মায়ার চিন্তা বাড়িয়ে আজাদের খুদে সৈনিক
এ মহল্লায় এমন হুঙ্কার চন্দ্রশেখর আজাদই দিতে পারেন। নিজের ‘ভীম আর্মি’ গড়ে যিনি মায়াবতীর ঘুম ছুটিয়েছেন।
bhim

ঘরে-ঘরে মায়াবতী-অম্বেডকর-চন্দ্রশেখর। —নিজস্ব চিত্র

চেনা নাকছাবি, কানে দুল। গোলাপি ওড়না জড়িয়ে হাসছেন বহেনজি। চটা ওঠা দেওয়ালে, যত্নে বানানো ফ্রেমে।

ভরদুপুরে ভুল করে অন্যের বাড়িতে ঢুকে পড়েছি! পাড়ার খুদেগুলির শয়তানি হবে।

বড় রাস্তার ওপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘চন্দ্রশেখরের বাড়ি কোথায়?’’ ঠাকুরদের গ্রামে উত্তর এসেছিল, ‘‘রাস্তা পেরিয়ে ‘হরিজন কলোনি’তে।’’ রাস্তা পেরিয়েই সামনে পেলাম একদল খুদেকে। বাড়িটা তারাই চিনিয়ে দিল। মূল ফটক খোলাই ছিল। দেওয়ালে লেখা: ‘জয় ভারত-জয় ভীম আর্মি-জয় বহুজন।’ আর তার নীচে ‘আমাদের দেশের শাসক হতে হবে।’

এ মহল্লায় এমন হুঙ্কার চন্দ্রশেখর আজাদই দিতে পারেন। নিজের ‘ভীম আর্মি’ গড়ে যিনি মায়াবতীর ঘুম ছুটিয়েছেন। ক’দিন আগেই মায়াবতী টুইট করে বলেছিলেন, ‘‘চন্দ্রশেখর বিজেপির এজেন্ট।’’ কিন্তু এই চন্দ্রশেখরই বারাণসীতে নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে লড়তে চলেছেন। হাসপাতালে অসুস্থ থাকার সময় দিল্লি থেকে আজাদের সঙ্গে দেখা করতে ছুটে এসেছিলেন প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বঢরা। আজ সহারনপুরে প্রিয়ঙ্কার রোড-শোতেও ভীম আর্মির সৈনিকরা চন্দ্রশেখরের ছবি নিয়ে পৌঁছে গিয়েছেন। ঠিক যেমন দু’দিন আগে গিয়েছিলেন দেওবন্দে মায়া-অখিলেশের যৌথ সভাতেও। যা দেখে মঞ্চেই একরাশ বিরক্তি দেখান বহেনজি।

পাড়ায় ঢুকতেই খুদের দল বলেছিল, ‘শেখর ভাইয়া’ বাড়ি নেই। ভোটের প্রচারে বাইরে। তবু বহুজন সুপ্রিমোকে যিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারেন, তাঁর সাম্রাজ্য চাক্ষুষ করার তাগিদ তো আছে। কিন্তু যে বাড়ির দেওয়ালে সবার উপরে বহেনজির ছবি, তার নিচে বাবাসাহেব— সেটি চন্দ্রশেখরের বাড়ি হয় কী করে? জিভ কেটে বেরিয়েই আসছিলাম। খাটের উপর প্রৌঢ়াকে তবু একবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘এটি কি চন্দ্রশেখর আজাদের বাড়ি?’’ চমকে দিয়ে উত্তর এল, ‘‘হ্যাঁ, আমার ছেলে।’’ ‘‘ভীম আর্মির চন্দ্রশেখর?’’ ‘‘হ্যাঁ, কিন্তু  বাড়ি নেই।’’

আরও পড়ুন: দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

একটু ধাতস্থ হতেই নানান গল্প শোনালেন কমলেশ দেবী। চন্দ্রশেখরের মা। স্বামী স্কুলে পড়াতেন। কিন্তু ‘দলিত’ বলে শিক্ষকদের মধ্যেও ভেদাভেদ হত। খাওয়ার বাসন, জলের গ্লাস আলাদা রাখতে হত। তাঁর স্বামী গোঁফ রাখতেন, যখন তাঁদের গোঁফ রাখাটা পছন্দ করত না উঁচু জাতরা। তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলের নাম রেখেছিলেন ভগৎ সিংহ আর চন্দ্রশেখর আজাদ। অস্পৃশ্যতা কিন্তু দূর হয়নি। গ্রামের ঠাকুর সম্প্রদায়ের বাচ্চারা ‘দলিত’দের অন্য চোখে দেখে।  তাই নিয়েই চন্দ্রশেখর আন্দোলন শুরু করেন। ভীম আর্মি তৈরি করেন। এ সব গল্পগাছার মধ্যেই এক যুবক এলেন। আশপাশের গ্রাম ঘুরতে বললেন। ছুটমলপুর গ্রাম থেকে তার পরেই শুরু করলাম একের পর এক গ্রাম অভিযান। ফতেপুর থেকে ঘডকৌলী।  

ফতেপুরের দলিত কলোনিতে অভদেশ সিংহের সঙ্গে দেখা। আজাদের মতোই গোঁফে তা দিচ্ছেন। বললেন, ‘‘দলিতদের উপর ঠাকুরদের অত্যাচার যা হয়, আজাদ না থাকলে আজ গোঁফ উঁচু রাখতে পারতাম না। আগে স্কুলে আমাদের বাচ্চারা উঁচু জাতের একসঙ্গে জল খেতে পারত না। ক্লাসে পিছনে বসতে হত। আজাদ লড়াই করে ভেদাভেদ ঘুচিয়েছেন। আমাদের সাহস জুগিয়েছেন। এখন আমাদের বাচ্চারাও ঠাকুরদের জবাব দেয়।’’ তা হলে এ বারের ভোটে কী হবে? ‘‘ভোট যাবে বহেনজির কাছে। কিন্তু আমাদের নেতা আজাদই।’’

ঘডকৌলী গ্রামে ঢুকতেই বড় ফলক, ‘দ্য গ্রেট …। ভীমরাও অম্বেডকর গ্রাম।’ বাদ দেওয়া শব্দটি এখন অবমাননাকর বলে স্বীকৃত। কিন্তু গ্রামে গ্রামে সকলের ঘরে মায়াবতী-অম্বেডকর আর চন্দ্রশেখরের ছবি। কেশোরাম বললেন, ‘‘তিন জনেই আমাদের আদর্শ। আমাদের নেতা। শেখর যখন ভোটে লড়বেন, তখন তাঁকেই ভোট দেব।’’ ১৩০০ গ্রামে তৈরি ভীম আর্মির সৈনিক। শুধু দলিত নয়, মুসলিম এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে নিয়ে তিলে 

তিলে তৈরি হচ্ছে ভীমের সেনা। শক্তি যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে মায়াবতীর হৃদস্পন্দন।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। গ্রামের স্কুলগুলিতে শুরু হয়েছে ‘ভীম পাঠশালা’। আঁচল, পায়েল, পারুল, করণ, অর্জুন। সরকারি স্কুলে যা শেখানো হয় না, খুদে পড়ুয়ারা শেখে এখানে। গণিত, বিজ্ঞান, সঙ্গে সমাজে নাক উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র। আজাদের খুদে সৈনিকরাও তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত