Advertisement
E-Paper

চারকাহন

খোদ মুম্বই নগরীতে কিনা বাংলা ছবির স্পেশ্যাল স্ক্রিনিং। তাতে চলে এসেছে বলিউড। আফটার পার্টি ডিনারে মোচার চপ, ইলিশ, লিচু সন্দেশ। দেখলেন স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়।খোদ মুম্বই নগরীতে কিনা বাংলা ছবির স্পেশ্যাল স্ক্রিনিং। তাতে চলে এসেছে বলিউড। আফটার পার্টি ডিনারে মোচার চপ, ইলিশ, লিচু সন্দেশ। দেখলেন স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়।

শেষ আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০০:১৩

রাত দেড়টা।

মুম্বই মায়ানগরী অবশ্যই ঘুমোয়নি। আন্ধেরি ওয়েস্ট-এর এক রেস্তোরাঁয় স্লিভলেস নীলাম্বরী জাম্পস্যুটে আর লালরঙা লিপস্টিকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত পৌঁছে গেলেন সবার আগে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সুমন মুখোপাধ্যায়। চোখাচোখি হতেই ঋতুপর্ণা সরে গেলেন গোপন ফোন নিয়ে। সুমন চুমুক দিলেন পানীয়ে। তার একটু আগে শেষ হয়েছে মুম্বইয়ে ‘তিনকাহন’ ছবির স্পেশাল স্ক্রিনিং।

সানি ভিলা। ধর্মেন্দ্রর সেই স্টুডিয়ো, যেখানে এক সময় বাপি লাহিড়ি একের পর এক জনপ্রিয় গান রেকর্ড করেছেন। সেখানেই কিনা ইমতিয়াজ আলি তাঁর মুম্বইয়ের বন্ধুদের ডেকেছেন ‘তিনকাহন’ দেখাতে। কড়া নিরাপত্তা। সাংবাদিকদের ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা মানা। প্রবেশ আমন্ত্রণভিত্তিক।

আসন্ন গণেশ চতুর্থীতে রঙ্গোলি, নাকাড়া নিয়ে জনস্রোতে ভাসছে মুম্বই। ঠাকুর আসার প্রস্তুতি যেন একটা উৎসব। সব মিলিয়ে মুম্বইয়ের ট্র্যাফিক পেরিয়ে ছবি দেখতে আসতে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হয়েছে জোয়া আখতারকে। কবে থিয়েটারে গিয়ে বাংলা ছবি দেখেছেন মনে করতে পারলেন না জোয়া। উল্টে বললেন, ‘‘বাংলা ছবির মুম্বইতে প্রিমিয়ার বা স্পেশাল স্ক্রিনিং হয় না কেন বলুন তো? বাঙালি পরিচালক কি ভাবেন আমরা তাঁদের ছবি দেখে কিছুই বুঝব না! অথচ তামিল ছবির প্রিমিয়ার হয় এখানে।’’ জোয়ার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই ছবি শুরু। পরিচালক বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের চোখেমুখে বেশ চিন্তার ছাপ। একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলেন ‘হাইওয়ে’র পরিচালক ইমতিয়াজ আলি। ২৭ নভেম্বর রণবীর কপূর-দীপিকা পাড়ুকোনকে নিয়ে তাঁর ছবি ‘তামাশা’ মুক্তি পাচ্ছে। এখনও শেষ হয়নি ডাবিংয়ের কাজ। প্রোমো শ্যুটের জন্য দীপিকার ডেট পাওয়া যাচ্ছে না। রণবীরের সঙ্গেও বসতে হবে। এত ঝামেলার মধ্যেও বাংলা ছবির জন্য তিনি যে ভাবে হলের বাইরে দাঁড়িয়ে সকলকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন, দেখার মতো। ‘‘‘তিনকাহন’য়ের ইমেজারিতে আমি সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের ছবি দেখতে পেয়েছি। এই তিন পরিচালক এক সময় বাংলা ছবিকে যে ভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সে ভাবে কিন্তু সুপারহিট হিন্দি ছবিও তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। এটা ভাবলে খুব আশ্চর্য লাগে,’’ বলেন ইমতিয়াজ।

বিরতিতে দেখা ছবির নায়িকার সঙ্গে। নিয়ম মেনে যথারীতি লেট। ঋতুপর্ণার দিকে তাকিয়ে এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুমন বললেন, ‘‘চিরটাকাল ঋতু দেরি করে এলো। কিন্তু এই দেরি করার অভ্যেস নিয়েও নিজের কাজ দিয়ে এত বছর ইন্ডাস্ট্রিতে ও থেকে যেতে পারল।’’ দূরে দর্শকাসনে বসা ‘লুটেরা’, ‘উড়ান’-এর পরিচালক আদিত্য মোতওয়ানে। শাহিদ কপূরকে নিয়ে তাঁর পরের ছবি। বলছিলেন, ‘‘বাংলা ছবিতে প্রেম নিয়ে এই রকম টুইস্ট হতে পারে, আশা করিনি!’’

ইমতিয়াজের ডাকে হাজির সুনিধি চহ্বন-ও। ‘তিনকাহন’-এ পার্বতী বাউলের গান শুনে মুগ্ধ তিনি। বললেন, ‘‘ইদানীং মুম্বইয়ে প্রিমিয়ারের খুব একটা চল নেই। অনেক দিন বাদে প্রিমিয়ারে এসে ভাল লাগছে। সাবটাইটেলে বাংলা ছবি দেখা তো! ভেবেছিলাম কিছুক্ষণ থেকে চলে যাব। কিন্তু পারলাম না।’’

দূরে তখন সিগারেট খাচ্ছিলেন সুমন। ছবিতে এমনই তাঁর মেক আপ যে ফার্স্ট লুক দেখে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত তাঁকে চিনতে পারেননি। বড় বড় চোখ করে দিয়া মির্জা লাফিয়ে গেলেন সুমনের দিকে। ‘‘ও নো! দ্যাট ওয়াজ ইউ? আমি তো চিনতেই পারিনি।’’ ততক্ষণে পাশে এসে গিয়েছেন ছবির অন্য এক অভিনেতা জয় সেনগুপ্ত। সুমনকে বললেন, ‘‘তুমি মুম্বইতে দিয়াকে দিয়ে কিন্তু নাটক করাতে পারো।’’

বিরতি শেষ। সিনেমা শুরু। পর্দায় তখন ’৭৮-এর বন্যায় ভাসা কলকাতা। মুখোমুখি সব্যসাচী চক্রবর্তী আর জয় সেনগুপ্ত। শুরু রেসপন্সিবল স্বামী আর ইরেসপন্সিবল প্রেমিকের ল ড়াই। বিরতির সময় হলেই বসেছিলেন ‘যব উই মেট’, ‘রকস্টার’য়ের জনপ্রিয় গীতিকার ইরশাদ কামিল। ‘‘কোনও দিন হলে গিয়ে বাংলা ছবি দেখেছি কি না মনে করতে পারছি না। ‘তিনকাহন’ দেখে বাংলা ছবি সম্পর্কে ধারণাই বদলে গেল।’’ দেখা বিধুবিনোদ চোপড়ার স্ত্রী ফিল্ম সমালোচক অনুপমা চোপড়ার সঙ্গেও। পরিচালক বৌদ্ধায়নকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘‘হোয়াট ইজ দ্য নেম অফ দ্যাট লেডি অ্যান্ড বয়? বর.. শোন অ্যান্ড অনন্যা? বোথ অফ দেম হ্যাভ ব্রিলিয়ান্ট আইজ। সারা ছবিতে প্রেম নিয়ে নানা চমক।’’

স্ক্রিনিং-এর শেষে দেখা ‘খাল্লাস’ গার্ল ইশা কপিকারের সঙ্গে। চার বছর পর কামব্যাক করছেন অঙ্কুর ভাটিয়ার ‘আশি নব্বই পুরা শ’ ছবিতে। বললেন, ‘‘স্ক্রিপ্ট ভাল হলে আর অন্য কিছুর যে সেই রকম দরকার হয় না সেটাই মনে করিয়ে দিল ‘তিনকাহন’। মুম্বইতে বাংলা ছবির প্রিমিয়ারে বাঙালিয়ানা থাকবে না তা কি হয়? পার্টির খানাপিনা হল পুরো বাঙালিমতে।

ছবি দেখে খুশি জোয়া আখতার। ‘‘আমি আর বাবা (জাভেদ আখতার) ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি নিয়ে আলোচনা করতাম। ‘তিনকাহন’ ঋতুপর্ণ ঘোষের কথা মনে করিয়ে দিল,’’ বলেই ঋতুপর্ণাকে জড়িয়ে ধরলেন।
‘‘দারুণ অভিনয় তোমার। মুম্বইতেই থেকে যাও,’’ বলেই ছুটলেন গাড়ির দিকে। ইমতিয়াজও পার্টিতে গেলেন না।

ইমতিয়াজ আলি, জয় সেনগুপ্ত, সুমন মুখোপাধ্যায়, জোয়া আখতার, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত,
বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায় ও মোনালিসা মুখোপাধ্যায়। সানি ভিলায় স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে।

এদিকে রেস্তোরাঁয় আসতে শুরু করেছে বাঙালি খানা। আমপোড়ার শরবত থেকে আলু পোস্ত, মোচার চপ হয়ে ইলিশ। ঋতুপর্ণা ইলিশ মাছ ভাজা আর এক বাটি ইলিশের তেল নিয়ে বসেছেন। একটু আলু পোস্তও টেস্ট করে ফেলেছেন। বললেন, ‘‘প্রথম দিকে মুম্বইতে নিজেকে খুব একঘরে মনে হত।
তার পর ছবি করলাম। আমার বাড়িও আছে এখানে। আজ মুম্বইটাকে মনে হয় যেন দ্বিতীয় কলকাতা। খুব ভাল লাগল ইমতিয়াজকে দেখে। একটা বাংলা ছবির জন্য ও যে এফর্টটা দিল, সেটা আমার একটা বড় পাওয়া। মুম্বইয়ের অনেক পরিচালকের যে ছবিটা ভাল লাগল, সেটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।’’

ফিশফ্রাই খেতে খেতে সুমন বললেন, ‘‘ভায়া, এখন তো মহিলাদেরই যুগ। তার ওপর মুখোপাধ্যায় হলে তো কথাই নেই। খার-এ আছি তাই অনেক বন্ধুই ফোন করে জিজ্ঞেস করছেন ইন্দ্রাণীকে আমি চিনি কি না। বা দেখতে পাচ্ছি কি না। হোয়াটসঅ্যাপে মজা করে কত মেসেজ জড়ো হচ্ছে জানো? তবে ভেবে দেখলাম সবটাই মহাভারতের খেলা! কুন্তী তো কর্ণকে জলে ভাসিয়েই দিয়েছিল। সেটাও তো এক ধরনের সন্তান হত্যাই। মহাভারতের বাইরে কিন্তু কিছু ঘটছে না।’’

ঘড়ির কাঁটা দু’টো ছুঁইছুঁই। ততক্ষণে ঋতুপর্ণার খাওয়া শেষ। বেরিয়ে পড়লেন ড্রাইভারের খোঁজে। মধ্যরাতে মুম্বইয়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেরে নিলেন স্বামীর সঙ্গে রোজের ফোন। ফোনের চার্জও ফুরিয়ে গেল।

সুমনও ফিরবেন খার-এর গেস্ট হাউসে। গাড়ি নেই। অটোও পাচ্ছেন না। ‘‘আমি ড্রপ করে দেব?’’ সুমনের দিকে এগিয়ে গেলেন ঋতুপর্ণা...

মধ্যরাতে দেখা দিল দিনের আলো।

ananda plus cover story special screening bengali film special screening charkahon charkahon mumbai special screening boudhyayan mukhopahdyay monalisa mukhopadhyay rituparna sengupta imtiaz ali abpnewsletters
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy