Muhammad Yunus approves millions of rupees project may impact on national election of Bangladesh dgtl
Muhammad Yunus and Bangladesh Election
৪০ নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ বিপুল টাকা, সবার উপরে চট্টগ্রাম, শেষ রাতে ওস্তাদের চাল দিয়ে ভারতের চিন্তা বাড়ালেন ইউনূস?
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন। ভোটের মুখে ৪০টি নতুন প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন ঢাকার অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনে পড়বে এর প্রভাব?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০০
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১২০
কথায় বলে, ওস্তাদের মার শেষ রাতে! বিদায়বেলায় সেই প্রবাদই যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সরকার। স্লগ ওভারে চালিয়ে খেলে ৬৪টির বেশি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন পদ্মাপারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিও সেরেছে ঢাকা। এর জেরে আগামী দিনে কতটা লাভবান হবে পূর্বের প্রতিবেশী? ভারতের উপরেই বা পড়বে কেমন প্রভাব?
০২২০
বাংলাদেশে চলছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন। ঠিক তার আগে একের পর এক প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে চমকে দিয়েছেন অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘প্রথম আলো’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে নজিরবিহীন ভাবে ৬৪টি প্রকল্পের জন্য ১ লক্ষ ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি বাংলাদেশি টাকা খরচের কথা ঘোষণা করেছে ইউনূস প্রশাসন।
০৩২০
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নির্বাচনের মুখে অনুমোদন পাওয়া ৬৪টির মধ্যে ৪০টিই নতুন প্রকল্প। ‘প্রথম আলো’ জানিয়েছে, তার জন্য ৭৯ হাজার ৩৫৬ কোটি বাংলাদেশি টাকা ব্যয় বরাদ্দ করেছেন ইউনূস। তালিকায় বেশ কয়েকটি ‘কম জরুরি’ ও ‘বিতর্কিত’ প্রকল্পও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এ-হেন সিদ্ধান্ত ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। যদিও কোনও স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেনি ঢাকা।
০৪২০
পদ্মাপারের গণমাধ্যমগুলির দাবি, গত দেড় বছরে মোট ১৩৫টি নতুন প্রকল্প নিয়ে এসেছে ইউনূস প্রশাসন। তাতে মোট ২ লক্ষ ৩ হাজার কোটি বাংলাদেশি টাকা খরচের সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে তারা। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে অবশ্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা গিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে। পিছিয়ে থাকা স্বাস্থ্য পরিষেবাকে উন্নত করতে তিনটি প্রকল্প অনুমোদন করেছেন তিনি। এ ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো খাতেও ব্যয় বৃদ্ধি করেছে ঢাকা।
০৫২০
গত দেড় বছরের বেশি সময়ে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যাপারে মোট ১৯টি বৈঠক করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। গত ২৫ জানুয়ারি মোট ১৪টি প্রকল্পে সবুজ সঙ্কেত দেয় ইউনূস প্রশাসন। এর জন্য খরচ হবে ১৯ হাজার ১৬৫ কোটি বাংলাদেশি টাকা। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর ১৪টি নতুন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল ঢাকা। তাতে ৪৫ হাজার ৮০ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ করে পদ্মাপারের সরকার।
০৬২০
ইউনূস সরকারের সমালোচকদের দাবি, ভোটের মুখে বেশ কয়েকটি নতুন প্রকল্পে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নতির কথা বলা হয়েছে। অন্তর্বর্তিকালীন প্রশাসনের এ-হেন সিদ্ধান্ত বিশেষ কয়েকটি দল বা প্রার্থীকে সুবিধা পাইয়ে দিতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। উদাহরণ হিসাবে সাতক্ষীরার কথা বলা যেতে পারে। সেখানকার পরিকাঠামো উন্নতির জন্য ১ হাজার ৯৩০ কোটি বাংলাদেশি টাকা বরাদ্দ করেছেন নোবেলজয়ী প্রধান উপদেষ্টা।
০৭২০
তবে দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দিকে আলাদা করে জোর দেয়নি ইউনূসের অন্তর্বর্তিকালীন সরকার। পাশাপাশি মেগা পরিকল্পনার বদলে ছোট ছোট পরিকাঠামোগত উন্নতিকে পাখির চোখ করেছে তাঁর প্রশাসন। এমনটাই উঠে এসেছে ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদনে। গত দেড় বছরের বেশি সময়ে পাঁচ হাজার কোটি বা তার বেশি অর্থ বরাদ্দের মাত্র সাতটি প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে ঢাকা। তার মধ্যে রয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামের কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ।
০৮২০
এ ছাড়া ইউনূসের সবুজ সঙ্কেত দেওয়া বেশ কয়েকটি প্রকল্পকে ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ বলে চিহ্নিত করেছে ‘প্রথম আলো’। সেই তালিকায় আজ়িমপুরে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল নির্মাণ, দমকল আধিকারিকদের জন্য বহুতল নির্মাণ এবং চট্টগ্রামে কর ভবন নির্মাণ প্রকল্পকে রেখেছে পদ্মাপারের ওই গণমাধ্যম। সংশ্লিষ্ট তিন প্রকল্পে যথাক্রমে ৭৭৫ কোটি, ৬৫ কোটি এবং ৪৩৭ কোটি বাংলাদেশি টাকা ব্যয় বরাদ্দ করেছে ঢাকা।
০৯২০
অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য সবচেয়ে বেশি টাকা বরাদ্দ করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ় সম্পদ খাতে। এতে মোট ১৩টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এর মধ্যে রয়েছে ১২টি প্রাকৃতিক গ্যাসের কূপ খনন, অনুসন্ধান ও সরবরাহ। ইউনূস যে এ ব্যাপারে বিদেশি নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছেন, তা বলাই বাহুল্য। তাঁর আমলে পিছিয়ে থাকেনি ধর্ম মন্ত্রকও। বরং প্রকল্পের নিরিখে যথেষ্ট উপরের দিকে জায়গা পেয়েছে ওই দফতর। নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বাড়াতে মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পে ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি বাংলাদেশি টাকা বরাদ্দ করেছেন তিনি।
১০২০
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে সরকারি আনুকূল্যের নিরিখে সাধারণত পিছিয়ে থাকত ধর্ম মন্ত্রক। সেই নীতি থেকে পুরোপুরি সরে এসেছেন নোবেলজয়ী ইউনূস। উল্টে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বাড়াতে মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পে ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি বাংলাদেশি টাকা বরাদ্দ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। এ ছাড়া জেলাভিত্তিক প্রকল্পের নিরিখে সবার উপরে রয়েছে চট্টগ্রাম। বন্দর সংলগ্ন ওই এলাকার জন্য মোট ১২টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
১১২০
শুধুমাত্র চট্টগ্রামের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ৭৬ হাজার ২৭৪ কোটি বাংলাদেশি টাকা বরাদ্দ করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। সেটা নতুন প্রকল্পগুলির মোট ব্যয়ের ৩৮ শতাংশ বলে জানা গিয়েছে। চট্টগ্রামকে বাদ দিলে পৃথক প্রকল্প পাওয়া জেলার সংখ্যা ৪৩। এ ছাড়া বিদায়বেলায় ‘ঢাকা ওয়াসা প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা অ্যাকাডেমি’ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে ইউনূস প্রশাসন। এর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) থেকে ৫৭১ কোটি বাংলাদেশি টাকা ঋণ নেবে পদ্মাপারের প্রতিবেশী।
১২২০
ঘরোয়া প্রকল্পগুলির পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের ঠিক মুখে আমেরিকার সঙ্গে মেগা বাণিজ্যচুক্তি সেরেছেন ইউনূস। এর পোশাকি নাম পারস্পরিক শুল্কচুক্তি। সেখানে বলা হয়ছে, যুক্তরাষ্ট্রের থেকে যাত্রিবাহী বিমান কিনবে ঢাকা। বিনিময়ে পদ্মাপারের বেশ কিছু বস্ত্র এবং পোশাকসামগ্রীর উপর থেকে পারস্পরিক শুল্ক প্রত্যাহার করবে ওয়াশিংটন। প্রধান উপদেষ্টার এই পদক্ষেপকে অনেকেই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
১৩২০
আমেরিকা ও ইউরোপের উন্নত দেশগুলিতে মূলত বস্ত্র রফতানি করে থাকে বাংলাদেশ। বিদেশি মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এটাই ঢাকার অন্যতম বড় মাধ্যম। বর্তমানে আন্তর্জাতিক কাপড়ের বাজারে নিজের জায়গা পোক্ত করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূসের বাণিজ্যচুক্তি নয়াদিল্লির রাস্তায় বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
১৪২০
এত দিন বাংলাদেশি পণ্যে ১৯ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রেখেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য দিকে ভারতীয় সামগ্রীতে শুল্কের মাত্রা ৫০ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন তিনি। এই হিসাবে আমেরিকার বাজারে ঢাকার তুলনায় সস্তায় পোশাক ও কাপড় বিক্রি করার সুযোগ পেত নয়াদিল্লি। কিন্তু, নতুন বাণিজ্যচুক্তির ফলে সেটাই পুরোপুরি পদ্মাপারের দিকে হেলে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ইউনূসের সমঝোতায় আরও কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বস্ত্র নিয়ে যেতে পারবেন বাংলাদেশি রফতানিকারীরা।
১৫২০
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পত্তির তথ্য প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ। ওই রিপোর্টে গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সম্পদের হিসাব দিয়েছে ঢাকা। তাতে দেখা গিয়েছে এক বছরের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ইউনূসের বেড়েছে ১ কোটি ৬১ লক্ষ ৪ হাজার ৩৯২ বাংলাদেশি টাকার সম্পত্তি।
১৬২০
রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছরের (পড়ুন ২০২৫) ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মোট সম্পদ ছিল ১৫ কোটি ৬২ লক্ষ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকার। এর এক বছর আগে তা ছিল ১৪ কোটি ১ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা।
১৭২০
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ১৪ কোটি ৭৬ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪০১ বাংলাদেশি টাকার আর্থিক সম্পত্তি রয়েছে ইউনূসের। এক বছর আগে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ১৮ লক্ষ ৭১ হাজার ৪৩৩ টাকা। আর তাঁর স্থাবর সম্পদ (এ তালিকায় আছে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট-সহ সব ধরনের স্থাবর সম্পদ) আছে ২১ লক্ষ ৬ হাজার ২৫০ টাকার। এক বছর আগে তা ছিল ২০ লক্ষ ৯২ হাজার ৫০০ টাকার।
১৮২০
এ ছাড়া দেশের বাইরে ইউনূসের ৬৪ লক্ষ ৭৩ হাজার ৪১৪ টাকার সম্পত্তি রয়েছে। এক বছর আগে যেটা ছিল ৬১ লক্ষ ৭৫ হাজার ৭৪০ টাকার। রিপোর্টে বলা আছে, সঞ্চয়পত্র, মেয়াদি আমানতে বৃদ্ধি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ার ইত্যাদি কারণে এক বছরে ১ কোটি ৬১ লক্ষ ৪ হাজার ৩৯২ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে নোবেলজয়ী প্রধান উপদেষ্টার।
১৯২০
প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের মোট সম্পদ ১ কোটি ২৭ লক্ষ ৬৩ হাজার ৩৬০ টাকার, যা আগের বছর ছিল ২ কোটি ১১ লক্ষ ৭৭ হাজার ২৭৪ টাকার। সে হিসাবে এক বছরে আফরোজীর সম্পদ কমেছে ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টাকা। তাঁর ৪ লক্ষ ৫১ হাজার ৮৬০ টাকার আর্থিক সম্পত্তি এবং ১ কোটি ২৩ লক্ষ ১১ হাজার ৫০০ টাকার স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। এ ছাড়াও মাথার উপরে আছে ১৬ লক্ষ ৯৬ হাজার টাকার ঋণ।
২০২০
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হলে বাস্তবায়িত হবে ইউনূসের অনুমোদন দেওয়া যাবতীয় প্রকল্প। তখন অবশ্য সেখানে কাটছাঁটের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলি ভোটে কতটা প্রভাব ফেলে মিলবে তারও উত্তর।