Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৩ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

নরেন্দ্রনাথের ভাই

বৈষয়িক বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। অদ্ভুত প্রখর স্মৃতিশক্তি। প্রবল রসবোধ। ভুবনবিদিত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নরেন্দ্রনাথ তথা স্বামী বিবেকানন্দের তুলনায় আপা

শংকর
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:০৩
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

সিমলে দত্তবাড়ির এই অদ্ভুত মানুষটির জন্ম ১ অগস্ট, ১৮৬৯। স্বামীজি সম্পর্কে ছোট একটা ভুল শুরুতেই ভেঙে দেওয়া ভাল। আমাদের নরেন্দ্রনাথ কিন্তু বিশ্বনাথ দত্ত ও ভুবনেশ্বরী দাসীর জ্যেষ্ঠপুত্র নন। নরেনের আগে এঁদের আর একটি ছেলে ছিল, মাত্র আট মাস বয়সে নামকরণের আগেই শিশুটির দেহাবসান হয়। বিশ্বনাথের তিন পুত্র নরেন্দ্রনাথ, মহেন্দ্রনাথ ও ভূপেন্দ্রনাথের জন্ম তার অনেক পরে। আমাদের হিসেবমতো বিশ্বনাথ দত্তের ছেলেমেয়ের সংখ্যা দশ। চার ছেলে, ছয় মেয়ে। এঁদের মধ্যে নবম মহেন্দ্রনাথ ৮৭ বছর বেঁচে ছিলেন এবং কনিষ্ঠ ভূপেন্দ্রনাথের দেহাবসান ৮১ বছর বয়সে।

গৌরমোহন মুখার্জি রোডের দত্তবংশ সম্বন্ধে আমার কৌতূহল কমবয়স থেকে। অল্প বয়সে সিমুলিয়ার গৌরমোহন মুখার্জির গলি আমি ঘুরে এসেছি। বিবেকানন্দ ভিটেতে মহেন্দ্রনাথ দত্ত আমাকে একেবারেই পাত্তা দেননি, বরং তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। জানতে চেয়েছেন, মহাপুরুষদের জন্মস্থান দেখতে সময় নষ্ট করে কী লাভ হয়? সেই পুণ্যস্থানে আর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। পরবর্তী কালে এক সাহিত্যপ্রেমী সুরসিক সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, মহেন্দ্রনাথকে শেষশয্যায় দেখতে এসেছিলেন ডা. বিধানচন্দ্র রায় এবং মহেন্দ্রনাথের ‘শোকসংবাদ’ রচনা তাঁর সাংবাদিক জীবনের প্রথম দিনের প্রথম কাজ।

ভুবনবিদিত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার তুলনায় মহেন্দ্রনাথ তেমন কিছু করেননি, কিন্তু পরবর্তী কালে তাঁর শতখানেক বইয়ের অনেকগুলো পড়ে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি। স্বামীজির জীবনকথার উপাদান সংগ্রহ করতে বুঝেছি, মহেন্দ্রনাথ দাদার তুলনায় তেমন কিছু কীর্তিমান না হলেও মহেন্দ্রনাথের মতো মানুষ এ দেশে তেমন জন্মগ্রহণ করেননি। অন্য দেশ হলে এত দিনে তাঁর বিচিত্র জীবন নিয়ে নির্মিত অন্তত আধডজন চলচ্চিত্র বিশ্বজনকে মোহিত করত!

Advertisement

মহেন্দ্রনাথ অবশ্যই আমাদের কালের অনন্য এক দার্শনিক, দুঃসাহসী, গবেষক, চিন্তানায়ক, ইতিহাসবিদ, পরিব্রাজক এবং উদাসী এক সাধক। শুনেছি, লেখক মহেন্দ্রনাথের কলম ধরার অভ্যেস ছিল না, কিন্তু এই স্মৃতিধর পুরুষটি ভক্তজনকে ডিক্টেশন দিতেন—যেমনটা দিতেন ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় শিষ্য নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ। আরও শুনেছি, বই লিখে অর্থ উপার্জনের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন মহেন্দ্রনাথ। তাঁর নামাঙ্কিত বইগুলি ছাড়া এ দেশের রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনকে পুরোপুরি বোঝা প্রায় অসম্ভব। যদিও কেউ কেউ এখন দুঃখ করেন, লেখক মহেন্দ্রনাথ তাঁর প্রাপ্য সম্মান আজও পাননি। নিজের নামাঙ্কিত ছোট ছোট বইগুলি ছাড়াও আরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েক ডজন কথোপকথন। সব রচনা বোধ হয় আজও গ্রন্থিত হয়নি, কিন্তু ভক্তজন ও অনুরাগীদের এই সব স্মৃতিসঞ্চয়ে বিবেকানন্দ অ্যান্ড ফ্যামিলির যে সব খবরাখবর ছড়িয়ে আছে, তা বিস্ময়কর। আমাকে সবচেয়ে যা বিস্মিত করে, তা হল তাঁর অনন্য স্মৃতিশক্তি, সেই সঙ্গে রসবোধ ও সত্যনিষ্ঠা। মহেন্দ্রনাথ যখন লেখক, তখন আমরা এক আশ্চর্য বিবেকানন্দকে বারে বারে খুঁজে পাই। ঘটনামালার গভীরে ঢুকে খুঁজে পেতে ইচ্ছে করে সেই বিবেকানন্দকে, যিনি আজও তুলনাহীন!

একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, ভুবনবিদিত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার থেকে তিনি ছ’বছরের ছোট। এই সাধকের প্রাক্‌সন্ন্যাস জীবনের তথ্য তাঁর থেকে বেশি কেউ জানতেন না। কিন্তু ঐতিহাসিকের সত্যনিষ্ঠা নিয়ে তিনি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সম্বন্ধে যে সব ঘটনামালা দেশে এবং বিদেশে লিপিবদ্ধ করেছেন, সেখানে তাঁকে দেবত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে অহেতুক কোনও ব্যস্ততা নেই। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে তিনি কী নামে ডাকতেন? ‘দাদা’ বলতেন কি না, তা ঠিক বুঝতে পারা যায় না। কিন্তু অনেকগুলি বই একের পর এক পড়লে বোঝা যায়, এই সব লেখা না থাকলে আমরা সম্পূর্ণ বিবেকানন্দকে এমন নিবিড় ভাবে পেতাম না। কিন্তু কেমন ছিল তাঁর সঙ্গে দাদার সম্পর্ক? বিবেকানন্দ বচন যাঁরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন, তাঁরা জানেন—বিবেকানন্দ তাঁর ভাইকে যে ভূমিকায় দেখতে চেয়েছিলেন, তা পূর্ণ হয়নি এবং জ্যেষ্ঠের এই হতাশা এবং কঠিন মন্তব্য চিঠিপত্রের দু’এক জায়গায় ছড়িয়ে আছে।

এই সব প্রসঙ্গে এক সময় অবশ্যই আসতে হবে। কিন্তু মহেন্দ্রনাথের জীবনকথার কয়েকটি বিভাগ সবারই নজরে পড়ে যায়। প্রথমে গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের যে বাড়িতে তাঁর জন্ম: মহেন্দ্রনাথ নিজেই জানিয়েছেন—ভিটেবাড়ির ভিতরে দেড়বিঘা জমি ছিল এবং অনেক জমিতে রেওয়ত ছিল। দশ ভাইবোনের মধ্যে ‘সাতজন বড় হইয়াছিল।’ যে কন্যারা বড় হয়েছিল, তাঁদের নাম হারামণি, স্বর্ণলতা, কিরণবালা ও যোগেন্দ্রবালা। দাদার ও নিজের বল্গাহীন তামাকপ্রিয়তা সম্বন্ধে মহেন্দ্রনাথ নির্ভয়ে জানিয়েছেন, পিতৃদেবের কোচোয়ানের কাছ থেকেই এ ব্যাপারে নরেন্দ্রনাথের হাতেখড়ি। সে বলত, ‘বিলুবাবু, হুক্কা পিয়ো।’ হুঁকো থেকে নরেন্দ্রনাথের এই তামাকপ্রিয়তা যে নস্যি, খৈনি এবং চুরুটে বিস্তৃত হয়েছিল, তা আমরা মহেন্দ্রনাথের রচনা থেকেই জানতে পারি। মারবেল, লাটিম, ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে তিনি যে ব্যাটম্বল (এখনকার ক্রিকেট) খেলায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন, তাও মহেন্দ্রনাথের সুনিপুণ বর্ণনা থেকেই আমরা জানতে পারি।

পিতৃদেব বিশ্বনাথ দত্তের ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে ওকালতির খবররাখবর আমরা যতটুকু পাই, তা মহেন্দ্রনাথের জন্যই। আইনবিদ বিশ্বনাথ দত্তের কোনও চিত্র বা আলোকচিত্র আজও উদ্ধার হয়নি। কিন্তু মহেন্দ্রনাথ আমাদের জানিয়েছেন, সে বার লাহৌরে বিশেষ বরফ পড়ায় বিশ্বনাথ কানে কালা হয়ে যান। পসার ছেড়ে তিনি প্রথমে রাজপুতানা, পরে ইনদওর ও শেষে মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরে চলে যান। রান্নাবান্না এবং খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে নরেন্দ্রনাথের বিশেষ আগ্রহ যে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া, তা মহেন্দ্রনাথই আমাদের জানিয়েছেন। পোলাও ও মাংস রান্নায় তাঁর পিতৃদেব ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সেই দক্ষতা যে বিবেকানন্দ সন্ন্যাসজীবনেও ত্যাগ করেননি। আরও একটি মজার খবর— নরেন্দ্রনাথ অল্প বয়সে কিছুতেই ইংরেজি পড়তে চাইতেন না। শেষ পর্যন্ত জননী ভুবনেশ্বরীই নরেনকে বাংলা এবং ইংরেজি শেখানোর দায়িত্ব নেন।

দাদা সম্বন্ধে মহেন্দ্রনাথ যা লিখছেন তার আকার তেমন দীর্ঘ নয়, কিন্তু তথ্যের উৎস হিসেবে এগুলিকে সোনার খনি বলাটা অত্যুক্তি হবে না। এ ছাড়াও অনেক খবর ছড়িয়েছিটিয়ে আছে নানা জনের সঙ্গে মহেন্দ্রনাথের শেষ বয়সের সংলাপে। যেমন তাঁর ছোটবেলার খাদ্যবিলাস। স্কুল থেকে ফিরে দু’ভাই পাঁঠার মুড়ি দিয়ে কড়াইশুঁটির তরকারি প্রাণভরে খেতেন। এঁরা যে মিতাহারী ছিলেন, এমন ভাবার সুযোগ নেই! তাঁর বইতে আরও খবর আছে, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন তৈরির অনেক আগে নরেন তাঁর বন্ধুদের নিয়ে ‘গ্রিভি ক্লাব’ সংগঠন করেছিলেন এবং ভুনি খিচুড়ি তৈরিতে সবিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। আর একটি খবর আমার খুব ভাল লেগেছিল—বেদ বেদান্ত উপনিষদ বোঝার অনেক আগেই তিনি ফরাসি রান্নার দামি বই কিস্তিতে কিনেছিলেন। নিলামে কিনেছিলেন চায়ের কেটলি। চায়ের নেশা এতই প্রবল ছিল যে, ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের রাত্রে কাশীপুরে বাড়ির দরজায় আগুন ধরিয়ে, তাতেই সবাই মিলে চা পান করেছিলেন।

সে কালের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্বন্ধে মহেন্দ্রনাথ বিভিন্ন জায়গায় যে সব বিবরণ রেখে গিয়েছেন, তার কোনও তুলনা নেই। তিনি জানিয়েছেন কয়লার প্রচলনের আগে কলকাতার রান্নাঘরের কথা। সেই সময় সব বাড়িতে কাঠের জ্বালে রান্না হতো এবং খালধার থেকে গাড়ি করে ‘সুঁদুরীকাঠ’ আসত। ‘ইংরেজি ১৮৭৫ বা ৭৬ সালে গ্যাস ঘরেতে পাথুরে কয়লা চলন হলো এবং লোকের বাড়িতে গাড়ি করে বিনামূল্যে বিতরণ হত। ...ক্রমে কয়লার এক আনা করে মণ হলো।’ মহেন্দ্রনাথ জানাছেন, হুগলিতে তখন নাকি গুঁড়িগুঁড়ি বরফ পড়ত।

নরেন্দ্রনাথের বাল্যকাল সম্বন্ধে মহেন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘একসময় রাতের বিবাহেও ফলাহার হত, অর্থাৎ চিঁড়ে, দই, ঘি ইত্যাদি।’ যথাসময়ে কলকাতায় নিমন্ত্রিতের পাতে লুচির শুভাগমন, ‘তখনকার দিনে কলাপাতায় বড় বড় লুচি দিত, আর আলুনী কুমড়ার ছক্কা...কলাপাতার এক কোণে একটু নুন দিত।’

১৮৯১ সালে যখন এফ এ পাশ করেন, তখন তাঁর দাদা সন্ন্যাসী হয়ে পরিব্রাজক এবং দু’বছর পরে বোম্বাই থেকে জাহাজে আমেরিকায় পাড়ি দেন।

মহেন্দ্রনাথের সুদীর্ঘ জীবনকে ঠিক ভাবে বুঝতে গেলে কয়েকটি পর্বে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমে দাদার সঙ্গে শৈশব, বাল্যজীবন ও পিতার আকস্মিক দেহত্যাগে পারিবারিক বিপর্যয়। এর পরই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সংসারত্যাগে আর এক বিপর্যয় এবং‌ কাশীপুর উদ্যানবাটি ও বরাহনগর মঠে দাদার কঠিন জীবন যাপন। এর পরে স্বামীজির পরিব্রাজক জীবন সম্বন্ধে মেজ ভাইয়ের কাছে তেমন খবরাখবর নেই। দাদার বিদেশযাত্রার পরে নিয়মিত অর্থসাহায্য খেতড়ি থেকে আসত এবং খেতড়িরাজ নিজে গুরুর পরিবারের সব খবরাখবর নিতেন।

এফ এ পাশ করে, বিশেষ কিছু না করে ১৮৯৬ সালে খেতড়ির মহারাজের কাছ থেকে এক পিঠের জাহাজভাড়া নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়বার আশায় মহেন্দ্রনাথ লন্ডনে হাজির হন। তাঁর অজ্ঞাতে খেতড়ির মহারাজের কাছ থেকে বিদেশে আসার অর্থসাহায্য নেওয়া স্বামীজির মোটেই পছন্দ হয়নি। লন্ডনে মহেন্দ্রনাথ ব্রিটিশ মিউজ়িয়ামে নিয়মিত পড়াশোনা করতেন এবং সেই সময় প্রবাদপ্রতিম সান-ইয়াৎ-সেন-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সংসারত্যাগী দাদা ছিলেন ভাইয়ের আইন পড়ার বিশেষ বিরোধী। তিনি বললেন, আমেরিকায় গিয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ো, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ভাই রাজি হলেন না। ফলে দাদার প্রবল ধৈর্যচ্যুতি। তিনি সোজা বললেন, দেশে ফিরবার জাহাজভাড়া তিনি দিতে পারবেন না। মনে রাখতে হবে, এই পর্বে স্বামীজির প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়, যার বিবরণ মহেন্দ্রনাথ দিয়েছেন। এর পর মহেন্দ্রনাথ উধাও, দাদাকে না বলেই পায়ে হেঁটে বিলেত থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত। তাঁর এই আচরণ দাদাকে বিশেষ কষ্ট দিয়েছিল এবং স্বামীজি উধাও হওয়া ভাইকে অন্যের মাধ্যমে খবর পাঠাচ্ছেন, তাতে লিখছেন, মহিম যেন মাকে চিঠি দেয়।

১৮৯৮ থেকে টানা পাঁচ বছর নিঃসম্বল অবস্থায় পর্যটন, মহেন্দ্রনাথের জীবনে এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়। এর সম্বন্ধে সামান্য কিছু লেখা হলেও তা যথেষ্ট নয়। ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ায় মহেন্দ্রনাথের দুঃসাহসিক ভ্রমণ সম্বন্ধে যৎসামান্য যা লিপিবদ্ধ হয়েছে। তা যথেষ্ট নয়।

