নাগপুরে উন্নয়নের রথে সওয়ার গডকড়ী, কংগ্রেসের ভরসা ‘ডিএমকে’ ফর্মুলা
নাগপুর শহরের আনাচকানাচে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এই ‘ডিএমকে’-র কথাই।
Nitin

ভোট প্রচারে নিতিন গডকড়ী। ছবি পিটিআই।

ডিএমকে ফর্মুলা কাজে আসবে? প্রশ্নটা শুনেই হেসে ফেললেন নানা পাটোলে। কিছু ক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে তাঁর সাংবাদিক সম্মেলন। নাগপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে আনন্দবাজারের সঙ্গে কথাবার্তার শুরুতেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েছিলাম।

এই ‘ডিএমকে’ মানে কিন্তু তামিলনাড়ুর এম কে স্তালিনের দল ডিএমকে নয়। নাগপুরের অধুনা চর্চিত এই ‘ডিএমকে’ আদপে ‘দলিত-মুসলিম-কুনবি’ সমীকরণ, জাতপাতের যে সমীকরণের উপরে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস সম্মুখ সমরে নেমেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। এটা বললে অবশ্য কিছুই বোঝায় না! কারণ, এই নাগপুর লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীর নাম নিতিন গডকড়ী। কেন্দ্রের এই হেভিওয়েট মন্ত্রী নাগপুরেরই ভূমিপুত্র। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন যিনি, কংগ্রেসের সেই নানা পাটোলে জাতে কুনবি।

জাতপাতের এই সমীকরণ নাগপুরে আদৌ কার্যকর হবে কি না তা বোঝা যাবে আরও কয়েক দিন পরে। কিন্তু নাগপুর শহরের আনাচকানাচে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এই ‘ডিএমকে’-র কথাই।

 

এমনিতে ঝাঁ চকচকে নাগপুর শহরে নির্বাচনমী প্রচার শেষবেলায় অবশ্য তুঙ্গে। প্রথম দফায় এই কেন্দ্রে ভোট ১১ এপ্রিল। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক শিবিরের চূড়ান্ত ব্যস্ততার আঁচ পড়েনি নাগপুরে। চতুর্দিকে রাস্তার কাজ চলছে। এমনিতেই ব্যবসার শহর নাগপুর চতুর্দিকের নানা বিষয়ে মাথা ঘামায় না। শহরের সিতাবাল্ডি এলাকার যুবক অজয় শর্মা যেমন বলছিলেন, ‘‘আরে, যা হবে, ১১ এপ্রিল বোঝা যাবে। আমাদের শহরে এমনিতেই উন্নয়নের বন্যা! মনে রাখবেন, নিতিনজি আর দেবেন্দ্র ফড়নবীস, দু’জনেই নাগপুরের ভূমিপুত্র।’’

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

হক কথা! নিতিন গডকড়ী তো বটেই, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীসও নাগপুরের মানুষ। ফলে, উন্নয়নের জন্য অর্থের অভাব কোনও দিনই নাগপুরের হয়নি। নাগপুরবাসী তাই গর্ব করে বলেন, পুণের আগেই আমাদের এখানে মেট্রো রেল চালু হয়েছে। এখানে এইমস এসেছে, আইআইটি হয়েছে, আইন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, হয়েছে আইআইএম-ও।

এবং ঘটনাচক্রে দু’জনেই আরএসএসের পছন্দের লোক। আরএসএসের সদর দফতর এই নাগপুরেই। সঙ্ঘের প্রভাবও প্রবল। অতীতে মাঝেমধ্যেই নিতিনের নানা মন্তব্য নরেন্দ্র মোদী ও নিতিনের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে জন্ম দিয়েছে নানা রটনার। জনশ্রুতি ভেসে এসেছে, প্রধানমন্ত্রী পদে মোদীর থেকে গডকড়ীকেই বেশি পছন্দ সঙ্ঘের।

প্রসঙ্গটা তুলতেই আরএসএসের মুখপাত্র ‘তরুণ ভারত’-এর মুখ্য সম্পাদক গজানন নিম্বডো বললেন, ‘‘খোদ গডকড়ী নিজেই বার বার বলেছেন, তিনি মোদীর নেতৃত্বেই কাজ করবেন। আরএসএস-ও মোদীকে প্রধানমন্ত্রী চায়। ওঁদের দু’জনেই তো আমাদের! বিরোধের প্রশ্ন উঠছে কেন? গডকড়ীর নাম আরএসএস করেনি। বিজেপি-ই ঠিক করেছে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন।’’

এ বারে কি লড়াইটা কঠিন? নানা পাটোলের ‘ডিএমকে’ ফর্মুলা কি কাজ করবে? গজাননের জবাব: ‘‘কোনও কাজই করবে না। অতীতেও কি ‘ডিএমকে’ ছিল না? জনতা ভোট দেবে উন্নয়ন দেখে। এখানে উন্নয়ন নিয়ে তো কোনও প্রশ্নই উঠছে না। মনে রাখবেন, নিতিন ও ফড়নবীস, দু’জনেই নাগপুর সমেত গোটা বিদর্ভের উন্নয়নের জন্য অনেক টাকা এনেছেন।’’ তার পরেও তো কৃষকের দুর্দশা চলছেই। গজানন বলেন, ‘‘গত চার বছরে প্রচুর কাজ হয়েছে। নাগপুর ও যবতমাল জেলার গ্রামীণ এলাকার আড়াই লক্ষ একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করেছেন নিতিন ও ফড়নবীস। বেম্বলা সেচ প্রকল্পের অধীনে এক লক্ষ একর জমিতে সেচের কাজ হচ্ছে। একটু অপেক্ষা করুন, কৃষকের আত্মহত্যা বন্ধ হয়ে যাবে।’’

