China challenges US, Russia, France fighter jets market through its cheap warplanes dgtl
Chinese Jets vs F-35 or Rafale
৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ‘ফ্ল্যাট ডিসকাউন্ট’! সস্তার যুদ্ধবিমানে দোকান সাজিয়ে খদ্দের ডাকছে চিন, মাথায় হাত তিন দেশের
অস্ত্রব্যবসায় মুনাফা করতে লড়াকু জেট বিক্রির উপর জোর দিয়েছে চিন। খদ্দের টানতে ব্যাপক সস্তায় বিভিন্ন যুদ্ধবিমান বাজারে এনেছে বেজিং। এ ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের অস্ত্রের বাজার খাবে ড্রাগন? উঠছে প্রশ্ন।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:০৬
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে চিনা অনুপ্রবেশ। অত্যাধুনিক হাতিয়ার রফতানির নিরিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা ফ্রান্সের মতো বড় বড় ‘খেলোয়াড়’দের পিছনে ফেলতে চাইছে বেজিং। সেই লক্ষ্যে লড়াকু জেটকে পাখির চোখ করেছে ড্রাগন। আর তাতেই পশ্চিমি ‘সুপার পাওয়ার’দের কপালে প়ড়েছে চিন্তার ভাঁজ। দামের নিরিখে মান্দারিনভাষীদের যুদ্ধবিমান বেশ সস্তা হওয়ায় এর চাহিদা বৃদ্ধির প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। সেটাকে পুঁজি করে অস্ত্রবাজারে চিন পা জমালে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলির যে মুনাফায় টান পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
০২১৮
গত বছরের (২০২৫ সালের) ডিসেম্বরে গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না) সামরিক বাহিনীর শক্তি সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনে জমা পড়ে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবসায় জোয়ার আনতে বর্তমানে তিনটি লড়াকু জেটকে বাজারজাত করেছে বেজিং। নজিরবিহীন ভাবে সেই তালিকায় আছে এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন অফ চায়না এবং নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ় কর্পোরেশনের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার তৈরি যুদ্ধবিমান। অতীতে জেট রফতানির জন্য বেজিঙের মধ্যে এতটা আগ্রাসী মনোভাব দেখা যায়নি।
০৩১৮
২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল চিন। এ বছর সেখান থেকে তিন বা দু’নম্বরে উঠে আসার চেষ্টা করছে ড্রাগন। পেন্টাগনের রিপোর্ট অনুযায়ী, শেষ এক দশকে ধীরে ধীরে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের মতোই হাতিয়ার ব্যবসাকে বিদেশনীতির অংশ করে ফেলেছে বেজিং। ফলে পাকিস্তানের মতো বেশ কিছু ‘বাঁধাধরা খদ্দের’ জুটেছে তাদের। তার পরেও অবশ্য মান্দারিনভাষীদের লড়াকু জেটের চাহিদা সে ভাবে তৈরি হয়নি। বিষয়টি চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের চিন্তা বাড়িয়েছে।
০৪১৮
বেজিং নির্মিত পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ শ্রেণির লড়াকু জেটগুলির মধ্যে অন্যতম হল জে-২০ এবং জে-৩৫। এর পাশাপাশি ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের পরীক্ষামূলক উড়ানেও সাফল্য পেয়েছেন ড্রাগনের প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীরা। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, সেই জেটগুলির পোশাকি নাম হল, জে-৩৬ এবং জে-৫০। পেন্টাগনে জমা পড়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, দামের নিরিখে সস্তা হলেও জে-২০ বা জে-৩৫-এর তেমন ক্রেতা পাচ্ছে না চিন। তুলনায় আন্তর্জাতিক হাতিয়ারের বাজারে অনেক বেশি চাহিদা আছে তাদের হামলাকারী পাইলটবিহীন যানের (ড্রোন)।
০৫১৮
মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধবিমানের বাজার ধরতে পঞ্চম প্রজন্মের এফসি-৩১ এবং চতুর্থ প্রজন্মের জে-১০সি সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে চিনের শাসনক্ষমতায় থাকা সিপিসি (কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না)। এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার নামের একটি হালকা ওজনের লড়াকু জেট বিক্রির পরিকল্পনা আছে বেজিঙের। ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটিকে নিয়ে বড় ঘোষণা করে ইসলামাবাদ। আগামী দিনে বিপুল সংখ্যায় জেএফ-১৭ আজ়ারবাইজ়ানকে দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দেয় তারা।
০৬১৮
মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, খুব দ্রুত পাক বিমানবাহিনীকে এফসি-৩১ গিরফ্যালকন লড়াকু জেট সরবরাহ করা শুরু করবে চিন। পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ শ্রেণির এই যুদ্ধবিমানের অন্য নাম জে-৩৫। এ বছর ইসলামাবাদের সেনা সর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্স) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের হাতে ৪০টি এই যুদ্ধবিমান তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ড্রাগনের। সূত্রের খবর, দামের দিক থেকে এই জেটগুলিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে রাজি হয়েছে জিনপিং সরকার। প্রেসিডেন্ট শি-র এ-হেন ‘পাকিস্তান প্রেম’ নিয়ে সমাজমাধ্যমে উঠেছে সমালোচনার ঝড়।
০৭১৮
‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদকে বাদ দিলে গত বছরের (২০২৫ সাল) মে মাস পর্যন্ত এফসি-৩১-এর আর কোনও গ্রাহক পায়নি চিন। তবে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমানটির ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির। তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডারের চাহিদা কিছুটা বেশি। আজ়ারবাইজ়ানের পাশাপাশি মায়ানমার এবং নাইজ়েরিয়া এর সম্ভাব্য ক্রেতা বলে জানা গিয়েছে। এ ছাড়া ইরাকের সঙ্গেও জেএফ-১৭র চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে বেজিং।
০৮১৮
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, বিশ্ববাজারে লড়াকু জেট বিক্রির নিরিখে চিনের চেয়ে কয়েক যোজন এগিয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ফ্রান্স। এদের মধ্যে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক মস্কোর উপর ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে পশ্চিমি দুনিয়া। ফলে পঞ্চম প্রজন্মের এসইউ-৫৭ ফেলনের মতো অতিশক্তিশালী যুদ্ধবিমান বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেমলিনকে হোঁচট খেতে হচ্ছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, রুশ অনুপস্থিতির সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ‘খদ্দের’ ধরতে নেমে পড়েছে বেজিং।
০৯১৮
এ ব্যাপারে উদাহরণ হিসাবে মিশরের কথা বলা যেতে পারে। গত বছর এসইউ-৫৭ ফেলনের জন্য মস্কোর সঙ্গে একপ্রস্ত কথা সেরে ফেলে কায়রো। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাটসা’ (কাউন্টারিং আমেরিকা’স অ্যাডভার্সারিজ় থ্রু স্যাঙ্কশনস অ্যাক্ট) নিষেধাজ্ঞার ভয়ে সেখান থেকে পিছিয়ে আসে তারা। বিকল্প হিসাবে চিনের জে-১০সিকে পছন্দ করতে পারে ‘পিরামিডের দেশের’ বায়ুসেনা। একই কথা ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, সেই কারণেই এসইউ-৫৭ নিয়ে ক্রেমলিনের সঙ্গে চুক্তিতে রাজি হচ্ছে না নয়াদিল্লি।
১০১৮
বর্তমানে আলজিরিয়াকে বাদ দিলে পঞ্চম প্রজন্মের ওই যুদ্ধবিমানের জন্য কোনও ক্রেতা পাচ্ছে না রাশিয়া। এমনকি নিষেধাজ্ঞা-কাঁটায় ‘বন্ধু’ দেশ ইরানকেও এসইউ-৫৭ জেট সরবরাহ করতে সমস্যা হচ্ছে মস্কোর। অন্য দিকে ইজ়রায়েলের সঙ্গে শত্রুতা চরম আকার ধারণ করায় ‘বৃদ্ধ’ বায়ুসেনার আধুনিকীকরণের কাজ দ্রুত করতে চাইছে তেহরান। ফলে সেখানেও জে-১০সি সরবরাহের মেগা সুযোগ যে বেজিঙের সামনে থাকছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
১১১৮
পৃথিবীর সেরা বায়ুসেনাগুলির প্রথম পছন্দ অবশ্যই মার্কিন লড়াকু জেট। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিক্রি করেছে লকহিড মার্টিনের তৈরি এফ-৩৫ লাইটনিং টু নামের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। স্টেলথ শ্রেণির নিরিখে সারা বিশ্বে এর জুড়ে মেলা ভার। পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে এই জেট। কিন্তু তার পরেও দু’টি কারণে এর বাজারে ‘সিঁদ’ কাটছে বেজিং। এর মধ্যে একটি অবশ্যই এফ-৩৫-এর অস্বাভাবিক দাম।
১২১৮
ড্রাগন তার জে-৩৫ যুদ্ধবিমানটিকে মার্কিন লড়াকু জেটের সমতুল্য বলে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আকৃতিগত দিক থেকে এই দুই যুদ্ধবিমানের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। মজার বিষয় হল, এফ-৩৫-এর থেকে বেজিঙের জেটটি অন্তত ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সস্তা। ফলে আর্থিক দিক থেকে তুলনামূলক ভাবে দুর্বল দেশগুলির বিমানবাহিনীর স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে উঠছে জে-৩৫। চিনা যুদ্ধবিমানটির রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বেশ কম।
১৩১৮
গত বছরের সেপ্টেম্বরে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কেরলের তিরুঅনন্তপুরম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে ব্রিটিশ রয়্যাল নৌবাহিনীর একটি এফ-৩৫বি লড়াকু জেট। এর পর সেটির মেরামতি করতে গিয়ে কালঘাম ছুটে যায় ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ারদের। ফলে লম্বা সময় ধরে যুদ্ধবিমানটি রানওয়েতেই আটকে ছিল। ওই সময় বিশ্বের আরও কয়েকটি জায়গা থেকে এই ধরনের খবর আসতে শুরু করে। এতে এফ-৩৫-এর গুণগত মান নিয়ে ওঠে প্রশ্ন।
১৪১৮
২০২৫ সালে আবার সংশ্লিষ্ট মার্কিন লড়াকু জেটটিকে নিয়ে বিস্ফোরক খবর প্রকাশ করে বেশ কয়েকটি জার্মান গণমাধ্যম। সেখানে বলা হয়, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে আছে বিশেষ একটি ‘কিল সুইচ’। সংঘাত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তা চালু করে দিলে জেটটিকে নাকি ওড়ানোই যাবে না। বার্লিনের সংবাদমাধ্যমগুলির এই খবরে পশ্চিমি দুনিয়ায় পড়ে যায় হইচই। চাপের মুখে বিবৃতি দেয় ওয়াশিংটনের নির্মাণকারী প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিন। জানিয়ে দেয় এফ-৩৫ জেটে এই ধরনের কোনও ‘কিল সুইচ’ নেই।
১৫১৮
লকহিড মার্টিনের ওই বিবৃতি সত্ত্বেও মার্কিন জেটটির বাজার যে ২০২৫ সালে দুর্দান্ত চাঙ্গা ছিল, এমনটা নয়। সেই তুলনায় গত বছর ভাল ব্যবসা করেছে ফ্রান্সের দাসোঁ অ্যাভিয়েশন। তাদের তৈরি সাড়ে চার প্রজন্মের রাফাল জেট কিনতে বরাত দিয়েছে মোট আটটি দেশ। ফলে আগামী কয়েক বছর ধরে ৫৩৩টি যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে তারা।
১৬১৮
রাফালকে ভরসা করে ফ্রান্সের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। দাসোঁর তৈরি ৩৬টি জেট বিমানবাহী রণতরীতে মোতায়েন করবে নয়াদিল্লি। এ ছাড়া মিশর, কাতার, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সার্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া রাফালের বরাত দিয়েছে। ফলে শীর্ষ অস্ত্র রফতানিকারী দেশগুলির তালিকার উপরের দিকে উঠে এসেছে ফ্রান্স।
১৭১৮
গত বছরের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’কে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘যুদ্ধে’ রাফাল ব্যবহার করে ভারতীয় বায়ুসেনা। লড়াই থামতেই চিনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমানের সাহায্যে ফ্রান্সের জেট ধ্বংস করা হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচার চালায় ইসলামাবাদ। বিশেষজ্ঞদের দাবি, রাওয়ালপিন্ডির এ-হেন মিথ্যাচারে আখেরে লাভ হয়েছে বেজিঙের। রাফালের বিকল্প হিসাবে নিজেদের যুদ্ধবিমানগুলিকে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে ড্রাগন।
১৮১৮
সাবেক সেনাকর্তারা অবশ্য মনে করেন অস্ত্রের বাজারে নিজের অবস্থান মজবুত করার ক্ষেত্রে চিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল তাদের তৈরি হাতিয়ারের যুদ্ধের অনভিজ্ঞতা। এখনও পর্যন্ত লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কোনও অস্ত্র তৈরি করেনি বেজিং। আগামী দিনে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ফের স্বমহিমায় ফিরে আসতে পারে রাশিয়া। তখন সস্তা হাতিয়ারেও খদ্দের ধরে রাখা মান্দারিনভাষীদের পক্ষে যে কঠিন হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।