কানাডা সংলগ্ন বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ভেনেজ়ুয়েলার কায়দাতেই সেখানে তিনি সামরিক অভিযান পাঠাতে পারেন বলে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা। এতে কি ভেঙে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নেটোর মতো সামরিক জোট?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৮
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
ভেনেজ়ুয়েলা পর্ব শেষ হতে না হতেই এ বার ‘সবুজ দ্বীপ’! গ্রিনল্যান্ড কব্জায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারাকাসের কায়দায় সেখানেও সামরিক অভিযান চালাবে ওয়াশিংটন? এই নিয়ে জল্পনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে চরম হুঁশিয়ারি দিল বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপটির ‘প্রকৃত মালিক’ তথা ‘অভিভাবক’ ডেনমার্ক। কোপেনহেগেনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাফ কথা, ‘সবুজ দ্বীপে’ আগ্রাসনের অর্থ হল আমেরিকার সামরিক জোট নেটোর অবসান, যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও ভেঙে চুরমার করে দেবে।
০২১৮
ভেনেজ়ুয়েলা অভিযানে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভের পর গত ৪ জানুয়ারি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন ট্রাম্প। ওই সময় পারিষদবর্গের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ানে’ ছিলেন তিনি। সেখান থেকে ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) বলেন, ‘‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের প্রয়োজন। এটা একটা কৌশলগত ব্যাপার। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই দ্বীপটিতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। কারণ, ওর আশপাশে সর্ব ক্ষণ রাশিয়া ও চিনের জাহাজ ঘোরাফেরা করছে।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পরই পশ্চিম ইউরোপে নতুন করে শুরু হয় হইচই।
০৩১৮
ট্রাম্পের এ-হেন মন্তব্যের পরই সুর চড়ান সুমেরু সাগর সংলগ্ন ‘সবুজ দ্বীপের’ অভিভাবক তথা ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডরিকসেন। পাল্টা ফুঁসে উঠে ড্যানিশ টিভিতে তিনি বলেন, ‘‘আমেরিকার কাছে আর্জি, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের হুমকি দেওয়া বন্ধ করুন। যে দেশ বা দেশের জনগণ বলছে, আমরা বিক্রি হব না, তাঁদেরও হুঁশিয়ারি দেবেন না। কোনও নেটো সদস্যের উপর হামলার অর্থ হল সংশ্লিষ্ট সামরিক জোটের অবসান। গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন আগ্রাসন কিন্তু সব কিছু শেষ করে দেবে।’’
০৪১৮
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সমাজতান্ত্রিক সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) সঙ্গে ‘ঠান্ডা যুদ্ধে’ জড়ায় পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় মস্কোকে ঘিরতে ইউরোপীয় ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে একটি সামরিক জোটে আবদ্ধ হয় আমেরিকা। তার পোশাকি নাম ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা’ বা নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন)। বর্তমানে এর সদস্যের সংখ্যা ৩২। সেই তালিকায় ওয়াশিংটন ছাড়াও আছে পরমাণু শক্তিধর ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। নেটো গঠনের সালটা ছিল ১৯৪৯। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে ছিলেন হ্যারি এস ট্রুম্যান।
০৫১৮
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সোভিয়েত-বিরোধী সামরিক জোটটি গড়ে ওঠার সময় এর সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল ১২। এর মধ্যে অন্যতম হল ডেনমার্ক। গ্রিনল্যান্ড সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় দেশটির অংশ হওয়ায় এত দিন নেটোর সামরিক ছাতার তলায় থাকতে এর কোনও অসুবিধা হয়নি। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে সেখানে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে আমেরিকা, যা আজও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। ওয়াশিংটনের ওই সেনাছাউনি ‘পিটুফিক স্পেস বেস’ নামে পরিচিত। মূলত সুমেরু সাগর বা আটলান্টিকের দিক থেকে কোনও আক্রমণ আসছে কি না, সেটা দেখাই এর কাজ।
০৬১৮
ডেনমার্কের মূল ভূখণ্ডের থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডের উপর গত প্রায় ৩০০ বছর ধরে অধিকার রয়েছে কোপেনহেগেনের। ৫৬ হাজার বাসিন্দার ‘সবুজ দ্বীপের’অবশ্য একটা নিজস্ব সরকার রয়েছে। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি পরিচালনার জন্য একটা স্বায়ত্তশাসনমূলক ব্যবস্থা সেখানে চালু রেখেছে ডেনমার্ক। যদিও বিদেশ এবং প্রতিরক্ষার মতো জটিল বিষয়গুলির সিদ্ধান্ত নিতে পারে না গ্রিনল্যান্ড প্রশাসন। এ ব্যাপারে পুরোপুরি ভাবে কোপেনহেগেনের উপর নির্ভরশীল ‘সবুজ দ্বীপের’ নেতা-নেত্রীরা।
০৭১৮
বিশেষজ্ঞদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নজর গ্রিনল্যান্ডের উপরে পড়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এই দ্বীপটি হাতে থাকলে উত্তর মেরুতে রাশিয়ার একচ্ছত্র প্রতিপত্তি শেষ করতে পারবে ওয়াশিংটন। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে বেজিং বা মস্কোর গ্রিনল্যান্ড দখল করলে প্রশ্নের মুখে পড়বে নিরাপত্তা। সেটা যাতে না হয়, তাই আগাম ব্যবস্থা নিতে চাইছেন ট্রাম্প।
০৮১৮
তৃতীয়ত, অনেকেই মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডে আছে বিরল খনিজের বিপুল ভান্ডার। কানাডার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ‘সবুজ দ্বীপে’ পাওয়া যেতে পারে লিথিয়াম, নিওবিয়াম, হাফনিয়াম এবং জ়িরকোনিয়ামের মতো দুষ্প্রাপ্ত ধাতু। বিশ্লেষকদের অনুমান, সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট এলাকাটি কব্জা করতে চাইছেন ট্রাম্প। যদিও এই অভিযোগ পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছেন ‘পোটাস’।
০৯১৮
গত ৪ জানুয়ারি লুইজ়িয়ানার গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে ‘ড্যানিশ আর্কটিক অঞ্চলের’ (এই অঞ্চলেই গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান) আমেরিকার বিশেষ দূত হিসাবে নিযুক্ত করেন ট্রাম্প। তাঁর এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ডেনমার্ক। ওই দিনই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানায় কোপেনহেগেন। ৫ জানুয়ারি এই ইস্যুতে যৌথ বিবৃতি দেন ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রী ও ‘সবুজ দ্বীপের’ প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন। তাঁদের কথায়, ‘‘গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীর।’’ পরে এই নিয়ে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টও করেন নিলসেন।
১০১৮
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই দ্বীপের সংযুক্তির কোনও সম্ভাবনাই নেই। তা ছাড়া ভেনেজ়ুয়েলার সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের তুলনা করলে চলবে না। এটা একটা স্বাধীন দেশ।’’ যদিও ট্রাম্প এ সব মন্তব্যকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন এমনটা নয়। কারণ গত ১১ মাসে বেশ কয়েক বার ‘সবুজ দ্বীপের’ দখল নিতে চেয়েছেন তিনি। এ ব্যাপারে উল্টে নেটো-ভুক্ত দেশগুলির উপর চাপ তৈরি করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
১১১৮
২০১৯-’২১ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু কোপেনহেগেন সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়ায় স্বপ্নপূরণ হয়নি তাঁর। গত বছর (পড়ুন ২০২৫) দ্বিতীয় বারের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথের ঠিক মুখে ‘সবুজ দ্বীপের’ বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন তিনি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই জানিয়ে দেন, এ ব্যাপারে সেনাবাহিনীকে যে ব্যবহার করা হবে না, এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
১২১৮
গত বছরের জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ড সফরে যান ‘পোটাস’-পুত্র জুনিয়র ট্রাম্প। সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। পরে এই ইস্যুতে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘সারা বিশ্বের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার স্বার্থে আমেরিকা মনে করে যে, গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ এই মুহূর্তে অপরিহার্য।’’
১৩১৮
গত বছর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের একের পর এক আগ্রাসী মন্তব্যে ফুঁসে ওঠে নেটো-ভুক্ত ফ্রান্স ও জার্মানি। যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কোনও পদক্ষেপ করলে গোটা ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমেরিকার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে বলে ওই সময় স্পষ্ট করেন ফরাসি বিদেশমন্ত্রী জ়িন নোয়েল ব্যারট। পাশাপাশি, বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতাকে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাভাবনা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ তিনি।
১৪১৮
প্রায় একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলার ওলাফ স্কোলজ়ের গলায়। তিনি বলেন, ‘‘বর্তমান সময়ে সীমান্ত লঙ্ঘন করে অন্য দেশের জমিদখলের নীতি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সেটা পূর্ব (পড়ুন রাশিয়ার দিক থেকে) বা পশ্চিম (পড়ুন আমেরিকার দিক থেকে) যে কোনও প্রান্তেই ঘটুক না কেন।’’
১৫১৮
জোড়া নেটো সদস্যের এ-হেন প্রতিক্রিয়ার পর আমেরিকা জুড়েও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। ফলে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে চুপ করে যান ‘পোটাস’। বছর ঘুরতেই ফের এ ব্যাপারে সরব হয়েছেন তিনি। সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, বিশ্বের বৃহত্তম ওই দ্বীপটি দখল করা তাঁর বাহিনীর পক্ষে তেমন শক্ত হবে না। কারণ, ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনও প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতাই নেই ‘সবুজ দ্বীপের’ স্বশাসিত প্রশাসন বা ডেনমার্কের।
১৬১৮
আর তাই এ ব্যাপারে সতর্ক করে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ড্যানিশ পার্লামেন্টের গ্রিনল্যান্ড সদস্য আজা চেমনিটজ। তাঁর কথায়, ‘‘সবুজ দ্বীপের বাসিন্দাদের সবচেয়ে খারাপ অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বকে নতুন একটি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন ট্রাম্প। যেখানে সুশাসন নেই, আছে জঙ্গলের আইন।’’
১৭১৮
গত ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে (স্থানীয় সময় রাত ২টো নাগাদ) ভেনেজ়ুয়েলায় আক্রমণ শানায় আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স। ওই সময় রাজধানী কারাকাসে ঢুকে নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন সেনা। এই সামরিক অভিযানের কোড নাম ছিল ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’ (চরম সংকল্প)। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিলসেনেরও একই পরিণতি হতে পারে, বলছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।
১৮১৮
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও আছে। ডেনমার্ক যে হেতু নেটো-ভুক্ত দেশ, তাই ভেনেজ়ুয়েলার মতো গ্রিনল্যান্ড কব্জা করা ট্রাম্পের পক্ষে মোটেই সহজ নয়। সে ক্ষেত্রে রুখে দাঁড়াতে পারে ফ্রান্স ও জার্মানি। তাতে অবশ্য গত পৌনে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সম্পূর্ণ অন্য দিকে মোড় নিতে পারে। এককথায় ট্রাম্পের ‘সবুজ দ্বীপের অভিযান’ যে বিশ্ব রাজনীতির অঙ্ক বদলাবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।