সেনা অফিসারদের আনুগত্য যাচাইয়ে পলিগ্রাফ পরীক্ষা, পর পর ছাঁটাই! যুদ্ধ সচিবের ‘খ্যাপামি’র বড় মূল্য চোকাবে আমেরিকা?
ফাঁস হচ্ছে মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথের একের পর এক কীর্তিকলাপ। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসারদের পলিগ্রাফ পরীক্ষার নির্দেশ দেন তিনি। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড থেকে বাদ দিয়েছেন ভারত শব্দটিও।
যখন-তখন জেনারেল পদমর্যাদার ফৌজি অফিসারদের বরখাস্ত। সেনা সদরে কর্মরতদের জবরদস্তি পলিগ্রাফ পরীক্ষা। আমেরিকার যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথের ‘পাগলামি’তে অতিষ্ঠ পেন্টাগন। তাঁর সন্দেহবাতিক স্বভাবের খেসারত দিতে গিয়ে ইরান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ দশা! ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের একগুচ্ছ লড়াকু জেট, ট্যাঙ্কার বিমান, ড্রোন ও রেডার উড়িয়েছে তেহরান।
গত বছর প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নিয়ে হেগসেথকে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সদস্য করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর চালানোর দায়িত্ব পান তিনি। পরে বিভাগটির নাম বদলে করা হয় যুদ্ধ দফতর। এর সদর কার্যালয় হল রাজধানী ওয়াশিংটনের পেন্টাগন। সেখানে প্রবেশের আগে টেলিভিশন সঞ্চালকের কাজ করতেন বছর ৪৫-এর পিট। তাঁর ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস উইকেন্ড’ দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল।
টেলিভিশন সঞ্চালক থাকাকালীনই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন রিপাবলিকান পার্টির অন্ধ সমর্থক হেগসেথ। যুদ্ধ সচিবের দায়িত্বভার পাওয়া ইস্তক দেড় বছরে দু’ডজনের বেশি সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন তিনি। সেই তালিকায় নাম আছে মার্কিন সেনাপ্রধান তথা চিফ অফ স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জেরও। পাশাপাশি, বাহিনীর চার শাখায় পদোন্নতির ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
গত বছরের মার্চে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের গুপ্তঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বিমানবাহিনী। সেই তথ্য স্ত্রী এবং বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেন হেগসেথ। নির্দিষ্ট একটি ‘গ্রুপ চ্যাটে’ চলে দীর্ঘ ক্ষণ আড্ডা। ‘ভুল’বশত সেখানে যুক্ত ছিলেন এক সাংবাদিকও। ফলে মার্কিন গণমাধ্যমে ফাঁস হয় পিটের কীর্তিকলাপ। তাঁর পরেও শোধরাননি মার্কিন যুদ্ধ সচিব।
কিছু দিনের ব্যবধানে ফের একই কাজ করেন হেগসেথ। এ বার তাঁকে নিশানা করে নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হতেই আমেরিকা জুড়ে হইচই পড়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে, সেনার গোপন তথ্য অবলীলায় কেন ফাঁস করছেন স্বয়ং যুদ্ধ সচিব? এই পরিস্থিতিতে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ আসরে নামেন ট্রাম্প। ফলে পিটকে পদ খোয়াতে হয়নি। কিন্তু, এর পরই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর কলমের খোঁচায় ছাঁটাই হন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
আরও পড়ুন:
গত মার্চে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার দুই কৃষ্ণাঙ্গ এবং কয়েক জন মহিলা অফিসারের পদোন্নতি আটকে দেন হেগসেথ। এই নিয়ে স্থলবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকলের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয় তাঁর। শুধু তা-ই নয়, সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি চিফ্স অফ স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে জানান তিনি। কয়েক দিনের মাথায় পিট-ড্রিসকল মতপার্থক্যের কথা প্রকাশ করে একটি মার্কিন গণমাধ্যম।
সূত্রের খবর, পেন্টাগনের অন্দরের খবর সংবাদসংস্থায় ফাঁস হতেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন হেগসেথ। বাহিনীতে পদোন্নতির ব্যাপারে চাপ তৈরি করতে পর্দার আড়াল থেকে র্যান্ডি জর্জ কলকাঠি নেড়েছেন বলে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় তাঁর। সঙ্গে সঙ্গে কোনও রকম তদন্ত ছাড়াই সেনাপ্রধানকে ছাঁটাই করেন তিনি। ইরান যুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে। বাহিনীর মনোবল ঠিক রাখতে মার্কিন সরকার জানিয়ে দেয় পদত্যাগ করেছেন চিফ্স অফ স্টাফ।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির দাবি, র্যান্ডি জর্জকে তাড়িয়ে হেগসেথ যে শান্ত ছিলেন, এমনটা নয়। তাঁর কোপে পড়েন ড্রিসকলও। যদিও স্থলবাহিনীর সচিবের চাকরি খেতে পারেননি তিনি। কারণ, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের সঙ্গে তাঁর রয়েছে গলায় গলায় ভাব। আর তাই ড্রিসকলকে শায়েস্তা করতে পেন্টাগনের সমস্ত কর্মীর পলিগ্রাফ পরীক্ষার নির্দেশ দেন মার্কিন যুদ্ধসচিব।
পিটের এই ‘পাগলামি’র খবর কানে আসতেই বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তড়িঘড়ি পেন্টাগনের অন্দরে এই ধরনের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন তিনি। ফলে পিছু হটতে বাধ্য হন হেগসেথ। তার পরেও তিনি দমে যাননি। চলতি বছরের এপ্রিলে নৌসচিব জন ফেলাকে বরখাস্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতর। শুধু তা-ই নয়, আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর অপসারণের কারণও ব্যাখ্যা করেনি ওয়াশিংটন।
আরও পড়ুন:
সম্প্রতি, হেগসেথের কাণ্ডকারখানা নিয়ে সিএনএন-কে বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার দেন প্রাক্তন ও বর্তমান মিলিয়ে পেন্টাগনের ১৫ জন কর্মকর্তা। তাঁদের দাবি, সেনাবাহিনীর পদস্থ আধিকারিকদের গোপনীয়তার চুক্তিতে সই করিয়েছেন পিট। সব সময় তাঁদের আনুগত্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চান তিনি। সেটা এখন মানসিক রোগের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আর এর মূলে আছে সন্দেহবাতিক স্বভাব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেন্টাগনের এক কর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘‘দৈনন্দিন কাজকর্মের ক্ষেত্রেও একটা চিন্তা আমাদের গ্রাস করত। সেটা হল, যা করছি তাতে আবার কারও চাকরি যাবে না তো! ফলে একটা অসুস্থ পরিবেশের মধ্যে যে রয়েছি, সেটা স্পষ্ট।’’
এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে পাঁচ জন ফৌজি আধিকারিককে বরখাস্ত করেন হেগসেথ। তাঁরা হলেন, জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ, এয়ারফোর্স জেনারেল সি কিউ ব্রাউন, চিফ অফ নেভাল অপারেশন্স, অ্যাডমিরাল লিসা ফ্রাঞ্চেত্তি, জ্যাগ (জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল) আর্মি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল তৃতীয় জোসেফ বার্জার, জ্যাগ এয়ারফোর্স, লেফটেন্যান্ট জেনারেল চার্লস এল প্লামার এবং জ্যাগ নেভি রেয়ার অ্যাডমিরাল লিয়া এম রেনল্ড্স। এঁদের অধিকাংশই ছিলেন ফোর স্টার জেনারেল।
এই পাঁচ জনের বরখাস্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ছ’দিনের মাথায় (পড়ুন ২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন সেনা। তার সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ রাখে যুক্তরাষ্ট্র। আক্রমণের নীলনকশা তৈরিতে জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ, এয়ারফোর্স জেনারেল ব্রাউন এবং চিফ অফ নেভাল অপারেশন্স, অ্যাডমিরাল ফ্রাঞ্চেত্তির কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। তবে হামলার ব্যাপারে আপত্তি তোলায় তাঁদের চাকরি গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফৌজের ভিতরে বিদ্রোহের জন্ম দিচ্ছেন ট্রাম্প ও হেগসেথ। তা ছাড়া যুদ্ধসচিবের ‘বিকৃত’ মানসিকতা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। কিছু দিন আগে পিট ঘোষণা করেন, মার্কিন বাহিনীকে আরও ক্রুর এবং নৃশংস করে তুলতে চান তিনি। সংঘর্ষ চলাকালীন নিরীহ নাগরিকদের গণহত্যা তাঁর কাছে একেবারেই অপরাধ নয়। হেগসেথের এ-হেন বক্তব্যের পর তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক।
এ বছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে লোহিত সাগরে আচমকাই অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী মার্কিন রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। সঙ্গে সঙ্গে গ্রিসের সেনাঘাঁটিতে ওই যুদ্ধজাহাজকে সরিয়ে নেয় পেন্টাগন। একটি বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’ জানায়, রণতরীটির লন্ড্রি রুম থেকে ছড়িয়েছে আগুন, যা নিছকই দুর্ঘটনা। কিন্তু কয়েক দিন যেতেই প্রকাশ্যে আসে অন্তর্ঘাতের তত্ত্ব।
মার্কিন নৌসচিব জন ফেলানের বরখাস্তের সঙ্গে ফোর্ডকাণ্ডের কোনও যোগ আছে কি না তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে এই ঘটনার প্রভাব বাহিনীর নিচুতলায় পড়েছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। ফলে ইরানের রণাঙ্গনে বড় ধরনের সাফল্য পায়নি ওয়াশিংটন। উল্টে হরমুজ় বন্ধ রেখে যুক্তরাষ্ট্রের উপর পাল্টা চাপ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে তেহরান।
২০১৮ সালে প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন প্রশান্ত মহাসাগরে চিনের প্রভাব হ্রাস করতে বড় সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। সেখানকার সামরিক বিভাগের নাম বদলে ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড করে আমেরিকা। অতীতে যা ছিল শুধুই প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড। এ বছরের ১৭ জুন ভারত শব্দটি ফের ছেঁটে ফেলে পেন্টাগন। গোটা বিষয়টির নেপথ্যে পিট হেগসেথের যে হাত আছে, তা বলাই বাহুল্য।
এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রান্সে জি-৭ বৈঠকে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেখান আবার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘‘কেউ ভারত আক্রমণ করলে পাশে থাকবে আমেরিকা।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পরই সর্বত্র হইচই পড়ে যায়। তবে কি পিটের করা ভুল শোধরাতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট? উত্তর দেবে সময়।