Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

কলকাতা পুলিশের শার্লক হোমস

নিখিল সুর
১৮ জুলাই ২০২১ ০৮:৫০

পয়লা এপ্রিল, ১৮৬৮। রাত প্রায় দুটো। টহল দিয়ে এক জন কনস্টেবল ফিরছিলেন কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিট দিয়ে। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল বিপরীত দিকের ফুটপাতে বিদেশি মহিলাদের কিছু কাপড়-চোপড় পড়ে আছে। সন্দেহবশে কাছে যেতেই চমকে উঠলেন। মহিলাদের কাপড়-চোপড় নয়, এক বিদেশি মহিলাই পড়ে আছে ফুটপাতের ওপর। এক পুকুর রক্তের মধ্যে শায়িত দেহটা। গলাটা কাটা আড়াআড়ি ভাবে। কাছে পড়ে আছে রক্তমাখা একটা লম্বা ছোরা, যা নাবিকরা ব্যবহার করে সচরাচর।

ঘণ্টাখানেক আগেই কনস্টেবল ওই স্থান দিয়েই টহলে গিয়েছিলেন। তখন কিন্তু তাঁর নজরে কিছুই পড়েনি। আর এক জন কনস্টেবলকে লাশের পাহারায় রেখে অদূরে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায় ছুটলেন ইনস্পেক্টরকে খবর দিতে। লাশ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেল মহিলা এক জন সুন্দরী যুবতী। ডান হাতের অনামিকায় আংটি দেখে পুলিশ অনুমান করল, মহিলা সম্ভবত বিবাহিতা খ্রিস্টান রমণী।

কলকাতা শহরে তখন এই ধরনের অপরাধের রেখাচিত্র ঊর্ধ্বগামী। ওই বছরেই তত দিনে এজরা স্ট্রিটে খুন হয়েছিলেন পাঁচ জন মহিলা, যাদের মধ্যে তিন জন ছিলেন বারাঙ্গনা। তার পর আবার এই হত্যাকাণ্ড, তা-ও একেবারে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার নাকের ডগায়! ঝড় উঠল কলকাতা শহরে। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে অভিজাত নাগরিক পরিবারে এবং নামী সংবাদপত্রে আলোচনার খোরাক হয়ে উঠল এই হত্যাকাণ্ড। লাশ রেখে দেওয়া হল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। পুলিশ শত চেষ্টা করেও এমন কারও খোঁজ পেল না, যে লাশ শনাক্ত করতে পারে। তাই সেটা সমাধিস্থ করার আগে স্যাশে অ্যান্ড ওয়েস্টফিল্ড স্টুডিয়ো কোম্পানির আলোকচিত্রীকে দিয়ে তুলে রাখা হল মহিলার ছবি। উল্লেখ করা যেতে পারে, পুলিশি তদন্তের সাহায্যে ছবি তুলে রাখার পদ্ধতি প্রবর্তিত হয় এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তকালে। বলা যায়, অপরাধের তদন্তে এক নতুন পর্যায়ের ফলক ছিল এই আলোকচিত্রের ব্যবহার।

Advertisement

নিহত মহিলার পরিচয় আবিষ্কারে পুলিশের ব্যর্থতায় সাধারণ মানুষের উষ্মার পারদ চড়ছিল ক্রমশ। তাদের অনেক প্রশ্ন ছিল— কেন এই যুবতীর পরিচয় জানা যাচ্ছে না? হত্যাকাণ্ডের পর এতগুলো দিন কেটে যাওয়া সত্ত্বেও, একেবারে রাজপথের ওপর, থানা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে কী করে ঘটল এই হত্যাকাণ্ড? খুনি কে, কবে সে ধরা পড়বে? এমন অজস্র প্রশ্ন। সংবাদপত্রগুলিও তর্জনী তুলল পুলিশের দিকে। বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন স্বয়ং পুলিশ কমিশনার স্টুয়ার্ট স্যান্ডার্স হগ। তিনি ডেপুটি কমিশনারকে ভর্ৎসনা করে বললেন, রহস্যভেদে তাঁর এবং অপদার্থ পুলিশের ব্যর্থতা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পুলিশ কমিশনারের দফতরকে।

শেষ পর্যন্ত পুলিশ কমিশনার হগ এক জন যুবক পুলিশ ইন্সপেক্টর, রিচার্ড রিডকে এই অপরাধের তদন্তের ভার দিলেন রহস্যের জট খুলতে। রিচার্ড তখন তিরিশের কোঠায়। এই তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর পরিচয় তেমন মেলে না। তবে তত দিনে রিড যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিলেন বুদ্ধিমত্তা, নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও দ্রুত সিদ্ধান্তে আসার দক্ষতার পরিচয় দিয়ে। পরবর্তী কালে তাঁর পরিচয় চিত্রিত হয় অনেক বড় ক্যানভাসে, যখন তিনি প্রায় ইতিহাসে সৃষ্টি করেছিলেন আধুনিক ভারতে অপরাধ জগতের অন্যতম অগ্রণী প্রতিবেদক এবং লেখক হিসেবে। তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘এভরি ম্যান হিজ় ওন ডিটেকটিভ’ কলকাতা থেকে প্রকাশ করেছিল ডব্লিউ নিউম্যান অ্যান্ড কোম্পানি, ১৮৮৭ সালে। আর ওই বছরই লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় আর্থার কোনান ডয়েল-এর ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’, যে গ্রন্থের মূল আকর্ষণ গোয়েন্দা শার্লক হোমস এবং যে গ্রন্থ সূচনা করে গোয়েন্দা সাহিত্যের। এ এক আশ্চর্য সমাপতন, লন্ডনে শার্লক হোমস, কলকাতায় রিচার্ড রিড। প্রথম জন লেখক কোনান ডয়েলের মানস-গোয়েন্দা। দ্বিতীয় জন রক্ত-মাংসের মানুষ, ঐতিহাসিক গোয়েন্দা। তাঁর ‘এভরি ম্যান’ গ্রন্থের গল্পগুলি কল্পনা নয়, রিডের কর্মজীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল, যেগুলির মধ্যে বেঁচে আছে সমসাময়িক কলকাতা শহরজীবনের চমকপ্রদ এবং বিস্ময়কর অপরাধের ইতিহাস।

ফেরা যাক আমহার্স্ট স্ট্রিটের খুনের ঘটনায়। রিডের কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে সেই ঘটনার বিশদ বর্ণনা। প্রথম যে প্রশ্ন পুলিশের সামনে আসে, তা হল, ঘটনাটা হত্যা না আত্মহত্যা? আত্মহত্যার সম্ভাবনা খারিজ হয়ে যায়, কারণ আত্মহত্যা হলে ক্ষত এত গভীর হত না। যে বস্তুটা রিডের নজর টানে তা হলে নাবিকের ছোরা। উল্লেখযোগ্য যে, সে কালে কলকাতা বন্দরের জাহাজ থেকে নাবিকরা হামেশাই দাপিয়ে বেড়াত শহরে ঢুকে, খুন-খারাপিও করত মাঝেমধ্যে। রিড আরও লক্ষ করেন, নিহত যুবতীর পা খালি, কিন্তু পায়ে ধুলো-কাদা লেগে নেই! অর্থাৎ অনেকটা পথ হেঁটে তিনি অকুস্থলে আসেননি। তাঁকে শনাক্ত করতে তাঁর ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হল গোটা শহরে। কয়েক সপ্তাহ পরে আমহার্স্ট স্ট্রিটের নিকটবর্তী বৈঠকখানা লেনের বাসিন্দা জনৈক মিস্টার হ্যারিস এসে জানালেন, মহিলা তাঁর পরিচিত। নাম রোজ় ব্রাউন, এক জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। তাঁর ভাড়াটে। তদন্ত আরও কিছুটা গড়িয়ে গেলে জানা গেল, রোজ় ব্রাউনকে প্রায়ই দেখা যেত ব্যবসায়ী মাধবচন্দ্র দত্তর সঙ্গে, যাঁর একটা ছুরি-কাঁটার দোকান আছে বৌবাজারে। নাবিকদের কাছ থেকে কিনে তিনি সেগুলো বেচতেন সাধারণ ক্রেতার কাছে।

তল্লাশি চালিয়ে মহিলার জিনিসপত্র থেকে পাওয়া গেল কিংসলে নামে এক ব্যক্তির ছবি। হাওড়ার বাসিন্দা। পুলিশের খাতার নাম আছে এক জন ঠগ এবং বদমাশ হিসেবে। জানা গেল, কিংসলের সঙ্গে রোজ় ব্রাউনের একটা সম্পর্ক ছিল। খুন হওয়ার কয়েক মাস আগে ব্রাউন হাওড়ায় কিংসলেকে ছেড়ে এসে ভাড়া নেয় বৈঠকখানা লেনে হ্যারিসের বাড়িতে। কিন্তু সব সময় শঙ্কিত থাকতেন কিংসলের ভয়ে, তাকে ছেড়ে আসার কারণে।

হাওড়ায় কিংসলের বাড়ি তল্লাশি করে পাওয়া গেল কিছু মহিলার পোশাক, যাতে ছিল রক্তের দাগ। আর পাওয়া গেল একটা চাবি, যা দিয়ে খোলা যেত ব্রাউনের নতুন বাসার দরজার তালা। এই খুন সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহলে তখনও ভাটা পড়েনি বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেলেও। ১৮৬৮-র ৫ জুন ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা লিখল, ‘বঙ্গীয় সরকার ঘোষণা করেছে রোজ় ব্রাউনের হত্যাকারীকে গ্রেফতারে সাহায্য করার জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর দিতে পারবে, সরকার তাকে পুরস্কৃত করবে হাজার টাকা দিয়ে। এটা হয়ত উচিত পদক্ষেপ, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করে না যে, এতে রহস্যের জট খুলবে। এর আগেও এক ইহুদির পত্নীর খুনের ঘটনায় এমনই পুরস্কার ঘোষণা করে লাভ হয়নি কিছুই।’ পত্রিকাটি কলকাতা পুলিশকে বিব্রত করল এ ভাবে খোঁচা মেরে।

শেষ পর্যন্ত রোজ় ব্রাউনের খুনের ঘটনার রহস্যের জট খুলল রিডের তদন্তের ফলে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলেও তাঁর তদন্তের পদ্ধতি কলকাতার পুলিশি ব্যবস্থায় একটা বিশেষ পরিবর্তনের সূচনা করল৷ কমিশনার স্যান্ডার্স হগ উপলব্ধি করলেন, এই রকম খুনের মতো জটিল রহস্যের জাল ছেঁড়ার জন্য প্রয়োজন একটা স্বতন্ত্র গোয়েন্দা বিভাগ। রোজ় ব্রাউনের খুনের ঘটনার প্রায় আট মাস পরে ১৮৬৮-র ২৮ নভেম্বরে ১৪৯ নং বিজ্ঞপ্তিতে হগ ঘোষণা করলেন, এর পর থেকে কলকাতা পুলিশের একটা স্বতন্ত্র গোয়েন্দা বিভাগ থাকবে। এই উদ্যোগ ব্রিটিশ ভারতে পুলিশি ব্যবস্থায় প্রথম এবং অভিনব। এত দিন কলকাতার পুলিশি ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল লন্ডন পুলিশের মডেল। পুলিশ কমিশনারের পদ সৃষ্টি হয়েছিল ১৮৫৬-র পয়লা নভেম্বরে, বিলেতের মডেলে। কলকাতার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট স্যামুয়েল ওয়াচোপ হন প্রথম পুলিশ কমিশনার। প্রস্তাব ওঠে একটা গোয়েন্দা দল গঠন করার, কিন্তু ছোটলাট ফ্রেডরিক জেমস হ্যালিডে নাকচ করে দেন সেই প্রস্তাব। অবশেষে এক যুগ পর সেই গোয়েন্দা দল গঠিত হল। রিচার্ড রিড যোগ দিলেন সেই দলে। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকে ওয়াচোপ দ্বিতীয় বার কমিশনার হয়ে এই অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, স্বতন্ত্র গোয়েন্দা বিভাগ চালু হওয়ায় খুশি হননি স্থানীয় ইন্সপেক্টররা। কারণ, তাঁরা দেখছিলেন, বিশেষ ঘটনার তদন্তে সমস্ত কৃতিত্ব কেড়ে নিচ্ছে গোয়েন্দারা। এমনকি অনেকে নিস্পৃহ হয়ে পড়েছিলেন তদন্তের কাজে। ওয়াচোপ গোয়েন্দা দলের বিলুপ্তি ঘটালেন। কেবল তদন্ত করার জন্য কয়েক জনকে রাখলেন ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে। ১৮৭৩-এ হগ আবার ফিরে এলেন কমিশনারের পদে এবং রিচার্ড রিডকে দিলেন গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব। রিড একই সঙ্গে হলেন গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর এবং সুপারিন্টেনডেন্ট। গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দিয়ে রিড দারুণ সাফল্য পেলেন গোয়েন্দা হিসেবে। তাঁর ধারালো পর্যবেক্ষণ শক্তি এতটাই নির্ভরযোগ্য মনে হয়েছিল যে, ১৮৭৫-৭৬-এ প্রিন্স অব ওয়েলস— যিনি পরে সপ্তম এডওয়ার্ড নামে ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেছিলেন— ভারতে এলে রিডকে নিযুক্ত করা হয় তাঁর দেহরক্ষী হিসেবে। গোয়েন্দা হিসেবে রিড অপরাধের তদন্ত করতে গিয়ে প্রথাগত ছকে বাঁধা পুলিশি পদ্ধতিকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রয়োগ করেন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি, যা ছিল রীতিমতো অভিনব। অপরাধী চিহ্নিতকরণে তিনি হাতিয়ার করেছিলেন ফিজ়িয়োনমি বা মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণকে। রিডের বক্তব্য ছিল, মানুষের মুখমণ্ডল মনের অভ্রান্ত রূপের দর্পণ। মানুষের মুখের আনন্দ, ক্রোধ, ভয়, লজ্জা, ভাবের প্রকাশকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে সে অপরাধী না নির্দোষ, তা নির্ণয় করতে অসুবিধে হয় না এক জন বুদ্ধিমানের। প্রয়োজন শুধু সযত্ন প্রশিক্ষণ। কর্মরত অবস্থায় তিনি প্রশিক্ষণ দিতেন তরুণ পুলিশ অফিসারদের। ছাত্রদের বলতেন, এক জন মানুষের সদাচার বা সদ্‌গুণ নিয়ে মাথা ঘামিও না, চেষ্টা করো তাকে নিখুঁত ভাবে পড়তে।

শুধুমাত্র সন্দেহভাজনের মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন এবং চোখের চাউনি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করে রিড যে সব অপরাধের রহস্য ভেদ করে অপরাধীকে শনাক্ত করেছিলেন, তার বর্ণনা রয়েছে তাঁর গ্রন্থে। একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যাক। কর্নেল বার্ন ছিলেন ভারত সরকারের প্রাক্তন মিলিটারি সেক্রেটারি। থাকতেন তেরো নম্বর লাউডন স্ট্রিটে। এক রাতে কে বা কারা তাঁর স্ত্রীর ঘরের আলমারি ভেঙে চুরি করে নিয়ে যায় প্রায় হাজারখানেক টাকা৷ রিড তদন্ত করতে গিয়ে লক্ষ করলেন, যে হাতিয়ার দিয়ে আলমারি ভাঙা হয়েছে, সেটা পড়ে আছে ঘরের মধ্যেই। কাজটা যে পেশাদার চোর বা বাইরের কারও দ্বারা হয়নি, সেটা এক লহমায় বুঝে গেলেন রিড। পেশাদার চোর কখনও ওই রকম হাতিয়ার ব্যবহার করে না এবং ঘটনাস্থলে ফেলে যায় না আনাড়ির মতো। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ছাড়া তৃতীয় কেউ নেই। আছে এক দল ভৃত্য। রিডের সন্দেহ হল চুরিটা করেছে বাড়ির ভৃত্যদের মধ্যে কেউ। তিনি বাড়ির সমস্ত ভৃত্যকে দাঁড় করালেন এক লাইনে। তার পর ধীরে ধীরে প্রত্যেকের সামনে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন তাদের চোখ-মুখ। এক জনের মুখের ওপর তীব্র এবং সোজাসুজি দৃষ্টি ফেলতেই তার চোখের মণি চঞ্চল হয়ে উঠল। ঘোরাফেরা করতে থাকল ডান দিকে এবং বাম দিকে। অন্যদের মতো কিছুতেই চোখ রাখতে পারছিল না রিডের চোখের ওপর। ঢোক গিলছিল ঘন ঘন। রিড মুহূর্তে গৃহকর্তাকে দেখিয়ে দিলেন কে চোর। ভৃত্যটি অপরাধ স্বীকার না করে পারল না।

উদ্ধার হল চোরাই টাকা। শুধু মুখায়বয়ব পর্যবেক্ষণই নয়, তিনি প্রথাগত পদ্ধতিতে অপরাধীর স্বীকারোক্তি আদায় না করে অনেক সময় অপরাধীকে ফাঁদে ফেলে আদায় করতেন কবুলতি। তবে, রিডের পদ্ধতিতে তেমন ভরসা ছিল না অনেক দেশীয় গোয়েন্দার। কারণ, পারিবারিক অপরাধের তদন্তে কাজে লাগত না রিডের দেওয়া প্রশিক্ষণ।

রিডের বেশির ভাগ তদন্ত ছিল কলকাতার হোয়াইট টাউন বা সায়েব পাড়ার মধ্যে। যে সব অপরাধের তদন্ত তিনি করেছিলেন, তা সবই সংঘটিত হয়েছিল লাউডন স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, রাসেল স্ট্রিট, ওয়াটার লু স্ট্রিট, পোলক স্ট্রিট এবং ময়দানে। তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। অপরাধ নির্ণয়ে রিড যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, ঘটনার খুঁটিনাটি তথ্য, হস্তাক্ষর ইত্যাদির ওপর জোর দিলেও আপাতদৃষ্টিতে তাঁর মনোভাব ছিল অভিজাত ঔপনিবেশিক ইংরেজের মতোই রক্ষণশীল। দেশীয় অপরাধীদের সাহস, বুদ্ধিমত্তাকে তিনি দেখতেন খাটো করে। তাঁর দৃষ্টিতে বাঙালি অপরাধীরা ছিল কাপুরুষ এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এজিকল সারবেন্স যে ১৮৬৮-তে লি জুদাকে নিষ্ঠুর ভাবে খুন করেছিল পোলক স্ট্রিটে, কিংবা কিংসলে যে জড়িত ছিল রোজ় ব্রাউনের খুনের ঘটনায়— সকলেই রিডের দৃষ্টিতে নিতান্তই অধঃপতিত ইউরোপীয়।

একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রিড ছিলেন বঙ্গ-সমাজের নানা সংস্কারের কড়া সমালোচক, যদিও এ সব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা তাঁর ছিল না। বিধবাবিবাহে সরকারের সম্মতি দানে দোলাচল সমর্থন করতে পারেননি। বিধবাবিবাহের সমর্থকদের সমাজে একঘরে করে রাখার সামাজিক শাস্তিকে নিন্দা করেছিলেন কড়া ভাবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, হিন্দু বিধবাদের প্রতি তাঁর অভিপ্রায়শূন্য সমবেদনা, যা সমসাময়িক আর কোনও ইংরেজ আমলার মধ্যে ছিল বলে জানা যায় না। রিড অন্যান্য সামাজিক কুসংস্কারের সরাসরি নিন্দা করতেও ছাড়েননি।

রিডের সমসাময়িক বাঙালি পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি ১৯১১-তে অবসর নেন। রিডের গোয়েন্দাগিরির যে সংযত মূল্যায়ন তিনি করেছিলেন, তাতে দেখা যায় তাঁর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তবে, রিডের বইটি প্রকাশিত হওয়ার ছ’বছর পরে তাঁর ‘দারোগার দপ্তর’ কিন্তু রিডের প্রত্যয়েরই প্রতিফলন। তথাপি, তদন্তকারী ও লেখক হিসেবে রিডের কিছু সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করেছেন প্রিয়নাথ। সীমাবদ্ধতা ছিল প্রিয়নাথেরও, অন্তত গোয়েন্দা কাহিনিকার হিসেবে। এক জন খাঁটি, পেশাদার গোয়েন্দার প্রধান গুণ হওয়া উচিত কোনও আবেগ বা আদর্শকে প্রশ্রয় না দেওয়া, সে কাজে ব্যর্থ হয়েছিলেন রিড এবং প্রিয়নাথ দু’জনেই। অনেক ক্ষেত্রে রিড প্রকাশ করেছেন অপরাধীদের প্রতি অনুকম্পা, আর প্রিয়নাথ ‘দারোগার দপ্তর’-এ কোথাও
কোথাও সহানুভূতিশীল। রিড এবং প্রিয়নাথের কথা বাদ দেওয়া যাক। হোমসও সর্বদা পারেননি শুধু মস্তিষ্ককে চালনা করতে। কখনও কখনও উঁকি দিয়েছে অপরাধীদের প্রতি মনের দুর্বলতা।

এক জন আদর্শ প্রশিক্ষক এবং লেখক হিসেবে রিড আড়াল করার চেষ্টা করেননি নিজের ব্যর্থতা। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি বোকা বনে গিয়েছিলেন অপরাধীকে ধরতে গিয়ে। বড়বাজারে এক জুয়েলারি দোকান থেকে এক জন বারাঙ্গনা এবং তাঁর দুই সঙ্গিনী চমৎকার কায়দায় হাতিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন অলঙ্কার। রিড একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে যান তাঁদের কারসাজিতে। এ কথাও তিনি লিখেছেন নির্দ্বিধায়।

রিডের ‘এভরি ম্যান হিজ় ওন ডিটেকটিভ’ উনিশ শতকে কলকাতার নানা অপরাধের নিখুঁত রোমাঞ্চকর ছবি। সে কালে অপরাধবিজ্ঞান এ কালের মতো অত্যাধুনিক উপকরণ এবং ফরেনসিকের মতো উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমৃদ্ধ ছিল না। তথাপি আগেকার নাড়ি-টেপা বৈদ্যদের রোগ নির্ণয় করার মতো ক্ষমতার অধিকারী হয়ে রিড কিনারা করতে পেরেছিলেন অনেক জটিল অপরাধের রহস্য। রিডের বই আমাদের সামনে তুলে ধরে সে কালের কলকাতার অনেক বিচিত্র অপরাধের পরিচয়, যার মূলে ছিল নগরায়ণের প্রভাব। রিড দেখিয়েছেন, অনেক অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকত পরিবারের কোনও সদস্য। রিডের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-প্রসূত গোয়েন্দাগল্পগুলো আধুনিক গোয়েন্দা গল্পকারদের কাছে হতে পারে প্রেরণার উৎস। বলা যেতে পারে রিডের গোয়েন্দা গল্প ভারতীয় গোয়েন্দা সাহিত্যের পথিকৃৎ।

আরও পড়ুন

More from My Kolkata
Advertisement