আতঙ্কের নাম ‘ডার্ক প্যাটার্ন’, অজান্তেই প্রতি বছর ২৫ হাজার কোটি টাকা খোয়াচ্ছে আমজনতা! কী ভাবে কাজ করে ‘অন্ধকার নকশা’?
ডার্ক প্যাটার্ন হল বিভিন্ন অনলাইন সংস্থার এমন কিছু কৌশল, যা গ্রাহকদের এমন কোনও কাজ করতে বা অর্থ খরচ করতে প্ররোচিত করে বা বিভ্রান্ত করে যা তাঁরা আসলে করতে চাননি বা করার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।
গত কয়েক বছরে ই-কমার্স এবং কুইক কমার্স (দ্রুত পণ্য সরবরাহ পরিষেবা) সংস্থাগুলির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। দেশে অনেক গ্রাহকই প্রতি দিন অন্তত এক বার কোনও পণ্য অর্ডার করেন বা অনলাইনে কোনও পরিষেবা বুক করেন। এর মধ্যে থাকে ক্যাব বুক করা, খাবার বা মুদি দোকানের সামগ্রী অর্ডার করা কিংবা গৃহকর্মী নিয়োগ করা।
অর্ডার বা বুকিং করার সময়, টাকা মেটানোর সময় বা চেকআউট পেজে অনেক গ্রাহকই কখনও কখনও কিছু অপ্রত্যাশিত ফি, যেমন আগে থেকেই টিক দেওয়া কোনও অনুদানের বাক্স, আগে থেকে নির্বাচিত বিমা বা অন্যান্য অতিরিক্ত পরিষেবা (অ্যাড-অন) অথবা নতুন সাবস্ক্রিপশন বা তা নবায়নের জন্য টিক দেওয়া কোনও বাক্স ইত্যাদি লক্ষ করে থাকেন।
তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকলে অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্রাহকদের এগুলির জন্য টাকা খরচ করতে হয়। কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহৃত এই ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ আদতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে নিচ্ছে গ্রাহকদের কাছ থেকে। আসলে পণ্য কেনার সময় ওই সব অবাঞ্ছিত অর্থের পরিমাণ এতই সামান্য থাকে যে গ্রাহকদের উপর বিশেষ কোনও প্রভাব পড়ে না। কিন্তু যখন হাজার হাজার গ্রাহকের এই দু’টাকা-পাঁচ টাকা একসঙ্গে যোগ হয়, তখন তার পরিমাণ হয় আকাশছোঁয়া।
বাজার গবেষণা সংস্থা ‘ডেটাম ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রকাশিত ‘ডার্ক প্যাটার্নস ইন ইন্ডিয়াজ় অনলাইন মার্কেটপ্লেসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহৃত ডার্ক প্যাটার্নের কারণে ভারতীয় গ্রাহকেরা প্রতি বছর প্রায় ২৫,০০০ কোটি থেকে ২৮,০০০ কোটি টাকা খোয়াচ্ছেন।
কী এই ‘ডার্ক প্যাটার্ন’? এগুলি রোধে ‘সেন্ট্রাল কনজ়িউমার প্রোটেকশন অথরিটি’ (সিসিপিএ)-র নির্দেশিকা কী? ডার্ক প্যাটার্ন হল বিভিন্ন অনলাইন সংস্থার এমন কিছু কৌশল, যা গ্রাহকদের এমন কোনও কাজ করতে বা অর্থ খরচ করতে প্ররোচিত করে বা বিভ্রান্ত করে যা তাঁরা আসলে করতে চাননি বা করার কোনও উদ্দেশ্য তাঁদের ছিল না। ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ গ্রাহকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ বা ব্যাহত করে, যা এক ধরনের অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যকলাপ বা গ্রাহক অধিকারের লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য হয়। এগুলি কোনও ভাবেই গ্রাহকের স্বার্থের অনুকূল নয়।
আরও পড়ুন:
২০২৩ সালের নভেম্বরে সিসিপিএ ‘ডার্ক প্যাটার্ন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্দেশিকা, ২০২৩’ নামে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এই নির্দেশিকাটি ডার্ক প্যাটার্ন প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে এবং এটি সমস্ত প্ল্যাটফর্ম, বিজ্ঞাপনদাতা ও বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ওই বিজ্ঞপ্তিতে সিসিপিএ ১৩টি সুনির্দিষ্ট ডার্ক প্যাটার্ন চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত করেছে।
কোনও কিছু বুকিং করার সময় অনেক গ্রাহকেরই ‘আর মাত্র কয়েকটি বাকি আছে’ (পোশাকের ক্ষেত্রে), ‘দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে’ (সিনেমার টিকিটের ক্ষেত্রে), ‘এই মুহূর্তে আরও ৫০ জন এটি দেখছেন’ (ট্যুর প্যাকেজের ক্ষেত্রে) কিংবা ‘মাত্র ৫ মিনিটের জন্য বিশেষ অফার’ (মেম্বারশিপ অফারের ক্ষেত্রে) ইত্যাদি বার্তা চোখে পড়ে। এই ধরনের বার্তাগুলি জরুরি অবস্থা বা পণ্য হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, এমন এক কৃত্রিম ধারণা তৈরি করে এবং গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করে তখনই ওই পণ্য কেনা বা পরিষেবা নিতে প্ররোচিত করে।
এর মধ্যে অন্যতম ‘বাস্কেট স্নিকিং’। গ্রাহকেরা কখনও কখনও লক্ষ করেন যে তাঁদের সম্মতি ছাড়াই অনলাইন কেনাকাটার ঝুড়িতে (বাস্কেট বা কার্ট) অতিরিক্ত কিছু পণ্য বা পরিষেবা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে গ্রাহকদের নির্বাচিত পণ্য বা পরিষেবার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে মোট বিলের পরিমাণ বেড়ে যায়।
যেমন কোনও বৈদ্যুতিন ডিভাইস বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের পণ্য কেনার সময় এর সঙ্গে একটি বর্ধিত ওয়ারেন্টি পরিষেবা যুক্ত করে দেওয়া হয়। খাবার অর্ডার করার সময় এমন কোনও মেম্বারশিপ বা সদস্যপদ যুক্ত করা হয়, যা বিনামূল্যে ডেলিভারি ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করে। বিমানের টিকিট বুক করার সময় ভ্রমণবিমা বা টিকিট বাতিলজনিত বিমা পরিকল্পনা যুক্ত করা হয়। একেই বলা হয় ‘বাস্কেট স্নিকিং’।
আরও পড়ুন:
আরও আছে। কোনও গ্রাহক হয়তো অনলাইনে একটি আকর্ষণীয় নিবন্ধ বা লেখা খুঁজে পেলেন, কিন্তু কয়েক অনুচ্ছেদ পড়ার পরই লেখাটি পুরোপুরি পড়ার জন্য তাঁদের বিনামূল্যে সাইন-আপ করতে বা কোনও বিনামূল্যের নিউজ়লেটারে সাবস্ক্রাইব করতে বাধ্য করা হয়। কিছু প্ল্যাটফর্ম লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য গ্রাহকদের টাকার বিনিময়ে সাবস্ক্রিপশন কিনতে বাধ্য করে। আবার কিছু প্ল্যাটফর্ম নির্দিষ্ট কিছু ফিচার বা সুবিধা ব্যবহারের জন্য তাদের অ্যাপ ডাউনলোড করতে বাধ্য করে গ্রাহকদের।
কিছু প্ল্যাটফর্ম কোনও পণ্য বা পরিষেবা বিনামূল্যে ‘ট্রায়াল’ বা পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সুযোগ দেয়। তবে, সেই ট্রায়াল শুরু করার আগেই সংস্থাটি গ্রাহকদের কাছে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য বা অর্থপ্রদানের অন্যান্য মাধ্যম সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে বসে। কিছু অ্যাপ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগে ‘কন্টাক্ট লিস্ট’ দেখার বা মেসেজ পড়ার অনুমতি চাওয়া হয়। অর্থাৎ, এই ডার্ক প্যাটার্নের ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মটি গ্রাহককে এমন কোনও পদক্ষেপ করতে বাধ্য করে যেখানে সাইন-আপ করা, সাবস্ক্রাইব করা, অ্যাপ ডাউনলোড করা বা ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না।
রয়েছে ‘সাবস্ক্রিপশন’-এর ফাঁদও। যে কোনও ডিটিএইচ চ্যানেলের সাবস্ক্রিপশন নেওয়া সহজ! কেবল একটি নির্দিষ্ট নম্বরে মিস্ড কল দিলেই তা হয়ে যায়। অথচ সেই ডিটিএইচ চ্যানেলেরই সাবস্ক্রিপশন বাতিল করতে হলে গ্রাহককে হয়তো ডিটিএইচ সংস্থার অ্যাপ ডাউনলোড করে ‘আনসাবস্ক্রাইব’ অপশনটি খুঁজে বার করতে হয়। অথবা সংস্থার কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে জটিল প্রক্রিয়া পেরিয়ে কোনও প্রকৃত প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার পর তা সম্ভব হয়।
একই ভাবে অনেকেই হয়তো নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করা সহজ। মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই সব কাজ সেরে ফেলা যায়? কিন্তু যখন সেই ক্রেডিট কার্ডটি বন্ধ করার প্রয়োজন হয়, তখন সাধারণত অনলাইনে তা করার কোনও সুযোগ থাকে না। তখন গ্রাহককে হয় কাস্টমার কেয়ারে ইমেল বা ফোন করতে হয়, অথবা কাজ থেকে ছুটি নিয়ে ব্যাঙ্কের শাখায় গিয়ে কার্ড বন্ধের ফর্ম জমা দিতে হয়।
অর্থাৎ, ‘সাবস্ক্রিপশন ট্র্যাপ’ বা সাবস্ক্রিপশন-সংক্রান্ত ফাঁদ এমন এক ব্যবস্থা যা কোনও সাবস্ক্রিপশন বাতিল করার প্রক্রিয়াকে জটিল, দীর্ঘ, অস্পষ্ট, বিভ্রান্তিকর এবং ঝামেলাপূর্ণ করে তোলে। তেমনটাই দাবি প্রতিবেদনে।
এ ছাড়াও রয়েছে ‘ড্রিপ প্রাইসিং’ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে শুরুতেই পণ্যের বা পরিষেবার সম্পূর্ণ মূল্য জানানো হয় না। গ্রাহক হয়তো কার্টে পণ্য যোগ করলেন, কিন্তু চেকআউট পেজে গিয়ে দেখলেন প্ল্যাটফর্ম ফি, ডিসকাউন্ট প্রসেসিং ফি, ডেলিভারি ফি, প্যাকেজিং ফি ইত্যাদির মতো বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে। আবার গ্রাহক হয়তো কোনও প্রোগ্রামের ফ্রি মেম্বারশিপ বা সদস্যপদ নিলেন। কিন্তু যখনই বিশেষ কোনও ফিচার ব্যবহার করতে গেলেন, তখন ‘পেইড মেম্বারশিপ’ কেনার জন্য বলা হল। আবার কখনও হয়তো গ্রাহক সামান্য অর্থের বিনিময়ে সদস্যপদ নিয়ে নিলেন, কিন্তু বিশেষ ফিচার ব্যবহারের সময় আরও টাকা দিতে বলা হল। এ সবই ‘ড্রিপ প্রাইসিং’ পদ্ধতির আওতায় পড়ে।
‘ন্যাগিং’ বা অনবরত তাগাদা দেওয়াও একটি ডার্ক প্যাটার্ন। উদাহরণস্বরূপ, গ্রাহক হয়তো কোনও আকর্ষণীয় নিবন্ধ পড়ার জন্য একটি ওয়েবসাইটে গেলেন। কিন্তু বার বার পপ-আপ বিজ্ঞাপন, সাইডবার বিজ্ঞাপন বা লেখার মাঝখানে আসা বিজ্ঞাপনের কারণে পড়ায় ব্যাঘাত ঘটতে থাকল। কিংবা গ্রাহক হয়তো একটি ভিডিয়ো দেখছেন, সেখানেও কয়েক মিনিট অন্তর বিজ্ঞাপনের কারণে বিরক্ত হচ্ছেন। এর সমাধান হিসাবে গ্রাহককে বিজ্ঞাপন-মুক্ত ‘পেইড সাবস্ক্রিপশন’ কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ন্যাগিং বলতে বোঝায় গ্রাহককে বার বার বিভিন্ন বার্তা বা বাধার মাধ্যমে বিরক্ত করা, যাতে বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে তাঁকে কোনও কিছু কিনতে বা পরিষেবা গ্রহণ করতে প্ররোচিত করা যায়। ন্যাগিং-এর আরও কিছু উদাহরণ হল— কোনও প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে বার বার তাদের অ্যাপ ডাউনলোড করতে, কুকিজ় ‘অ্যাক্সেপ্ট’ করতে, মোবাইল নম্বর শেয়ার করতে বা নোটিফিকেশন চালু করতে তাগাদা দেওয়া।
অন্যান্য প্রচলিত ডার্ক প্যাটার্নের মধ্যে রয়েছে ‘কনফার্ম শেমিং’, ‘ইন্টারফেস ইন্টারফেয়ারেন্স’, ‘বেট অ্যান্ড সুইচ’, ছদ্ম বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন এবং ক্ষতিকারক ম্যালঅয়্যার। নভেম্বর ২০২৩-এর নির্দেশিকাগুলি আরও কঠোর ভাবে কার্যকর করার লক্ষ্যে সিসিপিএ গত বছরের ৫ জুন একটি পরামর্শপত্র জারি করে। তাতে ই-কমার্স সংস্থা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিকে তাদের নিজস্ব সিস্টেম বা ইন্টারফেস যাচাই করতে এবং সেখান থেকে ডার্ক প্যাটার্নগুলি অপসারণ করতে বলা হয়েছে।
ডার্ক প্যাটার্নের ব্যবহার রোধে কিছু প্ল্যাটফর্মের উপর জরিমানাও আরোপ করেছে সিসিপিএ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের জুন মাসে পড়াশোনা সংক্রান্ত অ্যাপ ‘ফিজ়িক্সওয়ালা’কে ৫ লক্ষ টাকা এবং অ্যান্টিভাইরাস সংস্থা ‘এমক্যাফে’কে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। সিসিপিএ উভয় সংস্থাকেই তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ডার্ক প্যাটার্নগুলি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে।
কঠোর ভাবে নিয়ম পালন করার জন্য প্ল্যাটফর্মগুলিকে পরামর্শ দিয়েছে সিসিপিএ। এ ছাড়া ডার্ক প্যাটার্ন ব্যবহারে রোধে কিছু প্ল্যাটফর্মকে জরিমানা করেছে। তবে, প্ল্যাটফর্মগুলির নির্দেশিকা পালনের ক্ষেত্রে এখনও অনেক খামতি রয়ে গিয়েছে। যেহেতু কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম এখনও কিছু ডার্ক প্যাটার্ন ব্যবহার করে, গ্রাহকেরা সতর্ক হয়ে তা শনাক্ত করতে না পারলে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হতে থাকবে।