Oxford-Educated Physician and Former NCP Leader Enters Bangladesh Elections as Independent Candidate dgtl
Who is Tasnim Jara
অক্সফোর্ডের প্রাক্তনী, ফেসবুকে ৭১ লক্ষ অনুগামী! তবু নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে ব্যর্থ ‘জুলাই বিপ্লবের’ সেই তাসনিম
বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে একজন ছিলেন তাসনিম জারা। তাঁর জয়লাভের সম্ভাবনা নিয়ে তুমুল আলোচনা হলেও শেষমেশ ব্যালটে তার প্রভাব পড়েনি। হেরে গিয়ে তৃতীয় স্থান নিয়ে সন্তুষ্ট হতে হয়েছে তাঁকে।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:০২
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৯
চোখে ছিল পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন। বিলেতের মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার আশা নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন ৩১ বছর বয়সি চিকিৎসক। ব্রিটেনের হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশের নির্বাচন লড়তে প্রত্যাবর্তন করেন সঙ্গে নেটমাধ্যমে ৭১ লক্ষেরও বেশি অনুরাগী থাকা তাসনিম জারা।
০২১৯
ব্রিটেন থেকে দেশে পা রাখার পর বাংলাদেশের ছাত্রনেতাদের একাংশের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগদান করেন। কিন্তু পরে ইসলামপন্থী দলগুলির সঙ্গে জোটের কারণে তিনি দলত্যাগ করেন। নির্দল প্রার্থী হিসাবে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন প্রবাসী চিকিৎসক তরুণী। যদিও প্রথম বার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সাফল্য থেকে গেল অধরাই। দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘অন্য’ রাজনীতির পাঠ শেখানোর চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সফল হলেন না তাসনিম।
০৩১৯
সদ্যসমাপ্ত পড়শি দেশের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে একজন ছিলেন তাসনিম। ইংল্যান্ড থেকে ঢাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর নির্বাচনী লড়াই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে অনেকেরই। ঢাকা-৯ আসনে সাবেক এনসিপি নেত্রী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ফুটবল প্রতীকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন।
০৪১৯
ফলাফল প্রকাশের (বেসরকারি মতে) পর দেখা গিয়েছে ঢাকা ৯ নম্বর আসনে তাসনিম পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। তৃতীয় স্থানে রয়েছেন তিনি। জিতেছেন বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদ। ধানের শীষ প্রতীক চিহ্নে তিনি মোট ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়েছেন। তাসনিম লড়েছিলেন ফুটবল প্রতীকে।
০৫১৯
নির্বাচনের ময়দানে নেমে মেঠো প্রচারের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন সমাজমাধ্যমকেও। তরুণ এই প্রার্থীকে নিয়ে সমাজমাধ্যমও যথেষ্ট সরগরম ছিল। তাঁর জয়লাভের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও শেষমেশ ব্যালটে তার প্রভাব পড়েনি। তৃতীয় স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে বিদেশের নিরাপদ জীবন ও চিকিৎসা পেশা ছেড়ে আসা এই মেধাবী তরুণীকে।
০৬১৯
স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক ভিডিয়ো পোস্ট করে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন তাসনিম। তাসনিম জারা ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিসের (এনএইচএস) চিকিৎসক। তাঁর সুস্পষ্ট, প্রাঞ্জল বাংলা বাচনভঙ্গি ও বিষয়বস্তু বাছাইয়ের জন্য অল্প সময়ে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ অনুরাগী তৈরি করেছেন তাসনিম। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই অক্সফোর্ডের এই প্রাক্তনীর পেশাগত সাফল্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
০৭১৯
তাসনিমের জন্ম ঢাকা শহরে, ১৯৯৪ সালে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পরে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘এভিডেন্স বেসড হেল্থ কেয়ার’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবন শুরু করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেই। জুনিয়র ডাক্তার হিসাবে।
০৮১৯
কলেজে পড়ার সময় তিনটি আন্তর্বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তাসনিম। এ ছাড়াও সে সময় রাষ্ট্রপুঞ্জের যুব উপদেষ্টা পরিষদ বাংলাদেশের সভাপতিও ছিলেন তিনি। দেশে কিছু দিন চাকরির করার পর তাসনিম চলে যান ইংল্যান্ডে। অতিমারির শুরু থেকেই ইংল্যান্ডের একটি হাসপাতালে সামনের সারিতে থেকে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়েছিলেন তিনি।
০৯১৯
তাসনিম এনসিপি-র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ছিলেন। জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপি-র নির্বাচনী জোট মেনে নিতে না পেরে দলত্যাগ করেন তিনি। তাসনিমের স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহও এনসিপি-র দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এর পর ঢাকা–৯ নম্বর আসনে নির্দল প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দেন তাসনিম।
১০১৯
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রার্থীদের হলফনামা অনুযায়ী, তাসনিমের অস্থাবর সম্পদের মূল্য ২২ লাখ ৩০ হাজার ১৯০ টাকা (বাংলাদেশি)। তাঁর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ শূন্য। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ ১৬ লাখ বাংলাদেশি টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা ৩ লাখ ৭০ হাজার বাংলাদেশি টাকা। ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়ের পরিমাণ ১০ হাজার ১৯০ বাংলাদেশি টাকা। তাঁর সম্পদের মধ্যে আড়াই লক্ষ বাংলাদেশি টাকা মূল্যের সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুও রয়েছে।
১১১৯
বাংলাদেশে চাকরি করে বছরে ৭ লাখ ১৩ হাজার বাংলাদেশি টাকা আয় করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাঙ্ক থেকেও তাঁর আয় হয়। দেশের বাইরে থেকে তাঁর আয় ৩ হাজার ২০০ পাউন্ড।
১২১৯
বাংলাদেশে প্রার্থীদের মধ্যেও অনেকেই ফেসবুকে সক্রিয়। তাঁদের অনুগামীর সংখ্যাও যথেষ্ট। সমাজমাধ্যমের অনুসরণকারীদের নিরিখে সকলকে টপকে গিয়েছেন তাসনিম। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও। তাসনিম জারার ফেসবুকে অনুসরণকারী ৭১ লাখের বেশি। ফেসবুকে তারেকের অনুসরণকারীর সংখ্যা ৫৬ লাখ।
১৩১৯
যদিও তাসনিমের ফেসবুক পেজটি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে খোলা, সেই অর্থে বেশ পুরনোই বলা যায়। নির্বাচনের আগেই তিনি এনসিপি-র প্রার্থী হিসাবে ফেসবুকে ‘ক্রাউন্ড ফান্ডিং’-এর মাধ্যমে ৪৭ লাখ বাংলাদেশি টাকার বেশি অর্থসহায়তা পান। এই টাকা তিনি প্রচারের কাজে লাগাবেন বলে হলফনামায় জানিয়েছিলেন চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ।
১৪১৯
মনোনয়নপত্র দাখিলের পর ভোটারের তালিকায় গরমিলের কারণে তাসনিমের ভোটে দাঁড়ানো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। বাতিল হয়ে যায় তাঁর মনোনয়নও। প্রার্থীপদে তাসনিমের নাম প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসাবে যে ১০ জন ছিলেন তাঁদের মধ্যে দু’জন ঢাকা-৯ নম্বর আসনের ভোটার ছিলেন না। নির্বাচনবিধি অনুযায়ী তাঁর মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে দমে না গিয়ে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে গত ১০ জানুয়ারি প্রার্থীপদ ফিরে পান তিনি।
১৫১৯
নির্বাচনী প্রচারের ফাঁকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাসনিম জানিয়েছিলেন, বিদেশে থিতু হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনের লড়াইয়ের সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কাজ করেনি তাঁর। দু’টি বিষয় তাঁকে রাজনীতির ময়দানে টেনে এনেছে। এক জন চিকিৎসক হিসাবে বহু মানুষকে সাহায্য করার সুযোগ থাকলেও এই পেশা তাঁকে সমাজ ও রাজনীতির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করতে দেবে না।
১৬১৯
দ্বিতীয় কারণটি হল তিনি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং শাসনব্যবস্থায় স্থায়ী সংস্কার চান। স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতির আধিপত্য বিস্তারকারী রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে স্বচ্ছতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তাসনিম। প্রচলিত অর্থ ও পেশিশক্তির মাধ্যমে নির্বাচন জেতা নিয়ে বার বার সরব হয়েছিলেন তিনি। প্রচারের সময় জানিয়েছিলেন, ‘‘আমি প্রমাণ করতে চাই যে অর্থ ও পেশিশক্তির বাইরে গিয়েও নির্বাচন করা এবং জেতা সম্ভব।’’
১৭১৯
তাসনিমের প্রচারের মূল হাতিয়ার ছিল ভোটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আস্থা। রাজনীতির প্রচারের জন্য শহর জুড়ে বড় সমাবেশ বা পোস্টারের সাহায্য নেননি তাসনিম। একটি ক্লিপবোর্ড নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পথচারীদের কাছ থেকে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন।
১৮১৯
বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে বড় জয়ের পথে এগোচ্ছে তারেক রহমানের বিএনপি। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই আসনসংখ্যা বাড়ছে বিএনপি-র। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে নির্বাচন হয়েছে বৃহস্পতিবার। এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় বিএনপি ২১২ আসনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৭৭টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ অন্যরা পেয়েছে ৮টি আসন।
১৯১৯
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ বার ছিল একেবারে ভিন্ন। ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া হিংসাত্মক গণবিক্ষোভের জেরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ছাত্র-যুবদের সেই আন্দোলনের মূল মদতদাতা ছিল কট্টরপন্থী দল ‘জামায়াতে ইসালামী’ বা জামাত। সমাজমাধ্যমে ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাসনিমকে নিয়ে উন্মাদনা থাকলেও ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ভিন্ন বার্তাই দিয়েছে। অনভিজ্ঞ তরুণ রাজনীতিককে না বেছে বিএনপি-র হাবিবুর রশিদ হাবিবকেই বেছে নিয়েছেন জনতা।