Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

শ্রাবণের সফরনামা

২১ জুন ২০১৫ ০০:০৩

‘‘আষাঢ় কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া/ মাঠের শেষে শ্যামল বেশে ক্ষণেক দাঁড়া।’’আষাঢ় ভেজা মনে রবিঠাকুর গুনগুনিয়ে ওঠেন। বর্ষা দিনে নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখে দেওয়ার দরকার নেই তো কোনও। কাজের ব্যস্ততার ফাঁকফোকরে দু’চার দিনের ছোট্ট ছুটিতে লালিত ইচ্ছেগুলো জড়ো করে বাউন্ডুলে ভ্রমণরসিক মন মুখিয়ে উঠুক বেরিয়ে পড়ার বাহানা নিয়ে। জীবনের কিছু অপ্রাপ্তিগুলোয় সাময়িক মলম হিসেবে লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়া কিন্তু দারুণ ফল দেবে। ওই পাহাড়-উপত্যকা-নদী-জঙ্গল-সমুদ্র মুহূর্তগুলো অকপটে নিজের সঙ্গে খানিক ভাগ করে নেওয়া আর কী। প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য ও বিশালতা নিয়ে আমাদের বারে বারেই অবাক করে। প্রকৃতির লাবণ্যপ্রভায় আমরা কেমন মুগ্ধ হয়ে হারিয়ে যাই। প্রতিবারই তো এমনই মুগ্ধতার আঁচলে বেঁধে রাখে।চেনা চৌহদ্দির বাইরে প্রকৃতির অনাবিল স্নিগ্ধ রং-রূপ প্রাণে আনে ফূর্তির ছোপ। মুম্বইয়ের বৃষ্টিটাও অন্যরকম। এমন বৃষ্টি দিনে লাগামছাড়া বেরিয়ে পরার ঠেক তো আর কম নেই মুম্বই ও মুম্বইয়ের কাছে-পিঠে। এই বৃষ্টিমেদুর আমেজে ভ্রমণরসিক মন পুরোদস্তুর মনসুন ম্যানিয়ায় চূড়ান্ত হয়ে বেরিয়ে পড়ুক অগোছালো বা অবিন্যস্ত নয়, পরিপাটি ভ্রমণ মজলিশে। যেখানে খুব বেশি খরচাপাতি নয়, একেবারে মিনিমাম খরচ, প্রকৃতির ম্যাজিক ও সুন্দর প্রকৃতিপাঠ—এই সবই তো রসদ হয়ে থাকবে মনের কোটরে। কখনও তাই দূরন্ত রোমান্টিকতায় পাড়ি জমানো মানসেজ ঘাট-কোয়েনানগর-তিকলদরা-পঞ্চগনি-লোনাভালা-খাণ্ডালা-লাভাসা-ভণ্ডারদরা ইত্যাদি....

সাবেক বর্ষা মোহে মালসেজ ঘাট

Advertisement

মালসেজ ঘাটকে পর্যটকরা আদর করে ডাকেন ‘হিল সাইড হ্যামলেট’। প্রায় ২,২০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বর্ষণসিক্ত মালসেজ ঘাটের রমণীয় প্রকৃতিতে কেবল সবুজেরই সমারোহ। মহারাষ্ট্রের পশ্চিমঘাট পাহাড়কোলে অপরূপ দিগন্ত ঘেরা নিসর্গ শোভা, ঘনজঙ্গলে বাতাবরণ, পরিযায়ী পাখি, বর্ষার মদতপুষ্ট অগণিত নদী-নালা-প্রপাত। বর্ষা মরসুমেই পর্যটক বেশি আসেন এখানে, প্রকৃতির রম্যতাকে নিজস্বতায় জারিত করতেই আর মালসেজ ঘাট-এর চিরসবুজ প্রকৃতি তার বর্ষা ধোওয়া নবীন উদারতায় আপনাকে ভোলাতে সদা প্রস্তুত।



মুম্বই থেকে জাতীয় সড়ক ৩ ঘরে ১৫৪ কিমি দূরত্বে নিজস্ব বাহনে বা গাড়িতে ভাড়া করে সহজেই চলে আসা যায়। অপূর্ব পথ শোভা। মালসেজ ঘাটের অদুরেই ক্ষিরেশ্বর গ্রাম। নিরালা সে গ্রামটিতেও প্রকৃতি যেন আপনভোলা হয়ে একান্তে পড়ে আছে। মালসেজ ঘাটে রয়েছে সহস্রাধিক প্রজাতির গাছগাছালি ও গুল্মতার সমারোহ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিযায়ী পাখিদের হট্টমেলা বসে যায় এখানে। দুরান্ত থেকে স্রেফ দুই ডানায় ভর দিয়ে উড়ান সাঁতরে পরিযায়ীরা মৌরসিপাট্টা জমায় মালসেজ ঘাট চত্বরে। তাদের রঙিন অথবা সাদা ডানার ঝলক ক্যামেরার লেন্সে টুকে রাখার মতোই। জলপাহাড়ায় রয়ে যায় বর্ষার মালসেজ ঘাট এর শান্ত ভ্রমণকথা। কাছেপিঠেই রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক দুর্গ। ইতিহাসের পাতা ওলটানো ঘটনা, প্রাসাদ, ঘন বনাঞ্চল, অভয়ারণ্য সবই আছে এখানে। জঙ্গলে চিতা, বাঘ, খরঘোস, কাঠবিড়াল, ময়ূর, হনুমান প্রভৃতির দেখা পাওয়া যায়। অনতিদূরে আছে বৌদ্ধ গুহা। শতাব্দী প্রাচীন হরিশ্চন্দ্রগড় এক সময়ে কালাচুরি রাজন্যবর্গ দ্বারা শাসিত ছিল। পরে মোঘল ও মরাঠাদের শাসনে আসে। এই হরিশ্চন্দ্রগড় থেকে মালসেজ ঘাট-এর উদাত্ত প্রকৃতি ছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতোই জাঁকালো। মালসেজ ঘাটে বর্ষা মরসুমে বেড়াতে আসেন সাধারণ পর্যটক থেকে পর্বতারোহী, শখের ছবি তুলিয়ে, আমোদপ্রিয় দীর্ঘ পায়ে হাঁটা ভ্রামণিক থেকে পক্ষী-প্রেমিক পর্যন্ত। সবারই বেশ পছন্দের জায়গা মালসেজ ঘাট। যাত্রাপথের এক পাশে পাহাড় অন্য পাশে রেলিং-এর ওপারে উপত্যকা, জঙ্গল। কোথাও পাগাড় চুঁইয়ে নামছে জলধারা। কোথাও ঝিরঝিরে তো কোথাও সবেগে। কয়েকটা পথচলতি পাহাড়ি সুড়ঙ্গ গলে আবার খোলা পথ। অসাধারণ পথ পরিক্রমা। বর্ষার রমণীয় প্রকৃতির কাছে জব্দ হওয়ার জন্য তো আষাঢ়স্য দিনে মালসেজ ঘাট আসা।

বর্ষা-কোলাহলে কোয়েনানগর

অসামান্য অবকাশে আষাঢ় বেলায় এক জলজ মহিমা। হঠাৎ ফিরে পাওয়া মেয়েবেলার মতো কোয়েনা নদীয় বেয়ে যাওয়া জলের নাগালে পা ডুবিয়ে ভাবি, এই বেশ ভাল আছি। নদীর কাছটিতে এলেই পায়ে পায়ে জুড়ে যাচ্ছে পাহাড়ি নির্জনতা। বৃষ্টিভেজা বাতাসে অন্য আমেজ। নুড়ি ও পাথরে মৃদু ছলকাচ্ছে কোয়েনার জল। কখনও উথলে উঠছে তার কোমল বাচালতা। মহারাষ্ট্রের সহ্যাদ্রী পাহাড়স্থলিতে অন্য এক গন্তব্য কোয়েলনগর। সাতারা তহশিলের ৭৪৬ মিটার উচ্চতায় পাখির নীড়ের মতো নব্য এক বেড়ানোর ঠেক। মহারাষ্ট্রের বাণিজ্যিক শহর কোলহাপুর থেকে প্রায় শ’দেড়েক কিমি দূরে কোয়েনানগর। রেলপথে চিপলুন স্টেশন নেমেও যাওয়া যায় ৩৮ কিমি দূরের কোয়েনানগরে। বর্ষায় রূপবতী হয়ে ওঠে কোয়ানানগর। জুন থেকে অক্টোবর এখানে বেড়াতে আসার মোক্ষম সময়। বাজেটের মধ্যেই তিন তারকা সমৃদ্ধ কিছু হোটেল ও জঙ্গল লজ রয়েছে থাকার জন্য। কোয়েনা নদী দক্ষিণ ভারতের তিন অন্যতম নদীর একটি কৃষ্ণা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। কোয়েনানগরের নিজস্ব সম্পদ বলতে মহারাষ্ট্রের দীর্ঘতম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও কোয়না নদী ও জলাধারের প্রাকৃতিক বৈভব। ট্রেকার-রসিকদের জন্যও কোয়ানা লোভনীয় স্পট। কোয়ানার নীলাভ জলাধার ৪২২ বর্গকিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় রত্নগিরি পর্যন্ত এর বিস্তার।
কোয়েনানগরের কাছের শহর বামনোলি থেকে ফেরি যাত্রায় কোয়েনানগর আসাটাও চমৎকার অভিজ্ঞতার। কোয়েনানগর থেকে ৫৫ কিমি দূরে সাজনগড় নামে একটা পবিত্র স্থান আছে। যেখানে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের আধ্যাত্মিক গুরু সমর্থ রামদাস স্বামী তাঁর শিষ্যগণ-সহ বসবাস করতেন। এই এলাকাতেই চাপহল নামে আরেক দ্রষ্টব্য স্থান আছে। এই স্থানে গুরু সমর্থ রামদাস স্বামী একটি সুন্দর মন্দির নির্মাণ করেন। এই রামন্দিরে অধিষ্ঠিত শ্রীরামের হাতে চিরাচরিত ধনুকের বদলে, দুই হাতে দুইটি পদ্ম শোভিত। চাপহলের কাছেই আছে রামদাস স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত ‘কুবরি তীর্থ’। কথিত আছে, রামদাস স্বামী একটি অলৌকিক উপায়ে এখানে একটি প্রপাত সৃষ্টি করেন। এই অলৌকিক প্রস্রবনটি আজও বয়ে চলেছে। বহু ভক্ত আসেন এই কুবরি তীর্থে অলৌকিক বহতা প্রস্রবনটি দেখতে। পর্যটকদের ভিড় কোয়েনানগরের রক্ষিত বনাঞ্চলকে সে ভাবে কলুষিত করতে পারেনি। নিশিদ্র এই বনে সূর্যালোকও সেভাবে পৌঁছতে পারে না। কোয়েনা জলাধার তথা হ্রদটি বনের পশুজগৎকেও অনেক খানি রক্ষণাবেক্ষণ করে। বাঘ, চিতা, বাইসন, বন্য শুয়োর, নববিড়াল, হায়না, শেয়াল, বাঁদর, ভাল্লুক, হরিণ এবং আরও কিছু ছোট মাঝারি পশুদের অবাধ দেখা মেলে এখানে। ‘বায়ো-ডাইভারসিটি’ মুখ্য এলাকা হিসেবে পরিচিত ৪২২ বর্গ কিমি ব্যাপৃত ঔষধি বৃক্ষ পরিব্যপ্ত এই পাহাড়ি অঞ্চলটি ট্রেকারযাত্রীদের কাছেও যথেষ্ট আদরনীয়। দুর্গ, ব্যাকওয়াটার, পাহাড়টিলা, হ্রদ, ঘন জঙ্গল এ সব নিয়ে একটা দারুণ চড়ুইভাতি স্থান টাপোলা। পর্যটকরা অতি উৎসাহে টাপোলা অঞ্চলটিকে ডাকেন ‘মিনি কাশ্মীর’। কোয়েনানগর বর্ষায় সেজে ওঠে অন্য মাদকতায়।



মহাবালেশ্বর পঞ্চগনি

প্রখর শ্রাবণদিনে শৈলশহর মহাবালেশ্বরের অন্যতম পাঁচ কৃষ্ণা, কোয়েনা, বীণা, সাবেত্রী ও গায়েত্রী ও ভেন্না হ্রদটি আরও টলটলে ভরাট হয়ে ওঠে। সহ্যাদ্রী পাহাড় চুঁইয়ে নেমে আসা বৃষ্টি জলধারা, নিঃসীম সবুজের পরত বুলিয়ে দিতে থাকে সুন্দরী মহাবালেশ্বরের মনোরম লাবণ্যে। মেঘ চাঁদোয়ায় ঢাকা থাকে তামাম মহাবালেশ্বর ও তার ভগিনী শহর পঞ্চগনি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিবাতাস মেখে অনন্যা সবুজাভ প্রকৃতি। বাতাসে সোঁদা ঘ্রাণ। প্রাকৃতির কুঞ্জবনে ফার-ওক-ম্যাপেল-পোয়েনসিটিয়া ইত্যাদির শাখে থম ধরা জলজ মায়া। মুম্বই থেকে পঞ্চগনি প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার ও মহাবালেশ্বর আরও প্রায় কুড়ি কিলোমিটার মতো। পথের শোভা অপরূপ।
বর্ষায় যেন আরও খোলতাই হয় পঞ্চগণি-মহাবালেশ্বরের পাহাড়ি শোভা। মাথার ওপর শ্রাবণ মেঘের জটলা নিয়ে আকাশ। সে ভেজা মেঘের স্পর্শ গায়ে মেখে নিচ্ছি কখনও। বৃষ্টিধারায় ভরাট হয়ে আছে ভেল্পা লেক। তাতে টাপুর টাপুর ঝরে পড়ছে আরও বৃষ্টিধারা। মহাবালেশ্বরের হৃদয় উদ্দত ভেন্না লেকের পাড় বরাবর টাটকা রসালো স্ট্রবেরি, নানান ফ্রুট জ্যুসের দোকান, চাট-ভেলপুরি-পাওভাজি-পপকর্নের দোকান। ঘোড়া ভ্রমণের সহিসরা ডেকে যাবে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় ঘুরিয়ে আনার জন্য। লেকের পাড়া বাঁধানো বসার চাতালগুলিতে বিশ্রামের আমেজে মাখামাখি। প্রকৃতির আবিলতায় পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে প্রচুর ভিউ পয়েন্টে ছয়লাপ মেঘে-ঢাকা ‘টুইন হিল স্টেশন’-এর পরিপাটি সংসার। আছে অনেক আবাসিক স্কুল। পৌরাণিক ইতিহাস, ইংরেজ ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জলছবি আঁকা প্রেক্ষাপট-পর্যটকের পছন্দের জায়গা। মরাহাষ্ট্রে বাসবাসকারীর বেড়ানোর আদর্শ ঠাঁই।

ভান্ডারদরার বৃষ্টি মায়ায়



প্রকৃতির রম্যতায় বৃষ্টিমায়ায় নিপাট বর্ষাভেজা কাটাতে ভান্ডারদরাও এক নিরিবিলি ঠেক। একদিকে সহ্যাদ্রীর অনন্ত নিবিড়তা অন্যদিকে সুবজাভার বর্ণময়তা। পুরোদস্তুর মনসুন সিজন জুন থেকে সেপ্টেম্বর ভন্ডারদরাই অন্যতম প্রভার নদী ও শাখা নদীগুলি ছোট বড় প্রপাতগুলি, যেন চমক দমকে ভরে থাকে। অপরূপ রহস্যরোমাঞ্চে আমব্রেলা ফলস, রন্ধা ফলস, সিপলওয়ে ফলস এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ—এমনই প্রাণবন্ত। মরাঠিরা বলেন ‘মহারাষ্ট্রের এভারেস্ট’ সেই ‘কালসুবাঈ’ হল মহারাষ্ট্রের সহ্যাদ্রী পর্বতমালার উচ্চতম গিরিশিখর। ট্রেকারপ্রেমীদের পছন্দের জায়গা। ভান্ডারদরার গর্বিত অহংঙ্কার এখানকার আর্থার লেক। টলটলে নীল জলে রিমঝিম বৃষ্টি মেঘে নৌবিহার করার বিনোদনের ভাগীদার হতে দিই নিজেকে যথেচ্ছ ভাবে। রয়েছে ব্রিটিশ জমানায় স্থাপিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কালো মর্মরে সৃষ্ট অমৃতেশ্বর শিবমন্দিরটি ১১ শতকের সাক্ষী। গর্ভগৃহে শিব লিঙ্গ। পবিত্র এই মন্দির চত্বরটি লাগোয়া জলাশয়ে উদায়স্ত পরিযায়ী পাখিদের জটলা। পক্ষীপ্রেমীদের জন্য আদর্শ স্থান বলা যেতে পারে। মনোরম ভান্ডারদরা চলে আসা যায় দু’ঘণ্টার ফাঁকেই মুম্বই থেকে জাতীয় সড়ক ৩ ধরে ও পরে যেটি মোড় থেকে রাজ্যসড়ক ৪৪ পথে। প্রকৃতির উথলে ওটা নিরিবিলি পথ। ভরা বর্ষায় যখন উইলসন ড্যামের স্লুইস গেট গুলো খুলে দেওয়া হয় কিংবা কৃষিকাজের প্রয়োজনে জল সরবরাহ অনিবার্য হয়ে ওঠে—কৃত্রিম এই প্রপাতটির জলোচ্ছ্বাস মনে রং ধরায়।

অস্ফুট ছুঁয়ে উলহাস নদীতট



অস্ফুট ছুঁয়ে থাকে বর্ষণসিক্ত ওই নদীতট। বয়ে চলা নিজস্ব বনেদীয়ানায় উলহাস নদী। উলহাস নদী ও অববাহিকা যেন বর্ষায় রোদ্দুর ও ছায়ামাখা এক সংলাপ। পাথরের বুকে জলের খোলস ভাঙতে ভাঙতে সে নদী সরে যাচ্ছে দূরে কোথাও। বেবাক নিরিবিলি তার চারপাশ। পশ্চিমমুখী উলহাস নদী বর্ষার জলে মহীয়ান হয়ে বয়ে চলে আপন বাচালতায় মুম্বই থেকে দূরত্ব তো তেমন কিছু নয়। সওয়া ঘণ্টার মধ্যেই সড়ক পথে পৌঁছে যাওয়া যায় ৬৬.৮ কিমি দূরের উলহাস ভ্যালিতে। কিছু দূরেই সব দূরত্ব ঘুচিয়ে হেসে কুটি কুটি সবুজ পাহাড়টিলা। অসংখ্য স্নিগ্ধ সবুজ কথামালা। উলহাস উপত্যকাভূমটি উপুর হয়ে পড়ে আছে অসম্ভব নিসর্গ শোভা নিয়ে সবুজ ঘন প্রান্তর বর্ষার শুশ্রূষায় আরও ঘন। অগণিত বর্ষণপুষ্ট জলধারা প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে ঘন জঙ্গলের পানে। যান চলাচলের রাস্তার একাধারে কিছু দুর্দান্ত বাংলো বাড়ি রয়েছে যার ব্যালকনিতে বসে থাকলেই অবকাশ জড়িয়ে দেবে তার আরাম। অনেকগুলি সুড়ঙ্গ রেলপথ রয়েছে উলহাস উপত্যকার কাছে। কাছেপিঠে থেকে বহু পর্যটক চলে আসেন বর্ষার নিজস্ব রূপ দেখতে উলহাস ভ্যালিতে। বর্ষা মাখা দিনে লং ড্রাইভে উলহাস উপত্যকা এনে দেবে প্রকৃতির সব বিশ্বাস।

আতি ক্যায়া খান্ডালা

এই বৃষ্টি মরসুমে যাচ্ছি বটে, মাঝে মধ্যে পথ আগলাচ্ছে ক্ষণিক বৃষ্টি ধারাপাত। মুম্বই-পুণে জাতীয় সড়ক ৪ জুড়ে গাড়ি ছুটছে বৃষ্টি মাথায় করেই। যাত্রাপথটিতে পাহাড় কেটে তৈরি বেশ কয়েকটি গুহা পথ আছে। ভাটান ট্যানেল প্রথমেই। তার পর মণ্ডপ টানেল। বৈদ্যুতিন আলোয় আলোকিত সুড়ঙ্গপথে সেঁধিয়ে পথ পাড়ি জিতে দারুণ রোমাঞ্চ লাগে। মসৃণ বর্ষাধৌত সড়ক, পথের দু’পাশে আবাদি জমি, সামান্য দূরেই পশ্চিমঘাটের হলকা ঢেউ। তৃতীয় সুড়ঙ্গপথ খান্ডালা-বোগদা টানেল পেরিয়ে আরও একটু এগোতেই রমনীয় প্রকৃতি-সবুজময়তা-পাহাড় ঘেরা খান্ডালা। সহাদ্রী পাহাড়ের ৬২৫ মিটার উচ্চতায় সবুজে ছাওয়া নির্জনতায় নিস্তরঙ্গ ছোট্ট এক পাহাড়ি শহর খান্ডালা। বর্ষা দিনের অসামান্য লাবণ্য ছারখার করে দেবে মনের সব কয়েকটি আগল। দিলখুশ মেজাজে যাত্রাপথে কত বার যে গুন গুন গেয়ে উঠেছি—আমির খান রানি মুখোপাধ্যায়ের অভিনীত বহু আগে দেখা ‘গুলাম’ ছবির জনপ্রিয় সেই গানটি ‘‘আতি ক্যায়া খান্ডালা... আরে ঘুমেঙ্গে ফিরেঙ্গে নাচেঙ্গে গায়েঙ্গে অ্যায়াস করেঙ্গে...অওর ক্যায়া’’...মেঘেরা আকাশ ছেড়ে খান্ডালার পথে নেমে এসে চাতার মতো মাথার উপরে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। প্রায় শ’তিনেক ফুট ফঁচু থেকে নীচে গড়িয়ে আসা ভুসির উচ্ছ্বল জলধারা খুবই চিত্তাকর্ষক খান্ডালায়। এখানেও বেশ কিছু পয়েন্ট দেখার হাতছানি নিয়ে হাজির ডিউকস নোজ, কুনে পয়েন্ট, সানসেট পয়েন্ট, টাইগার্স ক্লিভ, ভুসি ড্যাম। দৃষ্টি মেলে দেখে যাওয়া শুধু খান্ডালার তরঙ্গায়িত পাহাড় ।

শিরোনামহীন সফরে লোনাভোলা

সফরনামা টুকরো বৃষ্টিকথায় কেমন অচেনা আমেজে। পর্যটন যত সবুজের দিকে গড়ায়, লোনাভোলার মৃদুভাষ আলাপ গড়ে উঠতে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে তখন। হাত দুয়েক দূরেই কী অপরূপ পরিমিত বোধে সব দূরত্ব ঘুচিয়ে সহ্যাদ্রীর নাগাল। যতদূর চোখ যায় লোনাভোলার মাধুর্য নিয়ে পাহাড়ের ঢেউ। মৌসুমীপ্রবণ দিনগুলো লোনাভোলার এক্কেবারে পিক সিজন। হোটেল, রিসর্টগুলো তখন লাগাম ছাড়া দর হাঁকে। মনোরম জলবায়ুর জন্য লোনাভোলায় ভিড়টা সারাবছরই থাকে। বর্ষায় লোনাভোলার রূপ আরও খোলতাই হয়। বর্ষার লোনাভালার নিজস্ব রমনীয়তায় উষ্ণ ও পজিটিভ এই বৃষ্টি বৃষ্টি গল্পগাছায় লোনাভালা বেড়ানো—এইটাই মোক্ষম ইউএসপি। সড়কপথে মুম্বই থেকে লোনাভোলা জাতীয় সড়ক ৪ হয়ে কম বেশি সওয়া ঘণ্টার পথ। দূরত্ব ৬৪ কিমি। ‘লোনাভোলা’ শব্দটি এসেছে প্রাচীন সংস্কৃত শব্দ ‘লোনেলি’ থেকে যার অর্থ ‘গুহার শহর’। এই শৈলশহরে বেশ কিছু গুহা রয়েছে—কারলা গুহা, বেদসা গুহা, ভাজা গুহা। ৩৮ বর্গকিমি বিস্তার লোনাভোলা পাহাড়ি শহরটি পুণে জেলার মিউনিসিপল কাউন্সিলের অন্তর্গত। প্রাচীনকালে লোনাভোলা যাদব সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল পরে এখানে মোঘল-মরাঠা-পেশোয়ারাও রাজত্ব করে গেছেন। ১৮৭১ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ অধিকর্তা লর্ড এলবিনসন পুনরায় আবিষ্কার করেন যমজ শহর লোনাভোলা-খান্ডালা।



মুম্বই মহানগর ও নগরতলির প্রচুর পর্যটক সপ্তাহান্তিক ছুটিছাটায় ভিড় জমান এখানে। বর্ষা মরসুমে তো কথাই নেই। লোনাভোলার রাস্তায় তখন গাড়ি পার্ক করাটাও সমস্যা হয়ে যায়। কত যে পয়েন্ট আছে এখানে। সানসেট পয়েন্ট, মাঙ্কি পয়েন্ট, লায়ন পয়েন্ট, সুইসাইড পয়েন্ট, টাইগার্স লিপ, রিউড পার্ক। অদুরেই ভিসাপুর দুর্গ, গোড়ার খুরের মতো করলা হ্রদ, রাজমাচি, পাভালা হ্রদ, টুঙ্গারলি হ্রদ, ব্যারোমিটার হিল ইত্যাদি। লোনাভোলা রেলস্টেশনের থেকে তিন কিমি দূরে কেরালার মোম পুতুল নির্মাণশিল্পী সুনীল খান্ডালোর ওয়াক্স মিউজিয়ামে দেশিবিদেশি অনেক সেলিব্রেটির মোম মূর্তি সংগ্রহ দেখার মতো। স্থানীয় কোলি উপজাতির আরাধ্যা দেবী একরিবা মন্দির বা একবিশ্বদেবীর জাগ্রত মন্দির রয়েছে কাছেই। দৃষ্টির নেপথ্য জুড়ে উপত্যকা-পাহাড় ও প্রকৃতির রংবাহারি আলাপন। সহ্যাদ্রীর বৃষ্টিধৌত আনাচকানাচ। লোনাভোলার মহাবীর স্বামী চক-এর বাজারপেঠ জুড়ে জনপ্রিয় চিক্কির থরে থরে দোকান। পর্যটকরা গাড়ি থামিয়ে বাক্স ভর্তি নানান স্বাদের চিক্কি কিনে নিয়ে যান। কাজু-গুড়-বাদাম-সাদা তিল-চিনি-আখরোট ইত্যাদি সহযোগে নির্মিত চিক্কি নামের মিষ্টান্নটির চাহিদা এ অ়ঞ্চলে প্রচুর। জলবায়ু খসানো লোনাভোলা পাহাড়ি মাধুর্যে ভরে থাকে বৃষ্টিভোজা ছটায়।

লাভাসার বর্ষায়, নিরিবিলি মোহে

কবিতার মত সরচে উপত্যকা ও বৃষ্টি মোহ নির্ভর অপাঙ্গে এলিয়ে থাকা লাবণ্যময় লাভাসা। আর যেখানে প্রকৃতি এসে জাপটে ধরে থাকে ওই পাহাড়স্থলিকে। আর ওই যে নীলচে রঙা ওড়াসগাঁও হ্রদ—২০ কিমি লম্বা এই হ্রদকে ঘিরেই তো ওম মেখে স্যাঁতস্যাঁতে ভিজে আরামে পড়ে আছে ‘লেক সিটি’ লাভাসা নামের মহারাষ্ট্রের এই ছোট্ট শহরটা। নিসর্গের ঘেরাটোপে কিছুটা সময় বা দু’একটা দিন দু’দণ্ড জিরেন হয়। বৃষ্টি মেখে মুম্বইয়ের কাছে পিঠে এমন নব্য কেতাদুরস্ত পাহাড়ি শহরে পৌঁছে যাওয়া কিছুই রকমারি নয়। মুম্বই থেকে মাত্র ১৭০ কিমি দূরে আর পুণে থেকে নাগালেই ৪২ কিমি দূরেই পশ্চিমঘাট পাহাড় ঢালে ২,১০০ ফুট উচ্চতায় লাভাসা প্রকৃতির আবিলতায় এক চিলতে নিসর্গ মায়ায়। আভিজাত্যে ও উচ্চবিত্ত প্রলেপ লাভাসার গায়ে গায়ে। তবু চোখের পাতা ছুঁয়ে থাকা পাহাড়-উপত্যকা মুহূর্তগুলো বয়ে আনে এক কেয়াবৎ সফর। নীলাভ হ্রদটা অপাঙ্গে লুটিয়ে থাকে লাভাসার সমস্ত উপত্যকাভূম জুড়ে। এই হ্রদটাই লাভাসার ভর কেন্দ্র। লাভাসার অন্য দিকটা যেখানে রুক্ষ পাথুরে পায়ে চলা পথ গিয়েছে কেবল বর্ষা মাখামাখি প্রকৃতিকে সেখানে নিবিড় করে পাব বলেই। তেমন কিছু তো আলাদা করে দেখার নেই লাভাসায় ওই হ্রদ ও পাহাড় জঙ্গল ছাড়া। সবুজ পাহাড়গুলির পিঠে সেই আবহমান কালের চেনা ছবি। প্রকৃতিপাঠ আর ভ্রমণ যেখানে সমার্থক হয়ে ওঠে।

আষাঢ় জলে ধৌত মুলসী ড্যাম

মুম্বই থেকে ঘণ্টা খানেকের সফরেই পৌঁছে যাওয়া যায় বৃষ্টি জলে টইটুম্বর মুলসী জলাধারের কাছটিতে। পুণে জেলার মুলসী তালুকে ১৯২৭ সালে সৃষ্ট হয় ১৫৩৩.৩৮ মিটার লম্বা এই জলাঝারটি। যখন এই জলাধারটি সবে নির্মাণ কার্য চলছে সেই ১৯২০-২১ সালে, স্থানীয় কৃষক নেতা পাণ্ডরঙ্গ মহাদেব পাবটা, ‘মুলসী সত্যাগ্রহ আন্দোলন’ করেছিলেন। যাদের জমি অধিগ্রহণ করে এই জলাধারটির খননকার্য তারা সবাই বাপট এর নেতৃত্বে একাত্রিত হয়েছিলেন। মুলসী জলাধারটি ইকো-ট্যুরিজম তকমা বিশিষ্ট জনপ্রিয় স্পট ইদানীং। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড় ঘেরা হ্রটি পর্যটকদের খুবই পছন্দের জায়গা। মুলা নদী খাত বয়ে গেছে জলাধারটির কাছ দিয়ে। শান্ত এলাকাটিতে কেবল মাথার ওপর জল ভরা মেঘলা আকাশ, পাহাড় টিলা, কুয়াশাচ্ছন্ন সবুজ পরিবহ মনকে নিয়ে যাবে স্রেফ দু’দণ্ড জিরেন দিতে। বর্ষায় মুলসী ড্যামের রমনীয়তা অন্য মাত্রা আনে। হ্রদের জলে নৌবিহারের ব্যবস্থাও আছে। প্রাকৃতিক পরিবহের মধ্যে সহ্যাদ্রী পাহাড় ঘেরা ঘন জঙ্গল এবং ধনগড় ও কোড়াইগড় নামের প্রাচীন দুটি দুর্গ।



বর্ষা অবকাশে কারজাট

বর্ষায় লং ড্রাইভে কারজাট চলে যাওয়া যায়। কারজাট স্টেশন তো আছেই আবার খোপলি অথবা পানভেল হয়েও যাওয়া যায়। ৬৩৬ ফুট উচ্চতায় কারজাট নিরিবিলি এলাকা। কিছু দূরে উলহাস নদী। বর্ষা দিনে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সবুজে ছেয়ে যায় কারজাট। সড়কপথটিও সাজানো গোছানো। দু’পাশে দূরে কখনও পাহাড়ি টিলা, সুসজ্জিত ধাবা, রেস্তোরাঁ, মহার্ঘ হোটেল, বিবাহ মণ্ডপ বিশিষ্ট অত্যাধুনিক ভবন। বর্ষাকালে উলহাস নদীর পাহাড়ি খাতে ওয়াটার রাফটিং, রক ক্লাইবিং, রক ট্রেকিং ইত্যাদি নানান কসরত ও প্রতিযোগিতা হয় স্থানীয় সংগঠনগুলির ব্যবস্থাপনায়। পাঠক, যাবেন নাকি ঘর থেকে বেরিয়ে বৃষ্টিভেজা মরসুমে এই সব সবুজ মাখা এলাকা গুলোতেও বেরিয়ে এসে মনে হতে বাধ্য শরীর-মন অনেকটাই বেশ ঝরঝরে হয়ে গেছে। অতএব মনসুন ম্যানিয়ায় ফুল মস্তিতে চলুন বেড়িয়ে পড়ি—যেখানে আসমান-জমিন বৃষ্টিতে আপাতত একাকার।

আরও পড়ুন

Advertisement