হয়তো হবে, হয়তো বা হবে না। কিন্তু নিজের জয়ের ব্যাপারে নিঃসংশয় কংগ্রেস প্রার্থী নানা পাটোলে। তাঁর অভিযোগ, গডকড়ী নিজের ভালর জন্য কাজ করেছেন। মজার কথা হল, ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের আগে নানা কিন্তু নিতিনের সহযোদ্ধা ছিলেন। ২০১৪-য় পাশের ভাণ্ডারা-গোন্ডিয়া লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির হয়ে লড়ে নানা পরাস্ত করেছিলেন শরদ পওয়ারের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের (এনসিপি) প্রফুল পটেলকে। ‘জায়ান্ট কিলার’ শিরোপা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলে তাঁকে বলা হয়, তিনি চিরবিদ্রোহী। কারণ, বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি কংগ্রেসেই ছিলেন। ২০০৯-এ কংগ্রেস ছেড়ে তিনি যোগ দেন বিজেপিতে। কিন্তু বিদর্ভের কৃষকের দুর্দশার প্রতি মোদী সরকার উদাসীন, এই অভিযোগে ২০১৭-য় বিজেপি ছাড়েন তিনি।

কংগ্রেসে আসার পরে এই নাগপুর থেকে নিতিনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নানা। এর ফলস্বরূপ, ১৯৯৮ থেকে ২০১৪, পর পর চার বার এই কেন্দ্রের সাংসদ বিলাস মুট্টেমেওয়ারকে ‘বিসর্জন’ দেয় কংগ্রেস। এই নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরমহলে কার্যত বিদ্রোহ হলেও কোনওক্রমে তা ধামাচাপা দেন দলীয় নেতৃত্ব। নানা পাটোলের প্রার্থীপদকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের অন্দরের অসন্তোষের কথা কার্যত স্বীকার করে নেন মহারাষ্ট্রে কংগ্রেসের অন্যতম মুখপাত্র অতুল লোহান্ডে। নাগপুর শহরে তাঁর বাড়িতে বসে আনন্দবাজারকে তিনি বলেন, ‘‘নাগপুরে এ নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল। ছিল না, এমন নয়। তবে এখন নানা পাটোলের জন্য কংগ্রেসের সব গোষ্ঠীই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। আপনি কংগ্রেসের সভায় বা প্রচারে গেলেই দেখতে পাবেন, দলের সব নেতাই এককাট্টা হয়ে আমাদের প্রার্থীকে জেতানোর জন্য কাজ করছেন।’’

কংগ্রেস অবশ্য ‘ডিএমকে’ ফর্মুলার উপরেই ভরসা রাখছে বেশি। তাদের হিসাবে, নাগপুর কেন্দ্রের প্রায় ২১ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ১২ লক্ষের বেশি ভোটার দলিত, মুসলিম ও কুনবি সম্প্রদায়ের। এই ভোট তাঁদের পক্ষেই যাবে বলে কংগ্রেস নেতৃত্ব আশাবাদী। যদিও ইতিহাস বলছে, ২৮ বছর আগে কংগ্রেস শেষবার এই কেন্দ্রে কুনবি সম্প্রদায়ের দত্তা মেঘে-কে প্রার্থী করেছিল। তিনি সে বার জেতেন।

নাগপুর আরএসএসের সদর দফতর হলেও বরাবরই কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত। গডকড়ী দ্বিতীয় বিজেপি প্রার্থী যিনি নাগপুর থেকে জিতেছেন। এর আগে ১৯৯৬-তে এই কেন্দ্র থেকে জেতেন বিজেপির বনোয়ারিলাল পুরোহিত। তিনিও অবশ্য কংগ্রেস থেকেই বিজেপিতে এসেছিলেন।

কংগ্রেসের ‘ডিএমকে’ ফর্মুলাকে যদিও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন নিতিন গডকড়ীর নির্বাচন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজেপি নেতা সুধাকর দেশমুখ। বললেন, ‘‘ওই ফর্মুলায় কংগ্রেসের জেতার চান্স জিরো পার্সেন্ট। তা-ই যদি হবে তা হলে এর আগে তিন বার নানা নির্বাচনে ওই সম্প্রদায়ের প্রার্থী আমাদের প্রার্থীর কাছে হারেন কী ভাবে? দেবেন্দ্র ফড়নবীসের কাছেও কুনবি সম্প্রদায়ের প্রার্থী হেরেছিলেন। গত ২০ বছর ধরে এই কেন্দ্রের জন্য কাজ করছেন নিতিনজি। উন্নয়নের ধারা দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন।’’ ২০১৪-য় এই কেন্দ্রে নিতিনের জয়ের ব্যবধান ছিল ২ লক্ষ ৮৪ হাজারের বেশি ভোট। এ বারে বিজেপির লক্ষ্য তা বাড়িয়ে ৩ লক্ষ ছাড়িয়ে যাওয়া।

ইটোয়ারি, সদর, সিভিল লাইনস, জরিপাটকা— নাগপুর শহরের বিভিন্ন মহল্লায় কান পেতে অবশ্য নিতিনের কাজের প্রশংসাই শোনা গেল। ‘জনতা জনার্দন’-এর একটা অংশ ইতিউতি শোনালেন, এক জন হেভিওয়েট ও কেন্দ্রে ক্ষমতাবান প্রার্থীকে ভোট দিলে আদপে লাভবান হবে নাগপুর।

ল়ড়াইটা তা হলে ‘জায়ান্ট’-এর সঙ্গে ‘জায়ান্ট কিলার’-এর!

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত