• অতনু চন্দ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রিনি রিনি রিনচেনপং এবং সুন্দরী বোরং

1
বোরং মনাস্ট্রি

যাহ্! দু’মিনিটের মধ্যে ওয়েটিং লিস্ট ১৭৭!

একরাশ হতাশা ছড়িয়ে গেল মনে।

বেশির ভাগ স্কুলে এই সময়টায় গরমের ছুটি পড়ে যায়। কাছাকাছির তালিকায় উত্তরবঙ্গের নাম সবার উপরে। ফলে, উত্তরবঙ্গমুখী ট্রেনগুলিতে টিকিটের হাহাকার দেখা দেয়। এ সবই জানা। তাই বলে দার্জিলিং মেল দু’মিনিটে এতটা পিছিয়ে ছিটকে দেবে! ও দিকে হোটেল বুক হয়ে গিয়েছে। কী যে করি! ভাবতে ভাবতেই বাকি ট্রেনগুলির খোঁজে ফের ওয়েবসাইট হাতড়াই। কিন্তু সর্বত্রই ‘ঠাঁই নাই’ বার্তা।

শেষে অনেক খুঁজেপেতে টিকিট পাওয়া গেল পরের দিনের শতাব্দী এক্সপ্রেসে। বাধ্য হয়ে কমাতে হল বেড়ানোর জন্য বরাদ্দ কয়েকটি দিনের থেকে মহার্ঘ্য একটিকে। সবার মন খারাপ। এই ক’টা দিন তো মোটে ছুটি পাওয়া গিয়েছে! তার থেকেও একটা দিন বাদ! কী আর করার। কিন্তু, যাত্রা শুরুর এই হতাশা যে পরে একরাশ আশীর্বাদ হয়ে ঝরে পড়বে, সেটা বুঝতে পারলাম যাওয়ার সময়।

দুপুরে হাওড়া থেকে ছেড়ে ওই দিনই বেশি রাতে শতাব্দী এক্সপ্রেস গিয়ে পৌঁছয় নিউ জলপাইগুড়ি। এর আগে প্রতি বারই রাতের ট্রেনে উত্তরবঙ্গ গিয়েছি। ফলে, রাতের সেই সব সফরে কোনও বারই চোখে পড়েনি ৫৬১ কিলোমিটারের এই রেলপথে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অসংখ্য মণিমুক্ত— ছোট-বড় স্টেশন, নদী, খাল। কী অসাধারণ সব নাম তাদের। পেরিয়ে যাচ্ছি অসংখ্য ছোট-বড় নদী— বাঁশলৈ, তুতিয়ানালা, খারা, পাগলা। ফরাক্কার আদিগন্ত বিস্তৃত গঙ্গা পেরিয়ে একে একে পেরোলাম কুমারগঞ্জ, শ্রীপুর, সামসি, মালাহার-সহ নাম না জানা আরও কত স্টেশন। এ সবের মধ্যেই কখন যে ঝুপ করে সন্ধে নেমে এল, টেরই পেলাম না। অবশেষে রাত ১১টা নাগাদ ট্রেন এসে থামল নিউ জলপাইগুড়িতে। আর এ বারই প্রথম জানলাম, শিলিগুড়ি পৌঁছনোর আগে মহানন্দাকে দু’বার পার করতে হয়।

সিনসোরের ঝুলন্ত সেতু

রাত্তিরটা শিলিগুড়িতে কাটিয়ে, পরের দিন সকাল সকাল সব্বাই তৈরি হয়ে নিলাম। এ বারের ছুটিতে আমাদের গন্তব্য সিকিমের দুই পাহাড়ি গ্রাম— রিনচেনপং এবং বোরং। প্রথমে রিনচেনপং।

ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে ইদানীং রিনচেনপং পরিচিত হতে শুরু করেছে। এর কিছুটা নীচে রয়েছে পশ্চিম সিকিমের আর একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি জনপদ কালুক। রিনচেনপং থেকে কালুকের দূরত্ব মাত্র তিন কিলোমিটার। দুয়ের মধ্যে রিনচেনপং-এর জনবসতি তুলনায় কম। সবুজের ঘনত্বও বোধহয় বেশ খানিকটা বেশি। বাজার এলাকায় বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে। আমাদের থাকার জায়গা বাজার থেকে আরও এক কিলোমিটার উপরের দিকে। রিনচেনপং মনাস্ট্রির কাছে। শিলিগুড়ি থেকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে চার-পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি সফরের পরে এখানে পৌঁছে মন ও শরীর দুই-ই জুড়িয়ে যায়। এক দিকে আদিগন্ত বিস্তৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্য দিকে ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি গুম্ফায় গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ— সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ।

হোটেলটি চালান কলকাতার এক বাঙালি দম্পতি— দেবাণু এবং নন্দিনী। উত্তর কলকাতার বাসিন্দা দেবাণু কোনও এক অমোঘ টানে বছর পাঁচেক আগে স্ত্রী নন্দিনী এবং পাঁচ বছরের ছেলে দেবায়নকে নিয়ে চলে এসেছিলেন সবুজে ঘেরা এই পাহাড়ি গ্রামে। তার পর তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন অসাধারণ এই থাকার জায়গা। দু’জনে মিলে নিপুণ হাতে সামলে চলেছেন অতিথি আপ্পায়নের কাজ।

‘‘চলুন, বাজার থেকে একটু ঘুরে আসি।’’— দেবাণুর আহ্বান। ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে ৪টে। সদ্য শেষ করেছি বিকেলের চা। পাহাড়ি পথ ধরে দেবাণুর সঙ্গে গল্প করতে করতে রিনচিনপং-এর বাজার বেড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে মন চাইল না।

‘‘তুমি এখানে কেন এলে দেবাণু?’’ হাঁটতে হাঁটতে শুরু হল আমাদের আড্ডা। ‘‘৭ বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসেছিলাম কালুকে। প্রথম দেখাতেই ভালবেসে ফেলেছিলাম জায়গাটাকে। সে দিন থেকেই ভাবতে শুরু করি, এখানে চলে আসব। দু’বছর পরে সেই ভাবনার ফসল হোটেল ল্যান্ডস্কেপ। তার পর কোথা থেকে যে পাঁচটা বছর কেটে গেল, টের পেলাম না। এখন কলকাতা গেলে বেশি দিন থাকতে পারি না।’’— বেশ খানিকটা আবেগ জড়িয়ে গেল দেবাণুর গলায়। ভাবলাম, সত্যিই তো! পাহাড়ে ঘুরতে এলে এ রকমটা তো আমরা সবাই ভাবি। কিন্তু, করে দেখাতে পারি ক’জন?

আড্ডা তখন তুঙ্গে। হঠাত্ই দেবাণুর ঘোষণা, ‘‘আমাদের একটু পা চালিয়ে চলতে হবে কিন্তু! অন্ধকার হয়ে গেলে ফেরার গাড়ি পাওয়া মুশকিল হবে।’’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কেন?’’ মন তখন নতুন গল্পের সন্ধান পেয়ে গিয়েছে। দেবাণু শান্ত গলায় বললেন, ‘‘কাছেই একটা লেক আছে, নাম পয়জন। সেই লেককে ঘিরে অনেক ভৌতিক গল্প আছে। আর জানেনই তো পাহাড়ি লোকজনের ভূতের ভয় একটু বেশি! তাই সন্ধে হয়ে গেলে বেশির ভাগ গাড়ি এই রাস্তায় আসতে চায় না। তবে, আমি অনেক দিনই রাতের বেলা এই রাস্তায় ফিরেছি। কিছুই চোখে পড়েনি।’’ আমার এ দিক-ও দিক তাকানো দেখেই বোধহয় আশ্বাস দেন দেবাণু। তত ক্ষণে হাঁটার গতি বেড়ে গিয়েছে আমার। এক দমে আলোআঁধারি রাস্তা পেরিয়ে সোজা গিয়ে থামলাম বাজারের মাঝখানে সাজানো ফোয়ারার কাছে। নিজের মনেই হেসে উঠি, পাহাড়ি ভূতের গল্পে আমার ভয় পাওয়া দেখে!

দেবাণুর নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে শহুরে দমে ঘাটতির কথা এক বারের জন্যও বুঝতে পারলাম না। সঙ্গে এক আকাশ নির্মল অক্সিজেন তো ছিলই! চলতে চলতেই আলাপ হল হাসিমুখের পাহাড়ি মানুষদের সঙ্গে। মনে হল, যেন কত দিনের চেনা!

মেঘের আড়াল

সকাল বেলা নানা রকম পাখির ডাকে ঘুম থেকে উঠে একফালি কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পেলাম মেঘের ঢেউয়ের ফাঁক দিয়ে। আক্ষেপ হল না একটুও। জানলা দিয়ে মুখ বাড়াতেই দেখি পাহাড়ি ছেলেমেয়ের দল স্কুলের পথে সূর্যধোয়া একরাশ হাসি নিয়ে সুপ্রভাত জানাচ্ছে হাত নেড়ে। আগের দিনের শোনা গল্পের পাহাড় আর এই কচি কচি ঝলমলে মুখের নির্মল হাসি কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপস্থিতির দুঃখ ঘুচিয়ে দিল এক নিমেষে।

