একটা-দু’টো নয়। হাজার হাজার ‘রাক্ষস’ রয়েছে এই ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের ঠিকানা ‘মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি’র ঠিক মাঝখানে। সংখ্যায় যারা কম করে ১০ থেকে ২০ হাজার। ওই ‘রাক্ষস’রা রয়েছে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির ঠিক মাঝখানে। তারা ঘুরপাক খাচ্ছে মিল্কি ওয়ের ঠিক মাঝখানে থাকা একটা প্রকাণ্ড ‘রাক্ষস’-এর আশপাশে।

সেই ‘রাক্ষস’রা আসলে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। যা পায় তা-ই গিয়ে খায়। এমনকী, গপগপ করে গিলে খায় আলোও। আলো তার জোরালো অভিকর্ষ বলের ‘বাঁধন’ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারে না বলেই ওই ‘রাক্ষস’দের আমরা কালো দেখি। তাদের অন্দরে সব কিছু ঢুকে আর বেরিয়ে আসতে পারে না বলে তাদের বলি গহ্বর।

ওই হাজার হাজার ‘রাক্ষস’ ভরে কিন্তু খুব সামান্য নয়। আমাদের সূর্যের চেয়ে অন্তত ১০ থেকে ২৫ গুণ ভারী। আর তারা সবাই রয়েছে মিল্কি ওয়ের ঠিক মাঝখানে থাকা প্রকাণ্ড ‘রাক্ষস’ একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের আশপাশেই। যার নাম- ‘স্যাজিটারিয়াস-এ-স্টার’। সেই সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলটি আমাদের সূর্যের চেয়ে অন্তত ১০ লক্ষ গুণ ভারী।

নাসার ‘চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি’-র ১২ বছরের তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে ও অঙ্ক কষে ওই হাজার হাজার ‘রাক্ষস’দের সন্ধান পেয়েছে সম্প্রতি আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষকদল। যার নেতৃত্বে রয়েছেন বিশিষ্ট জ্যোতির্পদার্থবিদ চাক হেইলি। বুধবার তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘নেচার’-এ।

আরও পড়ুন- যুগান্তকারী আবিষ্কার, নিউট্রন তারার ধাক্কার ঢেউ দেখা গেল প্রথম​

আরও পড়ুন- সত্যিই টেলিস্কোপে ধরা দিল ব্ল্যাক হোল? বিজ্ঞানী মহলে উত্তেজনা তুঙ্গে​

আমাদের ছায়াপথ (গ্যালাক্সি)-এর ঠিক মাঝখানে থাকা সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলটির আশপাশে যে আরও অনেক ছোটখাটো কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে, ১৯৯৩ সালে তার প্রথম পূর্বাভাস দিয়েছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্ক মরিস। কিন্তু সরাসরি বা পরোক্ষে তা প্রমাণ করা সম্ভব হচ্ছিল না এত দিন। এই প্রথম অঙ্ক কষে ওই ‘রাক্ষস’দের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হল।

কী ভাবে জন্ম হল ওই ছোটখাটো হাজার হাজার ব্ল্যাক হোলের?

মূল গবেষক চাক হেইলি তাঁদের গবেষণাপত্রে লিখেছেন, আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির ঠিক মাঝখানে যে সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলটি রয়েছে, তার আশপাশে গ্যাস ও ধুলোবালির অত্যন্ত পুরু মেঘ রয়েছে। আমাদের সূর্যের মতো তারারা জন্মেছিল যে ভাবে, ঠিক সেই ভাবেই ওই পুরু গ্যাস ও ধুলোবালির মেঘ থেকে জন্ম হয়েছিল আরও হাজার হাজার তারাদের। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর সেই তারারাই হয়ে উঠেছিল এক-একটা ছোটখাটো ব্ল্যাক হোল।

ওই ছোটখাটো ব্ল্যাক হোলগুলি কি একা একা রয়েছে?

গবেষকরা জানিয়েছেন, না, ওই ‘রাক্ষস’রা কেউই একা নেই আমাদের ছায়াপথের ঠিক মাঝখানে। তারা প্রত্যেকেই রয়েছে একটা করে তারার সঙ্গে। জোড় বেঁধে। যাকে বলে- ‘বাইনারি সিস্টেম’। যার মানে, যার মানে, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে রয়েছে একটা করে তারা বা নক্ষত্র। যেখানে ওই তারা পাক মারছে তার সঙ্গে থাকা কৃষ্ণগহ্বরটাকে আর সেই কৃষ্ণগহ্বরটাও পাক মারছে সঙ্গে থাকা তারাটিকে।

কী পরিণতি হতে পারে ওই সব ছোটখাটো ব্ল্যাক হোলগুলির?

কলকাতার ‘সত্যেন্দ্রনাথ বোস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্সেস’-এর সিনিয়র প্রফেসর বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী বলছেন, ভয়াবহ পরিণতি হবে এক দিন। তবে অনেক লক্ষ কোটি বছর পর। কারণ, তারাগুলির প্রত্যেকটিরই জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এক দিন সেগুলি একটা করে ব্ল্যাক হোল হয়ে যাবে। তখন একটা ব্ল্যাক হোল আরেকটা ব্ল্যাক হোলকে ঘিরে পাক মারতে মারতে একে অন্যের কাছে এগিয়ে আসবে। তার পর একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাবে। আর সেই সময়েই প্রচণ্ড কম্পন হবে। যার ফলে তার আশপাশের এলাকার জ্যামিতি ভেঙেচুরে যাবে। পুকুরে বড় ঢিল ফেললে যেমন জলের মধ্যে তীব্র আলোড়ন হয়, ঠিক তেমনই আলোড়ন হবে ব্রহ্মাণ্ডে। তবে তার অনেক দেরি রয়েছে।

এত কাছে থাকা হাজার হাজার ব্ল্যাক হোলের হদিশ পেতে এত দেরি হল কেন?

সন্দীপ বলছেন, বহু দূরের ব্ল্যাক হোলগুলির হদিশ পাওয়া সম্ভব হয়েছিল তারা এক্স-রে বিকিরণ করেছিল বলে। ওই এক্স-রে তখনই বেরিয়ে আসে, যখন কোনও তারার দেহাংশ ছিটকে এসে পড়তে শুরু করে ব্ল্যাক হোলের আশপাশে (যার নাম- ‘অ্যাক্রিশন ডিস্ক’)। কিন্তু মিল্কি ওয়ের ঠিক মাঝখানে সদ্য হদিশ মেলা এই ছোটখাটো ব্ল্যাক হোলগুলির প্রত্যেকটির সঙ্গে যে একটি করে তারা রয়েছে, তাদের এখনও খেতে শুরু করেনি ব্ল্যাক হোলগুলি। ফলে, এক্স-রেও বেরিয়ে আসছে না সেগুলি থেকে। তাই তাদের হদিশ পেতে এত দেরি হল।

মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে সেই প্রকাণ্ড সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল ‘স্যাজিটারিয়াস- এ-স্টার’ রয়েছে যেখানে।

যদিও গবেষকরা খুব দুর্বল এক্স-রে বেরিয়ে আসতে দেখেছেন এই ব্ল্যাক হোলগুলি থেকে।

সন্দীপবাবুর মতে, হতে পারে আশপাশে থাকা ধুলোবালির যেটুকু খাচ্ছে ওই ব্ল্যাক হোলগুলি, তার জন্যই বেরিয়ে আসছে খুব দুর্বল ওই এক্স-রে।

তবে কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’-এর অ্যাকাডেমিক ডিন বিশিষ্ট জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী সৌমিত্র সেনগুপ্ত বলছেন, ‘‘এটা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কিন্তু ওই হাজার হাজার ছোটখাটো ব্ল্যাক হোলগুলি সত্যি-সত্যিই স্টেব্‌ল (স্থায়ী) অবস্থায় রয়েছে কি না, সে ব্যাপারে আরও সুনিশ্চিত হতে হবে। আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে আও অনেক দিন ধরে ওই ব্ল্যাক হোলগুলিকে পর্যবেক্ষণ করাও খুব জরুরি।’’      

এই ব্ল্যাক হোলগুলি বড্ড গোলমাল বাধাচ্ছে...

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এরা খুব গোলমাল বাধাচ্ছে। এরা থাকার ফলে ব্রহ্মাণ্ডের স্থান-কাল (স্পেস-টাইম) ভেঙেচুরে যাচ্ছে। তার ফলে দূরের ব্ল্যাক হোলগুলির পাঠানো ‘সিগন্যাল’ চিনতে মুশকিল হচ্ছে।

সন্দীপ বললেন, ‘‘অনেকটা যেন সেই মাছের বাজারের মতো। যার ঝাঁকায় ভাল ইলিশ আছে, তার গলা ভাল ভাবে শোনাই যাচ্ছে না। গোটা মাছের বাজারে তুমুল হইচই হচ্ছে বলে। যাদের হইচইয়ে তা ঢেকে যাচ্ছে, ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের ঠিকানা মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে এ বার তাদেরই খোঁজ মিলল। হদিশ পাওয়া গেল আমাদের ছায়াপথের ঠিক মাঝখানে থাকা সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের আশপাশের হাজার হাজার ছোটখাটো ব্ল্যাক হোলের।’’