×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

মেমদের মতো গড়ের মাঠে বেড়াতে যাবি?

২৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০১
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আঠেরো শতকের ষাটের দশকের গোড়ার দিক। বাংলার দিকচক্রবালে নবজাগরণ তখন সবে মাত্র দেখা দিয়েছে, কিন্তু ঘুম ভেঙেছে খুব কম লোকেরই। এমনকি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও তখন আলো ঢুকেছে কই? সেখানে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পরে আবার ফিরছে সংস্কারের দাপট। ঠাকুরবাড়ির বাইরে তো একটা গোটা সমাজ ব্রিটিশের চাবুক খেতে খেতে ক্রমশ তলিয়ে চলেছে আচারবিচারের কূপে। বিশেষত, সে সময়ের মেয়েদের জীবনছবিটি এক কথায় বিপজ্জনক। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, সতীদাহ প্রভৃতি অত্যাচার তো চলছিলই, সঙ্গে প্রতি পদে আটকানোর জন্য ছিল পাঁচশো রকম বেড়ি। তার মধ্যে লেখাপড়া করা, জামা-জুতো পরা, বাইরে বেরোনো, গান গাওয়া, গাড়ি চড়া— সব পড়ে। এই রকম এক ঘোর অন্ধকার রাতে, ঠাকুরবাড়ির অন্দরে একটা কাণ্ড হল। তার কুশীলব সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর বালিকা স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী এবং সত্যেন্দ্রনাথের পরম বন্ধু মনোমোহন ঘোষ। সত্যেন্দ্রের বয়স তখন কুড়ির মধ্যে। ঘোর র‌্যাডিকাল। তাঁর সব কাজের প্রাণের সঙ্গী মনোমোহন ঘোষ। মনোমোহনের ইচ্ছে বন্ধুর স্ত্রীকে দেখার। কিন্তু জ্ঞানদার তো বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। আর অন্য পুরুষ তো ছাড়, অন্দরে পুরুষ-ভৃত্যও আসতে পারে না। এমত কঠিন অবস্থায় একটি ফিকির বার করলেন সত্যেন্দ্র। বাকিটা শুনুন স্বয়ং জ্ঞানদানন্দিনীর জবানিতে—

‘‘ওঁরা দুজনে পরামর্শ করে বেশি রাতে সমান তালে পা ফেলে বাড়ির ভেতরে এলেন। তারপরে উনি মনোমোহনকে মশারির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে শুয়ে পড়লেন। আমরা দুজনেই মশারির মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলুম; আমি ঘোমটা দিয়ে একপাশে আর তিনি ভোম্বলদাসের মতো আরেক পাশে, লজ্জায় কারও মুখে কথা নেই। আবার কিছুক্ষণ পরে তেমনি সমান তালে পা ফেলে তিনি তাকে বাইরে পার করে দিয়ে এলেন।’’

নবীন স্বামীটির কীর্তি শুনে কেউ হাসবেন, কেউ শিউরে উঠবেন। আর যদি মনে পড়ে, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরই তো প্রথম ভারতীয় হিসেবে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করেছিলেন। তখন তাঁর এই দুঃসাহসের মধ্যেই দেখবেন ভবিষ্য-রেনেসাঁসের আলোকবর্তিকা। সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী পোশাকে বিপ্লব এনে বাধানিষেধের বেড়া উপড়ে বৃহত্তর জগতে এসে মেয়েদের মুক্তির আকাশ দেখিয়েছিলেন। বোন স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক লেখিকা। এই দুই ননদ ও বৌদি বাঙালির নারীজাগৃতির অগ্রগামিনী। আর বহু আয়াসে তাঁদের জন্য পথ গড়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। শুধু তাই নয়, বঙ্গভূমের যাপন ও সংস্কৃতিতে একের পর এক বর্ণিল সংযোজন করে তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। প্রস্তুত করছিলেন ঠাকুরবাড়ির বহুচর্চিত পরিবেশটি। তাঁর উদ্বোধিত নন্দনকাননেই একদিন শুদ্ধ হয়েছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম যৌবনের ঈষৎ-ক্লিষ্ট মন। এবং সেই উদ্যানেই তো আগুনের পরশমণিটি খুঁজে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

Advertisement

সরস্বতীর মুকুট, রবিনসন ক্রুসো

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা দেবীর দ্বিতীয় পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন পুরোপুরি হিন্দু অবিভক্ত ঠাকুরবাড়িতে, ১৮৪২ সালের ১ জুন। তাঁর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছরে ঠাকুরবাড়িতে নেমে আসে প্রবল ঝড়ঝাপটা। ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৪৭ সালে বিদেশে মারা গেলেন। সে কালের বাজারেই তাঁর দেনা ছিল এক কোটি টাকা! পুত্র দেবেন্দ্রনাথ পিতৃঋণ সুদসমেত শুধলেন, একই সঙ্গে চর্ব্যচোষ্যলেহ্যপেয় সরিয়ে ডাল-রুটি ধরলেন, অন্দরের গালচে ত্যাগ করে আনলেন মাদুর। তাঁর ব্রহ্মদর্শন ও কৃচ্ছ্রসাধনে দ্বারকানাথের বৈভবের বদলে মা দিগম্বরী দেবীর সংযমের ছায়াই দীর্ঘতর হল। মহর্ষি প্রতিকূল আবহাওয়া নিজেই শক্ত হাতে সামলেছিলেন। ছেলেপুলের জীবনবিকাশে তার প্রভাব পড়তে দেননি। সত্যেন্দ্র আপন বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং মেজদাদা (খুড়তুতো) গণেন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পন্ন বংশের সন্তানদের মতোই পূর্ণকুম্ভ সংসারে হেসেখেলে, কুস্তি আর ঘোড়দৌড়ে হাত পাকিয়ে দিব্যি বড় হচ্ছিলেন। শুধু নিজের মায়ের থেকে বেশি টান ছিল গণেন্দ্রনাথের মা, তাঁদের মেজকাকিমা যোগমায়া দেবীর উপরে। কিন্তু কিছু দিনেই বিষয়সংক্রান্ত কারণে পরিবার দু’ভাগ হল। মেজদাদা আর মেজকাকিমাদের সঙ্গে পৃথক হয়ে মনোবেদনা হয়েছিল সত্যেন্দ্রের। তখনও পর্যন্ত তাঁদের বাড়িতে অনেক পুজোই হত মহা ধুমধামে। তবু তার মধ্যেই দেবেন্দ্রনাথের অপৌত্তলিক দর্শন ছেলের ভিতরেও প্রকট হচ্ছিল। স্মৃতিকথায় নিজেকে ‘আইকোনোক্লাস্ট’ (লোকাচার ভাঙে যে) বলে সত্যেন্দ্র জানিয়েছেন, ‘সরস্বতীর অর্চনায় গিয়েছি— ফিরে আসবার সময় হাতে যে দক্ষিণার টাকা ছিল তাই দেবীর উপরে সজোরে নিক্ষেপ করে দে ছুট। তাতে দেবীর মুকুট ভেঙে পড়ল।’

ও দিকে হিন্দু স্কুলের মেধাবী ছাত্রের মুকুট বেড়েই চলল। এক বছর প্রাইজ়ে রবিনসন ক্রুসোর বই পেয়ে উল্লসিত হলেন, তার পর একবার তো কৃতিত্বের কদর রূপে পেলেন গোল্ডস্মিথের পুরো সেটটাই। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স পরীক্ষা শুরু হল। ২৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১৫ জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ। তার মধ্যে হিন্দু স্কুল থেকে সত্যেন্দ্রনাথ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রেসিডেন্সিতে পড়তে এসে সমমনস্ক পেলেন কেশবচন্দ্র সেনকে। কুলমন্ত্র গ্রহণ না করার জন্য কেশবের উপরে বাড়ির লোক জুলুম করছিল। কেশব সস্ত্রীক দেবেন্দ্রনাথের আশ্রয়ে এলেন। ব্রাহ্মসমাজের কালসারণিতে এ বড় গুরুত্ববহ সন্ধিক্ষণ। সত্যেন্দ্রনাথের নিজের কথায়, ‘কেশবের প্রভাবে সমাজ এক নূতন মূর্ত্তি ধারণ করলে। আমিও সে উৎসাহ-তরঙ্গে গা ঢেলে দিলুম।’ বস্তুত এই দু’জন তখন ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে মহর্ষির দু’টি হাত।



সুযোগ্যা সহধর্মিণী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী

দেখা দিল লন্ডন নগরী

‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার এই তরুণ সম্পাদক ব্রাহ্মসমাজের কাজে, পিতৃ-উপদেশ সঙ্কলনে আর ভক্তিগীত ভেঙে গান রচনায় আত্মোৎসর্গ করেই ইতিহাসে আসন পোক্ত করতেন, যদি না পৈতৃক বন্ধুতাসূত্রে ঠাকুরবাড়িতে আসতেন মনোমোহন ঘোষ। সত্যেন্দ্রের কথায়, ‘যেন একটা বোমা আকাশ থেকে পড়ে সব ভেঙ্গে চূরে দিয়ে গেল।’

পরিবার দস্তুর মতো, ১৮৫৯ সালে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যশোরের আট বছরের জ্ঞানদানন্দিনীর বিয়ে হয়েছে। একমাথা ঘোমটা টানা বালিকাটিকে চিন্তায় কর্মে স্বাবলম্বী করে নিজ মন-তরণীর সওয়ার করতে সত্যেন্দ্রের উদ্যোগের অন্ত নেই। লজ্জাশীলা ‘জ্ঞেনুমণি’ নিজে থেকে দুটো কথা বললেই তিনি তাকে বহুমূল্য ঘড়ি দেন, সেজ ভাই হেমেন্দ্রর কাছে ‘জ্ঞেনি’ কেমন পড়ছে, শতবার তল্লাশ করেন। জ্ঞানদার আড় ভাঙাতে সেই মনোমোহনকে ডেকে আনেন নিভৃত কক্ষে। এই মনোমোহনই তাঁকে পরামর্শ দিলেন, মহারানি ভিক্টোরিয়া তো ভারতীয়দের সিভিল সার্ভিসের অনুমতি দিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু কেউ এখনও পরীক্ষা দেয়নি। চলো না বিলেত গিয়ে দেখি, আমাদের সিভিল সার্ভিসে নেয় কি না। বহু কষ্টে মহর্ষির মত আদায় করে, ১৮৬২ সালে দুই বন্ধু সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতির জন্য ইংল্যান্ডে গেলেন। সেখানে তাঁদের দেখাশোনার, উপযুক্ত শিক্ষক খুঁজে দেওয়ার ভার নিলেন আত্মীয় জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর (প্রথম এশীয় ব্যারিস্টার, খ্রিস্টান হয়ে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, তাই বাবা তাঁকে ত্যাজ্য করেন)। সেখানে ভয়ানক পরিশ্রম শেষে মনোমোহন ফেল করলেন বটে, তবে সত্যেন্দ্র পাশ করে নজির গড়লেন। নির্বাচিত ৫০ জন ছাত্রের মধ্যে তিনি ৪৩তম, শেষ পরীক্ষায় ষষ্ঠ। অর্থাৎ তিনিই হলেন প্রথম দেশি সিভিলিয়ান। ১৮৬৪ সালে তাঁর দেশাভিমুখী জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছতেই কলকাতায় সংবর্ধনার আয়োজন শুরু হয়ে গেল। শুভেচ্ছা জানিয়ে মধুসূদন দত্ত সনেট লিখলেন। বেলগাছিয়ার বাগানে বিদ্যাসাগরের উপস্থিতিতে তাঁকে মহা সমারোহে বরণ করে নিল বাঙালি জাতি। কিন্তু যখন জানা গেল, তাঁকে কলকাতার বদলে বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে কালেক্টরি করতে পাঠানো হচ্ছে, ফুঁসে উঠল জনতা। যদিও সত্যেন্দ্রনাথের মতে ‘ন্যায্য পজ়িশন।’ কমিটির নিয়মে ৩৫ জনের পরে স্থান পেলে বোম্বাই বা মাদ্রাজ যাওয়ারই কথা। বরং এই সাফল্যে বিচলিত ব্রিটিশ সরকার অন্য হাতে আঘাত হানল। আরবি ও সংস্কৃতে (পরীক্ষক ছিলেন ম্যাক্স মুলার) অঢেল নম্বর পেয়েছিলেন সত্যেন্দ্র। পরের পরীক্ষা থেকেই দুই বিষয়ের মূল্যমান কমানো হল।

ঘর থেকে দূরে, পশ্চিমে কাজ করার সুযোগ পেয়ে, বস্তুত বহু দিনের স্বপ্ন বাস্তব করার উপায় পেলেন সত্যেন্দ্রনাথ। জ্ঞানদানন্দিনীকে নিদর্শন রূপে সামনে রেখে, ঠাকুরবাড়ি তথা বঙ্গসমাজের অন্তঃপুরপ্রথা তথা স্ত্রীজাতির কয়েদখানার তালাখানি ভেঙে দিলেন।

পরিচ্ছদ বিপ্লব পরিবর্তনের বন্যা

বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর স্মৃতিতে, ‘‘আশৈশব ইনি মহিলা-বন্ধু। ...বাড়ীর মেয়েরা মিউজিয়াম বা পশুশালা বা কোন বক্তৃতা শুনিতে যাইতে চাহিলে মেজদাদা অমনি শত কাজ শত অসুবিধা সত্ত্বেও তাহাকে সঙ্গে করিয়া যথাস্থানে লইয়া যাইতেন। মহর্ষির কাছে মেয়েদের যদি কোন আবেদন থাকতো তবে তাদের ‘মুরুব্বি’ হয়ে সত্যেন্দ্রনাথই তা অসঙ্কোচে নিবেদন করতেন।’’ সারদা দেবী তাঁকে ধমকাতেন। ‘‘তুই মেয়েদের নিয়ে মেমদের মত গড়ের মাঠে ব্যাড়াতে যাবি না কি?’’ তবু তাঁকে নিরস্ত করা যায়নি। বিলেত যাওয়ার আগেই স্ত্রী স্বাধীনতা বিষয়ে তেজিয়ান যুক্তি সাজিয়ে পুস্তিকা বার করেছিলেন।

ইংল্যান্ডে পঠনকালে মুগ্ধ হয়ে দেখলেন, ‘‘গার্হস্থ্য জীবনে মেয়েদের মোহন সুন্দর প্রভাব’ ও বিবাহিতা অবিবাহিতা রমণী’দের সমাজে বিবিধ মঙ্গলব্রতে উৎসর্গীকৃত জীবন। তাঁর খুব ইচ্ছে হল বিদেশে এসে জ্ঞানদাও এই উন্নত জীবনের পরশ নিন, যত কিছু শিক্ষা ও উৎকর্ষে তিনি সমৃদ্ধ হয়েছেন, তার ভাগী হন। কিন্তু মহর্ষি ছেলের প্রস্তাব এক বাক্যে নাকচ করে দিতে বিদ্রোহের আগুন তীব্রতর হয়ে উঠল। ঘুমের মধ্যে সত্যেন্দ্র দেখেন, জোড়াসাঁকোর ঝরোখা তিনি ভেঙে দিচ্ছেন। স্ত্রীকে চিঠির মাধ্যমেই বিদেশি বন্ধুবান্ধব, মেরি কার্পেন্টারের মতো বিদুষীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। কোন বই পড়তে হবে, কী খেতে হবে, কার সঙ্গে মিশতে হবে সবটা বলে দিলেন দীর্ঘ, দীর্ঘতর সে সব চিঠিতে। ফল ফলল, প্রাচীরে ফাটল ধরল। মেজ বৌয়ের ব্যবহার ‘উচ্চকিত’ মনে হল মহর্ষির। দেবেন্দ্র-সারদার সঙ্গে জ্ঞানদার কিছু মতানৈক্যের আভাস মেলে সত্যেন্দ্রের চিঠিগুলিতে। অবশেষে বিলেতজয়ী সত্যেন্দ্র কলকাতা ফিরলেন, বলে দিলেন কর্মস্থল বোম্বাইয়ে ‘সস্ত্রীক’ যাবেন। তখন যেতে হত জাহাজে। তার জন্য অন্তঃপুরের কুলবধূটি কর্মচারীদের চোখের সামনে দিয়ে দেউড়ি ডিঙিয়ে গাড়িতে উঠবেন, মহর্ষির মনঃপূত হল না। যে ঘেরাটোপ দেওয়া পালকি স্নানযাত্রার তিথিতে মেয়ে-বৌদের গঙ্গায় চুবিয়ে আনে, জ্ঞানদা সেই পালকিতেই একেবারে জাহাজে গিয়ে উঠবেন— মত দিলেন তিনি।

জ্ঞানদা লিখেছেন, ‘‘সে সময়ে খালি এক শাড়ি পরা ছিল, তা পরে তো আর বাইরে যাওয়া যায় না।’’ তাই সত্যেন্দ্র ফরাসি মহিলা দর্জির কাছ থেকে তথাকথিত ‘ওরিয়েন্টাল’ পোশাক বানিয়েছিলেন। তার পরিধানপ্রণালী এতই ঝামেলার যে, সত্যেন্দ্রকেই তা পরিয়ে দিতে হয়েছিল। বম্বে গিয়ে ধনী পারসি বাড়িতে তাঁরা ওঠেন। পারসি জীবনে নারী-পুরুষের একত্র ভোজন, অবাধ নারী স্বাধীনতা ও উৎসবে বর্ণাঢ্য পোশাকে নারীসমাজের অংশগ্রহণ দেখে সত্যেন্দ্র হর্ষিত। তাঁদের যৌথজীবনে সকল প্রভাবই এল। পারসিদের দৃষ্টান্তেই জ্ঞানদা সেই ওরিয়েন্টাল পোশাক ছেড়ে, ডান কাঁধের বদলে বাঁ কাঁধে আঁচল ফেলে বা ব্রোচ আটকে ‘বোম্বাই শাড়ি পরা’ রপ্ত করেন। সেখানে শিরিনবাইরা যেমন শাড়ির সঙ্গে জ্যাকেট বা সদ্‌রা পরতেন, সেই চলনেই শুরু হল ব্লাউজ় পরা। পরের ছুটিতে স্বামীর সঙ্গে এই পোশাকেই সরাসরি গাড়ি করে ঠাকুরবাড়িতে এলেন তিনি। এ দৃশ্যে বাড়িতে ‘শোকাভিনয়’ হল, পিতৃভবনে সত্যেন্দ্র প্রায় একঘরে হলেন। এই ছুটিতেই সত্যেন্দ্র স্ত্রীকে লাটসাহেবের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। বিদেশিনিদের মাঝে সুসজ্জিতা জ্ঞানদাকে দেখে অনেকেই ভোপালের বেগম ভেবেছিলেন। আর প্রকাশ্যে ঘরের বৌকে দেখে প্রসন্নকুমার ঠাকুর (জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের পিতা) সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ও দিকে প্রবাসে সত্যেন্দ্রের কর্মস্থল বদলাতে থাকল। পুণে, আহমদনগর, সাতারা, আমদাবাদ। সেখানে তিনি ভাই-বোনদের নিয়ে গিয়ে নতুন জীবনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ক্রমে ঠাকুরবাড়িতে বিলেতের ছোঁয়া লাগল, সর্বভারতীয়তার রং ধরল, অন্তঃপুরে অবরোধপ্রথা লুপ্ত হল। অন্য দিকে জজিয়তি করার সময়ে সমাজের বহু উপদ্রবের মুখোমুখি হলেন তিনি। বাল্যবিবাহ, বালিকাহরণ, দেবদাসী প্রথার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ছিলই। তার সঙ্গে সমাজস্বাস্থ্যের প্রশ্নে বয়স্থ হলে পাত্রপাত্রীর ইচ্ছেয় বিবাহ, একান্নবর্তী পরিবারের অবসানের পক্ষে কলম চালালেন। এ ভাবেই তিনি সমযুগীয় সবচেয়ে আধুনিক-মনস্কের চেতনাটিতেও নতুন কালের ইন্দ্রধনু এঁকে দিলেন।

স্বাদেশিকতা ভারতসঙ্গীত

সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ৩২ বছরের কর্মজীবনে অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন। ভারতবাসীর মধ্যে প্রথম সেশন জজ হয়েছিলেন। তবু তিনি অকালে অবসর নিয়েছিলেন। কারণ ইংরেজ তাঁর ন্যায়প্রীতি আমলেই আনেনি, কিছুতে তাঁকে হাইকোর্টের জজ করেনি। পুণেয় বাসকালে নিজে বলতেন, আমি একাধারে ইংরেজের বিদ্বেষভাজন দুই প্রকার ব্যক্তি— ‘বেঙ্গলি বাবু’ ও ‘পুণা ব্রাহ্মিন’। বিলেতে থাকতে ইংরেজগৃহিণীর ঔদার্য, ছাত্রের প্রতি মমতামধুর ভাব, ইংরেজজাতির পরিশ্রম, কর্তব্যনিষ্ঠা ও সভ্যতায় তিনি মোহিত ছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন, ‘এ জাদুর রাজ্য আমাদের নহে, আমরা যে ইংরাজের পদধূলি লইতে যাই, তাহাদের পদাঘাত পাইয়া আমাদের অবশেষে চেতনা হয়।’

রাজকাজের ফাঁকে ছুটিছাটা মিললেই সত্যেন্দ্র তাঁর লেখালিখির ভুবনের পরিধি বাড়িয়ে তুলেছেন। কলকাতায় এসে ঠাকুরবাড়ির নাটক গানের নব্যধারাটি সিঞ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত থেকেও সরকারের সমালোচনার স্পর্ধা দেখিয়েছেন। এমনকি তাঁর কর্মজীবনের গোড়ার দিকেই, যখন তাঁর বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবগোপাল মিত্রের উদ্যোগে দেশাত্মবোধ ও রাষ্ট্রীয় মুক্তিচেতনা জাগানোর উদ্দেশ্যে হিন্দুমেলা শুরু হল, তিনি তার দ্বিতীয় অধিবেশনে নিজে উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানের জন্য একটি ভারতসঙ্গীত লিখে দিয়েছিলেন। রাগিণী খাম্বাজ, তাল আড়াঠেকার সেই গান ‘মিলে সবে ভারতসন্তান’ শুনলেই বোঝা যায়, এই গানই বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম্’ ও অনুজ রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’র অগ্রদূত। বহু ক্ষেত্রেই এই গানকে দেশের প্রথম জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেওয়া হয়।

যোগাযোগের কারিগর

ঠাকুরবাড়ির অসংখ্য সূর্যের মতোই সত্যেন্দ্রের বিচিত্রমুখী প্রতিভার ছটায় আমাদের কেবলই ধাঁধা লেগে যায়। ‘বোম্বাই চিত্র’, ‘আমার বাল্যকথা’ ইত্যাদিতে মুখের কথায় মনের ভাবপ্রকাশে তাঁর মুনশিয়ানা, যখন-তখন গান বাঁধার পারদর্শিতা, ব্রহ্মনাদ প্রচার, শেক্সপিয়র-তুকারাম-কালিদাস অনুবাদের প্রাঞ্জলতা... সবই বুদ্ধিবৃত্তির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। স্মৃতিশক্তি ছিল বিস্ময়কর। বিশুদ্ধ উচ্চারণে তাঁর স্তোত্রপাঠ শুনতে প্রার্থনাসমাজে ভিড় হয়ে যেত। অবসরের পরে যখন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে এলেন, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি হলেন, সেখানে তাঁর ভাষণ ও অভ্রান্ত স্বরক্ষেপণে আবৃত্তি কে ভুলতে পারে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরাতন ভৃত্য’র ভিতর হতে প্যাথোসটিকে তুলে এনে কেষ্টা চাকরকে নাকি একেবারে চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতেন। নাটক কী করে যথোপযুক্ত ভাব ও স্বরভঙ্গির সঙ্গে পরিবেশন করতে হয়, তাও দেখিয়েছেন। তাঁর অভিনয়ে অংশগ্রহণ ও নাটক প্রভৃতি পরিচালনার সুখস্মৃতি ঠাকুরবাড়ির প্রায় সকলেরই অতীতচারণায় উজ্জ্বল। নির্দেশনায় বেশ কিছু অভিনবত্ব এনেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় দস্যুদলের নাচে কাবুলি ঢং এবং ডাকাতদের সাজসজ্জা তাঁরই নির্মাণ। কর্মস্থলে ইউরোপিয়ান ক্লাব আয়োজিত ফ্যান্সি ড্রেসে সোৎসাহে অংশ নিতেন। ষাট বছর বয়সে ‘জুলিয়াস সীজার’ নাটকে মার্ক অ্যান্টনির ভূমিকায় সকলকে তাজ্জব করে দিয়েছিলেন। বালিগঞ্জে তাঁর স্বতন্ত্র বাড়িটি বা পরিণত বয়সে রাঁচির পাহাড়ের উপরে বিশ্রামাগারটি ছিল প্রাণখোলা আনন্দের নিকেতন।

তবু বুঝি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সেই সংযোগ স্থাপনাতেই। যে বার (সম্ভবত ১৮৭৭) সত্যেন্দ্র জ্ঞানদাকে তিনটি শিশুসন্তান-সহ (সুরেন্দ্রনাথ, ইন্দিরা দেবী, কবীন্দ্রনাথ) অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় (কবীন্দ্র ও এই চতুর্থ শিশুটি অল্পায়ু) একলাই বিলেতে পাঠিয়ে দিলেন, তখন তাঁদের নিতে এসে সেই জ্ঞানেন্দ্র পর্যন্ত স্তম্ভিত— ‘সত্যেন্দ্র এ কী করলেন?’ এই ঘটনার পরে জ্ঞানদার সাঙ্ঘাতিক মনের জোরের কথা কিংবদন্তি হয়ে যায়। দ্বিমত নেই, এই মনের জোরের স্রষ্টা সত্যেন্দ্রনাথ। প্রত্যক্ষ ভাবে সরব আন্দোলন না করেও নিজের জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই স্বজনে ও সমাজে পরিবর্তন যে সজোরে ঠেলে দেওয়া যায়, তাও তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন। মহর্ষির অধ্যাত্মসম্পদের মূল উত্তরাধিকারটি বয়েছিলেন তাঁর মধ্যম পুত্রই। তবু সত্যেন্দ্রের ব্রহ্মতত্ত্ব গীতা উপনিষদ ব্যাখ্যান এবং বুদ্ধ বিষয়ক বইগুলির প্রধান গুণ সরলতা। সাধারণের মনে তার সারকথাগুলি প্রোথিত করতে তাঁর যত্নের শেষ ছিল না। সত্যেন্দ্রের জামাতা (ইন্দিরাদেবীর স্বামী) প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, শুধু পণ্ডিত সমাজের নয়, দেশের লোকেরও এ বিষয়গুলি জানা আবশ্যক। এই বইগুলি থেকে বিনা ক্লেশে সে জ্ঞানার্জনই সম্ভব। এক সময়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের গীতবাদ্য ও নাট্যরচনা, ছবি আঁকার অনুরাগ এবং পরে নিজ স্ত্রীকে অশ্বচালনা শিক্ষায় উৎসাহ দানে এই মেজ দাদার ভূমিকা ছিল সক্রিয়। কাদম্বরী দেবীর আকস্মিক মৃত্যুর পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তো আপন পরিবারভুক্তই করে নিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ।

কিশোর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে টেনিসন ও সংস্কৃত কাব্যসম্ভারের যোগাযোগ আমদাবাদে, মেজ দাদার বাংলোর লাইব্রেরিতে। বিলাতযাত্রার আগে মেজ দাদার কাছে এসেছিলেন কবি। সত্যেন্দ্রের মনে হল, ইংরেজি পড়লেও ইংরেজি কথা বলা বা আদবকায়দায় রবি অভ্যস্ত হচ্ছেন না। তাই আত্মারাম পাণ্ডুরঙের বোম্বাইয়ের বাড়িতে ভাইটিকে পাঠিয়ে দেন। এখানেই রবি পেয়েছিলেন আত্মারামের কন্যা আন্না তড়খড়কে— যিনি ছিলেন তাঁর ‘আপন মানুষের দূতী’, কবির ‘নলিনী’।

আমদাবাদে সেই ‘জজের বাসা’তেই একটি পুরনো ইতিহাসের ছবি রবীন্দ্রনাথের মনে প্রথম উঁকি দিয়েছিল। ‘ছেলেবেলা’য় কবি লিখেছেন, ‘‘দিনের বেলায় মেজদাদা চলে যেতেন কাজে; বড়ো বড়ো ফাঁকা ঘর হাঁ হাঁ করছে, সমস্ত দিন ভূতে-পাওয়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। ... চাতালটার কোথাও কোথাও চৌবাচ্ছার পাথরের গাঁথনিতে যেন খবর জমা হয়ে আছে বেগমদের স্নানের আমিরিআনার।’’ সতেরো বছর পরে এই বাড়ির স্মৃতিতেই মাথা তুলে দাঁড়ায় ‘ক্ষুধিত পাষাণ’।

এমন দীর্ঘজীবন মহামননের (মৃত্যু ১৯২৩, ৮১ বছর বয়সে) আংশিক পরিচয়ও এই অক্ষম লেখনীর পক্ষে দেওয়া দুরূহ। আমরা তো শুধু মালমশলা জড়ো করতে পারি মাত্র। আর তাই করতে গিয়ে দেখি, বৃদ্ধ সত্যেন্দ্র অবশেষে তৃপ্ত সুরে লিখেছেন, ‘‘সেকাল আর একাল— কি তফাৎ!... সত্যি সত্যিই অন্তঃপুরবাসিনীগণ এখন মেমের মত গড়ের মাঠে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছেন। ...আমার মনস্কামনা অনেকটাই পূর্ণ হয়েছে।’’ (১৯১৫) আর ক’বছর পরে সত্যেন্দ্রনাথের শোকনৈবেদ্যে বোন স্বর্ণকুমারীর সোনার কলম থেকে সহস্রধারায় ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা ঝরেছে— ‘‘রীতিমত বিদ্যাচর্চা, শ্বশুর শাশুড়ীর নিকটও কন্যাভাব, গাড়ী করিয়া যাতায়াত, বোম্বাই ফ্যাসানে পরিচ্ছদ পরিধান... এ সকলের যিনি প্রবর্ত্তক তাঁহাকে শত বাধা একাকী হস্তে উৎপাটন করিতে করিতে অগ্রগামী হইতে হইয়াছে। নিজের বাড়ীর লোকে পর্যন্ত তাঁহার সহিত যোগ দিতে ভয় পাইয়াছে। ... স্ত্রীজাতির উন্নতিতে ইনি এমনই অটলসংকল্প ছিলেন ...কোন বাধাকেই বাধা জ্ঞান করেন নাই, কোন অপমানেই তাঁহাকে নত করতে পারে নাই।’’

একশো বছরের এ পার হতে, অগণিত নতমাথার সারি আজও এই অগ্রজের প্রাপ্য।

ঋণ: ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল ও বাহিরমহল’: চিত্রা দেব

‘আমার বাল্যকথা ও আমার বোম্বাই প্রবাস’: সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পুরাতনী’: জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ‘সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সৃষ্টি’: ড. অমিতা ভট্টাচার্য

Advertisement