Advertisement
E-Paper

স্বাস্থ্য: কবে দায়বদ্ধ হবে সরকার?

স্বাস্থ্য খাতে ১০০ টাকা খরচ হলে, ৭০ ভাগের বেশি আসে মানুষের পকেট থেকে।

ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ ১৫:৪৩
স্বাস্থ্যখাতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ বছর বছর কমেই চলেছে।

স্বাস্থ্যখাতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ বছর বছর কমেই চলেছে।

ট্যাঁকের কড়ি না ফেললে ভাল চিকিৎসা পাওয়া ভার। এমন ছবি অবশ্য গোটা দুনিয়া জুড়ে নয়, আমাদের মতো গুটিকয়েক দেশে।

আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে ১০০ টাকা খরচ হলে, তার ৭০ ভাগের বেশি আসে মানুষের পকেট থেকে। এর ফলে বাড়ে দারিদ্র, বৈষম্য। বহু মানুষ বঞ্চিত হন স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে। আসে অকালমৃত্যু।

গত কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে দেশে বিদেশে চর্চা চলছে— কী ভাবে চিকিৎসা করাতে গিয়ে দারিদ্রের কবলে পড়া কমানো যায়, সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় স্বাস্থ্যসেবা। জনপ্রিয় হয়েছে ‘ইউনিভার্সাল হেল‌্থ কেয়ার’ বা সর্বজনীন স্বাস্থ্য রক্ষার ধারণা। অনেকেই একমত যে, সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়াতেই হবে।

আমাদের ২০০২ সালের দ্বিতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে এ কথা বলা হয়েছিল। পরে ন্যাশনাল কমিশন অন ম্যাক্রো ইকনমিকস অ্যান্ড হেলথ‌্ (২০০৫)-এ, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনে, হাই লেভেল এক্সপার্ট গ্রুপ অন হেলথ‌্ রিপোর্টে, দ্বাদশ পরিকল্পনায় এক বাক্যে ঘোষণা করা হয়েছে— স্বাস্থ্যে সরকারি খরচ বর্তমানে জাতীয় আয়ের এক শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করার কথা।

যখন জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১৭ (এনএইচপি ২০১৭) সংসদে পেশ করা হল, তখন অনেকে আশা করেছিলেন হয়ত সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার একটা স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হবে। কিন্তু বাস্তবে আশার চেয়ে আশঙ্কাই বড় হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ বছর বছর কমেই চলেছে। গত কয়েকটি বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী যা ঘোষণা করেছেন তা বাস্তবায়িত করতে হলে যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে সে কথা তিনি বেমালুম ভুলে গিয়েছেন। ফলে কাজ কিছুই এগোয়নি।

স্বাস্থ্যে সরকারি খরচ বাড়ানো যে কত জরুরি, তা আমাদের আশপাশের কিছু দেশের সঙ্গে তুলনা করলেই স্পষ্ট হবে। চিন (জাতীয় আয়ের ৩.১ শতাংশ), শ্রীলঙ্কা (২ শতাংশ), তাইল্যান্ড (৩.৬ শতাংশ), মালয়েশিয়ার (২.৩ শতাংশ) মতো দেশে, যেখানে সরকার জনগণের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে দায়বদ্ধ, স্বাস্থ্যে সরকারি খরচ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে স্বাস্থ্যের মানও অনেক উন্নত।

প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রসারিত করার উপর জোর দিয়ে ‘হেলথ‌্ অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টার’ খোলার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৭-র বাজেটে। সরকারি ব্যবস্থাকে তৃণমূল স্তরে নিয়ে গিয়ে বিনা খরচায় ওষুধ দেওয়ার, নানাবিধ পরীক্ষার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল এই বাজেটে।

নন-কমিউনিকেবল বা সংক্রামক নয় এমন সব রোগ সমানে বেড়ে চলেছে আমাদের দেশে। এ কথা মাথায় রেখে জোর দেওয়া হয়েছে রোগ নিবারণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও আগেভাগে রোগ নির্ধারণের উপর। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের হালের এক রিপোর্টে প্রকাশ, এই প্রকল্পের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রক যে পরিমাণ বরাদ্দ চেয়েছিল, তার অনেকটাই নাকচ করে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রক। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের আধিকারিকরাই মনে করছেন, এর ফলে ভেঙে পড়বে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ।

সরকারি ব্যবস্থায় অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার সুযোগ প্রাথমিক স্তরে নেই বললেই চলে। এর জন্য ওষুধ ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিক করা বিশেষ প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে তামিলনাড়ু আর রাজস্থানের মডেল বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে। জনমুখী করতে হবে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা। মানুষের প্রতি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা বাড়ানো খুবই প্রয়োজন। তৃণমূল স্তরে সবাইকে নিয়ে স্বাস্থ্যের পরিকল্পনা করার কাজ কেরলে শুরু হয়েছিল তিন দশক আগে। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনও চেষ্টা করছে দেশ জুড়ে স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষকে সামিল করতে। যে সব ত্রুটি দেখা দিয়েছে সেগুলি কাটিয়ে একে জোরদার করা জরুরি।

আর একটা কথা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ভাল করতে হলে প্রয়োজন হাসপাতাল ভিত্তিক পরিষেবার সঙ্গে প্রাথমিকের মেলবন্ধন। চিন্তার বিষয় হল, এনএইচপি (ন্যাশনাল হেলথ‌্ পলিসি বা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি) ২০১৭-তে প্রাথমিক আর হাসপাতাল ভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। বাস্তবিক পক্ষে, সবার আগে দরকার স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারদের খালি পদ ভরা, বদলি নীতি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা। মনে রাখতে হবে, দক্ষ, দায়বদ্ধ ও অনুপ্রাণিত চিকিৎসা কর্মীরাই কিন্তু উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড।

গত দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কয়েকটি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার গরিব মানুষদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার চেষ্টা করছে। পরিষেবা কেনা হচ্ছে মূলত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে, সরকার নির্ধারিত হারে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং’ বা পরিকল্পনামাফিক ক্রয়। হাসপাতাল ভিত্তিক পরিষেবার প্রসারে এনএইচপি ২০১৭ পরিকল্পনামাফিক কেনার উপর জোর দিয়েছে। তাতে পরিষেবা দিতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে একে অপরের সঙ্গে।

সরকার পরিষেবার জন্য উভয়কেই টাকা দেবে একই হারে। ২০১৬-র বাজেট ঘোষণায় রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিমা যোজনায় (আরএসবিওয়াই) চিকিৎসার খরচ ৩০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লক্ষ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এটা করলে হয়ত সাময়িক কিছু রিলিফ দেওয়া যেত। কিন্তু এই খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়েনি, বরং পরিকল্পনাটাকেই হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

(লেখক সোনিপতের জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর)

Budget Union Budget Central Budget Budget 2018 Budget 2018-19 Arun Jaitley Health Health Budget National Health Mission
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy