মন্ত্রকের দায়িত্ব, রাজনৈতিক চাপ, বিতর্কের জের— সব সামলে দিন দু’য়েকের ছু’টি কাটাতে গিয়েছিলেন গোয়ায়। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি পেলেন না কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। শুক্রবার ফ্যাব ইন্ডিয়ার এক দোকানের ‘ট্রায়াল রুমে’ ঢুকতেই তাঁর নজরে এল, গোপন ক্যামেরায় ট্রায়াল রুমের প্রতিটি মুহূর্ত ধরা পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসে স্বামী জুবিন ইরানিকে বিষয়টি জানান স্মৃতি। জুবিন কর্তৃপক্ষের কাছে ওই ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে চান। তাতেই দেখা যায়, স্মৃতির কোমর থেকে উপরের পুরো অংশের ছবি উঠেছে ক্যামেরায়। বিষয়টি নিয়ে এফআইআর রুজু করেন কালাঙ্গুটের বিজেপি বিধায়ক মাইকেল লোবো। রাতের মধ্যে ফ্যাব ইন্ডিয়ার চার কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আগামিকাল ওই সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্তাদের জেরা করা হবে।

ট্রায়াল রুমের ভিতর গোপন ক্যামেরা বসানো কিংবা ছবি তোলার প্রবণতা নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন শপিং মলে এমন একাধিক ঘটনার কথা জানা গিয়েছে। বহু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, চুরি রুখতেই ট্রায়াল রুমের ভিতর গোপন ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ দিন স্মৃতির ঘটনার পরও ফ্যাব ইন্ডিয়ার তরফে একই যুক্তি দেওয়া হয়। তাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর উইলিয়াম বিসসেল জানান, শুধু নিরাপত্তার খাতিরেই প্রথা মেনে তাদের প্রতিটি দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়ে থাকে। এবং এ পর্যন্ত ফ্যাব ইন্ডিয়ার কোনও কর্মীই বিষয়টি নিয়ে কোনও ‘অনভিপ্রেত আচরণ’ করেননি। ফ্যাব ইন্ডিয়ার এক কর্মীর বয়ানে, ‘‘অনেকেই চারটি পোশাক নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢোকেন। বেরিয়ে আসেন তিনটি নিয়ে। একটি নিজেদের জামার ভিতর লুকিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যান। গত সপ্তাহেও এমন এক রুশ পর্যটককে আমরা ধরেছি।’’ তাঁর যুক্তি, কোনও পোশাক এমন ভাবে গায়েব হয়ে গেলে তার দাম কর্মীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া হয়। সে সব রুখতেই ক্যামেরাটি বসানো হয়েছিল।

পুলিশ এ দিন যে চার কর্মীকে গ্রেফতার করেছে, তাঁদের নাম পরেশ ভগত, রাজু পয়াঞ্চে, প্রশান্ত নাইক ও করিম লখানি। পুলিশ আরও জেনেছে, মাস তিন-চারেক আগে ক্যামেরাটি বসানো হয়েছিল। যার ফুটেজ ধরা থাকত ওই পোশাক বিপণিরই ম্যানেজারের কম্পিউটারে। তাঁকে ফোন করা হলে বলেন, ‘‘আমি আজ ছুটিতে।’’ কে বা কারা ট্রায়াল রুমের বাইরে ক্যামেরাটি বসিয়েছিল, তা নিয়ে খোঁজখবর করছে পুলিশ। শুরু হয়েছে ওই কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কের তথ্য বিশ্লেষণের কাজও। তবে কংগ্রেস দাবি করেছে, এ দিনের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং এ হেন ‘ট্রায়াল রুম কেলেঙ্কারি’ গোয়ার প্রায় সর্বত্রই ঘটে, কিন্তু গোপনে। বিশেষত উপকূলবর্তী যে সব গ্রামে পর্যটকদের বেশি যাতায়াত, সেখানেই এমন ঘটনা বেশি ঘটে। কংগ্রেস মুখপাত্র দুর্গাদাস কামাতের বয়ানে, ‘‘শুধু এই পোশাক বিপণি নয়। ট্রায়াল রুম রয়েছে এমন সব বিপণিই সরেজমিনে দেখা উচিত। এক জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অন্তত কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে পারেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের সে সুযোগ থাকে না।’’

ঠিক কী হয়েছিল এ দিন?

পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার কান্দোলিম গ্রামের ওই বিপণিতে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন স্মৃতি। ক’টি পোশাক নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢোকেন। জামাকাপড় বদলাতে গিয়ে তাঁর নজর যায় ওই ক্যামেরার দিকে। ট্রায়াল রুমের বাইরে বসানো হলেও সেটির লেন্স যে ভিতরের সমস্ত কিছু নজরবন্দি করছিল, সেটা বুঝতে পেরে ছুটে বেরিয়ে আসেন স্মৃতি। জুবিনকে বিষয়টা জানান। ফোন করেন তাঁর দলেরই নেতা তথা কালাঙ্গুটের বিজেপি বিধায়ক মাইকেল লোবোকে। তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছলে ভিডিওটি দেখা হয়। তখনই নজরে আসে, কোমর থেকে উপরের অংশ ধরা পড়ছে গোপন ক্যামেরায়। লোবোর বয়ানে, ‘‘ক্যামেরাটা যখন চালু করা হল, তখন দেখা গেল গোটাটাই ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়েছে। এটা ভীষণ অন্যায়। কেউ নিশ্চয়ই রেকর্ডিংটা দেখছিল।’’ প্রকাশ্যে কোনও বিবৃতি না দিলেও শোনা যাচ্ছে, বিষয়টি নজরে আসার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেন স্মৃতি।

গোয়ার পুলিশ সুপার (উত্তর) উমেশ গায়োঙ্কর বলেন, ‘‘স্মৃতির বয়ান নেওয়া হয়েছে। আর এক মহিলা যিনি স্মৃতির আগে ওই ট্রায়াল রুমে ঢুকেছিলেন তাঁরও জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।’’ আর বিজেপির কর্মসমিতির বৈঠক উপলক্ষে বেঙ্গালুরুতে হাজির গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ্মীকান্ত পারসেকারের আশ্বাস, ‘‘কঠিন ব্যবস্থা নেব।’’ আপাতত দোকানটি সিল করা হয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪সি (লুকিয়ে দেখে আনন্দ পাওয়া) ও ৫০৯ (গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ) ধারায় মামলাও রুজু করা হয়েছে। গোয়ার বিপণিগুলোর প্রতিটি ট্রায়াল রুম যাতে এ বার খতিয়ে দেখা হয়, সেই মর্মে থানাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হবে বলে জানান উমেশ।

কিন্তু গত চার মাস ধরে যাঁদের ভিডিও উঠেছে, তাঁদের কী হবে? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, সেই ভিডিওগুলো গেল কোথায়? পুলিশের কাছে জানতে চেয়েছে গোয়ার মহিলা কমিশন। কিন্তু দেশের যে কোনও শপিং মলেই তো এমন ঘটনা ঘটতে পারে। অতীতে ঘটেছেও। এ-ও শোনা যায়, এ ধরনের ভিডিও বহু সময় পর্নোগ্রাফিক সাইটে আপলোড করা হয়। কলকাতার কিছু শপিং মলের কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, চুরি ঠেকাতে গোপন ক্যামেরার ব্যবহার দস্তুর হলেও ট্রায়াল রুমের ভিতর বা আশপাশে তা রাখা কোনও অবস্থাতেই বাঞ্ছনীয় নয়। একই মত কলকাতা পুলিশেরও। এ বার থেকে সব থানা যাতে তাদের এলাকার বিপণিগুলির ট্রায়াল রুম খতিয়ে দেখে, সে ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক শীর্ষকর্তা।