রিনচেনপংয়ের আশপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি ঘুরে দেখার জায়গা। এখান থেকে পেলিং যাওয়ার রাস্তায় পড়ে সিনসোর-এর ঝুলন্ত সেতু, হি রক গার্ডেন, ছাঙ্গে জলপ্রপাত, ছায়াতাল নামে আর একটি মায়াবী গ্রাম ইত্যাদি। হাতে সময় থাকলে পেলিং থেকে ঘুরে আসা যায়। রয়েছে দেনথাং উপত্যকা এবং অ্যালপাইন চিজ ফ্যাক্টরি। এখানে চিজ তৈরির প্রক্রিয়া দেখার পাশাপাশি টাটকা চিজ কেনাও যায়। বাজার এলাকায় পাওয়া যায় নেপালি খাবারের দোকান।

প্রতি রবিবার রিনচেনপংয়ে হাট বসে। স্থানীয় লোকজনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার হাট। ছোট্ট একটি চাতালের উপরে ভারী মজার সেই হাট। হরেক রকমের টাটকা সব্জির উজ্জ্বল রঙের সমাহার শহুরে আক্ষেপ অনেকটা বাড়িয়ে দিল। প্রকৃতির কোলে সূর্য-মেঘের আনাগোনা দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন যে হুশ করে কী ভাবে কেটে গেল, বুঝতে পারিনি। তিন দিন পরে হুঁশ ফিরল যে, আমাদেরও রিনচেনপং ছেড়ে যাওয়ার দিন এসে গিয়েছে। বেশ কষ্ট হয়েছিল। মনে মনে হিংসে হয়েছিল দেবাণু আর নন্দিনীকে। আবার ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা করে রওনা দিলাম পরবর্তী গন্তব্য ‘বোরং’-এর দিকে।

দক্ষিণ সিকিমের এক প্রত্যন্ত গ্রাম বোরং। এই অঞ্চলের এক অতি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র রাবংলা থেকে ১৮ কিলোমিটার উত্তরে বোরং-এর অবস্থান। বোরং-এ থাকার জায়গা কেবলমাত্র দু’টি। কলকাতা থেকে বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। আপাদমস্তক ঘন সবুজে ঘেরা এই গ্রামে রয়েছে শুধু হরেক রকম পাখির কলতান।

সড়কপথে রাবংলার সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা থাকলেও লোকসংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় গাড়ি চলাচল বেশ কম। ফলত পাখি এবং প্রজাপতিদের অবাধ গতিবিধির কোনই বাধা নেই এখানে।

আকাশ পরিষ্কার থাকলে মাউন্ট নরসিং এবং সংলগ্ন হিমালয়চূড়াগুলি দেখতে পাওয়া যায় এখান থেকে। আর আকাশ পরিষ্কার না থাকলে? একরাশ মেঘ কোথা থেকে এসে জড়িয়ে ধরে গোটা বোরংকে। ওই মেঘের ফাঁক থেকেই ইতিউতি উঁকি দেয় ধুপি গাছের মাথা। মনে হয় এই বুঝি আসবে পরীদের দল, উড়িয়ে নিয়ে যাবে মেঘের দেশে। অলস সকালে পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরে এলাম স্থানীয় গুম্ফায়।

দোকানপাট কম থাকায় প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ইত্যাদি সঙ্গে রাখাই ভাল। থাকার জায়গাগুলিতে সব রকম সুযোগ-সুবিধে পাওয়া যায়। গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে আসা যায় উষ্ণ প্রস্রবণ, ঝুলন্ত সেতু, পাহাড়ি  ঝর্না, রাবংলা বুদ্ধ পার্ক, চারধাম, টেমি টি গার্ডেন ইত্যাদি। হ্যান্ডমেড কাগজ তৈরির ছোট্ট কারখানা রয়েছে এই বোরং গ্রামে। স্থানীয় জঙ্গল থেকে গাছের ছাল সংগ্রহ করে নিপুণ দক্ষতায় কাগজ বানিয়ে চলেছেন গ্রামের মেয়েরা। বোরং-এ তৈরি হ্যান্ডমেড কাগজ পাড়ি দেয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের কাছে। স্থানীয় ভাবে বিক্রির ব্যবস্থাও আছে। ইচ্ছে করলে সংগ্রহ করতে পারেন এই কাগজ এবং এর থেকে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী।

সব ভাল যেমন এক সময়ে শেষ হয়ে যায়, আমাদের সবুজঘেরা দিনগুলোও শেষ হল সময়েরই নিয়মে। ফেরার দিন দেখলাম দূর পাহাড়ের কোলে ঘন মেঘ জমেছে, আমাদের মনের মেঘের মতোই।

সে মেঘের পালকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, আবার ফিরব এখানে!

 

রিনচেনপং এবং বোরংয়ের আরও ছবি এই গ্যালারিতে।

 

ছবি: লেখক।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন