ভাত-ডাল-তরকারির মতোই সঞ্চয়ের পাত সাজান ৬৫-১০-১০-১৫ ফর্মুলায়! ‘বোরিং থালি’তেই মিলবে সাফল্যের স্বাদ
বাজারের প্রবণতার পিছনে উদ্দেশ্যহীন ভাবে না ছুটে বৈচিত্রময় বিনিয়োগ পোর্টফোলিয়ো তৈরিতে সওয়াল করছেন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞেরা, যাতে একটি ক্ষেত্রে লাভের অঙ্ক যখন পড়তির দিকে থাকে তখন অন্যরা সেই ধাক্কা সামলে উঠে পোর্টফোলিয়োর ভারসাম্য বজায় রাখে। কোন মন্ত্রে বিনিয়োগে আসবে সাফল্য?
বাজার অস্থির। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক হারে কমছে আমানত বা সঞ্চয়ে সুদের হার। চাকরি বা ব্যবসা— জীবিকা যা-ই হোক না কেন, প্রত্যেকেরই সঞ্চয়ের একটা লক্ষ্য থাকে। চড়া বাজারদর সামলাতে সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগের দিকে ঝোঁক বাড়ছে আমজনতার। প্রথাগত বিনিয়োগ থেকে সরে গিয়ে লাভজনক বিনিয়োগের বিকল্প বেছে নিচ্ছেন আমানতকারীরা।
সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ তো আছেই। সেটা বাদ দিয়ে অসুখ বা হঠাৎ কোনও কারণে প্রয়োজন হতে পারে একসঙ্গে অনেক টাকার। রয়েছে অবসরজীবনের ভাবনাও। প্রতি পদক্ষেপেই আর্থিক সুরক্ষার জন্য শুরু থেকেই দরকার সঞ্চয়। খরচ কমানো, আয় বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে হোঁচট খান অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই।
বিনিয়োগের বাজারে বিভিন্ন রকমের তহবিল রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রবণতা তৈরি হয়। বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে বিনিয়োগ করতে গেলে সঞ্চয়কারীরা তাঁদের পোর্টফোলিয়ো ক্রমাগত পরিবর্তন করার চাপ অনুভব করেন। অস্থির বাজারে বিনিয়োগ করার সঠিক কৌশল হাতড়ে বেড়ান অনেকেই।
ইক্যুইটি ফান্ড (কেবলমাত্র শেয়ারে লগ্নি), ডেট ফান্ড (বন্ড বা ঋণপত্রে বিনিয়োগ), হাইব্রিড ফান্ড (শেয়ার এবং ঋণপত্রের মিশ্রণ), না সোনা-রুপোয় লগ্নি, না কি স্থির আয়— কোনটির দিকে হাত বাড়ানো উচিত এই নিয়ে দ্বিধা কাজ করে বিনিয়োগকারীদের মনে। শেয়ার বাজারের সূচকের উত্থান-পতনের গতি নিয়ে কেউ নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। এই অনিশ্চিত সময়ে বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেন।
পুঁজি বা সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সম্পূর্ণ সুরক্ষিত প্রকল্প, না কি অল্প ঝুঁকি থাকলেও চলবে? নিয়মিত আয় না কি বৃদ্ধি? ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য ও ইচ্ছা কতটা? এই সব প্রশ্নের উত্তর পেলে প্রকল্প বাছাই শুরু করা যায়।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, অর্থ বিনিয়োগ করার জন্য আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন। আর তা অর্জন করতে আপনাকে জানতে হবে নিজের অর্থ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জাদুমন্ত্রটি। আর্থিক আত্মবিশ্বাস তৈরি করার কিন্তু একটাই রাস্তা। বিনিয়োগ ব্যাপারটা কী এবং তা কী ভাবে কাজ করে সেটা বুঝে নেওয়া।
পরিকল্পিত বিনিয়োগেই মিলবে সাফল্য। সময়ের সঙ্গে আর্থিক ক্ষেত্রগুলি বা বিনিয়োগের বাজারের চালচিত্র বদলায়। একসময় যা ভাল রিটার্ন দিয়েছিল তা এখন আর তত ভাল না-ও দিতে পারে। তাই পদ্ধতি মেনে বিনিয়োগের দিকে ঝোঁকা বিনিয়োগ থেকে লাভের অংশ বার করে আনার চাবিকাঠি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ এক কৌশল বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বাজারের প্রবণতার পিছনে না ছুটে বৈচিত্রময় বিনিয়োগ পোর্টফোলিয়ো তৈরিতে সওয়াল করছেন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞেরা। সেটিকে ‘বোরিং থালি’ বলে উল্লেখ করছেন তাঁরা। সুষম খাবারের মতো সুষম বিনিয়োগ। কৌশলের সারমর্ম হল, আমাদের প্রতি দিনের আহারে যেমন ভাত, ডাল, তরকারি এবং দইয়ের মতো নিরাপদ অথচ একঘেয়ে খাবার থাকে, তেমনই আমাদের বিনিয়োগও সুষম হওয়া উচিত।
৬৫-১০-১০-১৫— নিরাপদ ও সফল বিনিয়োগের মূলমন্ত্র নাকি এটাই। ইক্যুইটি-সোনা-রুপো-ঋণপত্রে বিনিয়োগ। একটি মাত্র ক্ষেত্রে বিনিয়োগের উপর ভরসা না করে বিভিন্ন সম্পদে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে একটি ক্ষেত্রে লাভের অঙ্ক যখন পড়তির দিকে থাকে তখন অন্যরা সেই ধাক্কা সামলে উঠে পোর্টফোলিয়োর ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। বিনিয়োগকারীর অন্তত চার থেকে পাঁচটি আলাদা আলাদা তহবিলে টাকা রাখা উচিত। সে ক্ষেত্রে লোকসানের ঝুঁকি যে কমবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন:
অর্থনৈতিক চাপ বা মুদ্রাস্ফীতির সময় সোনা ও রুপো হেজ হিসাবে কাজ করতে পারে। ঋণ বা ডেট ফান্ডে বিনিয়োগ আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা এবং একটি পূর্বাভাসযোগ্য আয়ের সম্ভাবনা যোগ করে। অন্য দিকে, ইক্যুইটি দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে। সামগ্রিক ভাবে বিনিয়োগের পথকে মসৃণ করতে সহায়তা করে। চলতি বছরে শেয়ার সূচককে কখনওই টানা বাড়তে দেখা যায়নি।
বহুল আলোচিত ফর্মুলা অনুযায়ী বিনিয়োগের বেশির ভাগই শেয়ার বাজার বা মিউচুয়াল ফান্ডে হওয়া উচিত। ইক্যুইটির মধ্যে ফ্লেক্সিক্যাপ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। স্থিতিশীলতার পাশাপাশি লাভের অঙ্ক সুনিশ্চিত করার জন্য এর মধ্যে লার্জ-ক্যাপ এবং মিড-ক্যাপ ফান্ডের মিশ্রণ অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত বলে মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
দোলাচলে থাকা শেয়ার বাজারে লার্জ ক্যাপ সংস্থাগুলি যথেষ্ট মুনাফার মুখ দেখেছে। লার্জ-ক্যাপ ইক্যুইটি ফান্ডগুলি সুপ্রতিষ্ঠিত, বড় সংস্থায় বিনিয়োগ করে এবং স্মল-ক্যাপ ফান্ডগুলি ছোট অথচ আর্থিক বিকাশের সুযোগসম্পন্ন সংস্থাগুলিতে বিনিয়োগ করে। লার্জ ক্যাপ স্থিতিশীলতা এনে দেয়। অন্য দিকে মিড-ক্যাপ ফান্ডগুলি সম্পদবৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়।
বিশ্ব জুড়ে আর্থিক অনিশ্চয়তা ক্রমবর্ধমান। এ-হেন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মানুষ সোনাকে নিরাপদ সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করছেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ মাধ্যম হিসাবে সোনার কোনও তুলনা চলে না। তাই পোর্টফোলিয়োয় ১০ শতাংশ বিনিয়োগে সোনার জায়গা থাকা উচিত। পৃথিবীতে যখন খারাপ কোনও কিছু ঘটতে থাকে তখনই মানুষ সোনায় বিনিয়োগ করেন। সোনার দাম চড়চড় করে বাড়তে থাকে।
গত বছর সোনার পাশাপাশি রকেটগতিতে বেড়েছে রুপোর দর। ফলে ‘সাদা ধাতু’ থেকে দুর্দান্ত রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। গত ৬-৮ মাসের মধ্যে রুপোর দাম বেড়েছে অনেকটাই। ফলে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে ভাল আয়ের পথ খোলা থাকবে।
ঋণ বা ডেট ফান্ডে বিনিয়োগ একটি ঢাল বা রক্ষাকবচের কাজ করে। বিনিয়োগের অন্তত ১৫ শতাংশ এই ফান্ডে বিনিয়োগ করলে পোর্টফোলিয়োর একটি স্থিতিশীল আয়ের পথ দেখাতে পারে। সরকারি বন্ড ও কর্পোরেট বন্ড, পিএসইউ বন্ড, কমার্শিয়াল পেপার, ট্রেজ়ারি বিল এবং অন্যান্য সরকারি সিকিউরিটি বন্ডে বিনিয়োগ করে থাকেন ফান্ড ম্যানেজারেরা। এই ডেট মিউচুয়াল ফান্ডগুলি সাধারণত মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে। অর্থাৎ, তিন বছর বা পাঁচ বছরের মেয়াদে এই ফান্ডগুলিতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
আর্থিক বিশ্লেষকেরা বার বারই জানান, সামগ্রিক ভাবে, বিনিয়োগ কোনও দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। এটি একটি যাত্রা। যাঁরা শান্ত ভাবে এবং পদ্ধতিগত ভাবে মিউচুয়াল ফান্ড বা অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করেন তাঁরাই শেষ হাসি হাসেন। সুশৃঙ্খল বিনিয়োগ পরিকল্পনা আবেগের বশে শেয়ার বেচা বা কেনার মতো ভুল থেকে রক্ষা করবে।
হঠাৎ বাজারের ওঠানামা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীদের জন্য এই ফর্মুলাটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৌশলটি তাঁদের জন্য উপযুক্ত যাঁরা বাজারের ওঠানামার কারণে বিনিদ্র রজনী যাপন করেন। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সম্পদ গড়ে তুলতে চাইলে এর বিকল্প কমই আছে বলে মনে করছেন অনেকেই। রাতারাতি বিনিয়োগ দ্বিগুণ না-ও হতে পারে। তবে সারা বছর ধরে বিনিয়োগকে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি পোর্টফোলিয়োকে সুষম লাভের মুখ দেখাতে সক্ষম এই ‘বোরিং থালি’র জাদুকাঠি।