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে ফোন আসে গুলজারের। বাকি শিশুশিল্পীদের পিছনে ফেলে ‘পরিচয়’ ছবিতে কাজ করেন রাজু-ই।
Advertisement
পরে গুলজার জানিয়েছিলেন ক্যামেরার সামনে রাজুর স্বাভাবিক ও সহজ আচরণ ভাল লেগেছিল তাঁর। বরং, বাকি শিশুশিল্পীদের অভিনয় তাঁর খুব সাজানো এবং মেকি মনে হয়েছিল। জিতেন্দ্র, জয়া ভাদুড়ি, সঞ্জীবকুমার অভিনীত ‘পরিচয়’ ছবির সেটে সকলে ফহিমকে ডাকতেন ‘গুড্ডু’ বলে।

কিন্তু সঞ্জীবকুমারের গুড্ডু নাম পছন্দ ছিল না। তিনি ডাকতেন ‘রাজু’ বলে। সেই থেকে তাঁর পরিচয় হয়ে যায় ‘মাস্টার রাজু’। ছবির টাইটেল কার্ডেও সেই নামই ব্যবহার করা হয়। প্রথম ছবি থেকেই রাজু ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তাঁর কাজ গুলজারের এত পছন্দ ছিল, ‘খুশবু’ এবং ‘কিতাব’ ছবিতেও তাঁকেই নিয়েছিলেন।

শ্যুটিঙের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় পড়াশোনা এবং অভিনয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। শেষে ছবির সেটেই বইখাতা নিয়ে যেতেন রাজু। অভিনয়ের পাশাপাশি চলত পড়াশোনাও। পরে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ওই বয়সে নায়কনায়িকাদের ফ্লার্টও দিব্যি বুঝতেন তিনি। ছোট বলে তাঁর উপস্থিতি ধর্তব্যের মধ্যে আনতেন না তারকারা। কিন্তু তাঁদের ‘বিশেষ আলাপ’ সকলের অজান্তেই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতেন এই শিশুশিল্পী।

পেশাদার অভিনেতার মতোই সমৃদ্ধ এই শিশুশিল্পীর অভিনয়জীবন। ‘দিওয়ানগি’ ছবির অভিনয়ের সময় তিনি আহত হয়েছিলেন। আবার ‘মমতা’ ছবির শ্যুটিঙে সাঁতারের দৃশ্যে প্রায় ডুবতে বসার মতো অবস্থা হয়েছিল। প্রযোজকের কাছ থেকে ২ মাস সময় চেয়ে নেন রাজুর মা। সাঁতার শিখে এসে ওই বিশেষ দৃশ্যের শ্যুটিং সম্পূর্ণ করেন তিনি।

ব্যস্ত কেরিয়ারে প্রতি দিন ৩ শিফ্টেও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন অমিতাভ বচ্চনও। যত ক্ষণ না রাজু আসছেন, তত ক্ষণ ক্লোজ আপ শট নেওয়া হত বচ্চনের। অন্য ছবির সেট থেকে শ্যুটিং সেরে রাজু এলে তার পর দু’জনের লং শট ক্যামেরাবন্দি হত।

১৯৭৬ সালে রাতারাতি বদলে গেল রাজুর খ্যাতি। সে বছরই তিনি ‘চিততোর’ ছবিতে অভিনয় করেন। সুবোধ ঘোষের ছোটগল্প ‘চিত্তচকোর’ থেকে তৈরি এই ছবি পরিচালনা করেছিলেন বাসু চট্টোপাধ্যায়। মূল ভূমিকায় ছিলেন অমল পালেকর এবং জারিনা ওয়াহাব।

‘চিতচোর’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পান মাস্টার রাজু। অথচ এই ছবিতে রাজুর কাজ করার ব্যাপারে প্রথম থেকে নিমরাজি ছিলেন তাঁর মা। অমিতাভ বচ্চন, সঞ্জীবকুমারের মতো তারকাদের সঙ্গে অভিনয় করে আসে রাজু কি না কাজ করবে নবাগত অমল পালেকর, জারিনা ওয়াহাবের সঙ্গে! শেষে প্রযোজক তারাচাঁদ বরজাতিয়া জানান, তিনি রাজু ছাড়া কাউকে নেবেন না। তখন তাঁর মা রাজি হন।

রাজুর মায়ের এই নিমরাজি থাকার ঘটনা পৌঁছেছিল অমল এবং জারিনার কানে। শোনা যায়, পুরো ছবির শ্যুটিঙে তাঁরা রাজুর সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করেননি। তাঁদের কাছ থেকে কিছুটা তিক্ততাই পেয়েছিলেন মাস্টার রাজু। তবে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর এই ছবি ঘিরে সব তিক্ততা দূর হয়ে গিয়েছিল।

‘চিতচোর’ রাতারাতি পাল্টে দিয়েছিল জীবন। মাস্টার রাজুর পারিশ্রমিক ১০ হাজার থেকে বেড়ে হয়ে যায় লক্ষাধিক। ডোংরি ছেড়ে তাঁরা সপরিবার উঠে আসেন বান্দ্রার নতুন বাড়িতে। গুলজার, বাসু চট্টোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকও পছন্দ করতেন মাস্টার রাজুর অভিনয়। তাঁর পরিচালনায় ‘খট্টা মীঠা’, ‘হমারি বহু অলকা’ ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি।

১৯৮৩ সালে ‘নাস্তিক’ এবং ‘ওহ সাত দিন’ ছবিতে অভিনয় করেন রাজু। তার পর বেশ কয়েক বছর তিনি অভিনয় করেননি। তিনি চেয়েছিলেন কিছু বছর ছবি থেকে দূরে থাকতে। যাতে দর্শকদের স্মৃতি থেকে তাঁর শিশুশিল্পীর ভাবমূর্তি মুছে যায়। ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি ফিরে আসতে চেয়েছিলেন পূর্ণবয়স্ক নায়ক হয়ে।

কিন্তু তাঁর সেই ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি। শিশুশিল্পীর পরিচয় ছাপিয়ে তাঁকে নায়ক হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিল না বলিউড। ‘আফসানা প্যায়ার কা’, ‘শতরঞ্জ’, ‘খুদ্দর’, ‘সজন চলে সসুরাল’, ‘দিলজ্বলে’, ‘মসীহা’-সহ কিছু ছবিতে তিনি ছোটখাটো ভূমিকায় অভিনয় করেন। সে সময় রাজেশ খন্নার প্রযোজনা সংস্থায় কিছু দিন সহ-পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। মুলক আনন্দের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয় কাজের সূত্রে। ‘মহাসংগ্রাম’ ছবিতে মাস্টার রাজুকে অভিনয়ের সুযোগ দেন মুলক রাজ আনন্দ।

সলমন খানের সঙ্গেও হৃদ্যতা ছিল রাজুর। সলমনের কথায় তিনি ‘বাগী’, ‘জাগৃতি’ ছবিতে অভিনয় করেন। কিন্তু নিজের প্রত্যাশিত জায়গা পাচ্ছিলেন না রাজু। নায়কের বদলে খলনায়কের ভূমিকাতেও অভিনয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও অধরা সাফল্য।

শেষে বাধ্য হয়ে তিনি পা রাখেন টেলিভিশন দুনিয়ায়। নিজের নাম ‘মাস্টার রাজু’ থেকে পাল্টে করে নিয়েছিলেন ‘রাজু শ্রেষ্ঠ’। কিন্তু কোথাও যেন শিশুশিল্পীর পরিচয় তাঁর সঙ্গে থেকেই গিয়েছিল। যে সময়ে তিনি তারকা ছিলেন, সে সময়ে প্রচুর উপার্জন করেছিলেন। সেই অর্থ তাঁর বাবা মা বিনিয়োগ করেছিলেন যথার্থভাবে। ফলে অর্থাভাবে তাঁকে পড়তে হয়নি। টেলিভিশনের জন্য কাজের অভাবও হয়নি।

শিশুশিল্পী রাজু বড় হয়ে জনপ্রিয় হলেন ছোটপর্দার জগতে। ‘হরর শো’, ‘জয় হনুমান’, ‘দম দমা দম’, ‘শসসসস ফির কোই হ্যায়’, ‘আদালত’, ‘সিআইডি’, ‘ভারত কা বীর পুত্র-মহারানা প্রতাপ’-সহ বহু জনপ্রিয় ধারাবাহিকের তিনি ছিলেন অন্যতম অভিনেতা। ‘লাইফ অব পাই’ ছবির হিন্দি সংস্করণে তিনি ডাবিং করেছিলেন মূল চরিত্র সুরয শর্মার চরিত্রে।

শিশুশিল্পীদের বিস্মৃত হয়ে যাওয়া দেখতে বলিউড অভ্যস্ত। মাস্টার রাজু সেই তালিকায় নাম লেখাননি। শিশুশিল্পী হিসেবে যে জনপ্রিয়তা এবং খ্যাতি তিনি পেয়েছিলেন, বড় হয়ে তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেননি ঠিকই। কিন্তু ছোটপর্দার অভিনেতা হিসেবে নিজের জায়গা মজবুত করেছেন। উপার্জনের অর্থ সঠিক বিনিয়োগের জন্য কাজ না থাকলেও তাঁকে অর্থকষ্টের মুখোমুখি হতে হয়নি।