আকাশের দিকে তর্জনী। ভিড়ের হাততালি, ড্রামের আওয়াজ ছাপিয়ে গলা চড়ছে, ‘স্বতন্ত্রয়ম, জনথিপত্যম, সোশ্যালিজম জিন্দাবাদ’। শেষের জিন্দাবাদ-এর সঙ্গে আত্মবিশ্বাস, প্রত্যয়ে মুঠো হচ্ছে হাত।

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র জিন্দাবাদ নয়। বাঙালি কন্যা স্লোগান ছুড়ছেন খাঁটি মালয়ালমে। তাঁকে ঘিরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘লাল লহর’ উঠছে। একদা বাম-দুর্গ পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরের মেয়ে ঐশী ঘোষের বিশ্বাস, বাংলায় ফের বামেরা ঘুরে দাঁড়াবে। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘‘সাম্প্রদায়িক শক্তির মোকাবিলা করতে পারে একমাত্র বামপন্থীরাই। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষের সমস্যা নিয়ে, মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তা হলে বামেরা ঘুরে দাঁড়াবেই!’’

বাংলায় বামেরা ফেরে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু ঐশীর কাঁধে ভর দিয়েই বামেরা প্রকাশ কারাট-সীতারাম ইয়েচুরিদের আঁতুড় ঘর জেএনইউ-র ছাত্র সংসদ নিজেদের দখলে রাখা প্রায় নিশ্চিত করে ফেলল। দ্বিতীয় মোদী সরকারের ১০০ দিনের মাথায় একে ‘সরকারের মুখে চপেটাঘাত’ হিসেবেই দেখছেন এসএফআই-এর সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাস।

দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হয়নি। ১৭ সেপ্টেম্বরের আগে ফল ঘোষণা হচ্ছে না। কিন্তু সিংহ ভাগ ভোট গণনা হয়ে যাওয়ার পরে, জেএনইউ-এর ছাত্র সংসদের সব ক’টি আসনেই বাম ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে। সভাপতির পদে এসএফআই-এর ঐশী ঘোষ এবিভিপি-র প্রার্থীকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বার দিল্লির গদিতে ফিরলেও, খাস দিল্লির বুকে জেএনইউ-র ক্যাম্পাসের ছাত্র সংসদ এত দিন গেরুয়া বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। এ বার লোকসভা ভোটে আরও শক্তি নিয়ে বিজেপি জিতে আসায় সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি ‘বামপন্থী মুক্ত জেএনইউ’-র ডাক দেয়। তার মোকাবিলাতেই ঐশীকে সামনে রেখে জেএনইউ-তে আইসা, এসএফআই, এআইএসএফ ও ডিএসএফ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটে নামে।
ভোটগণনার গতিপ্রকৃতি বলছে, শুধু ঐশী নন, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম-সম্পাদক— তিনটি পদেও বাম ঐক্যের প্রার্থীরা এতটা ব্যবধান তৈরি করেছেন, ফল অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ময়ূখের মতে, ‘‘রোজগার নেই। নয়া শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক থেকে পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার উপরে আক্রমণ হচ্ছে। পড়ুয়ারা বুঝতে পারছেন। যেখানে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট হচ্ছে, সেখানেই এবিভিপি হারছে।’’

জেএনইউ-এ ফের লাল ঝান্ডা ওড়ালেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঐশীকে নিশানা করা শুরু হয়েছে। তাঁর একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ঐশীর ডান হাতে পাথর-সহ তাগা বাঁধা। আঙুলে লোহার আংটিও রয়েছে। ‘ট্রোল’ বাহিনীর প্রশ্ন, ইসরো-র চেয়ারম্যান চন্দ্রযান-২ রওনা হওয়ার আগে তিরুপতির মন্দিরে পুজো দিতে গেলে কমিউনিস্টরা তাঁকে আক্রমণ করেন। আর নিজেরা তাগা-তাবিজ পরেন! এসএফআই-এর নেতা ময়ূখের জবাব, ‘‘ওটা বহু পুরনো ছবি। বামপন্থী রাজনীতিতে এসে সচেতন হয়েছেন তিনি। এ সব বাদ পড়েছে।’’ প্রাক্তন ছাত্রনেতা কানাইয়া কুমার টুইট করেছেন, ‘গোলওয়ালকর, গডসে, হেডগেওয়ার, সাভারকরকে হারিয়ে ভগৎ সিংহ, আশফাক, গাঁধী ও অম্বেডকরের জয়।  প্রগতিশীল বিচারধারার জয়!’