এর পর ভারতের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র বলে পরিচিত সৌদি আরবের থেকে নেওয়া ২০০ কোটি ডলারের ঋণের ফাঁদ থেকে বেরোবার জন্য তদ্বির শুরু করে পাকিস্তান। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে নিরাপত্তা চুক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে দুই দেশ। এর মধ্যেই ‘ইসলামীয় নেটো’র পালে হাওয়া লাগিয়ে পাকিস্তান এবং সৌদির হাত শক্ত করতে এ বার এগিয়ে এল আরও একটি ইসলামীয় দেশ!
আঙ্কারাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘টিইপিএভি’-এর কুশলী নিহাত আলি ওজ়কান জানিয়েছেন, যদি তিন দেশের মধ্যে চুক্তি হয়, অর্থাৎ, পাকিস্তান এবং সৌদির চুক্তিতে তুরস্ক ঢুকে পড়তে পারে, তা হলে তিন দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। চুক্তি ফলপ্রসূ করতে টাকা ঢালবে সৌদি আরব। পাকিস্তান সাহায্য করবে তার পরমাণু শক্তি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জনবল দিয়ে এবং তুরস্ক সামরিক দক্ষতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প দিয়ে সাহায্য করবে, তেমনটাই জানিয়েছেন ওজ়কান।
পাশাপাশি, সৌদি আরব এবং তুরস্ক— উভয়ের সঙ্গেই শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের সম্পর্ক ভাল নয়। দু’দেশই ইরানকে নিয়ে স্থায়ী উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। যদিও উভয়েই সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে তেহরানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মিটমাটের পক্ষে। একই সঙ্গে স্থিতিশীল, সুন্নি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়াকে সমর্থন এবং প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষেও একমত আঙ্কারা এবং রিয়াধ।
যদিও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকের দাবি, ‘ইসলামীয় নেটো’র জিগির তুললেও তা তৈরি করা পাকিস্তানের পক্ষে কষ্টসাধ্য। বর্তমানে বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের সংগঠন ‘অর্গানাইজ়েশন অফ ইসলামিক কান্ট্রিজ়’ বা ওআইসিকে পুরোপুরি ‘ইসলামীয় নেটো’য় বদলে ফেলার ছক কষছে পাক ফৌজ ও সরকার। কিন্তু, সমস্যার জায়গা হল এর মধ্যে একাধিক দেশেই চলছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। দুনিয়ার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোকাক্ট) মাত্র আট শতাংশ অবদান রয়েছে ওআইসির। তা ছাড়া পরমাণু শক্তিধর হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্য এঁটুলি পোকার মতো গায়ে লেগে আছে ইসলামাবাদের।
পাকিস্তানের ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির রাস্তায় দ্বিতীয় কাঁটা হল শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব। বর্তমানে সারা বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই সুন্নিপন্থী। বাকি ১০ শতাংশ শিয়া মতাদর্শ মেনে চলেন। সুন্নি মতবাদকে সামনে রেখে ওআইসি-সহ সমগ্র ইসলামীয় দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার স্বপ্ন রয়েছে সৌদি আরবের। পাকিস্তান সেই পথেরই পথিক। কিন্তু, পারস্য উপসাগরের কোলের শিয়া মুলুক ইরান সেটা কতটা মেনে নেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সামরিক জোট গঠন তো দূরস্থান, উল্টে নিজেদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
ইসলামীয় দেশগুলির আর একটি বড় সমস্যা হল সন্ত্রাসবাদ। পাকিস্তান, ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক বা তুরস্ক— কেউই এর বাইরে নেই। জঙ্গি সংগঠনগুলির জাল ছড়িয়ে রয়েছে আফ্রিকার মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতেও। কোথাও স্থানীয় সরকার, কোথাও আবার প্রত্যক্ষ বিদেশি মদতে ক্রমাগত শক্তি বাড়াচ্ছে তারা। ফলে অধিকাংশ জায়গাতেই রয়েছে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। পাশাপাশি, ধর্মীয় কট্টরপন্থা এবং মৌলবাদ সেখানে দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে।
পাকিস্তানের ‘ইসলামীয় নেটো’র স্বপ্নের কফিনে পেরেক পুঁততে পারে রাজনৈতিক অস্থিরতাও। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর গত ৭৭ বছরে চার বার সেনা অভ্যুত্থান দেখেছে ইসলামাবাদ। একই অবস্থা ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন বা মিশরের মতো দেশগুলিরও। দুর্নীতির নিরিখে বিশ্বের প্রথম ২০টি স্থানেই রয়েছে কোনও না কোনও মুসলিম দেশ। সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে প্রথম ১০টির মধ্যে ন’টি রাষ্ট্রই ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
যদিও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওআইসি-ভুক্ত ৫৭টি দেশের মধ্যে মাত্র আটটি দেশের আর্থিক অবস্থা ভাল। সেই তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং জর্ডনের নাম। অপরিশোধিত খনিজ তেল রফতানির উপরে চলছে এদের অর্থনীতি। ফলে দেশগুলির বদান্যতায় ভবিষ্যতে ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির স্বপ্ন সফল হলেও হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy