সূর্য থেকে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা ‘রাক্ষস-খোক্কস’দের এ বার অনেক আগে থেকেই ঠাওর করা যাবে। তাদের এড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে অনেক আগে।এই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এল কলকাতার একদল বিজ্ঞানীর হাত ধরে।

কারা এই ‘রাক্ষস-খোক্কস’?

সৌরঝড় (সোলার স্টর্ম), সৌরবায়ু (সোলার উইন্ড) আর অসম্ভব শক্তিশালী সৌরকণা (সোলার পার্টিকল)-রা।

১০০ কোটি বা তারও অনেক বেশি পরমাণু বোমা এক সঙ্গে ফাটলে যে পরিমাণ শক্তির জন্ম হয়, এরা ততটাই শক্তিশালী। এদের বলে- ‘করোনাল মাস ইজেকশন’। এরা প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটাতে পারে। এদের নিয়েই আমাদের ভয় সবচেয়ে বেশি। এদের গতিবিধি যত আগে জানা তাবে, তত আগে থেকে নেওয়া যাবে সতর্কতা।

এই সৌরঝঞ্ঝারা যদি বিনা বাধায় সরাসরি পৃথিবীর পিঠে আছড়ে পড়তে পারত, তা হলে এখানে প্রাণের অস্তিত্বই থাকত না। তা হয়নি, কারণ এই বিপদকে আটকে দেয় পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডল (ম্যাগনেটোস্ফিয়ার)। এটাই আমাদের গ্রহের বর্ম হিসেবে কাজ করে। হানাদার সৌরঝড়, সৌরবায়ু আর সৌরকণারা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়তে চাইলে চৌম্বকমণ্ডলের সঙ্গে তাদের তুমুল লড়াই হয়। আর সেটা পৃথিবীর দুই মেরুতেই সবচেয়ে বেশি হয় বলে আমরা আলো ঝলসে উঠতে দেখি। যাকে বলি অরোরা বা মেরুজ্যোতি।

কিন্তু চৌম্বকমণ্ডলও সবটা আটকে দিতে পারে, এমন নয়। তীব্র ধাক্কাধাক্কির পর ফাঁক গলে কিছু ঝড়ঝাপ্টা ঢুকে পড়ে আয়নোস্ফিয়ারে। সেই টুকুর বিপদও কিন্তু খুব কম নয়। তেমন ভাবে বাগে পেলে, এরা আমাদের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। মেরুর উপর দিয়ে অনেক বেশি উচ্চতায় উড়ে যাওয়া বিমান যদি ‘উন্মত্ত’ সৌরঝড়ের মুখোমুখি হয়, তা হলে তা বিমানের সেন্সরগুলিকে অকেজো করে দিতে পারে। কেটে দিতে পারে গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের সঙ্গে বিমানের যাবতীয় যোগাযোগ। অনেকটা যেন সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া কোনও নৌকা! তার ফলে দিশাহীন হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে বিমান। অচল করে দিতে পারে বা পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে পৃথিবীর কক্ষপথগুলিতে পাক মারা হাজার হাজার কৃত্রিম স্যাটেলাইটকেও। আমূল বদলে দিতে পারে আমাদের মহাকাশের আবহাওয়া (স্পেস ওয়েদার)-টাই।

যে ভাবে তৈরি হয় সৌর কলঙ্ক আর সৌরঝড়। দেখুন নাসার ভিডিও।

আরও পড়ুন- বৃহস্পতির চাঁদে প্রাণ আছে? বাঙালির চোখে খুঁজে দেখবে নাসা​

সূর্যের বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে বাইরের স্তর বা করোনা থেকে আচমকা ধেয়ে আসা এই সব বিপদকে অনেকটা আগেভাগে জেনে ফেলার, তাদের হাতে কী কী ‘অস্ত্র’ রয়েছে, তা চিনে ফেলার একটি অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছেন ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (আইসার)-এর কলকাতা শাখার একদল বিজ্ঞানী। যার নেতৃত্বে রয়েছেন সৌরপদার্থবিজ্ঞানী দিব্যেন্দু নন্দী।

কোথায় এই গবেষণার কৃতিত্ব?

উত্তর ২৪ পরগনার মোহনপুরে, ‘আইসার-কলকাতা’র সৌরপদার্থবিজ্ঞানী দিব্যেন্দুর নেতৃত্বে ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ইন স্পেস সায়েন্সেস ইন্ডিয়া’ (সেসি)-র ৬ সদস্যের গবেষকদল কাজ করেছেন এটা নিয়ে। গত ২৪ জানুয়ারি দিব্যেন্দু ও তাঁর সহযোগীদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পত্রিকা ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ। গবেষকদলে দিব্যেন্দু ছাড়া রয়েছেন তাঁর ছাত্রছাত্রী প্রান্তিকা ভৌমিক, সুমন পান্ডা, রাজসিক তরফদার ও সৌম্যরঞ্জন দাস। রয়েছেন দিব্যেন্দুর এক সময়ের ছাত্র, এই মুহূর্তে ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যান্টনি ইয়েটসও।

এই গবেষকদের কৃতিত্ব হল- তাঁদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে, এ বার এক থেকে দু’মাস আগেই জানা যাবে সূর্যের করোনার কোন অংশ থেকে কতটা শক্তিশালী সৌরবায়ু ও সৌরকণারা ছুটে আসছে পৃথিবীর দিকে। বলে দেওয়া যাবে তারা কখন এসে আছড়ে পড়বে আমাদের গ্রহের ‘বর্ম’ ম্যাগনেটোস্ফিয়ারের উপর। এখন যার পূর্বাভাস দেওয়া যায় বড়জোর ৪/৫ দিন আগে। আগেভাগে জানতে পারার সুবিধে হল— আগে থেকে নিয়ে ফেলা যাবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

সূর্যের করোনা থেকে ছুটে আসা সৌরবিপদকে জানা কিন্তু সহজ নয়। কেন?

সূর্যের পিঠ (সারফেস) আর তার বায়ুমণ্ডলের একেবারে উপরের স্তরের (করোনা) মধ্যে বিস্তর ফারাক। সূর্যের পিঠের তাপমাত্রা ৬ হাজার ডিগ্রি কেলভিনের মতো। আর করোনার তাপমাত্রা কোথাও কোথাও ১০ লক্ষ ডিগ্রি কেলভিন। কোথাও বা তারও অনেক বেশি।

করোনার আলো জোরালো হয় না কেন?

সূর্যের পিঠ আর তার লাগোয়া এলাকায় গ্যাসের ঘনত্বও খুব বেশি। করোনার গ্যাসের ঘনত্ব তার চেয়ে অনেক গুণ কম।

তাই সূর্যের পিঠ থেকে বেরিয়ে আসা আলো যতটা জোরালো হয়, করোনার আলো ততটা জোরালো হয় না। সূর্যের পিঠ থেকে বেরনো জোরালো আলোয় ঢাকা পড়ে যায় করোনার আলো। আমাদের চোখ এমনই ধাঁধিয়ে দেয় যে, করোনাকে আমরা দেখতেই পাই না।

১ ডিগ্রি কেলভিন তাপমাত্রা বলতে বোঝায় মাইনাস ২৭২.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা মাইনাস ৪৫৭.৮৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট

করোনাকে ভাল ভাবে দেখার দরকার হয় কেন?

কিন্তু করোনা থেকেই তো বেরিয়ে আসছে সৌরঝড়, সৌরবায়ু, সৌরকণারা। আমাদের বিপদ-আপদের কারণ তো তারাই। তাই তাদের গতিবিধি, চালচলন, মতিগতি অনেক আগেভাগে জানতে পারলে তাদের এড়ানোর জন্য আমরা প্রস্তুতি নিতে পারি। তার জন্যই করোনাকে ভাল ভাবে দেখা, জানার প্রয়োজন হয়ে পড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের।

আরও পড়ুন- যুগান্তকারী আবিষ্কার, নিউট্রন তারার ধাক্কার ঢেউ দেখা গেল প্রথম

কী ভাবে দেখা যায় করোনাকে?

করোনাকে ভাল ভাবে দেখতে হলে সূর্যের পিঠ থেকে ঠিকরে বেরনো আলোকে ঢাকা-চাপা দিতে হবে। সেই ঢাকা-চাপা দেওয়ার কাজটা হয় মূলত দু’ভাবে।

একটা প্রাকৃতিক উপায়। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় যখন চাঁদ পুরোপুরি ঢেকে ফেলে সূর্যের পিঠটাকে। তখনই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে করোনা।

দ্বিতীয়টি কৃত্রিম উপায়। টেলিস্কোপেই থাকে করোনাগ্রাফ নামে একটা যন্ত্র। তাতে থাকে একটা চাকতি। যার নাম- ‘ওকাল্টিং ডিস্ক’। করোনাকে ভাল ভাবে দেখার জন্য সেই চাকতি দিয়েও সূর্যের পিঠ থেকে বেরনো জোরালো আলো ঢাকা দেওয়া যায়। কৃত্রিম উপায়ে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইসরো’ ২০২০ সালে দেশের প্রথম সূর্য অভিযানে পাঠাবে যে ‘আদিত্য এল-ওয়ান’ মহাকাশযানকে, তাতে থাকবে এমনই একটি করোনাগ্রাফ। আলোচ্য গবেষকদলের প্রধান দিব্যেন্দু নন্দী এই সূর্য অভিযানের কো-ইনভেস্টিগেটরও বটে।

এই মডেল দেশের প্রথম সূর্য অভিযান ‘আদিত্য-এল-ওয়ান’-এও কাজে লাগবে: দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

বেঙ্গালুরুর ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’ (আইআইএপি)-এর অধ্যাপক ও ‘আদিত্য-এল-ওয়ান’ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, দিব্যেন্দুদের মডেল আর করোনাগ্রাফের সাহায্যে যে ছবি পাওয়া যাবে, তাতে সূর্য থেকে সৌরকণারা কখন ম্যাগনেটোস্ফিয়ারে এসে আছড়ে পড়তে পারে, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আরও সঠিক তথ্য দিতে পারবেন। স্পেস ওয়েদার ভাল ভাবে বুঝতে হলে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ এবং এই ধরনের তাত্ত্বিক মডেল (দিব্যেন্দুদের মডেলের মতো) দু’টিই খুব জরুরি। ‘আদিত্য-এল-ওয়ান’ মহাকাশযানে যে করোনাগ্রাফটি থাকছে, তার পর্যবেক্ষণগুলিকে সম্পূর্ণ ভাবে বুঝতে ‘সেসি’র এই ধরনের তাত্ত্বিক কম্পিউটার মডেলগুলি থুবই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। 

করোনায় কী কী নজরে রাখা জরুরি?

করোনা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা ভয়ঙ্কর হানাদারদের আচার, আচরণ, শক্তি-সামর্থ ঠিকঠাক ভাবে বুঝতে হলে করোনার চৌম্বক ক্ষেত্রগুলিকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাবে জানা ও বোঝার দরকার হয়। সেই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি দেখতে কেমন, তার উপরেই নির্ভর করে সৌরঝড়, সৌরবায়ু ও সৌরকণাদের আচার, আচরণ, শক্তি-সামর্থ।

সৌরঝড়, সৌরবায়ু ও সৌরকণারা হয় সৌরমণ্ডলের শেষ প্রান্তে পৌঁছে আন্তর্নক্ষত্র মাধ্যম (ইন্টারস্টেলার মিডিয়াম)-এ মিশে যায়। না হলে তারা পৃথিবী বা অন্য গ্রহগুলির দিকে ছুটে আসে। যারা পৃথিবীর দিকে আসে তাদের নিয়েই আমাদের যত ভাবনা।

সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি ছড়িয়ে পড়ে কী ভাবে?

সূর্যের পিঠের নীচে বা সূর্যের ভিতরে তৈরি হয় সেই অসম্ভব শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি। তাদের জন্যই তৈরি হয় সৌর কলঙ্ক বা সান স্পট। তার পর সেই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি ছড়াতে ছড়াতে করোনায় পৌঁছে যায়।

এই গবেষকরা এমন একটি কম্পিউটার মডেল বানিয়েছেন, যার সাহায্যে করোনায় ছড়িয়ে পড়া চৌম্বক ক্ষেত্রগুলির চেহারা আগেভাগে জানা যাবে।

দিব্যেন্দুরা বুঝতে পেরেছেন, সূর্যের পিঠে বয়ে চলা প্লাজমা স্রোতই (ইলেকট্রন ও আয়নের স্রোত) করোনার চৌম্বক ক্ষেত্রগুলির চেহারা কী হবে, তা কয়েক মাস আগেই ঠিক করে দেয়।

করোনার চৌম্বক ক্ষেত্র দেখতে কেমন হয়? গবেষকদের কম্পিউটার মডেলের সিম্যুলেশন 

ভারতে প্রথম, বিশ্বে দ্বিতীয় এই মডেল: দিব্যেন্দু নন্দী

দিব্যেন্দুর কথায়, ‘‘করোনার চৌম্বক ক্ষেত্রগুলির চেহারার মডেল এর আগে বিশ্বে তৈরি করতে পেরেছিল একটি মাত্র সংগঠন। মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সেই সংগঠনের নাম ‘প্রেডিক্টিভ সায়েন্সেস ইঙ্ক’। কিন্তু তাদের পদ্ধতিতে মাত্র ৪/৫ দিন আগে করোনার চেহারা জানা যেত। আমাদের পদ্ধতিতে সেই খবর এক থেকে দু’মাস আগেই পাওয়া যাবে। এই ধরনের পদ্ধতি ভারতে প্রথম তো বটেই, ‘প্রেডিক্টিভ সায়েন্সেস’-এর পর বিশ্বে দ্বিতীয়।’’

দিব্যেন্দুর মডেল সঠিক, প্রমাণ হল কী ভাবে?

গত বছরের ২১ অগস্টে। আমেরিকার পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সে দিন দেখা গিয়েছিল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। চাঁদ পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছিল সূর্যকে। তার ফলে, প্রাকৃতিক উপায়েই দেখা গিয়েছিল সূর্যের করোনা থেকে বেরিয়ে আসা আলো এবং তার চৌম্বক ক্ষেত্রগুলির চেহারা।

এই মডেলকে স্বাগত জানাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানীরা

(বাঁ দিক থেকে) সোমক রায়চৌধুরী, দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিতা শ্রীবাস্তব, সৌরভ পাল ও দুর্গেশ ত্রিপাঠি

করোনার চেহারা যেমন হতে পারে বা যেমন হওয়া উচিত বলে দিব্যেন্দুদের মডেল পূর্বাভাস দিয়েছিল, গত ২১ অগস্টের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় দেখা গিয়েছিল, করোনার চেহারা প্রায় একই রকম। গবেষকরা যেমন বলেছেন, করোনার চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি ঠিক সেই রকমই হয়। চেহারায়, চরিত্রে।

এই মডেল ব্রহ্মাণ্ডকে আরও ভাল ভাবে বুঝতে সাহায্য করবে: সোমক রায়চৌধুরী

পুণের ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (‘আয়ুকা’)-র অধিকর্তা, দেশের বিশিষ্ট মহাকাশ বিজ্ঞানী সোমক রায়চৌধুরী বলছেন, ‘‘সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রের চেহারা বোঝাটা খুব কঠিন। এখানেই দিব্যেন্দুদের কৃতিত্ব। ওঁদের কাজ সূর্যের মতো অন্য নক্ষত্রদের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলিকে বুঝতে আমাদের পথ দেখাতে পারে। ব্রহ্মাণ্ডকে বুঝতে আমাদের আরও বেশি সাহায্য করতে পারে।’’

খুব শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের দরকার হবে না: নন্দিতা শ্রীবাস্তব ও দুর্গেশ ত্রিপাঠি

অমদাবাদের ‘ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ (পিআরএল)-র অধীনে থাকা উদয়পুর সোলার অবজারভেটরি (ইউএসও)-র প্রধান নন্দিতা শ্রীবাস্তব বলছেন, ‘‘দিব্যেন্দুদের মডেলটি সত্যিই অভিনব। কারণ, খুব শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার ব্যবহার না করেও, এ বার এক মাস আগে করোনার চৌম্বক ক্ষেত্রের চেহারার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।’’

পুণের ‘আয়ুকা’র অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর দুর্গেশ ত্রিপাঠির বক্তব্য, সূর্যগ্রহণের পূর্বাভাস দেওয়া শুধু জটিলই নয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণও বটে। এই গবেষণা সেই কাজটাকে অনেকটাই সহজ করে দিল।

এই গবেষণার স্পনসর কারা?

‘আইসার’ কলকাতার অধিকর্তা সৌরভ পাল বলছেন, ‘‘অর্থ বরাদ্দ করেছিল কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক, ইউজিসি-সিএসআইআর এবং ইন্দো-ফ্রেঞ্চ সেন্টার ফর প্রোমোশন অফ অ্যাডভান্সড রিসার্চ।’’

নতুন পদ্ধতিতে কোন কোন জরুরি তথ্য অনেক আগেভাগে জানা যাবে?

দিব্যেন্দু বলছেন, ‘‘মূলত, তিনটি জিনিস জানা যাবে। এক, সূর্যের করোনার চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি কী ধরনের। দুই, সেগুলি কতটা শক্তিশালী বা সেগুলি আমাদের পক্ষে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তিন, কতটা জোরে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে পারে সৌরবায়ু, সৌরকণারা।’’

সুমন পান্ডা, প্রান্তিকা ভৌমিক (বাঁ দিক থেকে), রাজসিক তরফদার ও সৌম্যরঞ্জন দাস। মধ্যমণি দিব্যেন্দু নন্দী।

সূর্যের পিঠ থেকে চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি কী ভাবে বেরিয়ে আসছে, ছড়িয়ে পড়ছে, নতুন পদ্ধতিতে সেটাও জানার চেষ্টা করছেন বলে দাবি গবেষকদের।

দিব্যেন্দুর কথায়, ‘‘সেটা করা সম্ভব হলে ওই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি (সূর্যের ভিতরে যাদের জন্ম) থেকে পৃথিবীর বিপদের সম্ভাবনা কতটা, তারও পূর্বাভাস অনেক আগেই দেওয়া যাবে।’’

এই মডেল কাজে লাগবে প্রতিরক্ষায়, টেলিযোগাযোগের নিরাপত্তায়: সৌরভ পাল

‘আইসার-কলকাতা’র অধিকর্তা বলছেন, ‘‘প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র সহ গোটা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এই গবেষণা খুবই কাজে লাগবে। উপগ্রহগুলির নিরাপত্তার জন্য অনেক আগে ব্যবস্থা নিতে পারবে ইসরো, নাসা, এসা-র মতো মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলি। এই গবেষণা স্পেস ওয়েদারের পূর্বাভাসেও কাজে লাগবে।’’

তমসো মা জ্যোতির্গময়...

এই গবেষণা আলোয় উজ্জ্বল করে তুলল সূর্যের করোনাকে। তার ‘অন্ধকারের রহস্য’ ভেদের ‘আলো’ দেখাল।

‘সূর্যসন্ধানী’ দিব্যেন্দু ও তাঁর সহযোগীদের মডেলে যেন ধ্বনিত হল সেই মন্ত্রই, ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়...’।

গ্রাফিক্স: শৌভিক দেবনাথ

ছবি ও ভিডিও সৌজন্যে: ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ইন স্পেস সায়েন্সেস ইন্ডিয়া’ (সেসি), ‘আইসার’-কলকাতা ও নাসা

গ্রাফিক্স তথ্য সৌজন্যে: অধ্যাপক দিব্যেন্দু নন্দী