Russia's second-largest oil company agrees to sell its global assets to American stock giant Carlyle Group dgtl
Lukoil international assets
নিষেধাজ্ঞার ফাঁসে ছটফট করা তেলসংস্থার সম্পদ লুটের ছক আমেরিকার! রাশিয়াকে প্যাঁচে ফেলতে নিজের তৈরি আইনও ভাঙবেন ট্রাম্প?
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার তিন মাস পর রাশিয়ার তেলশোধক লুকঅয়েল তাদের বিদেশি ইকুইটি মার্কিন সংস্থার কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এই সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার পুরোটাই নির্ভর করছে হোয়াইট হাউসের কর্তাব্যক্তিদের মর্জির উপর।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৮
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৭
নিজের গড়া আইন নিজেই ভাঙছে আমেরিকা। আর সেই আইন ভেঙে ‘চিরশত্রু’ দেশের কালো তালিকাভুক্ত তেলসংস্থার সম্পদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে তারা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটলান্টিকের পারের বেসরকারি ইকুইটি ফার্ম কার্লাইল গ্রুপ শামিল হয়েছে রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই তেলসংস্থার বিদেশি সম্পদ কেনার দৌ়ড়ে।
০২১৭
রাশিয়ার বৃহত্তম তেলসংস্থাগুলির একটি হল লুকঅয়েল। রসনেফ্ট ও গ্যাজ়প্রমের পরে তৃতীয় বৃহত্তম সংস্থা এটি। ২২০০ কোটি ডলারের বিদেশি সম্পদ বা ইকুইটি রয়েছে মস্কোর এই তেলশোধক সংস্থাটির হাতে। কিন্তু রাশিয়া ২০২২ সালের মার্চ মাসে, ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোয় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে লুকঅয়েলের শেয়ারের দাম ৯৫ শতাংশ কমে যায়।
০৩১৭
তার পরেও ২০২২ সালে সংস্থার আয় ছিল ২৯ লক্ষ কোটি রুবল (রাশিয়ার মুদ্রা)। ২০২৪ সালে তা ৩০ লক্ষ কোটি রুবলে দাঁড়িয়েছে। লুকঅয়েল মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ জুড়ে প্রায় ২,০০০ জ্বালানি স্টেশন নিয়ে একটি বড়সড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।
০৪১৭
সেই সংস্থারই বিদেশি সম্পদ কিনতে প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে মার্কিন বেসরকারি সংস্থা কার্লাইল। লুকঅয়েল গত বছরই (২০২৫ সালে) একটি বিবৃতি জারি করে জানিয়েছিল, কিছু রাষ্ট্র (মূলত আমেরিকা) তাদের ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমি বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাধ্য হয়েই তাই বিদেশে থাকা প্রকল্পগুলির সম্পদ অন্য সংস্থার হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। সংস্থাটি তাই আন্তর্জাতিক সম্পদ বিক্রি করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
০৫১৭
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার তিন মাস পর রাশিয়ার তেলশোধক লুকঅয়েল তাদের বিদেশি ইকুইটি মার্কিন সংস্থার কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও এই সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার পুরোটাই নির্ভর করছে হোয়াইট হাউসের কর্তাব্যক্তিদের মর্জির উপর। কার্লাইলের সঙ্গে লেনদেনের সবটাই মার্কিন প্রশাসনের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি না চান, তা হলে রুশ সংস্থার বিদেশি সম্পদ বেচা বিশ বাঁও জলে।
০৬১৭
লুকঅয়েল বা কার্লাইল কেউই এই বিক্রয়ের জন্য কোনও দর এখনও পর্যন্ত দেয়নি। দরদাম স্থির করার জন্য নিষেধাজ্ঞা পরিচালনাকারী মার্কিন সংস্থা অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোলের অনুমোদন প্রয়োজন। যদিও মার্কিন ট্রেজ়ারি লুকঅয়েলকে তার আন্তর্জাতিক পোর্টফোলিয়ো বিক্রি করার জন্য ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছে। সূত্রের খবর অনুসারে, দু’টি সংস্থা এখনও মূল্যায়নের বিষয়ে একমত হয়নি। সে কারণে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
০৭১৭
এই চুক্তিতে কাজাখস্তানে থাকা লুকঅয়েলের সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। এটি লুকঅয়েলের নিজস্ব অংশ বলে চিহ্নিত করা হবে। সেখানে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। কাজাখস্তানের মন্ত্রী ইয়েরলান আক্কেনঝেনভ ২৮ জানুয়ারি জানিয়েছেন, কাজাখস্তানে থাকা লুকঅয়েলের সম্পদ কেনার জন্য সে দেশের তেল মন্ত্রক মার্কিন ট্রেজ়ারির কাছে একটি অনুরোধ জমা দিয়েছে।
০৮১৭
তেংগিজ এবং কারাচাগানাক তেল প্রকল্পের পাশাপাশি কাজাখস্তানের প্রধান অপরিশোধিত তেল রফতানি রুট ‘কাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামে’ (সিপিসি) লুকোঅয়েলের অংশীদারি রয়েছে। মার্কিন ট্রেজ়ারি ইতিমধ্যেই লুকঅয়েলের সম্পদের তালিকা থেকে সিপিসি, তেংজিজ এবং গ্যাস কনডেনসেট ফিল্ড কারাচাগানাককে বাদ দিয়েছে।
০৯১৭
লুকঅয়েলর অন্যান্য বিদেশি সম্পদের মধ্যে রয়েছে আজারবাইজানের শাহ ডেনিজ প্রকল্প এবং ইরাকের বিশাল ওয়েস্ট কুর্না প্রকল্পটি। এ ছাড়াও উজ়বেকিস্তান, মিশর, ক্যামেরুন, নাইজ়িরিয়া, ঘানা, মেক্সিকো, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কঙ্গোতে তরল সোনার অনুসন্ধান ও উৎপাদনের প্রকল্পে অংশীদার রুশ সংস্থাটি।
১০১৭
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বক্তব্য, ইউক্রেনের সঙ্গে অর্থহীন যুদ্ধ বন্ধ করতে অস্বীকার করেছেন পুতিন। ক্রেমলিনকে যুদ্ধের মূলধন জোগানো মূল দু’টি সংস্থাকে ‘ভাতে মেরে’ শিক্ষা দিতে চায় ওয়াশিংটন। সে কারণেই গত বছরের (২০২৫ সালের) নভেম্বরে দু’টি রুশ তেলসংস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প দাবি করেছেন, রুশ তেলশোধক সংস্থাগুলির উপর নয়া নিষেধাজ্ঞা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে অগ্রগতির পথ তৈরি করতে পারে।
১১১৭
জ্বালানি খাতের বেসরকারি ইকুইটি সংস্থাগুলি সাধারণত বিক্রির চেষ্টা করার আগে লাভের মুখ দেখার জন্য প্রায় পাঁচ বছর ধরে সম্পদ ধরে রাখে। ট্রাম্পের দাবি, মাত্র এক বছরে ইউরোপে জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) বিক্রি করে প্রায় ১১০ কোটি ইউরো উপার্জন করেছে মস্কো। তাই মস্কোর সমস্ত দেশ সস্তায় রাশিয়ার তেল কিনে ভ্লাদিমির পুতিনকে যুদ্ধে সহায়তা করছে, তাদের শাস্তি দিতে বিপুল পরিমাণ শুল্ক চাপান ট্রাম্প।
১২১৭
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেই মস্কোর তেল বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল আমেরিকা। সেই সময় তেল বিক্রি অব্যাহত রাখতে মোটা টাকা ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসন। ভারতও তেল কেনার বিষয়ে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির উপর নির্ভরতা খানিক কমিয়ে রাশিয়া থেকে তেল কেনার পরিমাণ ক্রমশ বাড়াতে থাকে। চিনের পর ভারতই রুশ তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক।
১৩১৭
বিশ্বের সমস্ত দেশকে শুল্কের ‘জুজু’ দেখিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও নিজের দেশের সংস্থার মুনাফার জন্য নিষেধাজ্ঞার বেড়া নিজেই ডিঙোচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন, এমনটাই মনে করছে রাশিয়ার কূটনৈতিক মহল। যদিও পুতিনের সরকার এই চুক্তির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃত হয়েছে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, এটি একটি কর্পোরেট বিষয় এবং রাশিয়ার উপর পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞাগুলি অবৈধ।
১৪১৭
মার্কিন স্টক জায়ান্ট কার্লাইল একটি পৃথক বিবৃতিতে বলেছে, প্রস্তাবিত লেনদেনটি মার্কিন বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ অফিসের নীতি ও নির্দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তৈরি হবে। সংস্থাটি এ-ও জানিয়েছে, অধিগ্রহণের পর প্রকল্পগুলির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে। কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। সম্পদকে স্থিতিশীল করে সুরক্ষিত ও নির্ভরশীল পোর্টফোলিয়ো বজায় রাখা হবে।
১৫১৭
লুকঅয়েল অক্টোবরে ঘোষণা করেছিল যে, তারা তাদের আন্তর্জাতিক সম্পদ জ্বালানি ব্যবসায়ী গুনভোর গ্রুপের কাছে বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন ট্রেজ়ারি সেই চুক্তির আশায় জল ঢেলে দেয়। গুনভোরকে ক্রেমলিনের ‘হাতের পুতুল’ হিসাবে বর্ণনা করার পর চুক্তিটি ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে মার্কিন সংস্থা এক্সন মোবিল কর্পোরেশন, শেভরন কর্পোরেশন এবং আবু ধাবির তেলসংস্থা ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির মতো সংস্থাগুলি লুকঅয়েলের বৈদেশিক সম্পত্তি অধিগ্রহণে আগ্রহী হয়েছিল।
১৬১৭
ওয়াশিংটন ডিসিস্থিত কার্লাইল একটি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ সংস্থা। এদের সম্পদের পরিমাণ ৪৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে তেল ও গ্যাস, পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি ও পরিকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক শক্তি সম্পদে তারা বিনিয়োগ করেছে ২০০০ কোটি টাকা। বিনিয়োগ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই সংস্থাটির।
১৭১৭
মার্কিন ট্রেজ়ারি বিভাগ সূত্রের খবর অনুসারে ওয়াশিংটন তখনই এই চুক্তিটি অনুমোদন করবে যদি কার্লাইল বিদেশি সম্পদগুলি কেনার পর লুকঅয়েলের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করে। মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম একটি শর্ত হল লেনদেনের টাকা একটি ব্লক করা অ্যাকাউন্টে জমা করতে হবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত লুকঅয়েল সেই অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করার অনুমোদন পাবে না।