শুল্ক ফেরত দিচ্ছে আমেরিকা, সাড়ে ১৫ লক্ষ কোটি টাকা পাবে কারা? সত্যিই কি ৯৪ হাজার কোটি ফেরত পাবে ভারত?
যে সব মার্কিন সংস্থা অতিরিক্ত শুল্ক দিয়ে পণ্য আমদানি করেছিল, তারা টাকা ফেরত পেলে ভারত বা অন্যান্য দেশের সংস্থাগুলির ভাগ্যেও কি শিকে ছিঁড়বে? ট্রাম্পের চড়া শুল্কের ফলে যে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে তারা পড়েছিলেন, তার কিছুটা হলেও কি ফেরত পাওয়া সম্ভব?
নিজের পাতা জালে নিজেই আটকে ছটফট করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যে শুল্কের জুজু দেখিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকাতে চেয়েছিলেন, আদালতের এক কলমের খোঁচাতেই তা বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে তাঁর দিকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার শীর্ষ আদালত ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘আন্তর্জাতিক আমদানি শুল্ক’কে বেআইনি ঘোষণা করে।
গত বছর, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন সরকার কংগ্রেসের স্পষ্ট সমর্থন ছাডা়ই একটি জরুরি ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে ভারত-সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক চাপিয়ে দেয়। ফলে আমেরিকার বাজারে দামি হয়ে যায় পণ্যগুলি। জাতীয় জরুরি অবস্থার জন্য ব্যবহৃত আইন প্রয়োগ করে বিভিন্ন দেশের উপর আমদানি শুল্ক চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে সিদ্ধান্তকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিয়েছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ওই শুল্কগুলি অসাংবিধানিক। এর ফলে সেগুলি কার্যত বাতিল হয়ে যায়। আদালতের নির্দেশের পর শুল্কবাবদ নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে মার্কিন প্রশাসন।
ট্রাম্প সরকার নতুন শুল্কনীতির সাহায্যে আগামী ১০ বছরে ১ ট্রিলিয়ন (১ লক্ষ কোটি) ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আমদানি শুল্কবাবদ ট্রাম্পের আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি ডলার।
শুল্ককে বেআইনি বললেও টাকা ফেরতের বিষয়টি স্পষ্ট করেনি আমেরিকার শীর্ষ আদালত। আগামী দিনে নিম্ন আদালতগুলি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে করা হয়েছিল। আমেরিকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতের উপরেও বিষয়টি ছাড়া হতে পারে বলে মনে করেছিলেন অনেকে।
আরও পড়ুন:
ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণার দু’মাস পর অতিরিক্ত শুল্ক ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মূলত সে দেশের আমদানিকারীরাই লাভবান হবেন বলে মত আর্থিক বিশ্লেষকদের। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর গত ২০ এপ্রিল, কনসলিডেটেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্রসেসিং অফ এন্ট্রিজ় সিস্টেম নামে একটি নতুন অনলাইন পোর্টাল চালু করেছে ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত শুল্ক ফেরতের দাবি করতে পারে সংস্থাগুলি।
জিটিআরআই (গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প সরকারকে যে পরিমাণ শুল্ক ফেরত দিতে হবে তার পরিমাণ ১৬৬০০ কোটি ডলার বা সাড়ে ১৫ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি। তার মধ্যে ১০০-১২০ কোটি ডলার ভারতীয় পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে অধিকাংশ আবার বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যে সব মার্কিন সংস্থা অতিরিক্ত শুল্ক দিয়ে পণ্য আমদানি করেছিল, তারা টাকা ফেরত পেলে ভারত বা অন্যান্য দেশের সংস্থার ভাগ্যেও কি শিকে ছিঁড়বে? ট্রাম্পের চড়া শুল্কের ফলে যে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে তারা পড়েছিল, তার কিছুটা হলেও কি ফেরত পাওয়া সম্ভব? মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে ট্রাম্প সরকারের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পাবে কারা?
বাণিজ্য উপদেষ্টা জিটিআরআই-এর মতে, ভারতীয় রফতানিকারক সংস্থাগুলির সামনে এটা সুবর্ণসুযোগ। ভারতীয় সংস্থাগুলির উচিত আমেরিকায় তাদের পণ্যের ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলা, যাতে শুল্কখাতে ফেরত পাওয়া অর্থের একাংশ রফতানিকারীদেরও ফেরত দেয় তারা। গত বছর যে সব শিল্পখাতে সবচেয়ে বেশি শুল্ক চাপানো হয়েছিল, সেই খাতেই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন:
গত বছর ২ এপ্রিল প্রথমে ১০ শতাংশ হারে শুল্ক-পাল্টা শুল্ক চেপেছিল। ভারতের ক্ষেত্রে সেই শুল্কের হার বাড়তে বাড়তে ৭ অগস্ট পৌঁছে যায় ২৫ শতাংশে। আর রাশিয়ার থেকে তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসাবে ট্রাম্প গত বছর ২৮ অগস্ট থেকে চাপান আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক (মোট ৫০ শতাংশ)। এই হার ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহাল ছিল।
আদালতে রায়ের পর অনেকেই বলেছিলেন, যাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনকে শুল্কবাবদ দেওয়া টাকা ফেরত চান, তাঁদের মামলা করতে হবে আমেরিকার আদালতে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর হাজারের বেশি সংস্থা টাকা ফেরতের জন্য আইনি লড়াই শুরু করে। আদালতে দাখিল করা নথিতে ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন জানিয়েছে যে, ৩ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি আমদানিকারক সংস্থার ৫.৩ কোটিরও বেশি চালানের জন্য এই ১৬৬০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে মার্কিন প্রশাসনকে।
জিটিআরআই-এর এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন শুল্কের অর্থ ফেরত পেতে আমেরিকার আমদানিকারীদেরই জটিল একটি পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। তাদের শুল্ক ফেরতের প্রক্রিয়াটি এখন বিশ বাঁও জলে। সরকারের থেকে অতিরিক্ত শুল্ক আদায় করতে হলে পোর্টালে ভর্তি করতে হবে ফর্ম, জানাতে হবে আমদানির তথ্য, তার দাম ইত্যাদি। সিবিপি কোনও দাবি অনুমোদন করলে অর্থ ফেরত পেতে ৬০-৯০ দিন সময় লাগবে।
ভারতীয় রফতানিকারীদের সামনে সরাসরি এই অর্থ ফেরত পাওয়ার কোনও উপায় নেই। খোলা নেই আইনি পথও। ফলে অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে বাণিজ্যিক আলোচনার উপরে। কারণ মার্কিন আইন অনুযায়ী, যে পক্ষ মার্কিন বন্দরে পণ্য প্রবেশের সময় আইনত শুল্ক পরিশোধের জন্য দায়ী থাকে, শুল্ক ফেরত চাওয়ার অধিকারও শুধু তাদেরই থাকে। ভারতীয় রফতানিকারকেরা চুক্তিতে পণ্য পাঠান। আমেরিকান আমদানিকারক সংস্থা বা তাদের নিয়োগকৃত ব্রোকার সংস্থা শুল্ক জমা দেয়।
বহু ক্ষেত্রে আমেরিকার আমদানিকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে দাম ভাগাভাগি করে শুল্কসমস্যা মেটানো হয়েছিল। অর্থাৎ, কিছুটা শুল্ক আমদানিকারীরা বহন করেছে, কিছুটা রফতানিকারীরা। এখন মার্কিন সংস্থাগুলি শুল্কের টাকা ফেরত পেলেও ভারতীয় রফতানিকারীরা তা ফেরত না-ও পেতে পারে। ফলে তাদের কোনও লাভ হবে না। সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে ভারতের রফতানি হওয়া পণ্যের মধ্যে বস্ত্রের ক্ষেত্রে ৪০০ কোটি ডলার, ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী রফতানি খাতে ৪০০ কোটি ডলার এবং রাসায়নিক ও সংশ্লিষ্ট পণ্য ২০০ কোটি ডলার শুল্ক ফেরত পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে।
এমনিতেই ঋণের ভারে ন্যুব্জ আমেরিকা। শুল্ককে বেআইনি ঘোষণা করায় বিপুল পরিমাণ আয় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাড়ছে প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়। ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ চালাতে প্রতি দিন কয়েকশো কোটি টাকা খরচ হয়েছে মার্কিন কোষাগার থেকে। ২০২৬ সালে শুধু প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ হয়েছে ১ লক্ষ কোটি ডলার। ২০২৭ সালের বাজেটে তা ১.৫ লক্ষ কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায় ট্রাম্প সরকার।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, একেবারে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে ওয়াশিংটনের অর্থনীতি। সে দেশের জাতীয় ধারের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতা ছুঁয়েছে। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ৩৯ লক্ষ কোটি ডলার ছাপিয়ে গিয়েছে আমেরিকার জাতীয় ঋণ। ফলে ক্রমশ চওড়া হচ্ছে বাজেট ঘাটতি।
গত কয়েক দশকে অস্বাভাবিক দ্রুততায় বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার অঙ্ক। চলতি শতাব্দীর গোড়ায় আমেরিকার জাতীয় ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি ডলার। কিন্তু ২০২০ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে ২৩ লক্ষ ২০ হাজার কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছোয়। সেই আর্থিক ফাটল মেরামত করতে ভারত-সহ বিশ্বের একাধিক দেশের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে নেমেছিলেন ট্রাম্প। সেই বিকল্প পথ বন্ধ হয়েছে আদালতের নির্দেশে। লাভের চেয়ে লোকসানের ধাক্কা নেমে এসেছে আমেরিকার শিল্প সংস্থাগুলির ঘাড়ে। একাধিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ফলে রাজস্ব আমদানির তুলনায় জলের মতো খরচ হচ্ছে ডলার।
একটি মার্কিন বেসরকারি পর্যবেক্ষক সংস্থা, ‘ট্যাক্সপেয়ার্স ফর কমন সেন্স’ উল্লেখ করেছে যে, ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে জাতীয় ঋণ ২.৮ লক্ষ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঋণের মাসুল দিতে হচ্ছে মার্কিন আম নাগরিকদেরই। কারণ করদাতারা এখন শুধুমাত্র সেই ঋণ পরিশোধের জন্যই বছরে প্রায় ১ লক্ষ কোটি ডলার দিয়ে চলেছেন। সংস্থাটি বলেছে, এই বাজেট প্রস্তাব দেশের আর্থিক গতিপথের কোনও উন্নতি করবে না। প্রকৃতপক্ষে, ট্রাম্পের নীতি দেশটিকে আরও ভুল পথে চালিত করবে।