এ যেন অ্যাথলেটিক্সের ট্র্যাকে বাঙালি মেয়ের ম্যাজিক! রবিবার এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ দিনে তারিয়ে তারিয়ে যা উপভোগ করল ভুবনেশ্বরের কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে হাজির দর্শকরা।

এক বছর আগেও নিশ্চিত ছিল না তিনি ফের অ্যাথলেটিক্সে ফিরতে পারবেন কি না। কিন্তু উত্তরবঙ্গের হেপ্টাথলিট স্বপ্না বর্মন এ দিন হেপ্টাথলনে সোনা জিতে প্রমাণ করলেন কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প কিছুই হয় না।

এ দিন ভারতের জেতা পাঁচটি সোনার মধ্যে সব চেয়ে বেশি আলোড়ন ফেলে দেয় বাংলার অ্যাথলিট স্বপ্নার হেপ্টাথলনে সোনা জয়। হেপ্টাথলনের সাতটি ইভেন্টে স্বপ্নার সংগৃহীত পয়েন্ট ৫৯৪২। ৫৮৮৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করে রুপো পান জাপানের মেগ হেমফিল। এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পেলেন ভারতেরই পূর্ণিমা হেমব্রম। তাঁর সংগ্রহ ৫৭৯৮ পয়েন্ট।

এ দিন সোনা জেতায় অগস্টে বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে দেশের হয়ে নামার যোগ্যতা অর্জন করলেন জলপাইগুড়ির রাজবংশী পরিবারের এই মেয়ে। এর আগে অ্যাথলেটিক্সের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলা থেকে সোনা এনেছেন দু’জন। জ্যোতির্ময়ী শিকদার এবং সোমা বিশ্বাস। এ দিন সোনা জিতে সেই ক্লাবে ঢুকে পড়লেন স্বপ্না বর্মনও।

কোচের সঙ্গে হেপ্টাথলনের সোনাজয়ী স্বপ্না বর্মন। নিজস্ব চিত্র

বাঙালি এই মেয়ের কৃতিত্ব আরও বেশি করে আলোচিত হচ্ছে এই কারণেই যে এক বছর আগেও ফের স্বপ্নাকে ট্র্যাকে দেখা যাবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল রাজ্য অ্যাথলেটিক্স মহলে। দু’বছর আগে ২০১৫ তে জাতীয় প্রতিযোগিতায় শেষ বার নেমে সাফল্য পেয়েছিলেন স্বপ্না। কিন্তু এর পরেই পিঠের ব্যথায় কাবু হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় যায় যে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে জলপাইগুড়িতে নিজের গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাইয়ের কোচ সুভাষ সরকার স্বপ্নাকে ফের স্বমহিমায় ফেরাবেন বলে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। তিনিই স্বপ্নাকে প্রথম মনোবিদের কাছে নিয়ে যান। তার পর কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে স্বপ্নাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন আগের ফর্মে।

এ দিন ভুবনেশ্বর থেকে সোনা জিতে ফোনে স্বপ্না বলছিলেন, ‘‘পিঠের ব্যথা এখনও রয়েছে। কিন্তু বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নামব বলে সেগুলোকে পাত্তা দিইনি। সুভাষ স্যার না থাকলে এই জায়গায় আসতে পারতাম না।’’

আর স্বপ্নার সেই কোচ সুভাষ সরকার বললেন, ‘‘স্বপ্নাকে আজ বলেছিলাম, বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে নামতে হলে তোকে ভাল কিছু করতেই হবে। স্বপ্না যে এ রকম পারফর্ম করবে তা ভাবতে পারিনি। ও যে শেষ হয়ে যায়নি তা প্রমাণ করে ছাড়ল। কোচিং করানোটা আজ সার্থক।’’

শনিবারেই চিনকে পিছনে ফেলে এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে পদক তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে ফেলেছিল ভারত। রবিবার প্রতিযোগিতার শেষ দিনেও পাঁচটি সোনা, একটি রুপো ও তিনটি ব্রোঞ্জ জিতে শীর্ষ স্থানেই শেষ করল ভারত। স্বপ্না ছাড়াও এ দিন সোনা পেয়েছেন বাংলার আর এক মেয়ে দেবশ্রী মজুমদার। মহিলাদের ৪X৪০০ মিটার রিলেতে সোনাজয়ী ভারতীয় দলে ছিলেন তিনি। 

ফলে এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বমোট ১২ টি সোনা, পাঁচটি রুপো এবং ১২ টি ব্রোঞ্জ জিতে পদক তালিকার শীর্ষেই রয়ে গেল ভারত। দ্বিতীয় স্থানে রইল চিন। তাদের সংগ্রহ আটটি সোনা, সাতটি রুপো ও পাঁচটি ব্রোঞ্জ।

বত্রিশ বছর আগে জাকার্তায় এই প্রতিযোগিতাতেই ১০ টি সোনা, পাঁচটি রুপো ও সাতটি ব্রোঞ্জ—মোট ২২ টি পদক জিতে শেষ করেছিল ভারত। এ দেশের অ্যাথলেটিক্সে এতদিন এই ফলই ছিল এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের সেরা ফল। কিন্তু এ বার তার চেয়েও সাতটি পদক বেশি পেয়ে মোট ২৯ টি পদক জিতে নতুন নজির গড়ল ভারতীয় অ্যাথলেটিক্স। স্বপ্নাদের এই কৃতিত্বে ভারতীয় অ্যাথলেটিক্স এশীয় স্তরে যে সাফল্য পেল এ বার সেটা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চেও ধরে রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বপ্নারা কি পারবেন এ বার বিশ্বমঞ্চেও নিজেদের তুলে আনতে?