Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০২ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

দেশ

ভারতের প্রথম ‘স্বদেশী’ কোলড্রিঙ্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জরুরি অবস্থা, ইন্দিরা গাঁধীর রাজনীতিও

নিজস্ব প্রতিবেদন
০৩ জুন ২০২০ ২০:৫৪
এক সময় ভারত সরকার নিজের উদ্যোগে কোল্ড ড্রিঙ্ক তৈরি করে। কোলা স্বাদের প্রথম ‘স্বদেশী’ ড্রিঙ্কের নাম রাখা হয় ডবল সেভেন (৭৭)। এটা শুধু মাত্র একটা সংখ্যা বা নাম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের রাজনৈতিক ওঠাপড়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

দেশের ইতিহাসে প্রথম অকংগ্রেসী সরকারের হাত ধরে তৈরি হয় এই ‘স্বদেশী’ কোলা, ডবল সেভেন। আবার সেই প্রথম অকংগ্রেসী সরকারের পতনের সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় এই ডবল সেভেনের যাত্রা। জীবনকাল ছিল মাত্র তিন বছর। তবে এই তিন বছরে অনেক ইতিহাসের সাক্ষী সে।
Advertisement
১৯৭৫ সালে ২৫ জুন দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী। ২১ মাস পর ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ এই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়।

জরুরি অবস্থা জারির পরেই দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। সেই সময় প্রচুর বিরোধী নেতাকে জেলে পোরা হয়। যদিও অনেকে আবার এর পক্ষেও ছিলেন। তবে দিন দিন চাপ বাড়তে থাকে সরকারের উপর। জরুরি অবস্থা তোলার দাবি জোরালো হতে থাকে আন্দোলনও।
Advertisement
শোনা যায় জরুরি অবস্থা তোলা নিয়ে ইন্দিরা গাঁধী সরকারি সংস্থাগুলির মাধ্যমে দেশের মানুষের মতামত জানার চেষ্টা করেন। তিনি জানতে চান, জরুরি অবস্থা তুলে সাধারণ নির্বাচন হলে তাঁর ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতখানি। সেই সময় তাঁকে বলা হয়, তিনি আবার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবেন।

১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে দেশের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু ইন্দিরা গাঁধীকে যেমন বলা হয়েছিল, ফল হয়েছিল ঠিক তার উল্টো। নির্বাচনে হেরে যান ইন্দিরা গাঁধী। ক্ষমতায় আসে জনতা পার্টির জোট সরকার।

১৯৭৭ সালে জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেন মোরারজি দেশাই। প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গেই শপথ নেন ১৪ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জর্জ ফার্নান্ডেজ। যিনি কেন্দ্রীয় শিল্প মন্ত্রকের দায়িত্ব নেন।

১৯৭৭ সালে তৈরি ভারতের ‘বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আইন’ । এই আইনের ফলে ভারত থেকে ব্যবসা গোটানোর জন্য চাপ বাড়ে মার্কিন কোলড্রিঙ্কস কোম্পানি ‘কোকা কোলা’-র উপর।

কোকা কোলা-কে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজও। কারণ তিনি মনে করতেন বাইরের কোম্পানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উপর বিদেশি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি প্রভাব বিস্তার করবে।

নতুন আইনের ফলে কোকা কোলার সামনে দু’টি রাস্তা ছিল। হয় ভারত থেকে ব্যবসা গোটাতে হবে। না হয় কোকা কোলার ফর্মুলা সরকারের সামনে আনতে হবে। ভারতে ব্যবসার ৬০ শতাংশ কোনও ভারতীয় কোম্পানির হাতে দিতে হবে।

শুরুর দিন থেকেই কোকা কোলা তাদের স্বাদের রহস্য কারও কাছে প্রকাশ করেনি। অনেকে অনেক গবেষণা করেছে এই স্বাদের রহস্য জানার জন্য। কিন্তু সংস্থার শীর্ষ স্থানীয় কয়েক জন ছাড়া কোকা কোলার ফর্মুলা কেউ জানেন না। সেই ধারা তারা আজও বজায় রেখেছে।

১৯৭৭ সালেও কোকা কোলা কোনও ভাবেই তাদের স্বাদের গোপন রহস্য ফাঁস করতে রাজি ছিল না ভারত সরকারের কাছেও। ফলে সেই সময় ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্তই নেয় কোকা কোলা।

১৯৫০ সালে নতুন দিল্লিতে কোকা কোলার প্রথম বটলিং প্লান্ট তৈরি হয়। তার ২৭ বছর পর ভারত ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে চলে যেতে হয় এই মার্কিন সংস্থাকে। ফের ১৯৯২ সালে ভারতে পা রাখে কোকা কোলা। ১৯৯৩ সাল থেকে ফের ভারতে উৎপাদন শুরু করে।

১৯৭৭ সালে কোকা কোলার ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর জনতা সরকারের কাছে অন্য সমস্যা দেখা দেয়। কোকা কোলায় কাজ করা কয়েক হাজার কর্মী বেকার হয়ে পড়েন। তাঁরা বিক্ষোভও দেখান সরকারের বিরুদ্ধে।

বিক্ষোভ শান্ত করতে এবার কেন্দ্রের জনতা সরকারই নিজেদের উদ্যেগে কোলা ড্রিঙ্ক উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই ‘স্বদেশী’ কোলার নাম রাখা হয় ‘ডবল সেভেন’ বা ‘৭৭’। এই নাম রাখা হয় ইন্দিরা গাঁধীর জারি করা এমার্জেন্সি শেষ হওয়ার বছরের (১৯৭৭) কথা মাথায় রেখে।

ডবল সেভেন শুধু কোলা নয়, লেমন ফ্লেভারের ড্রিঙ্ক বাজারে আনে। তবে এই যাত্রা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কোলা কোলা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর সেই বাজার দখল করতে ডবল সেভেনর পাশাপাশি আরও অনেক ভারতীয় সংস্থা নতুন উদ্যমে নেমে।

জনতা সরকার প্রচুর চেষ্টা করে ‘স্বদেশী’ ডবল সেভেনের ব্যবসা বাড়াতে। তার জন্য আগ্রাসী বাজার নীতিও নেয়। কিন্তু অন্য বেসরকারি সংস্থাগুলির চাপে পিছিয়ে পড়তে থাকে ব্যবসায়। বিভিন্ন সংস্থার কোলা বা অন্য ফ্লেভারের ড্রিঙ্ক জনপ্রিয়তায় অনেক পিছনে ফেলে দেয়।

এরই মাঝে দিল্লিতে কিছুটা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না হওয়ার কারণে চাপে পড়ে পদত্যাগ করতে হয় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে।

মোরারজি দেশাইয়ের ছেড়ে যাওয়া দায়িত্ব বর্তায় উপপ্রধানমন্ত্রী চরণ সিংহের উপর। চরণ সিংহ ১৯৭৯ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেন। কিন্তু তাঁর শাসনকালও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সহযোগী দলগুলি একে একে সমর্থন তুলে নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রথম অকংগ্রেসী সরকার পড়ে যায় ১৯৮০ সালে।

এর পর ফের দিল্লির মসনদে ফের রাজনৈতিক পালাবদল। ১৯৮০ সালে লোকসভা নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় ফেরেন ইন্দিরা গাঁধী। অনেকে বলেন জনতা সরকার ফেলে দেওয়ার পিছনে ইন্দিরা গাঁধীর বড় ভূমিকা রয়েছে।

ইন্দিরা গাঁধীর নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরই ডবল সেভেনের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতা হয়ে যায়। কোনও শাসকই চান না তাঁর হারের চিহ্ন বয়ে বেড়াক সরকারের উদ্যোগ। তাই ক্ষমতায় ফিরেই সরকারি উদ্যোগে তৈরি ডবল সেভেন বন্ধ করে দেন ইন্দিরা গাঁধী। শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালেই বন্ধ হয়ে যায় ভারতের প্রথম এবং শেষ সরকারি উদ্যোগে তৈরি কোলা প্রস্তুতকারক সংস্থা।