India will reach 26 trillion-dollar economy in 100 years of Independence, says Ernst & Young dgtl
India Economic Growth
চিন-আমেরিকা ছাড়া দৌড়ে সবাই পিছনে, ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির চূড়ায় উঠবে ভারত! দাবি বিদেশি সমীক্ষক সংস্থার
নতুন বছরের শুরুতেই নয়াদিল্লির অর্থনীতি নিয়ে বিস্ফোরক ভবিষ্যদ্বাণী করল গবেষণা সংস্থা ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং’। তাদের দাবি, ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে ভারত।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৩
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১২০
এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কসংঘাত। অন্য দিকে চিনের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্যিক ঘাটতি। ঘরোয়া উৎপাদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে একগুচ্ছ সমস্যা। কিন্তু, তা সত্ত্বেও বেশির ভাগ দেশের তুলনায় ছুটছে ভারতের অর্থনীতি। এ বার নতুন বছরের গোড়াতেই বৃদ্ধির সূচক নিয়ে আশার পূর্বাভাস দিল ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং’। তাদের দাবি, স্বাধীনতার ১০০ বছরে (পড়ুন ২০৪৭-’৪৮ অর্থবর্ষে) ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে নয়াদিল্লি। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে কেন্দ্র।
০২২০
নতুন বছরের গোড়ায় ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং’। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সেখানে বলা হয়েছে, বছরে গড়ে ছ’শতাংশ বৃদ্ধির হার বজায় রেখেও ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছোতে পারবে নয়াদিল্লি। আর্থিক বৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পাশাপাশি বাড়বে মাথাপিছু গড় আয়। সেটা একলাফে ১৫ হাজার ডলার বা তার বেশি হতে পারে, যা বর্তমানের প্রায় ছ’গুণ বলে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
০৩২০
‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং’ মনে করে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চিন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে ভারত। বর্তমান অবস্থা বজায় থাকলে অচিরেই জার্মানিকে ছাপিয়ে যাবে নয়াদিল্লি। চলতি আর্থিক বছরের শেষে (পড়ুন ২০২৫-’২৬) এ দেশের ‘মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন’ বা জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) পৌঁছোবে প্রায় ৪.১ থেকে ৪.৩ লক্ষ কোটি ডলারে, গত ১০ বছরের নিরিখে যা দ্বিগুণ। ২০১৫ সাল নাগাদ ভারতের জিডিপির পরিমাণ ছিল ২.১ লক্ষ কোটি ডলার।
০৪২০
এ দেশের অর্থনীতির এ-হেন ‘অচ্ছে দিন’-এর সুখ্যাতিতে কৃপণতা করেনি ‘আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার’ বা আইএমএফ (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড)। শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নয়াদিল্লির বৃদ্ধির সূচক ৬.৫ শতাংশের নীচে যাবে না বলে উল্লেখ করেছে তারা। গত বছরই (পড়ুন ২০২৫ সাল) জাপানকে ছাপিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ক্রমতালিকায় চতুর্থ স্থানে উঠে আসে ভারত। আইএমএফের অনুমান, ২০২৮ সালের মধ্যে এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে তিন নম্বরে থাকা জার্মানিও।
০৫২০
গত বছরের এপ্রিলে ‘পারস্পরিক শুল্কনীতি’ চালু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ওই সিদ্ধান্তের পর কার্যত ওয়াশিংটনের শুল্কবাণের মুখে পড়ে নয়াদিল্লি। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কিন্তু সে ভাবে এ দেশের অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারেনি। সরকারি তথ্যেই মিলেছে তার প্রমাণ। কেন্দ্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবর্ষের (২০২৫-’২৬) দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২ শতাংশ, যা যে কোনও আর্থিক বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠানের অনুমানের চেয়ে অনেকটাই বেশি।
০৬২০
বিশ্লেষকদের দাবি, বিপুল জনসংখ্যার কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং পরিষেবা খাতে আর্থিক গতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে ভারত। বেসরকারি সংস্থাগুলিও বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিচ্ছে। সেখানে একটা স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে তারা। এ দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হল ভারতের বিপুল বাজার। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন শুল্কনীতির চ্যালেঞ্জ সেই চাহিদায় এতটুকু ফাটল ধরাতে পারেনি।
০৭২০
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ব্যক্তিগত চূড়ান্ত খরচ বা পিইসিই (প্রাইভেট ফাইনাল কনজ়াম্পশান এক্সপেনডিচার) প্রায় ৭.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত সুখস্বাচ্ছন্দ্য মাথায় রেখে যথেষ্ট খরচ করতে পারছে এ দেশের প্রায় সমস্ত পরিবার। সেইমতো প্রয়োজনীয় টাকাও রয়েছে তাদের হাতে। ঊর্ধ্বমুখী আছে উৎপাদন এবং নির্মাণক্ষেত্রের বৃদ্ধির সূচকও।
০৮২০
ভারতের ক্ষেত্রে উৎপাদন এবং নির্মাণ অর্থনীতির মধ্যম খাত হিসাবে বিবেচিত। বর্তমানে সেখানে ৮.১ শতাংশের বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে, যা রেকর্ড। বিশেষত উৎপাদন ক্ষেত্রের সূচক ৯.১ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এতে দিন দিন বাড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ। ফলে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে সর্বদা দৃষ্টি দিতে হচ্ছে সরকারকে। এর জেরে দু’দিক দিয়েই তৈরি হচ্ছে বিপুল কর্মসংস্থান।
০৯২০
এ দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হল পরিষেবা। একে নয়াদিল্লির চালিকাশক্তি বলা যেতে পারে। সেখানে আর্থিক বৃদ্ধির হার ৯.২ শতাংশে ঘোরাফেরা করছে। এর মধ্যে আবার রিয়্যাল এস্টেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো পেশাদার পরিষেবা খাতে সূচক বেড়েছে ১০.২ শতাংশ। এটি শুধুমাত্র ঘরোয়া বাজারেই কর্মসংস্থান তৈরি করছে এমনটা নয়। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গেও এটি গভীর ভাবে জড়িত।
১০২০
বর্তমানে ভারতে আছে প্রায় ১,৫০০ গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (জিসিসি), যেটা সারা দুনিয়ার মোট সংখ্যার ৪৫ শতাংশ। এটি নয়াদিল্লির হাতে যে দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে, সেই তথ্যই প্রকাশ করে। এ দেশের টেলিকম এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বর্তমানে ১২০ কোটি বাসিন্দা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। সেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮৩.৭ কোটি। এটা নয়াদিল্লির সামনে ডিজিটাল পরিষেবা উন্নতি করার রাস্তা খুলে দিয়েছে।
১১২০
গত দু’দশকে রফতানি বাণিজ্যেও উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে ভারত। শুধুমাত্র পরিষেবা খাতেই এর সূচক প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১-’২২ অর্থবর্ষে নয়াদিল্লির রফতানি বাণিজ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা এবং বিপিওগুলির অবদান ছিল ১৫.৭ কোটি ডলার। এটা আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতিতে পরিণত হতে কেন্দ্রকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।
১২২০
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, এ দেশের আর্থিক বৃদ্ধির অন্যতম স্তম্ভ হল গৃহস্থালির খরচ। গত কয়েক বছরে গ্রাম ও শহর দুই জায়গাতেই ভোগ্যপণ্য ও পরিষেবার ব্যয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত আর্থিক বছরে (২০২৪-’২৫) ব্যক্তিগত খরচ বেড়ে যায় প্রায় সাত শতাংশ, যেটা মোট জিডিপির প্রায় ৬২ শতাংশ। গত ২০ বছরে এই অঙ্কটা সর্বোচ্চ বলে জানা গিয়েছে। এর জেরে আবাসন, গাড়ি এবং খুচরো বাজারের অন্যান্য পণ্যের বিক্রির পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।
১৩২০
গত কয়েক বছর ধরেই পরিকাঠামো খাতে বিপুল লগ্নি করছে ভারত। এই আর্থিক বছরের (২০২৫-’২৬) বাজেটে পরিকাঠামো উন্নতির জন্য ১১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি ব্যয় বরাদ্দ করে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। সংশ্লিষ্ট অর্থ হাইওয়ে, সমুদ্রবন্দর, রেলপথ, নতুন শহর নির্মাণ এবং সরবরাহ খাতে খরচ করেছে প্রশাসন। এতে এক দিকে যেমন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্য দিকে তেমনই শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী হওয়ায় বেসরকারি সংস্থাগুলিকে আরও বেশি করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে।
১৪২০
দেশের আর্থিক বৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে মেক ইন ইন্ডিয়া, আত্মনির্ভর ভারত, উৎসাহ ভাতা বা পিএলআই (প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ) স্কিম, শ্রম এবং ভূমি সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। ফলে বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম এবং ওষুধ নির্মাণকারী সংস্থা ও স্টার্টআপগুলি বেশ লাভবান হয়েছে। নতুন নতুন পণ্য বাজারজাত করার দিকে উৎসাহিত হতে দেখা যাচ্ছে তাদের।
১৫২০
মার্কিন শুল্কের মুখে পড়ে গত বছর মন্ত্রীগোষ্ঠীর (গ্রুপ অফ মিনিস্টারস বা জিওএম) প্রস্তাব মেনে পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটিতে বড় বদল আনে কেন্দ্র। ফলে বর্তমানে ঘরোয়া বাজারে বিক্রি হওয়া যাবতীয় পণ্যে দু’টি হারে কর নিচ্ছে সরকার। সেগুলি হল, ৫ ও ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ, জিএসটির ১২ ও ২৮ শতাংশের হার প্রত্যাহার করে নিয়েছে কেন্দ্র। মদ, সিগারেট ও বিলাসবহুল গাড়ির উপর অবশ্য ৪০ শতাংশ জিএসটি ধার্য করা হয়েছে। এর জেরে ঘরোয়া বাজারে লাফিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে পণ্য বিক্রির পরিমাণ, যা অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করেছে।
১৬২০
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ডিজিটাল রূপান্তর ভারতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। ‘ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ বা ইউপিআইয়ে টাকার লেনদেন এবং ফিনটেক সংস্থাগুলির উত্থান ব্যবসা সম্প্রসারে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। ২০২২-’২৩ আর্থিক বছরে এ দেশের ডিজিটাল লেনদেন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছোয়। এতে খুব ছোট ব্যবসায়ীদেরও মূল ধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে সরকার।
১৭২০
গত আড়াই দশকে এ দেশে বেড়েছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট)। ২০০০-’২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর মাধ্যমে ১.০৫ লক্ষ কোটি টাকার লগ্নি পেয়েছে নয়াদিল্লি। এই অর্থ উৎপাদন, পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতে ব্যবহার করতে পেরেছে বিভিন্ন দেশীয় সংস্থা।
১৮২০
ভারতীয় অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার নেপথ্যে আর একটি ইতিবাচক কারণ হল তরুণ শ্রমশক্তি। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ২৪ বছর। ফলে যে কোনও কাজে তাঁদের ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি হওয়ার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির সামনে আছে বেশ কয়েকটা চ্যালেঞ্জও।
১৯২০
বিশেষজ্ঞদের দাবি, জিডিপি বৃদ্ধির নিরিখে বেকারত্বের হার যে ভাবে কমা উচিত, এ দেশের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। তা ছাড়া উন্নত দেশগুলির তুলনায় ভারতে মাথাপিছু গড় আয়ও বেশ খারাপ। সম্পদের অসম বণ্টনও সমস্যায় ফেলতে পারে নয়াদিল্লিকে। দেশের মোট আয়ের সিংহভাগই মাত্র ১০ শতাংশের মধ্যে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। বাকি ৯০ শতাংশকে তুলনামূলক ভাবে সীমিত সম্পদের উপর নির্ভর করতে হয়।
২০২০
২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছোনোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ভূ-রাজনৈতিক অশান্তি, যার জেরে মাঝেমধ্যেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের একাধিক দেশ। গত বছর জঙ্গিহামলাকে কেন্দ্র করে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মতো সামরিক পদক্ষেপে শিক্ষা দিতে হয়েছে পাকিস্তানকে। ইসলামাবাদের সঙ্গে আগামী দিনে লড়াইয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও নয়াদিল্লির আর্থিক বৃদ্ধির গতিকে স্তব্ধ করতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।