বিশ্বে ডবল এজেন্টদের ইতিহাস অনেক পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে চিনের সেনানায়ক সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে ডবল এজেন্ট নিয়োগের জন্য উদার ভাবে ব্যয় করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সান জু তাঁর ‘দ্য আর্ট অফ ওয়ার’-এ লিখেছেন, ‘‘আমাদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করতে আসা শত্রুর গুপ্তচরদের খুঁজে বার করতে হবে, ঘুষ দিয়ে প্রলুব্ধ করতে হবে, দূরে নিয়ে যেতে হবে এবং আরামে আশ্রয় দিতে হবে। এই ভাবে তাঁরা ডাবল এজেন্ট হয়ে উঠবে এবং আমাদের সেবা করার জন্য তৈরি থাকবে।’’
ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত ডাবল এজেন্ট রয়েছেন, যাঁরা একা হাতে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিলেন। গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ডাবল এজেন্ট ছিলেন মাতা হারি। মাতা ছিলেন এক জন বিদেশি নৃত্যশিল্পী এবং যৌনকর্মী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ১৯১৭ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ফ্রান্স।
১৯৬৯ সালে সহকর্মী তথা সিআইএ এজেন্ট ন্যান্সি সেগেবার্থকে বিয়ে করেন অলড্রিচ। এর পর তাঁকে তুরস্কে বিদেশি এজেন্ট নিয়োগের জন্য কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অফিসার হিসাবে পাঠানো হয়। কিন্তু আঙ্কারায় অলড্রিচের ঊর্ধ্বতনেরা মনে করেছিলেন তিনি গুপ্তচর হওয়ার অযোগ্য। চেয়ারে বসে কম্পিউটারের কাজই ভাল তাঁর জন্য। সে কথা অলড্রিচের তুরস্কের ঊর্ধ্বতনেরা সিআইএ-র সদর দফতরে চিঠি লিখে জানিয়েওছিলেন।
১৯৭২ সালে ব্যর্থ গুপ্তচর হিসাবে আমেরিকায় ফিরে আসেন অলড্রিচ। ব্যর্থতা মেনে না নিতে পেরে প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান শুরু করেন তিনি। দাম্পত্যজীবনেও সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। পরে বিয়ে ভেঙেও যায়। এর পর সিআইএ-তে তাঁর স্থবির কেরিয়ার শুরু করার জন্য রুশ ভাষা শিখতে শুরু করেন অলড্রিচ। এর পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সোভিয়েত বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
ওই সময় কলম্বিয়ার দূতাবাসের এক কর্মী এবং সিআইএ-র গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ মারিয়া দেল রোজ়ারিও কাসাস ডুপুয়ের সঙ্গে প্রেম শুরু করেন অলড্রিচ। পরে তাঁকে বিয়েও করেন। অলড্রিচকে নতুন সংসার যেমন টানতে হত, তেমনই মাসে মাসে খোরপোশ দিতে হত প্রথম স্ত্রীকে। ধীরে ধীরে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন তিনি। প্রচুর টাকার দরকার পড়েছিল তাঁর।
১৯৮৫ সালে ভার্জিনিয়ার ল্যাংলিতে অবস্থিত সিআইএ সদর দফতরে সোভিয়েত/পূর্ব ইউরোপীয় বিভাগে নিযুক্ত থাকাকালীন ওয়াশিংটনে থাকা সোভিয়েত দূতাবাসে গোপনে যোগাযোগ করেন অলড্রিচ। টাকার বিনিময়ে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। জানা যায়, সোভিয়েতে গোপনে এফবিআই-এর হয়ে কাজ করা কয়েক জন কেজিবি অফিসারের নাম দিয়েছিলেন অলড্রিচ। পরিবর্তে পেয়েছিলেন ৫০ হাজার ডলার।
১৯৮৬ সালের জুলাইয়ে অলড্রিচকে ইটালির রোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রোমে গিয়েও কেজিবির সঙ্গে বন্ধুত্ব চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। গোপনে বৈঠক করার পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে কেজিবি কর্তাদের সিআইএ-র গোপন নথি পাচার করতেন তিনি। রোমে কার্যভার শেষে ১৯৮৯ সালে আবার ওয়াশিংটনে ফিরে এসেছিলেন অলড্রিচ। সেখানেও ডবল এজেন্ট হিসাবে কেজিবির সঙ্গে গোপন আঁতাঁত বজায় রেখেছিলেন তিনি। কেজিবি কর্তাদের গোপনে নথি পাচারের জন্য কয়েক বছরে প্রায় ২৭ লক্ষ ডলার পেয়েছিলেন অলড্রিচ।
অবশেষে ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয় অলড্রিচকে। তার আগে প্রায় ১০ মাস ধরে তাঁর গতিবিধির উপর নজর রেখেছিলেন সিআইএ আধিকারিকেরা। গ্রেফতারির সময় অলড্রিচের বয়স ছিল ৩১। সিআইএ-র উচ্চপদস্থ এবং অভিজ্ঞ কর্তা হিসাবে কর্মরত ছিলেন তিনি। অলড্রিচের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রোজ়ারিওকেও গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছিল, রাশিয়ার কাছে নথি পাচারে অলড্রিচকে প্রত্যক্ষ ভাবে সমর্থন করেছিলেন রোজ়ারিও।
তদন্ত চলাকালীন ১৯৯৪ সালের ২৮ এপ্রিল অলড্রিচ এবং রোজ়ারিও— উভয়েই নিজেদের দোষ স্বীকার করেন। অলড্রিচকে প্যারোলে মুক্তির সম্ভাবনা ছাড়াই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রোজ়ারিওকে দেওয়া হয় ৬৩ মাসের কারাদণ্ড। তার পর থেকে জেলেই বন্দি ছিলেন অলড্রিচ। আমেরিকার একাধিক কারাগারে ঠাঁই হয়েছিল তাঁর। মেরিল্যান্ডের জেলে থাকাকালীন গত ৫ জানুয়ারি ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যু হয় অলড্রিচের।
তৎকালীন সিআইএ পরিচালক আর জেমস উলসি এক বার বলেছিলেন, ‘‘আমাদের অনেক গোয়েন্দা এবং চরের প্রাণ গিয়েছিল কারণ অলড্রিচের মতো বিশ্বাসঘাতক জীবনে বড় বাড়ি-গাড়ি চেয়েছিলেন।’’ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বয়সকালে অলড্রিচ নিজেও তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। জানিয়েছিলেন ভদকা, অহঙ্কার, মহত্ত্বের ভ্রান্ত ধারণা এবং লোভের কারণেই বিপথে চালিত হয়েছিলেন তিনি।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy