• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মন কি বাত

কৃষক-বিরোধী নই, বার্তা মোদীর

Narendra Modi

জমি নিয়ে চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এ দিন আকাশবাণীর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে কৃষকদের তিনি বললেন, রাজনৈতিক কারণে জমি বিল নিয়ে ধন্দ তৈরি করতে ‘মিথ্যা’ প্রচার চালানো হচ্ছে। সরকারের জমি নীতি যে কৃষক স্বার্থবিরোধী নয়, তা বোঝাতে মোদী বলেন, “কৃষকদের দরিদ্র করে রাখার জন্যই অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে প্রচার হচ্ছে। অথচ কেন্দ্রের নীতি কার্যকর হলে কৃষকরা যেমন ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন, তেমনই শিল্পায়নের পথ সুগম হলে কৃষকের ছেলেও কাজ পাবে।”

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই পাল্টা মুখ খোলে কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, “প্রধানমন্ত্রী মিথ্যা বলে কৃষকদের বোকা বানাচ্ছেন।” ইউপিএ জমানার জমি আইনের অন্যতম কারিগর জয়রাম রমেশ বলেন, “প্রধানমন্ত্রী পদের মর্যাদার কথা মাথায় রেখেই বলছি, সফেদ ঝুট বলছেন মোদী।” সনিয়া গাঁধীর রাজনৈতিক সচিব আহমেদ পটেল এই প্রসঙ্গে দেশে একের পর এক কৃষকের আত্মহত্যার কথা মনে করান। আজই রাজস্থানের কোটায় আরও দু’জন কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন বলে খবর মিলেছে। পটেলের মন্তব্য, মোদীর শাসনে কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন। জঙ্গিদের হাতে প্রাণ যাচ্ছে জওয়ানদের। অথচ ক্ষমতায় আসার আগে এই মোদীই কৃষকদের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ৫০% বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পটেল বিবৃতি দিয়ে বলেন, “সংসদে প্রশ্নের জবাবে মোদী সরকার বলেছে ৫০% বৃদ্ধির ওই প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে। এই মন কি বাত নিয়ে মোদীর কী বক্তব্য?”

বর্তমান জমি আইন সংশোধন করে গত ডিসেম্বরে রাতারাতি অধ্যাদেশ জারি করে মোদী সরকার। তা নিয়ে চাপের মুখে পড়ে অধ্যাদেশে নামমাত্র কিছু সংশোধন এনে তা বাজেট অধিবেশনে লোকসভায় পাশ হলেও রাজ্যসভায় বিলটি পেশই করতে পারেনি কেন্দ্র। ৫ এপ্রিল অধ্যাদেশটির মেয়াদ শেষ। তার পর ফের নতুন অধ্যাদেশ জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সন্দেহ নেই, তার জন্যই আজ কৃষকদের বার্তা দিতে সক্রিয় তিনি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এর থেকে দু’টি বিষয় স্পষ্ট। এক, জমি অধ্যাদেশ নিয়ে মোদী রাজনৈতিক চাপে। দুই, চাপ থাকলেও সংস্কারের পথে হাঁটার জেদ রয়েছে তাঁর। তাই অধ্যাদেশে আরও সংশোধন করার চেয়ে সেটারই ধারা-উপধারা কৃষকদের বোঝাতে চাইলেন তিনি।

পূর্বতন সরকারের সমালোচনায় প্রধানমন্ত্রী আজ বলেন, জমি অধিগ্রহণের জন্য ১২০ বছর ধরে ব্রিটিশ আইন চলছিল। স্বাধীনতার পর থেকে তার বদল হয়নি। ইউপিএ সরকারের শেষ দিকে তাড়াহুড়োয় ভ্রান্তিতে ভরা একটি আইন পাশ হয়। মোদী জানান, রেল, হাইওয়ে, বিদ্যুৎ ইত্যাদি ১৩টি ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের জন্য পৃথক আইন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের হার বাড়ানোর ব্যাপারে ইউপিএ কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি। সেটা কি ভুল ছিল না? ওই ১৩টি আইনে ক্ষতিপূরণের হার বাড়িয়ে চার গুণ করার জন্যই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

কিন্তু মোদীর এই দাবিকেই ‘ডাহা মিথ্যা’ বলছে কংগ্রেস। কারণ, ২০১৩ সালে যে জমি আইন পাশ হয়েছিল, তার ১০৫ ধারায় বলা ছিল, বর্তমান আইনটি কার্যকর হওয়ার এক বছরের মধ্যে ১৩টি ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের জন্য মূল জমি আইনের সমতুল্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সে জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে ওই ১৩টি আইনে। আইনের সেই ধারা উত্থাপন করে জয়রাম আজ বলেন, তা হলে মোদী সরকার নতুন কী করল? দ্বিতীয়ত, তাড়াহুড়োয় আইন পাশের অভিযোগ নিয়েও কংগ্রেসের আপত্তি রয়েছে। জয়রাম বলেন, ইউপিএ সরকার জমি আইন সংশোধন প্রস্তাব নিয়ে দু’বছরেরও বেশি সময় নিয়ে রাজনৈতিক সর্বসম্মতি গড়ে তুলেছিল। জয়রামের কটাক্ষ, “সবরমতীর মোহান্ত দশ লাখি কোট পরে নয়া মন্ত্র আওড়াচ্ছেন। অ-সত্যমেব জয়তে!’’

সরকারের শীর্ষ সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা আজ দিয়েছেন, আগামী দিনে সেটাই গাঁ-গঞ্জে প্রচার করবেন বিজেপির সাংসদ, বিধায়ক, নেতা ও সঙ্ঘ পরিবার। জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষকদের প্রাক সম্মতি নেওয়ার যে ধারা সরকার কার্যত বিলোপ করেছে, রাজনৈতিক ভাবে সেটাই বিঁধছে বিজেপিকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আজ বলেন, “জমি অধিগ্রহণের নামে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জমি হাতিয়ে নেওয়া হতে পারেচাষিদের মনে ক্ষোভ ও সংশয় রয়েছে। কিন্তু কথা দিচ্ছি, অধিগ্রহণের আগে দেখা হবে ঠিক কত জমি দরকার। এক ছটাকও বেশি নেওয়া হবে না।” সেই সঙ্গে সামাজিক প্রভাব নিরীক্ষার শর্ত তুলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ জন্য প্রকল্পের কাজ শুরু হতে অহেতুক দেরি হবে। সেই অনিশ্চয়তায় কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ, তাঁরা বুঝতে পারবেন না, জমিতে আর ফসল বোনা ঠিক হবে কি না। বোনার পর যদি জমি অধিগৃহীত হয়ে যায় এই সংশয় তাড়া করবে তাঁদের।

তা ছাড়া, সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রকল্প ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমির মালিকানা সরকারের কাছেই থাকবে। সুতরাং বেসরকারি সংস্থাকে জমি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও ভিত্তিহীন। এমনকী শিল্প করিডর সরকারই গঠন করবে। সেখানে কৃষকের বাড়ির ছেলেই সসম্মানে কাজ করবে। তাঁকে মুম্বই বা দিল্লির ঝুপড়িতে গিয়ে থাকতে হবে না। বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান জমি অধিগ্রহণ করতে চাইলে আগে যে নিয়ম ছিল তাই বহাল থাকবে।

কিন্তু কংগ্রেসের পাল্টা প্রশ্ন, সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমি না হয় সরকারের কাছে থাকবে, মুনাফা কার ঘরে যাবে? তা ছাড়া শিল্প করিডরের জন্য অধিগ্রহণের পর সেই জমি তো বেসরকারি উদ্যোগপতিকেই বেচবে সরকার।

এই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি থেকে স্পষ্ট যে জমি নীতি নিয়ে দ্রুত মীমাংসা সম্ভব নয়। ২০০৬ সালে সিঙ্গুর পরবর্তী সময়েও ব্রিটিশ জমানার জমি অধিগ্রহণ আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গত ন’বছরে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছে। এবং এখনও সুনির্দিষ্ট নীতি কেন্দ্র তৈরি করতে পারেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটে সংসদের যৌথ অধিবেশনে অধ্যাদেশটি মোদী পাশ করিয়ে নিতে সফল হলেও, তা যে সব রাজ্য মেনে নেবে এমন নয়। বিজেপির শরিক দল অকালি দলই জানিয়েছে, পঞ্জাবে তারা ভিন্ন নীতি নিয়ে চলবে।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন