Nicolas Maduro Abduction Incident Revives Memories of CIA Involvement in DRC First PM Patrice Lumumba’s Assassination dgtl
US Operations
গুলিতে ঝাঁঝরা কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রীর বুক, অ্যাসিডে চোবানো হয় দেহ, মাদুরোকাণ্ডে ফাঁস মার্কিন গুপ্তচরদের হাড়হিম করা নৃশংসতা!
আমেরিকার জেলে বন্দি ভেনেজ়ুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর জন্য কি অপেক্ষা করে আছে কোনও চরম পরিণতি? এই নিয়ে জল্পনার মধ্যেই ফের আলোচনায় মার্কিন গুপ্তচরবাহিনীর মদতে রাষ্ট্রনেতার গুপ্তহত্যার কুকীর্তি। সেখানে প্রমাণ লোপাটে অ্যাসিডে চুবিয়ে দেওয়া হয় মধ্য আফ্রিকার সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর গুলিবিদ্ধ দেহ।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৭
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১২০
ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন হামলা নিয়ে দুনিয়া জুড়ে শোরগোল। খনিজ তেলসমৃদ্ধ দেশটির রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। তাঁদের জন্য কি অপেক্ষা করছে কোনও চরম পরিণতি? এই নিয়ে জল্পনার মধ্যেই প্রকাশ্যে এল আমেরিকার গুপ্তচরবাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ বা সিআইএ-র আর এক কুকীর্তি। তাদের নির্দেশেই খুনের পর প্রমাণ লোপাট করতে অ্যাসিডে চুবিয়ে দেওয়া হয় সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া মধ্য আফ্রিকার একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর দেহ!
০২২০
গত শতাব্দীর ৬০-এর দশক। ‘ঠান্ডা লড়াই’কে কেন্দ্র করে তখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) সঙ্গে বিভিন্ন ফ্রন্টে পারদ চড়াচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হঠাৎই বেলজিয়ামের থেকে স্বাধীনতা পেয়ে যায় ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো বা ডিআরসি। তত দিনে মধ্য আফ্রিকার দেশটিতে ধূমকেতুর মতো উঠে এসেছেন বছর ৩৪-এর প্যাট্রিস এমেরি লুমুম্বা নামের এক রাজনৈতিক নেতা। সেখানকার বাসিন্দাদের নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন তিনি।
০৩২০
১৯৬০ সালের জুনে স্বাধীন ডিআরসির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন লুমুম্বা। ঠিক তার পরেই রাজধানী লিওপোল্ডভিলের (বর্তমান কিনশাসা) প্যালেস অফ নেশনের মঞ্চে উঠে বড় ঘোষণা করেন তিনি। বলেন, ‘‘স্বাধীন দেশকে ঐক্যবদ্ধ করাই হবে সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। কঙ্গোকে আমরা আফ্রিকার গর্ব করে তুলব।’’ ওই সময় পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদের কড়া সমালোচনা করতে শোনা যায় তাঁকে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল লুমুম্বার সঙ্গে একই মঞ্চে ছিলেন বেলজিয়ামের তৎকালীন রাজা বাউডউইন।
০৪২০
সদ্য স্বাধীন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রীর এ-হেন ভাষণ গোটা পশ্চিমি দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিষয়টা কানে যেতেই প্রমাদ গোনে আমেরিকা। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন আফ্রিকার দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তারের কাজ শুরু করে দিয়েছে। লুমুম্বার নেতৃত্বাধীন সরকার সে দিকে ঝুঁকে পড়লে ডিআরসির মতো খনিজ সম্পদে পূর্ণ মধ্য আফ্রিকার দেশটি যে পুরোপুরি হাতছাড়া হতে পারে, তা বুঝতে দেরি হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে তড়িঘড়ি ডাক পড়ে সিআইএ-র। লুমুম্বাকে দ্রুত কুর্সি থেকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয় তাদের।
০৫২০
মার্কিন দুঁদে গুপ্তচরবাহিনী এর পর আর দেরি করেনি। পর্দার আড়ালে থেকে নানা ভাবে ডিআরসির বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে উস্কানি দিতে থাকে সিআইএ। ফলে লুমুম্বার কুর্সিতে বসার মাত্র এক মাসের মধ্যেই খনিসমৃদ্ধ কাতাঙ্গা প্রদেশটি দেশ থেকে আলাদা হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, মধ্য আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলতে থাকে চরম বিশৃঙ্খলা। এই পরিস্থিতির জন্য যেন মুখিয়েই ছিল বেলজিয়াম। অশান্তির খবর আসতেই কাতাঙ্গায় সৈন্য পাঠায় ব্রাসেলস।
০৬২০
বেলজিয়ামের এই পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অশান্তি থামাতে তখন বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারস্থ হন লুমুম্বা। সেখান থেকে মধ্য আফ্রিকার দেশটিতে আসে শান্তিরক্ষা বাহিনী। যদিও কাতাঙ্গায় তাদের মোতায়েন করতে পারেননি ৩৪ বছরের প্রধানমন্ত্রী। বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, এর মূল কারণ হল রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। অন্য দিকে দেশের মাটিতে বিদেশি সৈন্যের পা পড়াকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেননি ডিআরসির অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব। লুমুম্বার নীতি-আদর্শ নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন তাঁরা।
০৭২০
১৯৬০ সালের জুলাইয়ের পর মরিয়া হয়ে ওঠেন ডিআরসির প্রথম প্রধানমন্ত্রী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এতে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম। কঙ্গোর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাসাভুবুর উপর প্রবল চাপ তৈরি করতে থাকে তারা। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে লুমুম্বাকে সরকার থেকে বরখাস্ত করেন তিনি। ফলে একরকম গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে মধ্য আফ্রিকার ওই দেশ।
০৮২০
লুমুম্বা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরতেই সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ডিআরসির ক্ষমতা দখল করেন কর্নেল জোসেফ মোবুতু। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গৃহবন্দি করেন তিনি। যদিও সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন ৩৪ বছরের ওই রাজনৈতিক নেতা। তাতে অবশ্য শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে মোবুতুর বিশ্বস্ত বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান তিনি।
০৯২০
১৯২৫ সালে জন্ম হওয়া লুমুম্বা ছিলেন কঙ্গোর এক কৃষক পরিবারের সন্তান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ওই সময় তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল বেলজিয়ামের হাত থেকে কঙ্গোর স্বাধীনতা। এর জন্য স্থানীয় জনজাতিদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন তিনি। লুমুম্বা নিজে অবশ্য ছিলেন ‘তেতেলা’ গোষ্ঠীর মানুষ। মোট পাঁচটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে, পড়তে এবং লিখতে পারতেন লুমুম্বা। সেই তালিকায় ছিল ফরাসি ভাষার নাম।
১০২০
এ-হেন লুমুম্বা গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁকে দেশে রাখার ভুল করেননি সেনাশাসক মোবুতু। দুই সহযোগী জোসেফ ওকিটো এবং মরিস এমপোলোর সঙ্গে তড়িঘড়ি একটি সামরিক বিমানে রিপাবলিক অফ কাটাঙ্গায় দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে পাঠিয়ে দেন তিনি। লুমুম্বার গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে কোনও গণ আন্দোলন মাথাচাড়া দিক, তা কখনওই চাননি মোবুতু। ফলে তাঁকে দেশছাড়া করতে দু’বার ভাবতে হয়নি তাঁকে।
১১২০
রিপাবলিক অফ কাটাঙ্গায় বেলজিয়ামের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন লুমুম্বা এবং তাঁর দুই সহযোগী। অভিযোগ, সেখানে তাঁদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালায় ইউরোপীয় দেশটির ফৌজ। শেষে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় তাঁদের বুক। কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের তারিখটা ছিল ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি।
১২২০
লুমুম্বার মৃত্যুর পর দেহ লোপাট করতে তৎপর হয় বেলজিয়ামের সেনা। প্রথমেই অগভীর একটি কবরে ফেলে দেওয়া হয় তাঁদের। তার পর অ্যাসিড ঢেলে তিন জনেরই দেহ গলিয়ে ফেলেন তাঁরা। লুমুম্বার সব কিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কেবলমাত্র অবশিষ্ট ছিল একটি দাঁত, যা আবার পরে চুরি করে নিয়ে পালায় বেলজিয়াম পুলিশ। ২০২২ সালে সেই দাঁত লুমুম্বার আত্মীয়দের কাছে ফেরত দেয় তারা।
১৩২০
ডিআরসির প্রথম প্রধানমন্ত্রীর এই করুণ পরিণতির কথা বহু দিন পর্যন্ত ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল বেলজিয়াম। যদিও একটা সময় ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলতেই দুনিয়া জুড়ে ওঠা প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে ব্রাসেলস। তখন বাধ্য হয়ে নৈতিক দায় স্বীকার করে তারা। পাশাপাশি জানিয়ে দেয়, গোটা ষড়যন্ত্রে কী ভাবে তাদের পাশে ছিল মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী সিআইএ।
১৪২০
বেলজিয়াম সরকার লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডের একাধিক নথি পরবর্তী কালে প্রকাশ করেছিল, যা নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়াতেই ওঠে নিন্দার ঝড়। যুক্তরাষ্ট্র যদিও গোটা বিষয়টিকে সে ভাবে গায়ে মাখেনি। এ ব্যাপারে সরকারি ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে দেখা যায়নি ওয়াশিংটনকে। লুমুম্বার পতনে আমেরিকারই সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
১৫২০
গত শতাব্দীর ৮০-র দশকে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত পানামা প্রজাতন্ত্রে (পড়ুন রিপাবলিক অফ পানামা) হঠাৎ করেই ঢুকে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। সেখানকার কুর্সিতে তখন ছিলেন সেনাশাসক ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও নেরিয়েগা। তাঁকে উৎখাত করাই ছিল ওয়াশিংটনের মূল উদ্দেশ্য। তাঁকে বন্দি করতে গিয়ে অবশ্য কালঘাম ছুটে গিয়েছিল মার্কিন ফৌজের। যদিও শেষ হাসি হেসেছিলেন তাঁরাই।
১৬২০
পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সেনা অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন জাস্ট কজ়’। এর শুরুটা অবশ্য নেরিয়েগার বাহিনীই করেছিল। তাদের আক্রমণে এক জন মার্কিন সৈনিকের মৃত্যু হতেই তীব্র প্রত্যাঘাত শানাতে থাকে ওয়াশিংটন। ওই সময়ে মাদুরোর মতোই পানামার সেনাশাসকের বিরুদ্ধে মাদকপাচারের অভিযোগ তুলেছিল আমেরিকা। এ ছাড়া নির্বাচনে কারচুপির মতো অপরাধের খাঁড়াও ঝুলছিল তাঁর মাথার উপর।
১৭২০
সংশ্লিষ্ট সেনা অভিযান শুরু হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ পানামা কব্জা করে ফেলে আমেরিকার সেনা। যদিও নেরিয়েগার টিকির ডগাটা পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি তারা। বিপদ বুঝে তড়িঘড়ি ভ্যাটিকানের দূতাবাসে ঢুকে পড়েন তিনি। সেখানে ঢুকে তাঁকে বন্দি করা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ঘিরে ফেলে অন্য রকমের রণকৌশল নেন ওয়াশিংটনের কমান্ডারেরা।
১৮২০
মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন থেকে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী নেরিয়েগাকে দূতাবাস থেকে বার করতে একগুচ্ছ রক গান বাজিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। সেই তালিকায় ছিল জনপ্রিয় কেসি অ্যান্ড দ্য সানশাইন ব্যান্ডের ‘গিভ ইট আপ’, অ্যালিস কুপারের ‘নো মোর মিস্টার নাইস গাই’, ব্ল্যাক সাবাথের ‘প্যারানয়েড’, গানস এন’ রোজ়েসের ‘ওয়েলকাম টু দ্য জাঙ্গল’, বন জোভির ‘ওয়ান্টেড ডেড অর অ্যালাইভ’ এবং দ্য ডোরসের ‘দ্য এন্ড’।
১৯২০
ওয়াশিংটনের এই কৌশল কিন্তু কাজে এসেছিল। ভ্যাটিক্যান দূতাবাসে ১১ দিন থাকার পর ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি আত্মসমর্পণ করেন পানামার সামরিক শাসক নেরিয়েগা। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে মিয়ামিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার আদালত মাদকপাচার, জালিয়াতি এবং আর্থিক তছরুপের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে। ২০১৭ সালে জেলবন্দি অবস্থাতেই মৃত্যু হয় তাঁর।
২০২০
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করে আমেরিকা। বাগদাদের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরির অভিযোগ এনেছিল ওয়াশিংটন। পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশটির কুর্সিতে তখন ছিলেন সাদ্দাম হুসেন। ওই বছর ইরাকের তিকরিত শহরের একটি বাঙ্কার থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো বাহিনী। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝোলানো হয় তাঁকে।