পরবর্তী কালে তাঁর ভক্তদের এক জন যে সংক্ষিপ্তসার দিয়েছেন তা নির্ভরযোগ্য মনে হয়। বর্ণনাটি মোটামুটি এই রকম:

‘ইংলণ্ড ত্যাগ করিয়া জাহাজে ফরাসি দেশ। সেখান হইতে জাহাজে জিব্রাল্টার পার হইয়া হাঁটাপথে মরাক্কা মাল্টাদ্বীপ, আলেকজান্দ্রিয়া, কায়রো।... কায়রো হইতে জেরুসালেম... আড়াই মাস অবস্থান করেন দামাস্কাসে। ত্রিপোলীতে দু’এক মাস, কনস্টানটিনোপল, সোফিয়া, বুলগেরিয়া, বানকাল পাহাড় অতিক্রম ও নানা পথ ভ্রমণ করিয়া পুনরায় কনস্টানটিনোপলে।... সে স্থান হইতে আরমেনিয়া, সেখান হইতে ককেশাস পাহাড় পার হইয়া বাকু শহরে অবস্থান। সেখান হইতে কাসপিয়ান সাগর পার... তেহরান-খোরসান-ইসপাহান-মেসোপটেমিয়া-বাগদাদ, বসরা-করাচি-কাশ্মীর।’

দাদার আকস্মিক দেহত্যাগের কয়েক দিন পর মহেন্দ্রনাথের কলকাতায় ফেরা।

সুদীর্ঘ জীবনে মহেন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন অনুধ্যান ছাড়াও অসংখ্য ভক্তজনের কাছে যে সব কথা বলেছেন, তার বেশ কিছু আমাদের হাতে রয়েছে। এই সব সংলাপ বিশ্লেষণ করে, তার থেকে মণিমুক্তো সংগ্রহ করা আজও হয়নি। তাঁর ব্যক্তিজীবন সম্বন্ধেও আমরা সমস্ত খবরাখবর সাজিয়ে নিতে পারিনি। কিছু কিছু খবর অবশ্য পাওয়া যাচ্ছে, যেমন ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তনকালে (১৯০২) মহেন্দ্রনাথ কিছুকাল করাচিতে সাংবাদিকতা করেছিলেন। কলকাতায় ফিরে মহেন্দ্র কখনও উপার্জনের তেমন চেষ্টা করেননি। বই থেকে উপার্জনের চেষ্টা সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব মতামত, ‘‘বই বেচার পয়সা থেকে এক পয়সার পান কিনে যদি আমায় খাওয়াও তা হলে আমি পতিত হব, আর তোমরা যদি খাও তা হলে তোমাদেরও বিশেষ অকল্যাণ হবে।’’

তবে বৈষয়িক বিষয়ে মহেন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন তা নয়। তাঁর এক ভক্ত লিখেছেন— ‘পৈত্রিক সম্পত্তি আত্মীয়দের গ্রাস থেকে তিনি নিজে অতি পরিশ্রম এবং অর্থাভাবের সঙ্গে লড়াই করে উদ্ধার করেছিলেন।’ গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বসতবাড়ি ছাড়া তিন-চারটি ভাড়াটে বাড়ি তাঁর এবং ছোটভাই ভূপেনবাবুর ছিল। এক সময় তিনি বলেছিলেন, ‘‘বাবার সম্পত্তি যেমন পেয়েছিলাম তেমনই রেখে যাবো।’’ তবে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে ছিল ‘দুই কি তিনখানি আটহাত মোটা কাপড়, হাতকাটা কামিজ দুই-একটি ও একটি লাঠি এবং রাস্তার ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনা আট আনা দামের চশমা এবং তামাকের লটবহর।’ মহিমবাবু বাড়িতে যে অন্ন পেতেন, তা তাঁর ভাড়াটেবাড়ির কিছু অংশ থেকে।

পরিচিত জনেরা মহেন্দ্রনাথের অদ্ভুত স্মৃতিশক্তির কথা বার বার উল্লেখ করেছেন। এক বার রসিকতা করে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘‘আমার ব্রেনের এক স্কোয়ার ইঞ্চিতে এক একটা বড় লাইব্রেরি আছে।’’ আবার তিনি বলছেন, ‘‘বই-পড়া বিদ্যের কানাকড়ি দর নেই।... আমি যা দেখেছি, তার কিছুই বলে যেতে পারলাম না। আমার গায়ে কুড়িটা জিভ বসিয়ে দাও, চল্লিশজন লোক বসে লিখুক কত দেখি।’’

জ্যেষ্ঠভ্রাতা স্বামীজি সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য, ‘‘তিনি দেশের এতো প্রিয়পাত্র হয়েছিলেন, দেশকে ভালবেসেছিলেন বলে। তাঁর ধ্যান-ভজনের জন্য অতোটা নয়। হার্ট এবং ইনটেলেক্ট দুটোই চাই কিছু করতে গেলে।’’ মহেন্দ্রনাথের আর একটি বিখ্যাত পরামর্শ, ‘‘কারও নিন্দে কোরো না, রূঢ় বাক্য ব্যবহার কোরো না। বড় ক্ষতি হয়। সবাইকে ভালবাসবে।’’

কথাপ্রসঙ্গে মহেন্দ্রনাথ এক বার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মাপজোক করেছেন। কথা উঠল, নরেনের কিছু ছিল না, ঠাকুরের কাছে গিছলো, তাই বিবেকানন্দ হলো! মহেন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘আরে সে যে পোয়েট ছিল, পেন্টার ছিল। ফিলজফার ছিল!’’

মহেন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল নানা বৈচিত্র। এক সময় তাঁর ভ্রমণকাহিনি সম্পর্কে বলা হত—তিনি ফা-হিয়েন, ইবন বতুতার সগোত্র। নানা বিষয়ে তিনি গ্রন্থ রচনা করে গিয়েছেন। শোনা যায় ওঁর তিরিশটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়েছিল। আরও শোনা যায়, তিনি নিজে কখনও কলম ধরেননি। সব সময় তিনি মুখে বলে গিয়েছেন এবং অন্য কেউ লিখেছে। ‘স্বামীজির জীবনের ঘটনাবলী’, ‘লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ’ ‘স্বামী বিবেকানন্দের বাল্যজীবন’ ‘কাশীধামে বিবেকানন্দ’ ইত্যাদি বইগুলো না থাকলে বিবেকানন্দকে আমরা এত নিবিড় ভাবে জানতে পারতাম না।

‘ঘটনাবলী’র তিনটি খণ্ড পাঠ না করলে স্বামী বিবেকানন্দ পাঠকের মনে যেন অপূর্ণ থেকে যান। এখানে তিনি ‘জাতক’-এর রীতি অনুসরণ করেছেন— ‘নিজের কোন মত প্রকাশ করা হয় নাই, পাঠ করিয়া যিনি যাহা বুঝিবেন সেইরূপ মীমাংসা করিবেন।’ একই মাপকাঠিতে অতুলনীয় স্মৃতিকথা দু’খণ্ডের ‘লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ’। যার ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন, ১৮৯৬ সালে স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা থেকে লন্ডনে যান এবং মধ্যম ভ্রাতাও এক সপ্তাহ পরে লন্ডনে পৌঁছন। দীর্ঘ জীবনলাভের সৌভাগ্য হয়েছিল মহেন্দ্রনাথের। শেষ পর্বে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়কে বাড়িতে ডাকা হয়েছিল। পরীক্ষা করে তিনি বললেন, ‘‘কি করে বেঁচে আছেন উনিই জানেন, এসব এঁদের পক্ষেই সম্ভব। আমরা চিকিৎসক, আমাদের শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা করে যেতে হবে।’’

তাঁর এক ভক্ত লিখে গিয়েছেন—‘১৩৬৩ সালের ২৮ আশ্বিন, রবিবার, পুণ্য বিজয়া দশমী। রাত্রি ১২টা ৪২ মিনিটে সব স্থির হইয়া গেল। আশ্চর্য, ঠিক সেই সময় পুণ্যদর্শনের ঘরের আলোটি ফিউজ হইয়া যাওয়ায় বরেনবাবু অতি দুঃখে বলিলেন, আমাদের আলোও নিভল।’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement