আইনের পরোয়া নেই, মেয়েদের অপহরণ করে বিয়ে করাই নাকি ‘প্রথা’! ছাড় নেই কিশোরীদেরও, ভয় ধরাবে মধ্য এশিয়ার দেশের ‘সংস্কৃতি’
মধ্য এশিয়ার এই দেশে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ে বা মেয়ের পরিবারের সম্মতি গ্রহণের কথা ভুলে যাওয়া হয়। রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা কোনও মেয়েকে পছন্দ হলেই তুলে আনেন পুরুষেরা। তার পর ছেলের বাড়ির সদস্যেরা সেই মেয়েকে বিয়ে করার জন্য এক প্রকার বাধ্য করেন।
২০২৬-এ এসেও নারী স্বাধীনতা নিয়ে লড়াই করতে হয়। বহু জায়গায় এ ছবি বদলেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই গল্পটা এখনও অন্য রকম। বিশেষ করে গ্রাম্য অঞ্চলগুলিতে আজও এমন নানা প্রথা প্রচলিত রয়েছে যা শহুরে মানুষ কল্পনাতেও আনতে পারবেন না।
মেয়ের বিয়ে ঘিরে প্রায় সব বাবা-মায়ের মাথাতেই নানা চিন্তা ঘুরে বেড়ায়। সেই কারণে অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের সম্মতি ছাড়াই এক প্রকার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার ঘটনারও কমতি নেই। অনেকেই ভাবেন যে কেবল ভারতের মাটিতেই এ সমস্ত ঘটনা ঘটে। কিন্তু এ ধারণা আসলে ভ্রান্ত। ভারতের বাইরে কিছু দেশে এর থেকেও ভয়ঙ্কর পন্থা মেনে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়।
মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং ককেশাসের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে কনে অপহরণের মতো এক ভয়ঙ্কর প্রথা। তথ্য বলছে, মধ্য এশিয়ার কাজ়াখস্তান এবং কিরঘিজ়স্তানের গ্রামীণ অঞ্চলগুলির প্রায় অর্ধেক বিয়ে কনেকে অপহরণ করার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
তবে কাজ়াখাস্তানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় প্রথম থেকেই এই প্রথা ভয়ঙ্কর ছিল না। সেখানকার স্থানীয় ভাষায় কনে অপহরণকে ‘আলিপ কাশু’ বলা হয়, যার অর্থ ‘পালিয়ে নিয়ে যাওয়া’। আগেকার দিনে বিয়ের খরচ কমাতে ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতেন পালানোর। বাড়ির লোকজনেরও সম্মতি গ্রহণ করা হত। তার পর তাঁরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই প্রথায় ছোঁয়া লাগে পুরুষতন্ত্রের। মেয়ে বা মেয়ের পরিবারের সম্মতি গ্রহণের কথা ভুলে যাওয়া হয়। রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা কোনও মেয়েকে পছন্দ হলেই তুলে আনেন ছেলেরা। তার পর ছেলের বাড়ির সদস্যেরা সেই মেয়েকে বিয়ে করার জন্য এক প্রকার বাধ্য করেন।
আরও পড়ুন:
অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর বেশি দেরি না করেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সেই মেয়ের বা মেয়ের বাড়ির লোকজনের সম্মতি গ্রহণের প্রয়োজন মনে করা হয় না। নাবালিকারাও এই অদ্ভুত প্রথা থেকে ছাড় পায় না।
এ ক্ষেত্রে যে ছেলে অপহরণ করছে, সেই ছেলের সঙ্গেই যে মেয়েটির বিয়ে হবে তেমন কোনও ব্যাপার নেই। যে কোনও ছেলের সঙ্গেই বিয়ে হতে পারে। হয়তো কোনও মেয়েকে দল বেঁধে পাঁচটি ছেলে অপহরণ করলেন। তাঁরা তাঁকে ছোঁবেন না, মেয়েটির সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যবহারও করবেন না।
সাধারণত কোনও বিশেষ রাসায়নিকের মাধ্যমে মেয়েটিকে অজ্ঞান করে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর মেয়েটির যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি দেখেন যে কোনও এক অপরিচিত জায়গায় চলে এসেছেন তিনি। অচেনা মানুষদের মাঝে বসে রয়েছেন। চলছে বিয়ের তোড়জোর।
মেয়েটির আর বুঝতে বাকি থাকে না যে তাঁরই বিয়ের তোড়জোর চলছে। অপহৃত মেয়েটির জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই সেই বাড়ির সদস্যেরা এসে তাঁকে সাদা রঙের কাপড় পরিয়ে দেন। তার পর এক সম্পূর্ণ অচেনা, যে ছেলের মুখ সেই মেয়ে আগে কখনওই দেখেননি, তাঁর সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এটাই নাকি কনে অপহরণের ‘সংস্কৃতি’ এবং ‘ঐতিহ্য’।
আরও পড়ুন:
কাজ়াখস্তান-সহ উল্লিখিত অঞ্চলগুলিতে মেয়ে অপহৃত হলে বাড়ির লোকজনও বুঝে যান যে তাঁদের মেয়ের বিয়ে হতে চলেছে। কিছু বাড়ি থেকে পুলিশের কাছে ছুটে যাওয়া হয়। তবে সিংহভাগ মেয়ের বাড়ির লোকজনই তাঁদের ভাগ্যের পরিহাস মেনে নেন। ‘লোকে কী বলবে’, ‘সমাজে তাঁদের নিয়ে কথা উঠবে’ এ সমস্ত নানা কথা ভেবে তাঁরা আর মুখ খোলেন না।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অপহৃত মেয়েটিও কোনও প্রতিবাদ করেন না। যদিও সেই প্রতিবাদের স্বর যে কেউ কানে তুলবেন তা নয়। কিন্তু ১০ জনের মধ্যে সাত জন অপহৃত মেয়েই কপালের ফের মেনে নিয়ে সংসারজীবনে মনোনিবেশ করেন।
এর বিরুদ্ধে কোনও আইন কি নেই? হ্যাঁ, তা আছে। কিন্তু সেই আইনের তোয়াক্কা করেন না কেউই। কারণ বহু মানুষের কাছেই এখনও সেই আইন অজানা। কাজ়াখস্তান সরকারও দেশের মানুষকে সেই আইন সম্বন্ধে সজাগ করার বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেন না। এর ফলে অপহরণ করার ইচ্ছা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ছেলেদেরও শাস্তি নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা থাকে না।
১৯৯৪ সালে কাজ়াখস্তানে কনে অপহরণ ঘিরে আইন কার্যকর করা হয়। কাজ়াখস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ত তোকায়েভ উদ্যোগী হয়ে ফৌজদারি ধারায় এই জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে আইন চালু করেন, যাতে অপহরণকারীদের তিন বছর পর্যন্ত জেলের বিধান দেওয়া হয়।
২০১৩ সালে সেই আইন পরিমার্জন করা হয়। মেয়েদের অপহরণ করলে তিন বছরের কারাদণ্ডের সময়কাল বাড়িয়ে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত করা হয়। নাবালিকাদের অপহরণ করা হলে ১০ বছর পর্যন্ত জেল খাটতে হবে বলা হয়। ২০২১ সাল থেকে কিরঘিজ়স্তানেও এই আইন চালু করা হয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় একটাই, আজও কাজ়াখস্তান এবং কিরঘিজ়স্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলির অর্ধেকের বেশি মানুষ এই আইনের সঙ্গে পরিচিত নন। সেই কারণে অপহরণের মাত্রাতেও বিশেষ কমতি দেখা যায়নি। বেশির ভাগ মেয়ের বাড়ি থেকে এখনও অপহরণের দ্বারা মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া মেনে নেওয়া হয়।
সে সমস্ত অঞ্চলের মানুষদের কনে অপহরণের মতো এই ঘৃণ্য প্রথাকে মেনে নেওয়ার বিশেষ কিছু কারণও রয়েছে। তা হল বিয়ের খরচ বেঁচে যাওয়া। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, সেখানকার সিংহভাগ মানুষ মনে করেন ছেলে দেখে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার যা খরচ, তা বহন করার চেয়ে এ ভাবে মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া ভাল।
মেয়েকে যদি জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া না হয়, তা হলে আবার তাঁর জন্য ছেলে খুঁজতে হবে, তাঁকে বিয়ে দিতে হবে। তা বেশ খরচসাপেক্ষ। সেখানে ছেলে নিজেই মেয়েকে পছন্দ করে বিয়ে করে নিচ্ছে, মেয়ের বাবা-মায়ের কোনও খরচই হচ্ছে না, এর থেকে ভাল আর কী-ই বা হতে পারে! এমনটাই মনে করেন কাজ়াখস্তানের প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দাদের অধিকাংশ।
এমন ভাবনার জন্য আইন থাকা সত্ত্বেও সেখানকার বেশির ভাগ বিয়েই এখনও কনে অপহরণের দ্বারাই হয়। সেগুলির সিকিভাগও আইনের কাঠগোড়ায় পৌঁছোয় না। কারণ, কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগই পৌঁছোয় না। এর বিরুদ্ধে যে আইন রয়েছে তা-ও বহু মানুষ জানেন না। অনেকে আবার বছরের পর বছর চলে আসা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান। তাই মুখ খোলেন না।
সমীক্ষা বলছে, কাজ়াখস্তানে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার বিয়ে কনে অপহরণের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এঁদের মধ্যে ৪০ শতাংশ নারীর সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। কিন্তু ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কনে অপহরণ সম্পর্কিত মাত্র ২১৪টি অভিযোগ সেখানকার আদালতে জমা পড়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নারীসুরক্ষা মন্ত্রক, অসরকারি সংস্থা প্রভৃতি থেকে কাজ়াখস্তান কর্তৃপক্ষের কাছে সেখানকার মানুষদের কনে অপহরণ কেন খারাপ এবং এর বিরুদ্ধে থাকা আইন সম্বন্ধে সজাগ করার আর্জি জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে গিয়ে তা আদৌ এই সমস্ত অঞ্চলের নারীদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আনবে কি না তা সময়ই বলতে পারবে।