বরফ এক বড় সমস্যা। রাস্তাঘাট অচল, গাড়ি নড়ে না, প্লেন ওড়ে না। সাদা আস্তরণে ঢেকে যায় দশ দিক। গৃহবন্দি হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।   

এ সমস্যা নিরসনে পথ দেখিয়েছেন তিন বিজ্ঞানী, যাঁদের দু’জন ভারতীয়, এক জন আবার এই কলকাতার এক বাঙালি সন্তান। ওঁদের পেপার সদ্য বেরিয়েছে ‘অ্যাডভান্সড মেটিরিয়াল্‌স’ জার্নালে। রুক্মাভ চট্টোপাধ্যায়, সুশান্ত আনন্দ এবং ড্যানিয়েল বেসেন্স-এর লেখা পেপারে দাওয়াই বাতলানো হয়েছে বরফের চাদরে পথঘাট, গাড়িঘোড়া এবং যন্ত্রপাতি ঢেকে যাওয়ার বিরুদ্ধে।

কি দাওয়াই? 

যেখানে বরফ জমার আশঙ্কা, সেখানে প্রলেপ দিতে হবে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ফেজ়-সুইচিং লিকুইড (পিএসএল)-এর। সাইক্লোহেক্সেন, সাইক্লোঅক্টেন, ডাইমিথাইল সাল্ফোক্সাইড, গ্লিসারল প্রভৃতি হল পিএসএল। 

কীভাবে বরফ জমা আটকায় পিএসএল? ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিকাগো কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং পিএইচডি গবেষক রুক্মাভ বললেন, ‘‘পিএসএলগুলোর গলনাঙ্ক জলের হিমাঙ্ক বা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটু উপরে। সুতরাং, জল যখন তরল থেকে বরফে রূপান্তরিত হয় তখনও পিএসএলগুলো থাকে কঠিন অবস্থায়। যে তলের উপর বরফ জমবে— পথঘাট, জানলার কাচ অথবা বিমানের প্রপেলার— উপর তরল পিএসএল স্প্রে করে দিন, ওগুলো কঠিন এক আস্তরণ তৈরি করবে। এ বার ধরুন উষ্ণতা নেমে এল মাইনাসে। তখন জলকণা জমে জমে বরফ হওয়ার দিকে এগোবে। জলকে বরফ হতে গেলে ছাড়তে হয় তাপ (লীন তাপ)। জল ওই তাপ ছাড়ামাত্র তা শুষে নেবে পিএসএল, যার এ বার কঠিন থেকে তরল হওয়ার পালা।’’

ওঁদের পেপারে রুক্মাভ, সুশান্ত এবং ড্যানিয়েল বলেছেন, এখন যে সব পদার্থ দিয়ে বরফ জমা ঠেকানোর চেষ্টা করা হয় পিএসএল প্রলেপ তাদের চেয়ে তিনশো গুণ বেশি ক্ষমতাবান। বরফ ঠেকাতে চালু পদার্থগুলো এখন যে কোনও তলে বারবার লাগাতে হয়, ওই তিন বিজ্ঞানীর আবিষ্কৃত পিএসএল ব্যবহারে সে ঝামেলা নেই। একবার প্রলেপ দিলে জলের লীন তাপ শুষে পিএসএল তরল প্রলেপে পরিণত হয়ে টিকে থাকে দিনের পর দিন। 

‘‘পিএসএল-এর তাপ শুষে নেওয়ার ক্ষমতা ভীষণ উপকারী,’’ বললেন রুক্মাভ, ‘‘ধরুন, জলকণা জমে তুষার বা বরফ হতে চাইছে। তা হতে গেলে উষ্ণতা কমা চাই। এই লক্ষ্যে জলকণা পাবে এক আপত্তিকর পরিবেশ। নীচেই বসে আছে পিএসএল আস্তরণ, যার তাপমাত্রা মোটেই শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস নয়। জলকণার বরফ হওয়া আটকে গেল। পরিবেশ আপত্তিকর আরও একটা কারণে। জলকণা বরফ হয় কোনও কিছুকে ঘিরে। পিএসএল আস্তরণ তো মোটামুটি মসৃণ, কাকে ঘিরে জল জমবে?’’ 

কয়েক দশক আগে ড্যানিয়েল গবেষণা করতেন ইউনিভার্সিত দ্য রিসার্স প্যারি সায়েন্সস-এ। তিনিও গবেষণা করতেন পিএসএল নিয়ে। লক্ষ্য করেছিলেন এক বিচিত্র ক্রিয়া। দেখেছিলেন, সাইক্লোহেক্সেনের মতো পিএসএলগুলোকে হিমাঙ্কের নীচে নামিয়ে আনলে তার উপরে জলবিন্দু বরফ হওয়ার সময়ে 

এ দিক-ও দিক ছোটাছুটি করে। সুশান্ত এবং রুক্মাভ ড্যানিয়েলের ওই আবিষ্কার নিয়ে গবেষণায় নামেন। ওঁরা ভেবেছিলেন খুব ঠান্ডায় (মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে) জলবিন্দুর ওই ছোটাছুটি থেমে যাবে। তা হল না। তার মানেই বরফ জমার কাজে বাধা। 

রুক্মাভ বললেন, ‘‘আমরা প্রথমে পিএসএল-এর ৩ মিলিমিটার পুরু প্রলেপ দিয়ে পরীক্ষা শুরু করেছিলাম। তাতে ফল ভালই। 

তার পরে ফিল্মের মতো পাতলা প্রলেপ দিয়েও দেখেছি, পিএসএল-এর ক্ষমতা কমেনি। সুতরাং,  পিএসএল আমরা মাখিয়ে দিতে পারি গাড়ির উইন্ডশিল্ডে অথবা বিমানের টারবাইন পাখনায়। প্রলেপ দেওয়ার ফলে ওদের কার্যক্ষমতা কিছুই কমবে না। 

জানেন তো, বরফ জমার ফলে যন্ত্রের কর্মক্ষমতা কমায় শীত প্রধান দেশে ক্ষতি হয় কোটি কোটি ডলারের। পিএসএল প্রলেপ কিন্তু স্বচ্ছ। গাড়ির বা জানলার কাচে লাগালে আপনি বাইরেটা দেখতে পাবেন হুবহু।’’