ছবির প্রথম দৃশ্যে কয়েকটি শট পরে, জেমস বন্ডের ঢঙে ব্যোমকেশের আবির্ভাব, শুরুতেই ইঙ্গিত করেছে সিনেমা হলেও বাঙালির পুজো জমবে ভাল। বিগত কয়েক বছর ধরে পুজোর সময় বাঙালি দর্শকদের জন্য বাংলা সিনেমার আসরে ব্যোমকেশ একটি বড় নাম। তবে এ বার ব্যোমকেশে ছিল অনেক চমক, এবং তার আভাস ট্রেলারই মোটামুটি দিয়েছিল। যার মধ্যে প্রথম চমক বোধহয় সত্যাণ্বেষীর ভূমিকায় পরমব্রত, এবং অজিত হিসেবে রুদ্রনীল। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘মগ্নমৈনাক’ অবলম্বনে ‘সত্যাণ্বেষী ব্যোমকেশ’-এ পরিচালক সায়ন্তন ঘোষাল দর্শকের প্রত্যাশা সম্পূর্ণ না হলেও, আংশিক ভাবে যে পূরণ করতে পেরেছেন তা বলাই যায়।

ইতিহাস দেখলে, সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে অ্যাডাপ্টেশন বাংলা সিনেমায় রীতিমতো ভাল ট্রেন্ড। বইপ্রিয় বাঙালি নিজের প্রিয় উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়িত রূপ দেখতে বার বার হলমুখী হয়েছেন। তবে মূল উপন্যাসটি ধরে এই সিনেমাটি বিচার করতে বসলে, দর্শক নিরাশ হবেন। শিল্পের ব্যবহারে শিল্পী সবসময়েই কিছু স্বাধীনতা পান, এবং এই ছবিতে পরিচালক তা পূর্ণরূপে ব্যবহার করেছেন। উপন্যাসে মূল পটভূমি স্বাধীনতার ১৫ বছর পরের সময়, অর্থাৎ ১৯৬২। সিনেমায়, তা ১৯৭১, সায়ন্তন তাঁর ছবিতে ধরতে চেয়েছেন আসন্ন নির্বাচনের আগে এক দিকে নকশাল আন্দোলন ও অন্য দিকে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের টালমাটাল দেশ। তবে এই রকম ইন্টারেস্টিং একটা সময়কালকে বেছে নিলেও, তার প্রাসঙ্গিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করায় ফাঁক থেকে গিয়েছে। যখন প্রেক্ষাপট বদলালেনই, এবং নতুন প্রেক্ষাপট হিসাবে ৭০-এর মতো একটা উত্তাল ও পরিবর্তনশীল দশককে বাছলেন, তখন শুরুতে ব্যোমকেশের এক জন ধৃত অসহায় মুক্তিযোদ্ধাকে পালাতে সাহায্য করা এবং বিরতির পরে একটি দৃশ্যে নকশালপন্থীদের ধড়পাকড়ের জন্য রাস্তায় সামান্য জটলা দেখানো ছাড়াও (বলে রাখা ভাল, এই দু’টি দৃশ্যের সঙ্গে মূল ন্যারেটিভের কোনও সংযোগ নেই) পরিচালক এই সময়কালকে ব্যবহার করতে পারতেন আরও ভাল করে।

ছবিতে মূল উপন্যাসের সঙ্গে আরও বহু বিসাদৃশ্য আছে। যেমন সন্তোষ সমাদ্দার এখানে সন্তোষ দত্ত, হেনা মল্লিকের ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার কোনও ঘটনা দেখানো হয়নি, রবিবর্মা এবং উদয়চাঁদ অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছেন। পরিচালক হিসাবে সায়ন্তন যে স্বাধীনতাগুলি নিয়েছেন গল্পের ক্ষেত্রে, তা বিচ্ছিন্ন লাগেনি, বরং সেগুলি রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। এর জন্য পরিচালককে কুর্ণিশ।

পরমব্রত সত্যাণ্বেষীর ব্যক্তিত্ব অসাধারণ ফুটিয়ে তুলেছেন।

আরও পড়ুন: মুভি রিভিউ ‘পাসওয়ার্ড’: বিশ্বনাগরিক হয়েও গোপনতার নেই মালিকানা​

সন্তোষ দত্ত যুক্তফ্রন্টের এক জন বড় নেতা। বাড়িতে দুই পুত্র (উদয়চাঁদ ও যুগলচাঁদ), স্ত্রী চামেলী, সেক্রেটারি রবি বর্মা, স্ত্রীর আশ্রয়প্রাপ্ত দুই ভাই-বোন চিংড়ি ও নেংটি ছাড়াও নতুন সদস্য হলেন হেনা মল্লিক। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা এক বাপ-মা মৃত রিফিউজি, যাকে আশ্রয় দেন গৃহকর্তা নিজে। তার বাস শুরু হওয়ার পরেই অন্দরমহলে জট পাকে জটিলতা, ধীরে ধীরে বিভিন্ন আন্তঃসম্পর্কে সমীকরণগুলি বদলে যায়, যার মূলে এই হেনা মল্লিক। তবে গল্পের প্রথম প্লট পয়েন্ট, ছাদ থেকে পড়ে হেনার মৃত্যু। এই মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, না কি কোনও আবৃত রসহ্যের জাল রয়েছে এর ভিতর? সে ক্ষেত্রে কোন কোন চরিত্র জড়িত এই জালে? এই সমস্ত প্রশ্নের সূত্র ধরে সত্যান্বেষণ শুরু হয় এবং গল্প ধীরে ধীরে এগয়।

ফ্ল্যাশব্যাক এই ছবির একটি বড় অস্ত্র। ফ্ল্যাশব্যাক যেমন রহস্যের জট ছাড়ায় এক দিকে, আবার অন্য দিকে তৈরি করে বিভিন্ন পরস্পর-বিরোধী পার্সপেক্টিভ, গল্পের চরিত্রগুলির জবানির ভিত্তিতে। এ ছাড়াও তা রহস্য সমাধানের সম্ভাব্য পথ উপস্থিত করে দর্শকের সামনে। তবে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই ফ্ল্যাশব্যাক অপ্রয়োজনীয় ভাবে মেলোড্রামাটিক, এবং স্লো পেস করে দেওয়ায় খানিক দৃষ্টিকটূ। যেমন মাউথ অর্গ্যানের সঙ্কেত শুনে হেনা মল্লিকের সিড়ি দিয়ে নীচে নামার দৃশ্য। এই ছবির আরেকটি প্রধান অস্ত্র, অজিত। উপন্যাস এবং পূর্ব চলচ্চিত্রায়িত ব্যোমকেশের ছবিগুলির একদম বিপরীতে হেঁটে, পরিচালক এখানে অজিতকে ব্যবহার করেছেন অনেক বেশি মাত্রায়। অজিত রহস্য সমাধানে এখানে ব্যোমকেশের সমান না হলেও, পাল্লা দিচ্ছে ভাল মতো। এমনকি, শেষের দিকে একটি দৃশ্যে ব্যোমকেশের নির্দেশে সে নিজেই জেরা করছে উদয়কে। ফলে, এই ছবিতে ব্যোমকেশ-অজিতের রসায়ন অনেক বেশি পোক্ত, তা ছবির একটি বড় ইউএসপি। তবে, একটি দৃশ্যের জন্য সত্যবতীর উপস্থিতি, তা-ও টেলিফোনের মারফত নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় লেগেছে, যেন জোর করে ব্যোমকেশ যে বিবাহিত তা দর্শককে বোঝানোর চেষ্টামাত্র।

আরও পড়ুন: বাস্কেটবল খেলোয়াড় প্রেমিকের সঙ্গে সমুদ্রের ধারে বোল্ড ছবি পোস্ট করলেন জ্যাকি-কন্যা​

এ ছবির সংলাপের ব্যবহার বিচিত্র। কখনও চরিত্ররা ছন্দ মিলিয়ে কথা বলে, কখনও তাতে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। কিন্তু, বেশ কিছু দৃশ্যে সংলাপ অতি নাটকীয়, যেমন সুকুমারী দেবী ও ব্যোমকেশের একটি কথা বলার দৃশ্য। অভিনয়ে ব্যোমকেশের চরিত্রে পরমব্রত সত্যাণ্বেষীর ব্যক্তিত্ব অসাধারণ ফুটিয়ে তুলেছেন। অজিতের চরিত্রে রূদ্রনীল অসাধারণ, তাঁর ও ব্যোমকেশের মধ্যে রসিকতার বিনিময়গুলো জীবন্ত করে তোলায় তাঁর কৃতিত্বই অধিক। তবে নজর কেড়েছেন অঞ্জন দত্ত। রবিবর্মার চরিত্র যে ভাবে তিনি এঁকেছেন তা অতুলনীয়, তার সমস্ত চারিত্রিক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব জীবন্ত করেছেন তার কথা বলার ভঙ্গিতে ও চালচলনে। বাকিদের অভিনয় যথাযথ। আবহসঙ্গীত, বেশ কিছু দৃশ্যে চড়া মাত্রায় ব্যবহার ছাড়া, খুবই ভাল, নীল দত্ত মিউজিক দিয়েই জাল বুনেছেন রহস্যের।

পুজোয় নতুন ব্যোমকেশ, ভাল-মন্দ মিশিয়ে, সত্যান্বেষণের টানে বাঙালি দেখে আসতেই পারে।