বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে নির্বাচন হয়েছে বৃহস্পতিবার। এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য কোনও দল বা জোটকে ১৫১টি আসনে জিততে হবে। চূড়ান্ত ফলঘোষণা না হলেও প্রাথমিক গণনায় স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে প্রয়াত খালেদা জিয়ার পুত্র তারেকের দল।
সব কিছু ঠিক থাকলে খালেদা জিয়ার মতো ৫৭ বছর বয়সি তারেককেও প্রধানন্ত্রীর পদে দেখতে চলেছে বাংলাদেশের জনগণ। দীর্ঘ দিন দেশছাড়া থাকার পর বাংলাদেশে ফিরে নির্বাচনে লড়েছেন খালেদা-পুত্র। জয়ী হয়েছেন দু’টি আসনেই (ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬) । এই আবহে প্রশ্ন উঠছে কে এই তারেক? কেনই বা দীর্ঘ দিন দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে?
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তারেকের জন্মসাল ১৯৬৮। যদিও অনেকের মতে ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় (তখন ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ ছিল) জন্ম তারেকের। তারেকের বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা, যিনি পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। ‘বীরবিক্রম’ (বাংলাদেশ সেনার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা) পেয়েছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর। বিএনপি দল তাঁর হাতেই তৈরি। অন্য দিকে, তারেকের মা খালেদা প্রথম জীবনে ছিলেন গৃহবধূ। খালেদার পরিচিতি ছিল জিয়াউরের স্ত্রী হিসাবে। রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল না তাঁর। তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর সেনা আধিকারিকদের গুলিতে খুন হওয়ার পর মত বদলান খালেদা। সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজেই নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী তিনিই।
জিয়াউর-খালেদার দুই পুত্রের মধ্যে তারেক জ্যেষ্ঠ। তারেক পড়াশোনা করেন ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে। দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে ভর্তি হন। পরে বিষয় পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। শোনা যায়, স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের সময় তারেক তাঁর শিক্ষাজীবন শেষ করেন এবং টেক্সটাইল শিল্প ও জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবসা শুরু করেন।
বিএনপি-র নেতৃত্বে এসেই বাংলাদেশের সেনাশাসক হুসেন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দলকে লড়াইয়ের ময়দানে নামিয়ে দিয়েছিলেন তারেকের মা খালেদা। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বহু বার খালেদাকে গৃহবন্দি করা হয়েছিল। কিন্তু এরশাদ-বিরোধী লড়াই থেকে সরেননি তিনি। সেই লড়াই-ই তাঁকে রাতারাতি প্রচারের আলোয় নিয়ে এসেছিল। সেই সময় একদম প্রথম সারিতে থেকে দলের হয়ে ল়়ড়াই চালিয়েছিলেন তারেকও।
১৯৯১ সালে খালেদার জনপ্রিয়তায় ভর করে ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন খালেদা। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-র জয়ের পর বগুড়ায় দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তারেক। এর পর ১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচন হয়। তবে সেই নির্বাচনেও কোনও আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি তিনি। পরিবর্তে খালেদার হয়ে নির্বাচনী কৌশল রচনা এবং প্রচারের দিকেই তাঁর নজর ছিল বেশি।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হওয়া নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয় বারের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন খালেদা। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে নির্বাচনের দাবি জানায় বিরোধী দলগুলি। এই দফায় খালেদা সরকারের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন (১৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ)। ওই বছরের জুন মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে হওয়া নির্বাচনে জয়ী হয় হাসিনার আওয়ামী লীগ।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সক্রিয় বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারেক। এর পর ২০০১ সালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি। আবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা। খালেদা ক্ষমতায় ফেরার পর সেই সময় তারেকের নেতৃত্বে একটি সমান্তরাল ক্ষমতাবলয় তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন অনেকেই। তারেক দলের কাজ পরিচালনা করতেন দলের বনানী অফিস থেকে, যা হাওয়া ভবন নামে পরিচিত ছিল।
অভিযোগ উঠেছিল, এই হাওয়া ভবন থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা তুলে তা বিদেশে পাচার করতেন তারেক। যদিও তারেকের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেয় বিএনপি। ২০০৪ সালের ২১ অগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড হামলা হয়। নিহত হন ২৪ জন। আহত হন হাসিনা-সহ ৩০০ জন। এই ঘটনাতেও তারেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় (যা ১/১১ নামেই পরিচিত)। তার পরেই বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা যায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। সেই সময়েই দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হন তারেক। ১৮ মাস জেলে থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয় তাঁকে। জেলে খালেদা-পুত্রের উপর অত্যাচার করারও অভিযোগ ওঠে।
১৮ মাসের কয়েদবাসের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছেড়ে লন্ডনে পাড়ি দিয়েছিলেন তারেক। সে সময় বাংলাদেশ জুড়ে খবর ছড়িয়েছিল যে, বাংলাদেশের সেনাকর্তাদের সঙ্গে একরকম রফা করেই দেশ ছেড়েছিলেন তারেক। প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তার ‘কারাগারে কেমন ছিলাম (২০০৭-২০০৮)’ বইয়ে লিখেছেন, “এমনও হতে পারে তিনি (খালেদা জিয়া) জেনারেলদের সাথে এই সমঝোতা করেছিলেন যে, তারেক রহমান আপাতত নিজেকে রাজনীতিতে জড়াবেন না এবং এই মর্মে তারেক রহমান কোনেও সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরও দিয়ে থাকতে পারেন।”
২০২৪ সালের অগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর সব মামলা থেকে তারেককে মুক্ত করা হয়। ২০০৪ সাল থেকে তারেকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মোট ৭৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৪ সালে একটি, ২০১৫ সালে তিনটি, ২০১৬ সালে আটটি, ২০১৭ সালে ছ’টি, ২০১৮ সালে চারটি, ২০১৯ সালে পাঁচটি, ২০২০ সালে একটি, ২০২১ সালে একটি এবং ২০২২ সালে পাঁচটি মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তারেককে। খালেদা-পুত্র সবচেয়ে বেশি (৪২) মামলায় মুক্তি পেয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। তার পরেই তাঁর দেশে ফেরার পথ প্রশস্ত হয়ে গিয়েছিল বলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল।
এর মধ্যেই বিএনপি নেত্রী খালেদা অসুস্থ হয়ে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হন। সেই পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরার জন্য তারেকের মুখাপেক্ষী হয়েছিলেন বিএনপি-র নেতা-কর্মীরা। এর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছরের নির্বাসনপর্ব কাটিয়ে স্ত্রী-কন্যাসহ বাংলাদেশে ফেরেন খালেদা-পুত্র তথা বিএনপি-র চেয়ারম্যান তারেক। উজ্জীবিত হয় বিএনপি।
হলফনামায় উল্লিখিত তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তারেকের বার্ষিক আয় ৬ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা। তাঁর স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য ১ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা (সব হিসাব বাংলাদেশি মুদ্রায়)। এর মধ্যে রয়েছে হাতে থাকা নগদ, ব্যাঙ্কে জমানো টাকা, শেয়ার, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু, আসবাবপত্র। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে তারেকের দুই একরের কিছু বেশি অকৃষিযোগ্য জমি রয়েছে, যার মূল্য ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা।
তারেকের ব্যাঙ্কে রাখা টাকার পরিমাণ ৩১ লক্ষ ৫৮ হাজার টাকার কিছু বেশি। তাঁর ৬৮ লক্ষ টাকার শেয়ার রয়েছে। ব্যাঙ্কে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে ৯০ লক্ষ ২৪ হাজার টাকার কিছু বেশি। সঞ্চয়ী ও অন্যান্য আমানত রয়েছে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকার। তারেকের কাছে থাকা আসবাবপত্রের মূল্য প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তারেকের নামে কোনও ঋণ নেই।
তারেকের স্ত্রী জুবাইদা রহমান পেশায় চিকিৎসক। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তাঁর আয় প্রায় ৩৫ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা। এই সময়ের মধ্যে তিনি প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ টাকা আয়কর জমা দিয়েছেন। আয়কর বিবরণী বা রিটার্নে তারেক-পত্নী ১ কোটি ৫ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার কিছু বেশি সম্পত্তি দেখিয়েছেন। তার মধ্যে ব্যাঙ্কে জমা এবং নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬৬ লক্ষ টাকা, স্থায়ী আমানতের পরিমাণ ৩৫ লক্ষ টাকা এবং সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার টাকা। জুবাইদার নামে কোনও স্থাবর সম্পত্তি নেই।
তারেকের জয় নিশ্চিত জেনে বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে শুভেচ্ছাবার্তা। তারেককে অভিনন্দন জানিয়ে সমাজমাধ্যমে বাংলায় পোস্ট করেছেন ভারতের প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একসঙ্গে কাজের বার্তা দিয়েছেন। পাকিস্তান থেকেও এসেছে শুভেচ্ছাবার্তা। তারেককে জয়ের অভিনন্দন জানিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বার্তা দিয়েছেন তিনি। বার্তা এসেছে পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জ়ারদারির কাছ থেকেও। তারেককে শুভেচ্ছা জানিয়েছে আমেরিকাও।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy