ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে সামরিক বিমান মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সোমবার নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড (নোরাড) জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের পিতুফিকে আমেরিকার সেনাঘাঁটিতে শীঘ্রই সামরিক বিমান পৌঁছে যাবে। ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা গ্রিনল্যান্ডের মার্কিন ঘাঁটিতে সামরিক বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গ্রিনল্যান্ডের উপর ডেনমার্কের দাবির আইনি ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ৫০০ বছর আগে ডেনমার্কের একটি নৌকা গ্রিনল্যান্ডে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেই জায়গার মালিকানাও ডেনমার্কের। উল্লেখযোগ্য ভাবে, এই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় বার ট্রাম্প এই ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ডের উপর ডেনমার্কের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
কারণ, নজরের আড়ালে থাকা বা নতুন কোনও জায়গায় সবার আগে নৌকা অবতরণের ফলে মালিকানা অধিকারের দাবি অন্তত পাঁচ শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক আইনের একটি ঐতিহাসিক নীতির অংশ। সেই নীতি পরিচিত ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’ বা ‘গানবোট কূটনীতি’ নামে। ভ্যাটিকান দ্বারাও বৈধতা পেয়েছিল সেই নীতি। এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাটিন আমেরিকায় উপনিবেশবাদের ন্যায্যতা হিসাবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
আবিষ্কারের নীতি (দ্য ডকট্রিন অফ ডিসকভারি) বা খ্রিস্টীয় আবিষ্কারের নীতি (দ্য ডকট্রিন অফ ক্রিশ্চিয়ান ডিসকভারি) পঞ্চদশ শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়েছিল। নীতিটি ভ্যাটিকান থেকে পোপের জারি করা ডিক্রিতে নিহিত ছিল, যা খ্রিস্টীয় ইউরোপীয় শক্তিগুলিকে তাদের দ্বারা আবিষ্কৃত খালি বা খ্রিস্টানদের দ্বারা অধ্যুষিত নয় এমন ভূখণ্ডে নৌকা অবতরণ করে মালিকানা দাবি এবং উপনিবেশ স্থাপনের অধিকার প্রদান করে।
ইউরোপীয় সেই নীতি আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যত্র উপনিবেশবাদকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্যও ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে আবিষ্কৃত ভূখণ্ডে যদি আগে থেকেই খ্রিস্টীয় মতবাদ প্রতিষ্ঠিত থাকে, তা হলে তার উপর কেউ মালিকানা দাবি করতে পারত না। তবে যদি সেখানে আদিবাসীদের বসবাস থাকত, তা হলে সেই ভূখণ্ডে মালিকানা দাবি করতে পারত আবিষ্কারক দেশ।
উদাহরণস্বরূপ, ১৭৭০ সালে যখন ব্রিটিশ অভিযাত্রী এবং মানচিত্রকার জেমস কুক অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন, তখন সেখানে প্রায় ৭,৫০,০০০ লোক বাস করতেন, যাঁরা হাজার হাজার ধরে সেখানে বসবাস করছিলেন। কিন্তু জেমস ভূখণ্ডটিকে ‘টেরা নুলিয়াস’ ঘোষণা করেন। জমিটি খালি ঘোষণা করে রাজা তৃতীয় জর্জের জন্য সেটির মালিকানা দাবি করেন তিনি।
১৪৫২ সালে পোপ পঞ্চম নিকোলাস ‘ডুম ডাইভারসাস’ জারি করেন, যা পর্তুগালের রাজা আফোনসো পঞ্চমকে ‘পৌত্তলিক এবং অন্য যে কোনও অবিশ্বাসী ও খ্রিস্টের শত্রুদের বশীভূত করার’ এবং ‘তাদের চিরস্থায়ী দাসে পরিণত করার’ অধিকার দেয়। ১৪৫৫ সালে, পোপ পঞ্চম নিকোলাস ‘রোমানাস পন্টিফেক্স’ জারি করেন, যা একই ভাবে পর্তুগালের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করে। সেই নথি পর্তুগালকে পশ্চিম আফ্রিকায় রাজত্ব করার এবং বাণিজ্য করারও নির্দিষ্ট অধিকার দিয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদ যুক্তি দেন যে নথিগুলি ‘আটলান্টিক দাস ব্যবসা’কে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্যও ব্যবহৃত হত।
১৪৯৩ সালে আবার পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডার একটি দানপত্র জারি করেন। সেই দানপত্র অনুযায়ী, কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ৫৫৬ কিলোমিটার পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণ রেখা বরাবর বিশ্বকে দু’টি গোলার্ধে বিভক্ত করা হয়েছিল। সেই রেখার পশ্চিমে অবস্থিত দ্বীপপুঞ্জ এবং দেশগুলি স্পেনকে অন্বেষণ, বাণিজ্য, বিজয়, আধিপত্য এবং খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরের জন্য দেওয়া হয়েছিল। পূর্বের দেশগুলি দেওয়া হয়েছিল পর্তুগালকে।
ষোড়শ শতাব্দী জুড়ে পোপের সেই নথি ব্যবহার করে স্পেন এবং পর্তুগাল দাবি করেছিল, পোপ তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রের মধ্যে অভিযান, বাণিজ্য এবং অ-খ্রিস্টীয় ভূমি দখলের একচেটিয়া অধিকার দিয়েছে। কিন্তু ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং সাবেক হল্যান্ড শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা এই দাবির বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল দখল করা আবিষ্কারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফরাসি রাজা কানাডায় উপনিবেশ স্থাপনের ন্যায্যতা প্রমাণ করার জন্য যুক্তি দিয়ে জানিয়েছিলেন, নতুন একটি ভূখণ্ড কেবল চোখ দিয়ে দেখা এবং সেটা আবিষ্কার করার অর্থ মালিকানা নয়। মালিকানার জন্য ভূখণ্ড দখল করা প্রয়োজনীয়। ১৭৯২ সালে আমেরিকার স্বাধীনতার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মার্কিন বিদেশমন্ত্রী টমাস জেফারসনও দাবি করেছিলেন, ইউরোপীয় দেশগুলির তৈরি আবিষ্কার এবং মালিকানা দাবির নীতি আমেরিকার নতুন সরকারের জন্য প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইন।
১৮২৩ সালে আমেরিকার শীর্ষ আদালত ‘জনসন বনাম ম্যাকিনটোশ’ মামলায় তার রায় জারি করে। রায়ে বলা হয়েছিল আবিষ্কারের নীতি বা ‘দ্য ডকট্রিন অফ ডিসকভারি’ ইউরোপীয় এবং ইংরেজ আইনের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি ছিল, যা ব্রিটেনের উত্তর আমেরিকান উপনিবেশগুলিতে কার্যকর ছিল এবং এটি আমেরিকারও আইন। আবিষ্কারের মাধ্যমে একটি ইউরোপীয় দেশ যে একচেটিয়া সম্পত্তির অধিকার অর্জন করে তা সংজ্ঞায়িতও করে মার্কিন আদালত। তার অর্থ ছিল, ইউরোপীয় এবং ইউরো-আমেরিকান ‘আবিষ্কারক’ দেশ কেবল একটি পতাকা লাগানোর মাধ্যমে আদিবাসীদের ভূমিতে প্রকৃত সম্পত্তির অধিকার অর্জন করতে পারত।
যে দেশ সেই ভূখণ্ড আবিষ্কার করেছিল তাদের স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ এবং সেখানে বসতি স্থাপনেরও অধিকার ছিল। প্রকৃত অর্থে আদিবাসীদের অধিকার উপেক্ষা এবং ক্ষুণ্ণ করা হয়েছিল। আমেরিকার আদালতের সেই রায় আজও আমেরিকার আইন এবং বিশ্ব জুড়ে অন্যান্য বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিক দেশগুলির আইনশাস্ত্র এবং ইতিহাসকেও প্রভাবিত করেছে।
পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ ‘দ্য ডকট্রিন অফ ডিসকভারি’কে সমস্ত আদিবাসী উচ্ছেদের চালিকাশক্তি হিসাবে বর্ণনা করেছিল। ২০১২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং আদিবাসী অধিকার আইনজীবী মোয়ানা জ্যাকসন বলেছিলেন, ‘‘যদিও ডকট্রিন অফ ডিসকভারি সর্বদা আদিবাসীদের ভূমি দাবি করার কর্তৃত্ব হিসাবে প্রথম দফায় প্রচারিত হয়েছিল, তবুও এই মতবাদে আরও বিস্তৃত ধারণা অন্তর্নিহিত ছিল।’’ মোয়ানা এ-ও মন্তব্য করেন, নীতিটি ‘গণহত্যার এক ধরনের আইনি জাদু’, যা পতাকা উত্তোলন বা ঘোষণার মাধ্যমে দাবি করতে পারে যে এখন থেকে একটি ভূখণ্ড অন্য কারও এবং সেই ভূখণ্ডে আগে থেকে বসবাসকারী মানুষেরা উপনিবেশ স্থাপনকারীদের অধীনস্থ।
তবে মজার বিষয় হল, ট্রাম্প সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের উপর ডেনমার্কের দাবির প্রেক্ষাপটে ‘ডকট্রিন অফ ডিসকভারি’র ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় নিজেই তাঁর নিজস্ব সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে তাঁকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে এবং মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োকে গ্রিনল্যান্ড দ্বীপে একটি আমেরিকার পতাকা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। পাশে একটি সাইনবোর্ডে লেখা, ‘গ্রিনল্যান্ড— মার্কিন অঞ্চল, ২০২৬’।
তবে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। ভাইকিংরা প্রথম গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছিল ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে, এক হাজার বছরেরও বেশি আগে। তবে তারা কেবল গ্রিনল্যান্ড আবিষ্কারই করেনি। সেখানে বসতি এবং উপনিবেশ স্থাপনও করেছিল। তবে গ্রিনল্যান্ড প্রকৃত অর্থেই ‘টেরা নুলিয়াস’ ছিল। সেখানে কোনও মানুষ বসবাস করতেন না। গ্রিনল্যান্ডে বসতি স্থাপনের সময় কোনও আদিবাসীকেও উচ্ছেদ করা হয়নি। ১,০০০ বছরেরও বেশি ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের পোস্ট করা ছবিটি ইঙ্গিত দেয় যে তিনি কেবল মার্কিন পতাকা উত্তোলন করে সেই দ্বীপে ইতিমধ্যেই বসবাসকারী মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তবে প্রকৃত ভূখণ্ডে নয়, সমাজমাধ্যমে।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy