এক লাফে একেবারে দু’ধাপ এগোনো!

বৃহস্পতিবার অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায় সতীশ ধবন মহাকাশ কেন্দ্র থেকে জিস্যাট-৬ কৃত্রিম উপগ্রহের সফল উৎক্ষেপণের পরে এমনটাই দাবি করছেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)-র কর্তারা। দু’টি ধাপ এই রকম:

ইসরো-কর্তারা বলছেন, এই উপগ্রহের সাহায্যে দেশে মোবাইল প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা যাবে। তার সুফল সাধারণ মানুষ তো পাবেনই। তা ব্যাপক ভাবে কাজে লাগবে দেশের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বাহিনীর। আমজনতা থেকে শুরু করে ফৌজ পর্যন্ত সকলের কাজে লাগতে পারাটাই অগ্রগতির প্রথম ধাপ।

প্রাত্যহিক উপযোগিতার সঙ্গে সঙ্গে অন্তত এক ধাপ এগোনো গিয়েছে প্রযুক্তির সিঁড়ি ব্যবহারেও। যে-প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপগ্রহটিকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে, সেটি এর আগে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি ওই উপগ্রহ এ দিন উৎক্ষেপণ প্রযুক্তিতেও তাদের মুকুটে নতুন পালক জুড়ে দিয়েছে বলে ইসরো-র দাবি।

প্রাপ্তি আরও আছে। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই নরেন্দ্র মোদী যে-‘ডিজিট্যাল ইন্ডিয়া’ তৈরির কথা বলেছিলেন, তা গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে এই উপগ্রহ। উৎক্ষেপণ সফল হওয়ার পরে টুইট করে ইসরো-কে অভিনন্দন জানান মোদী।

কী ভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করবে এই উপগ্রহ?

ইসরো জানিয়েছে, এই উপগ্রহ মোবাইল যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। তার দৌলতে কোনও বাধাবিঘ্ন ছাড়াই মোবাইল থেকে মোবাইলে যোগাযোগ ঘটবে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি হবে এই প্রযুক্তিতে। প্রত্যন্ত এলাকাতেও যোগাযোগ প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। এর উপযোগিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিকম প্রযুক্তি বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, ‘‘এই প্রযুক্তি যত বেশি ব্যবহার হবে, ততই উন্নত হবে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এমন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে মোবাইল ফোন থেকে বড় আকারের ভিডি়ও বা অডিও ফাইল লেনদেনে অনেক কম সময় লাগবে।’’

ইসরো-র মুখপাত্র বি আর গুরুপ্রসাদের দাবি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই উপগ্রহ সাহায্য তো করবেই। তা ছাড়াও এ দিন উৎক্ষেপণ প্রযুক্তিতে নতুন একটি কীর্তি গড়েছেন তাঁরা। জিস্যাট-৬ উপগ্রহের বাহন (জিএসএলভি-ডি৬ রকেট)-এ একটি বিশেষ জ্বালানি ট্যাঙ্ক (ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজ বা সিইউএস) জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনও রকেটে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার এই প্রথম। কোনও পদার্থকে অতিশীতল অবস্থায় রেখে কাজে লাগানোর বিদ্যাকেই ‘ক্রায়োজেনিক্স’ বলা হয়। এই রকেটের ক্ষেত্রে ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজে তরল অক্সিজেন (তাপমাত্রা মাইনাস ১৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং তরল হাইড্রোজেন (তাপমাত্রা মাইনাস ২৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ভরা হয়েছিল। সাধারণ জ্বালানির বদলে এই ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের ফলে রকেট অনেক বেশি গতি পায়।

উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির নিয়ম অনুযায়ী রকেটে একাধিক জ্বালানি ট্যাঙ্ক থাকে। সেগুলি ধাপে ধাপে কাজ করে এবং জ্বালানি শেষ হলেই মূল রকেট থেকে ট্যাঙ্কগুলি আলাদা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সিইউএস লাগানো হয়েছিল একেবারে উপগ্রহের সঙ্গে। তার ফলে নীচের দিকের সব ট্যাঙ্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সেটি কাজ শুরু করে। প্রযুক্তিবিদদের মতে, বাকি জ্বালানি ট্যাঙ্কগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় রকেটের ওজন অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তার ফলে নির্দিষ্ট কক্ষপথের কাছাকাছি পৌঁছতে ওই উপগ্রহের সময় লেগেছে অনেক কম। এ দিনের উৎক্ষেপণ সফল হওয়ায় ভবিষ্যতে বড় উপগ্রহ উৎক্ষেপণে সিইউএস ব্যবহার করা যাবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরো। সংস্থার মুখপাত্র জানান, জিস্যাট-৬ উপগ্রহটিকে কক্ষপথের কাছে পৌঁছে দিয়েছে সিইউএস। এর পরে উপগ্রহে থাকা লিকুইড অ্যাপোজি মোটর (ল্যাম)-এর সাহায্যে সেটিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করা হবে।

সাফল্যের মধ্যেও এই প্রকল্পের গায়ে ‘দাগ’ একটা থাকছেই। ওই উপগ্রহ যোগাযোগের যে-অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করবে, তা নেওয়ার জন্য ইসরো-র বাণিজ্যিক শাখা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানট্রিক্স’-এর সঙ্গে একটি বেসরকারি সংস্থার চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তদন্তে নামে সিবিআই। তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় ইসরো-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান মাধবন নায়ারের নাম। সেই তদন্তে এখনও অবশ্য কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি সিবিআই। ইসরো সূত্রে খবর, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। তাই প্রকল্প বাতিল হয়নি।