Russia may lose influence in Caucasus region as its close ally Armenia signs mega civil nuclear agreement with US dgtl
US Armenia Nuclear Deal
রুশ হাত ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি! ককেশাসে প্রভাব বিস্তারে পুতিনের ‘বন্ধু’কে দলে টেনে চমক ট্রাম্পের আমেরিকার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসামরিক পরমাণু চুক্তিতে সই করেছে এককালের সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকা আর্মেনিয়া। ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে আরও একা হয়ে পড়লেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন? কেন মস্কোর উপর আস্থা হারাল ইয়েরেভান?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২২
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১২০
সিরিয়া ও ভেনেজ়ুয়েলার পর এ বার আর্মেনিয়া। মার্কিন চালে ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের মাথায় আরও এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হাতছাড়া হতে চলেছে রাশিয়ার? সম্প্রতি খ্রিস্ট ধর্মপ্রধান ওই দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের পা পড়তেই এই নিয়ে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা। বিশ্লেষকদের দাবি, তাঁর সফরের জেরে দক্ষিণ ককেশাসের ভূ-রাজনীতিতে আসতে চলেছে বড় বদল। শুধু তা-ই নয়, এর মাধ্যমে এককালের সোভিয়েত এলাকায় অচিরেই ‘মেগা এন্ট্রি’ নেবে আমেরিকা।
০২২০
গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের আগে পর্যন্ত পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে আর্মেনিয়ার কোনও অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু, ১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে ১৫টি নতুন দেশের জন্ম হয়। তখনই দক্ষিণ ককেশাসের ওই এলাকাটি মস্কোর থেকে আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তী দশকগুলিতে ইয়েরেভানকে রাজধানী করে একটি শক্তিশালী সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে আর্মেনিয়া। ‘হাঁড়ি আলাদা’ হলেও এত দিন রাশিয়ার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলেছে তারা।
০৩২০
২০২৪ সালের নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বারের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হতেই বদলাতে শুরু করে যাবতীয় হিসাব। প্রথা ভেঙে তাঁকে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান আর্মেনীয় প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান। সোভিয়েত পতনের জেরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেও এমন কাজ কখনওই করেনি ইয়েরেভান। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কয়েক মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ‘মধ্যস্থতায়’ প্রতিবেশী আজ়ারবাইজানের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে সই করে তারা।
০৪২০
সোভিয়েত পতনে আর্মেনিয়ার মতোই ১৯৯১ সালে দক্ষিণ ককেশাসে জন্ম হয় আজ়ারবাইজানের। মুসলিমপ্রধান দেশটির রাজধানী বাকু। জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই নাগোর্নো-কারাবাখ এলাকাকে কেন্দ্র করে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে দুই প্রতিবেশী। অবস্থানগত দিক থেকে স্থলবেষ্টিত জায়গাটা আজ়ারবাইজানের অন্তর্গত। কিন্তু, সেখানকার বাসিন্দারা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হওয়ায় আর্মেনীয় এলাকা হিসাবে স্বীকৃতি পায় নাগোর্নো-কারাবাখ। ফলে এই ইস্যুতে দু’পক্ষের মধ্যে চড়তে থাকে সংঘাতের পারদ।
০৫২০
২০২৩ সালে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে নাগোর্নো-কারাবাখ দখল করে আজ়ারবাইজান। ফলে বাধ্য হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আর্মেনিয়ায় আশ্রয় নেন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা। এ-হেন পরিস্থিতিতে বাকু ও ইয়েরেভানকে শান্তিচুক্তির জন্য রাজি করানো ছিল ‘শিবেরও অসাধ্য’। কিন্তু সেখানে ১০০ শতাংশ সফল হন ট্রাম্প। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) এপ্রিলে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হোয়াইট হাউসে ডেকে এনে ঐতিহাসিক সমঝোতায় সই করান তিনি।
০৬২০
যুক্তরাষ্ট্রের ওই পদক্ষেপকে রাশিয়ার থেকে আর্মেনিয়ার দূরত্ব বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসাবে দেখেছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের কথায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জেডি ভান্সের ইয়েরেভান সফরের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয়েছে সেই বৃত্ত। দক্ষিণ ককেশাসের দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ইতিমধ্যেই একটি অসামরিক পরমাণু চুক্তিতে সই করেছেন তিনি। এর মাধ্যমে সেখানে কয়েক কোটি ডলার লগ্নির কথা আছে আমেরিকার।
০৭২০
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকা আর্মেনিয়ায় কখনওই পা রাখেননি কোনও মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সে দিক থেকে প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে ভান্সের ইয়েরেভান সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ ককেশাসের দেশটি এখনও প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেলের জন্য পুরোপুরি ভাবে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল। তার পরেও কেন মস্কোর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান? এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ।
০৮২০
আর্মেনীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার জন্য অনেকাংশেই দায়ী রাশিয়া। বহু বার প্রয়োজনের সময় সাহায্য চেয়ে মস্কোকে পাশে পায়নি ইয়েরেভান। ফলে যুদ্ধে হেরে গিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুখ পুড়েছে তাদের। আর তাই নতুন ‘বন্ধু’ হিসাবে আমেরিকাকে অনেক বেশি ভরসাযোগ্য বলে মনে হচ্ছে তাদের।
০৯২০
গত শতাব্দীর ৮০-র দশকে প্রথম বার নাগোর্নো-কারাবাখকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী আজ়ারবাইজানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় আর্মেনীয় ফৌজ। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েক বার যার পুনরাবৃত্তি হতে দেখা গিয়েছে। গোড়ার দিকে এই বিবাদে সরাসরি ‘নাক গলাত’ মস্কো। ফলে ক্রেমলিনের চাপে প্রতি বারই পিছু হটতে বাধ্য হত বাকু। ২১ শতকে পৌঁছে পুরোপুরি বদলে যায় সেই পরিস্থিতি, যা দক্ষিণ ককেশাসের দেশটি একেবারেই মেনে নিতে পারেনি।
১০২০
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণ করে মস্কোর ফৌজ। এর জেরে পূর্ব ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হলে পুরনো সহযোগীদের মাথার উপর থেকে একরকম হাত সরিয়ে নেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফলে ২০২৩ সালে আজ়ারবাইজানের সেনা নাগোর্নো-কারাবাখকে ঘিরে ফেললে ক্রেমলিনের কাছে সাহায্য চেয়েও তা পাননি প্রধানমন্ত্রী পাশিনিয়ান। অন্য দিকে পর্দার আড়াল থেকে বাকুকে হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহ করতে থাকে তুরস্ক।
১১২০
নাগোর্নো-কারাবাখ পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়ার পর রাশিয়ার উপর ক্ষোভ উগরে দেয় আর্মেনীয় সরকার ও সেনা। ওই বছর যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থা কাস্টো-র (কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকার করে ইয়েরেভান। প্রশ্ন তোলে সংশ্লিষ্ট সামরিক চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় এ ব্যাপারে তখন অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটে ছিল মস্কো।
১২২০
সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৯২ সালে ইউরেশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করে রাশিয়া। গড়ে তোলে একটা যৌথ বাহিনীও। তারই রেশ ধরে ২০০২ সালের অক্টোবরে জন্ম হয় কাস্টো-র। এর চার নম্বর ধারায় বলা আছে যে, সংশ্লিষ্ট সমঝোতার অন্তর্গত কোনও রাষ্ট্র যদি অন্য কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে সকলে তাকে যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করবে। মস্কো ও ইয়েরেভান ছাড়াও এই চুক্তিতে রয়েছে বেলারুশ, কাজ়াখস্তান, কিরঘিজ়স্তান ও তাজ়িকিস্তান।
১৩২০
কাস্টো-র সদস্য হিসাবে আজ়ারবাইজানের আক্রমণের সময় রুশ ও অন্যান্য দেশগুলির থেকে সামরিক প্রত্যাশা করেছিল আর্মেনিয়া। কিন্তু, ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে থাকায় এ ব্যাপারে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি মস্কো। ফলে কাস্টো-র অন্তর্ভুক্ত হয়েও নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় দক্ষিণ ককেশাসের ওই দেশ, যা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মুখ ঘোরাতে বাধ্য করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
১৪২০
রাশিয়ার উপর আর্মেনিয়ার বিশ্বাস হারানোর আরও কয়েকটা কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাস দখল করে হায়াত তাহরির আল-শাম নামের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। নেপথ্যে থেকে তাদের সাহায্য করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক। ওই সময় পশ্চিম এশিয়ার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে মস্কোয় আশ্রয় নেন সেখানকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার অল-আসাদ। বিপদগ্রস্ত অবস্থায় তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি রুশ ফৌজ।
১৫২০
চলতি বছরের ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে ভেনেজ়ুয়েলাকে নিশানা করে মার্কিন সেনা। রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনে ট্রাম্পের ডেল্টা ফোর্স। অতীতে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর যাবতীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পুতিন, যা বাস্তবে ফলপ্রসূ হয়নি। এতে মস্কোর উপর আর্মেনিয়ার বিশ্বাস যে অনেকটাই টলে গিয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
১৬২০
মাদুরো-কাণ্ডের কয়েক দিনের মাথাতেই আটলান্টিক মহাসাগরে একটি রুশ তেলবাহী জাহাজকে ‘অপহরণ’ করে মার্কিন নৌবাহিনী। সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ওয়াশিংটনকে হুমকি দেয় মস্কো। তাতে অবশ্য কাজের কাজ হয়নি। বিশ্লেষকদের দাবি, এই ঘটনার জেরে অনেকটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে ক্রেমলিনের শক্তি। পর পর ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলিই রাশিয়ার থেকে আর্মেনিয়াকে দূরে নিয়ে গিয়েছে।
১৭২০
সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির কথা সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে জানিয়েছেন ট্রাম্প। কিছু দিনের মধ্যেই সেই সমঝোতায় সই করবে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের দাবি, তার পর মস্কোর থেকে আর খনিজ তেল (উরাল ক্রুড) কিনবে না কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। সরাসরি এ ব্যাপারে অবশ্য এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি নয়াদিল্লি। তবে গত কয়েক মাস ধরে ক্রেমলিনের তরল সোনা আমদানি হ্রাস করতে দেখা গিয়েছে ভারতকে।
১৮২০
মার্কিন চালে একের পর এক ‘বন্ধু’কে হারিয়ে একঘরে হয়ে যাওয়া মস্কোর হাতে যে কোনও তাস নেই, এ কথা ভাবলে ভুল হবে। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা আর্মেনিয়াকে ইতিমধ্যেই বার্তা দিয়েছেন রুশ বিদেশমন্ত্রী সর্গেই লেভরভ। পুরনোদের ভুলে গেলে খেসারত দিতে হবে বলে ইয়েরেভানকে সতর্ক করেছেন তিনি।
১৯২০
খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য আর্মেনিয়া এখনও পুরোপুরি ভাবে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য সেটা হারানো ইয়েরেভানের পক্ষে আত্মহত্যার শামিল। ককেশাস এলাকার দেশটিতে সোভিয়েত যুগের পরমাণু চুল্লি রয়েছে, যেটা বর্তমানে বেশ বুড়িয়ে গিয়েছে। সেই কারণে আমেরিকার টাকায় নতুন আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী পাশিনিয়ান।
২০২০
সোভিয়েত ভেঙে বেরিয়ে আসা ইউক্রেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) অংশ হতে চেয়েছিল। ফলস্বরূপ রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে কিভ। ভবিষ্যতে আমেরিকার চাপে একই ভুল করবে আর্মেনিয়া? আগামী দিনে মিলবে তার উত্তর।