Advertisement
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
Durga Puja 2020

মলমাসের দৌলতে কি এবার পুজোর ফুর্তি বাড়ছে বাঙালির

আশ্বিনের শারদ প্রাতে বিধাতাপুরুষ পেঁজা মেঘের আড়ালে কাশবন সাক্ষী রেখে মুচকি হেসে বললেন— দেখ, কেমন লাগে!

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়
কলকাতা শেষ আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২০ ১৮:২৮
Share: Save:

বছর দশেক আগের বিজয়া দশমীর সন্ধে। পাড়ার প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে গিয়েছে। বিসর্জন-ফেরত কুশীলবরা সিদ্ধি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিকের প্রভাবে কিঞ্চিৎ এলোমেলো পদক্ষেপে মণ্ডপে ফিরে আসছেন। পুরুতমশাই শান্তির জল দিলে হাতে মিহিদানা দলা পাকিয়ে কোলাকুলির পালা শুরু হতে না হতেই জনৈক সিদ্ধি-বিহ্বল এক মদ্য-বিজড়িতকে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলেন। কান্না-বিগলিত কণ্ঠে বলে চললেন— “পুজো শেষ হয়ে গেল ভাই! কী নিয়ে বাঁচব ভাই!”

Advertisement

সেই মুহূর্তে ওটা নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি হলেও পরে টের পেয়েছিলাম, ব্যাপারটা একান্তই প্রতীকী। সত্যিই তো, হিন্দু বাঙালির জীবনে বিজয়া দশমীর মতো ট্র্যাজেডি আর কী-ই বা রয়েছে! সেই কবে মাইকেল নবমী নিশিকে শেষ তারাদল সমেত লোপাট হতে মানা করে কান্নাকাটি করেছিলেন। সেই থেকে সেই কান্নার রেশ বাঙালির জীবনে ফুরোল না। সেই থেকেই বোধহয় বাঙালির জীবনে একটাই কামনা— পুজো নামক উৎসবটি যেন কিছুতেই না ফুরোয়।

কিন্তু পঞ্জিকার নিদান। নির্ধারিত দিনে প্রতিমা জলে ফেলে বিষণ্ণ চিত্তে বাড়ি ফেরাটাও পুজোরই অঙ্গ। তবে ইদানীং সে দিকে কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে। বিজয়া দশমীর দিন শহরের রথী-মহারথী পুজোগুলো ক্ষান্তি দেয় না। তার পরেও শনিবার-টনিবার মিলিয়ে-জুলিয়ে দিন কয়েক আরও টেনে দেওয়া যায়। এর পরে আবার ‘কার্নিভাল’। এ ভাবেই উৎসব বাড়তে থাকে। আড়ে-দৈর্ঘ্যে প্রায় মাসখানেক ছুঁই ছুঁই।

আরও পড়ুন: ফটো ফ্রেম বা পোশাক, পুজোর উপহারে ‘ব্যক্তিগত ছোঁয়া’ কী ভাবে?

Advertisement

অতিমারির বাজারে পুজো যাকে বলে ‘হাফ খরচা’।জৌলুসে টান পড়বে, প্যান্ডেলের সাইজ কমবে, প্রতিমা বনসাই হবে।

কিন্তু পুজোর প্রিল্যুডই যদি দীর্ঘায়িত হয়? যদি পুজো আসছে-পুজো আসছে ভাবটাই লম্বা হতে থাকে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর এক কবিতায় লিখেছিলেন, কবিতা লেখা নয়, কবিতা লিখবেন— এই ভাবটাই তাঁর অধিক প্রিয়। যে কোনও ইভেন্ট আসবে, এটা ভেবে যে পুলক জেগে ওঠে, ইভেন্ট চলাকালে সেটা থাকে না। পুজোও তার ব্যতিক্রম নয়। হিন্দু বাঙালির পুজো-সর্বস্ব জীবনে ডিসেম্বর–জানুয়ারি থেকেই মা দুগ্‌গার ছবি-সহ বিজ্ঞাপন পড়তে শুরু করে। থিমপুজোর কর্তারা ‘টিজার’ টাঙিয়ে জানাতে থাকেন তাঁদের এ বছরের ধামাকা কোন ফিল্ডে। পাবলিকও সেই টিজারের উত্তাপে সারা বছর ধরে সেঁকতে থাকেন নিজেদের। খেলা জমে ওঠে শ্রাবণের শেষে জটাজূট সরিয়ে যদি একখণ্ড পেঁজা তুলোর মতো মেঘ আর উজ্জ্বল নীলমণি-মার্কা আকাশ ফুটে বেরোয়। ফেসবুকে, ইনস্টায় হই-হই রই-রই কাণ্ড। ওই শরৎ দৃশ্যমান হল— পুজোর আর মাত্র ১১১ দিন— এই সব পোস্ট শুরু হয়। তলায় লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের ছড়াছড়ি।

কিন্তু এ বছরটা অন্য রকম। ২০১৯-এর ডিসেম্বরেই ধামাকাদার খবর ছিল, এ বার পুজো মহালয়ার এক মাস পরে। ফলে পুজোবাজ বং-বৃন্দ একটা টান টান এক মাস কাটানোর ছক কষে ফেলেছিলেন। এক মাসে দু’খানি অমাবস্যা পড়ায় মলমাস ঘোষণা করেন পঞ্জিকাবিদরা। ফলে মায়ের বাপের বাড়ি আগমনও এক মাস পিছিয়ে যায়। মলমাসে মল-কেন্দ্রিক বং-জীবন প্রস্ফুটিত হওয়ার কথা ছিল। অতিরিক্ত এক মাস ধরে পুজোর বাজার। মহালয়ার পর দিন থেকেই মাইক লাগিয়ে ‘আশ্বিনের এই শারদ প্রাতে’-কে প্রলম্বিত করে এক মাস ধরে বাজানোর বিপুল পরিকল্পনা বাঙালির মনে-মগজে রীতিমতো ছকা হয়ে গিয়েছিল। নবমী নিশির ‘পোহায়ো না পোহায়ো না’ ভাবটা পুষিয়ে দিতেই যেন পাঁজি গ্রেস দিয়েছিল একটা গোটা মাস।

কিন্তু বিধি যদি সাথ না দেয়, কী করা যাবে! ‘সকলি গরল ভেল’— বৈষ্ণব পদকর্তার এই অমোঘ পংক্তি সার্থক করে ঘনিয়ে উঠল অতিমারি। আশ্বিনের শারদ প্রাতে বিধাতাপুরুষ পেঁজা মেঘের আড়ালে কাশবন সাক্ষী রেখে মুচকি হেসে বললেন— দেখ, কেমন লাগে!

এখন এই মাস্কবন্দি, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সের লক্ষ্মণরেখায় আবদ্ধ, স্যানিটাইজার-গন্ধী জীবন।

অতিমারির বাজারে পুজো যাকে বলে ‘হাফ খরচা’। পুজো হবে কি হবে না— এই নিয়েই তরজায় মেতেছিলেন নেটাগরিক বন্ধুরা। কিন্তু পাঁজি থাকতে তাঁরা নিদান দেওয়ার কে? পাঁজিতে লিখেছে যখন পুজো হবে, তখন হবেই। জৌলুসে হয়তো টান পড়বে, প্যান্ডেলের সাইজ কমবে, প্রতিমা বনসাই হবে। ভূয়োদর্শী ফেসবুকবাজরা বলতে লাগলেন, যো হোগা, সো দেখা যায়েগা। আপাতত হাতে একটি মাস। কিন্তু এই ‘গ্রেস’ পাওয়া মাসখানেকে যে যে ফূর্তির ঘোঁট পাকানোর কথা ছিল, সে সবের বারোটা বেজে গিয়েছে। এখন এই মাস্কবন্দি, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সের লক্ষ্মণরেখায় আবদ্ধ, স্যানিটাইজার-গন্ধী জীবন। মহালয়ার পরে যে বিশাল ‘আগমনী-গ্যাপ’ পাওয়া গিয়েছিল পাঁজির কল্যাণে, তা নেহাৎই ছড়িয়ে ছাপ্পান্ন।

আরও পড়ুন: করোনাসুরকে হারাতে হবে, ‘ইমিউনিটি’ বাড়াতে কী কী খাবেন​

সত্যিই কি করোনা-কাণ্ডে আগমনীর এক মাসের পরিকল্পনায় জল পড়ে গেল? মহালয়া থেকে ষষ্ঠী— এই পর্বটাই তো উৎসবের সব থেকে উত্তেজনার ক্ষণ। সেই পর্বটা যদি একমাসের গ্রেস পায়, তা হলে কী হওয়া উচিত আর কী হল, এর খতিয়ান কোথায় পাওয়া যায়?

পুজো-প্রস্তুতির সব থেকে বড় আখড়া হল সেলুন। ‘হাবিবি’ চালের মহার্ঘ ‘সালোঁ’ নয়। নেহাতই পাড়ার সেলুন। যেখানে যে কোনও মুহূর্তে ছেলে-ছোকরারা জটলা পাকাতে পারে, ‘পরান যায় জ্বলিয়া রে’ গাইতে গাইতে বারোয়ারি চিরুনিতে চুল আঁচড়ে নিতে পারে, শনিবারে হনুমান মন্দিরের জনসমাগম নিয়ে বিশ্লেষণী আলোচনা করতে পারে, খদ্দের না থাকলে আদিরসাত্মক হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিয়ো নিয়েও কনফারেন্স চালাতে পারে। তেমন জয়েন্ট করোনা-লকডাউনে এক্কেবারে ঘুমঘুমির মাঠ। নরসুন্দর একাই মাস্ক-মুখে বসে থাকেন খদ্দেরের আশায়।

পুজো-প্রস্তুতির সব থেকে বড় আখড়া হল সেলুন।

এমনই এক সেলুনের মালিক সাহেব মান্না। ফুটের দোকান। হাত ভাল। লকডাউনের আগে সারা দিনে কাঁচির আওয়াজ বন্ধ হয়নি তাঁর সেলুনে। লকডাউন পর্বে বাঁকুড়ায় দেশে চলে গিয়েছিলেন। আনলক শুরু হতে ফিরে এসে দোকান খুলেছেন। কিন্তু খোলাই সার। ফ্যাশনিস্তারা উধাও। মাস্ক ঢাকা মুখে দাড়ি বাড়ল কি কমল, তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই বলে কামানোর পাবলিকও কমতি। সর্বোপরি করোনার ভয়। চুল কাটা মাথায় থাক— বলে পাবলিক ক্ষান্ত দিয়েছে।

আরও পড়ুন: আদা, ডাল বাটা, কফির গুঁড়ো, রান্নাঘরেই পুজোর পার্লার

পুজোর সময়ে কী হবে? প্রশ্ন করতেই তড়িঘড়ি জবাব সাহেবের, “মহালয়ার পরে আর সময় নেই হাতে। হেব্বি চাপ।” কিন্তু এ বছর তো সব বাড়ি-বন্দি! সাহেবের উত্তর—“পুজোর আগেই সব ফিট হয়ে যাবে! সারা দিনে পনেরোটা ব্লিচিং, কুড়িটা হেয়ার ডাই কম করে। চাপ সামলাতে শালাবাবুকে আনিয়ে নিয়েছি শ্যামপুর থেকে।” কিন্তু মাস্ক পরে আর কতটা ফ্যাশন হবে? “মাস্ক তো মুখে। চুল তো খোলা!” সন্ধ্যাদির বিউটি পার্লারেও মাস্ক ঢাকা মুখ। কিন্তু মাস্কারা তো লাগাতেই হবে চোখে— এমন যুক্তি সেখানেও। চুল স্ট্রেট করানোর লাইনই নাকি সাংঘাতিক। এর পরে তো ফেশিয়াল-টেশিয়াল রয়েছেই। এহেন উজ্জ্বল ছবি একেবারেই নেই সিদ্ধার্থ প্রামাণিকের সেলুনে। বড় দোকান। চারজন ‘মিস্ত্রি’ সারাদিন হাত চালান। কিন্তু করোনাকালে মিস্ত্রীরা দেশে। ট্রেন চালু না হলে ফিরতে পারছেন না। সিদ্ধার্থ জানালেন, বাঁধা কাস্টমাররা একে একে ফিরছেন। তবে সেই ভিড় নেই। অন্য বছর চুল কাটা, ফেশিয়াল, ডাই ইত্যাদি ইত্যাদির যে হুড়ুমতাল থাকত, এ বছর তার নাম-গন্ধ নেই। সিদ্ধার্থর সেলুন একটা বাড়ির একতলায়। কাচের দরজা ঠেলে ঢুকতে হয়। এসি নেই। তবে কায়দার চেয়ার আছে। নীল রঙের ক্লোক গায়ে দিয়ে চুল কাটাতে হয়। সাহেবের কাস্টমার আর সিদ্ধার্থর ক্লায়েন্টরা একই আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠীভুক্ত নন। কিন্তু একই এলাকার কয়েক ফার্লং দূরত্বে বাস্তবতা এমনই বদলে যাচ্ছে? স্বীকার না করে উপায় নেই, সমাজের একটা থাক থেকে আতঙ্ক বিন্দুমাত্র যায়নি। নিউ নর্মাল সেখানে রীতিমতো জাঁকিয়ে বসে রয়েছে। কুমোরটুলিতেও একট দু’টি করে প্রতিমা মুখ বাড়াতে শুরু করেছে। ফেসবুকে মিম ঘুরছে— শাঁখা-পলা পরা হাতের তালুতে পুঁচকে দুর্গাপ্রতিমা। ক্যাপশন—‘হোক ছোট, মা তো আসছেন!’

অলঙ্করণ: তিয়াসা দাস

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.